'পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ' আহমদ ছফার একটি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। লেখক তাঁর পুরনো বাসা পরিবর্তন করে নতুন বাসায় যান। আগের বাসায় রেখে আসা গাছের জন্য খুব মায়া লাগছিল। নতুন বাসায় তাঁর পালিত পুত্র সুশীল বাসার ছাদে আধমরা একটি তুলসীচারা দেখতে পায়। সে চারাটি বাসায় নিয়ে আসে। পরদিন দেখা যায়, চারাটি উঠে দাঁড়িয়েছে। একসময় গাছটি বীজ দেওয়া শুরু করে। বাসার তুলসী ও নয়নতারার ফুল দেখে লেখকের জীবনের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস নতুন করে জন্মায়। আহমদ ছফা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক হলে থাকেন। একদিন শাহবাগ থেকে হলে যাওয়ার পথে তাঁর চোখে পড়ে রাস্তার মধ্যে পড়ে থাকা থেঁতলানো বেগুনচারা। তিনি চারাটি হলে নিয়ে এসে একটি পাত্রে রোপণ করেন। পরের দিন সকালে লেখক বেগুনচারাটি দেখে অবাক হয়ে যান। কারণ চারাটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। লেখক বলছেন,
থেঁতলানো বেগুন চারা যদি উঠে দাঁড়াতে পারে, আমার তো হতাশ হওয়ার কোন কারণ নেই।
মানে জীবনে অনেক কষ্ট ও বাধা আসবে, সেগুলো উপেক্ষা করে আমাদের উঠে দাঁড়াতে হবে। একসময় আহমদ ছফা তাঁর হলের সামনে ফাঁকা মাঠে বেগুনচারা চাষ করার চিন্তা করেন। যে চিন্তা সেই কাজ। শুরু হলো বেগুনচারা লাগানো। কাজটি করার সময় তাঁর খুব আনন্দ-উদ্দীপনা কাজ করেছিল। তিনি মনে করতেন, তাঁর পূর্বপুরুষের পেশাকে তিনি নিজের মধ্যে লালন করছেন। সবজির বাগানে বেগুনসহ টমেটো, বাঁধাকপি, মরিচ ইত্যাদি চাষাবাদ শুরু করেন। সেগুলো রক্ষার জন্য তিনি বাগানের চারদিকে বেড়া দেন। তাঁর ভাষায়
গরুর চাইতেও হারামখোর প্রাণী সংসারে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের বস্তিতে বসবাসরত ছোট্ট ছেলেমেয়েদের নিয়ে, যারা সারা দিন ঘুরে বেড়ায়, রাস্তাঘাটে বিভিন্ন জিনিস কুড়িয়ে সেগুলো বিক্রি করে মা-বাবার হাতে ৮-১০ টাকা তুলে দেয়। লেখক তাঁর বন্ধু মোস্তানকে নিয়ে শুরু করলেন বস্তির ছেলেমেয়েদের পাঠদান কার্যক্রম। তাঁরা তৈরি করেন একটি স্কুল। সেখানে পাঠদান করতে থাকেন সেই বস্তির ছেলেমেয়েদের। পাঠদান কার্যক্রমের ফলে লেখক লক্ষ্য করলেন, প্রথম দিকে বাচ্চাদের যে আচরণ এবং কথাবার্তা, সেগুলোর পরিবর্তন এসেছে। তিনি মনে করেন, শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষের চিন্তা-চেতনা ও আচরণের পরিবর্তন হয়, যা উচ্চতর হৃদয় গঠনেরও সহায়ক। লেখক স্মৃতিচারণা করেন তাঁর শৈশবের। তাঁদের ঘরের পাশেই থাকা শতবর্ষী আমগাছ, সেই আমগাছের সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। তিনি মনে করতেন, বৃক্ষ কথা বলতে পারে। যিনি বৃক্ষকে ভালোবাসেন, তিনি বৃক্ষের ভাষা ও ভাব বুঝতে পারেন। তাই লেখক বলেন,
মানুষ যদি বৃক্ষের শরণাগত না হয়, তার জীবনশক্তি জীবনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে।
লেখক সব সময় বৃক্ষের ব্যথায় ব্যথিত হতেন। নিজের মধ্যে বৃক্ষের ভালোবাসা জন্মে বলে তিনি অনুভব করতেন। লেখক বলেন,
মানুষ তরুর কাছে এই মৌন জাগরণের স্বভাব আয়ত্ত করে তবেই তপস্যা করতে শেখে। মানুষ গাছের কাছ থেকে হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
লেখকের একটি পোষা পাখি ছিল, পাখিটির সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। পাখিটির আনন্দে লেখকও আনন্দিত হতেন, পাখিটি কষ্ট পেলে লেখকও কষ্ট পেতেন। একদিন পাখিটি মারা যায়। দুঃখে ভেঙে পড়েন লেখক। তাই লেখক বলেছেন,
পাখি দাগা দিয়ে মারা যাবে অথবা পালিয়ে যাবে।
একেবারে শেষের দিকে আহমদ ছফা বলছেন,
মাটির মানুষের জগতে হিংস্রতা এবং হানাহানি দেখে আকাশের পাখির জগতে আমি আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেখানেও হিংস্রতা এবং জাতবৈরিতার প্রকোপ দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং মানুষের মত কর্তব্য পালন করার জন্য আমার মানুষের কাছে ফিরে না গিয়ে উপায় কি? আমি বৃক্ষ নই পাখি নই মানুষ। ভালো হোক মন্দ হোক বেদনার হোক আমাকে মানুষের মত মনুষ্য জীবন যাপন করতে হবে।
বইটিতে দেখতে পাই তুলসী ও নয়নতারার গাছ আমাদের কিভাবে অনুপ্রাণিত করে। বৃক্ষ আমাদের ভালোবাসতে শেখায়। আমাদের চলতে হলে আমাদের চারপাশের মানুষদের নিয়ে চলতে হবে।
**********
ছবি: chatgpt

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম