গল্পটা পড়তে পড়তে কয়েকবার মনে হচ্ছিল, থামি, হাত সরিয়ে নিই। কিন্তু পারলাম না। কাজী রাফির এই গল্পটা আস্তে আস্তে বুকের ওপর বসে যায়। প্রথমে মনে হচ্ছিল, একটা পুরনো প্রেমের গল্প হবে। ছেলেটা মেয়েটাকে ভালোবাসত, কিছু একটা হয়ে গেল, দুজন আলাদা হয়ে গেল। আমরা হাজারটা গল্প পড়েছি, এটাও তার মতোই কোনো একটা। কিন্তু গল্প যত এগোতে থাকে, মনে হতে থাকে, না, এটা প্রেমের গল্প নয়। এটা একটা মানুষের ভেঙে যাওয়ার গল্প। আর সেই ভাঙে যাওয়াটা নিয়ে কেউ কাঁদে না, কেউ হাহাকার করে না। শুধু ফেসবুক স্ক্রিনে একটা ছবি আসে, সেই ছবিটা দেখে পুরো জীবনটা ঝড়ের মতো উল্টে যায়।
গল্পটা শুরু হয় আমেরিকা থেকে। যেখানে বাদল নামের একজন মানুষ তার স্ত্রী টুম্পার ফোনে একটা ছবি দেখে। শিকল বাঁধা, পাগল হয়ে যাওয়া একটা মেয়ে। টুম্পা বলে, মহিলার নাম মেঘলা, গ্রাম বালিয়াডাঙ্গা, যাত্রাপালায় কাজ করতো বলে সমাজ তাকে পাগল বানিয়ে দিয়েছে। এই কথাটাই একটা বোমার মতো। কারণ বাদল জানে এই মেঘলাকে, চেনে সেই কিশোর বয়স থেকে। আর তারপর গল্পটা আস্তে আস্তে পেছন হটতে থাকে। বর্তমান থেকে অতীতে, আমেরিকা থেকে বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে। পাঠক আগে থেকেই জানে মেঘলার শেষটা কী! শিকলবাঁধা, পাগল, অপমানিত। কিন্তু ফ্ল্যাশব্যাকে যখন সেই মেঘলাকে দেখা যায়, তখন যে যন্ত্রণাটা হয়, সেটা কাউকে বোঝানো যাবে না। কারণ সেই মেঘলা তো আর শিকলবাঁধা কোনো পাগল নয়, সে হাসিমুখ, চঞ্চল, কবিমন একটা কিশোরী। এই দুটো ছবির মাঝের ফাঁকটা কতটা বড়, সেটা গল্প শেষ হওয়ার পর বুকে এসে লাগে।
ফ্ল্যাশব্যাকে যখন গল্পটা যায়, মনে হয় অন্য একটা জগতে ঢুকে পড়ি। বালিয়াডাঙ্গা গ্রাম, নভেম্বরের রোদ, ভাতারমারির দিগন্তহীন মাঠ। সর্ষেফুলের হলদে কণা হাওয়ায় ভাসতে থাকে। আর সেই মাঠের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দুজন কিশোর, বাদল আর মেঘলা। মেঘলা যাচ্ছে গোপীনাথপুর মেলায়, যাত্রাপালায় যোগ দিতে। বাবা নেই, অষ্টম শ্রেণি অসমাপ্ত, কাঁধে সংসারের ভার। এই মেঘলা কতটা সাহসী, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সে জানে, যাত্রাপালায় যাওয়া মানে সমাজের চোখে নিজেকে নষ্ট করা। কিন্তু তার মা রাজি হয়েছে। অভাব যে কতটা নিষ্ঠুর, সেটা যারা অভাবে পড়েনি, তারা বোঝে না। আর বাদল? বাদল সেই মেঘলাকে মেলায় পৌঁছে দিতে রাজি হয়। পঁচিশ মাইল হেঁটে। নিজের কেডস মেঘলাকে পরিয়ে দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে। এই কেডসটার কথা পড়ার সময় বুকটা একটু ভারী হয়ে যায়। একটা কিশোর ছেলে যখন তার জিনিসটা ত্যাগ করে, তখন সেটা শুধু জিনিস নয়, তার নিজের একটা অংশকে অন্য কারো হাতে তুলে দেওয়ার মতো।
পথে পা-ভাঙা দোয়েল পাখির কাহিনিটা আসে, সেটা গল্পের সবচেয়ে কষ্টের জায়গাগুলোর একটা। বাদল ছোটবেলায় একটা পা-ভাঙা দোয়েল পেয়েছিল, বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে কাঁদত, কবর দিয়েছিল। মেঘলা তখন বলেছিল,
আমি সেই পা ভাঙা দোয়েল পাখিটা, যার সাথে তোর একদিন ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে।
এই একটা লাইন! এই একটা লাইনের জন্যই পুরো গল্পটা পড়ার মতো। মেঘলা শুধু তখনকার জন্য কথাটা বলছে না, সে নিজের জীবনের একটা ভবিষ্যদ্বাণী করে ফেলছে। আর সেই ভবিষ্যদ্বাণীটা ঠিকই সত্যি হয়েছে। দোয়েলটা মারা গেছে, মেঘলাও মরে গেছে। যদিও সে বেঁচে আছে, কিন্তু যে মেঘলাটা বাদলের পাশে হেঁটে গেছিল, সেই মেঘলাটা আর নেই।
মেলায় গিয়ে যা হয়, তা বাদলের জীবনের সবচেয়ে অসহায় মুহূর্তগুলোর একটা। রওশন সার্কাসের তাঁবুতে তার জ্বর, মেঘলা নার্সের মতো সেবা করে। রাতের মেলায় ঘুরে বেড়ায়। মেঘলা পিতলের একটা পালকি কেনে, পুরনো জমিদার বাড়ির পরিত্যক্ত পালকি, ছয় বেহারার সেই পালকি। মেঘলা বাদলের পাশে বসে যেতে চেয়েছিল সেই পালকিতে। কিন্তু সমাজ তা দেয়নি। এই পালকিটার কথা পড়লে মনে হয়, এটা শুধু একটা জিনিস নয়, মেঘলার সব ইচ্ছার প্রতীক। সে চেয়েছিল বাদলের পাশে বসে একটা সুন্দর জীবন কাটাতে। কিন্তু সেই পালকিটাও পরিত্যক্ত, ভাঙা, মেঘলার জীবনের মতোই।
আর তারপর আসে গল্পের সবচেয়ে ধাক্কা দেওয়া জায়গাটা। বাদল সার্কাসে যায়, দেখে চোখ বাঁধা একজন মানুষ ধারালো চাকু ছুঁড়ে মেঘলার শরীরের পাশে তক্তায় বিঁধছে। বাদলের বুকে বজ্রপাত। সে বুঝতে পারে, মেঘলা জীবন-মৃত্যুর খেলায় নেমেছে। আর তারপর সেই রাতে, তাঁবুতে, সার্কাসের পোশাকখোলা মেঘলার শরীরের আলোকরেখা বাদলের চোখে ভরে যায়। এই দৃশ্যটা এমনভাবে লেখা হয়েছে যে, পড়ার সময় ঠিক বুঝতে পারছি না বাদল মেঘলাকে দেখে কী অনুভব করছে। সে কি মেঘলার সৌন্দর্য দেখছে? নাকি তার নগ্নতা দেখে লজ্জিত হচ্ছে? নাকি মেঘলার এই পরিণতি দেখে কষ্ট পাচ্ছে? নাকি সবকিছু একসাথে? কাজী রাফি এখানে কিছু বলে দেননি, শুধু দেখিয়েছেন। আর এই না-বলাটাই সবচেয়ে জোরালো কথা বলে যায়।
কিন্তু গল্পের যে জায়গাটা আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাঙল, সেটা তার পরদিনের। সকালে মেঘলা বাদলের হাতে তার জীবনের প্রথম উপার্জনের টাকা তুলে দেয়। এই টাকাটা কতটা মূল্যবান, সেটা বোঝার জন্য মেঘলার জীবনটা জানতে হয়। একটা কিশোরী, যার বাবা নেই, পড়ালেখা ছেড়ে দিতে হয়েছে, সে প্রথমবারের মতো নিজের হাতে কামানো টাকা তার ভালোবাসার মানুষের হাতে দিচ্ছে। এটা কতটা আবেগঘন মুহূর্ত, সেটা কাউকে বোঝানো যাবে না, যে নিজে কখনো কাউকে ভালোবেসেছে সে ছাড়া। কিন্তু বাদল সেই টাকা রাখে না। তার ঠিক পরপরই সে মেলায় একটা তাঁবুর পেছন দিয়ে মেঘলাকে আরেক পুরুষের সাথে দেখে ফেলে। মেঘলার শরীর সেই পুরুষের উপভোগের বস্তু হয়ে গেছে। বাদল টাকা ফিরিয়ে দিয়ে একটা চিরকালের চিঠি রেখে চলে আসে।
এই মুহূর্তটা নিয়ে আমি অনেকক্ষণ ভাবলাম। বাদল কি ভুল করেছে? নাকি সে ঠিকই করেছে? একদিকে মনে হয়, বাদল যা দেখেছে তার পর তার রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। সে তো মেঘলাকে ভালোবাসত, তার কাছে মেঘলা একটা "অপূর্ব" কিছু ছিল। সেই অপূর্বটাকে অন্য কারো সাথে দেখলে তার ধাক্কা লাগাটা স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যদিকে যখন ভাবি, তখন মনে হয়, বাদল কি মেঘলাকে কখনো বুঝেছে? মেঘলা কেন সার্কাসে গেল, সেটা কি সে কখনো ভেবে দেখেছে? মেঘলার বাবা নেই, মা অসহায়, সংসার চালানোর মতো কিছু নেই। সে তো বাঁচার জন্যই সার্কাসে গেছে। সেটা তার ইচ্ছা ছিল না, বাধ্যবাধকতা ছিল। আর সেই বাধ্যবাধকতার মাঝেও সে যখন বাদলকে পাশে চেয়েছে, যখন তার জীবনের প্রথম উপার্জনের টাকাটা বাদলকে দিয়েছে, সেটা কি শরীর বিক্রি করার পরও একটা মানুষের শেষ আশা, শেষ বিশ্বাসটুকু কাউকে দিয়ে যাওয়ার প্রমাণ নয়? বাদল সেটা বুঝতে পারেনি। সে শুধু দেখেছে, মেঘলা আরেক পুরুষের সাথে আছে। আর সেই দেখাটাই তার কাছে সব শেষ করে দিয়েছে।
এখানেই কাজী রাফির সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি বাদলকে খারাপ হিসেবে দেখাননি, আবার ভালো হিসেবেও দেখাননি। তিনি শুধু বাদলকে দেখিয়েছেন, একটা সাধারণ মানুষ হিসেবে। যার ভেতরে ভালোবাসা আছে, কিন্তু সেই ভালোবাসার চেয়েও তার সামাজিক শর্তাবদ্ধতা বেশি শক্তিশালী। বাদল ধনী পরিবারের ছেলে। তার মা মেঘলার সাথে ছেলের মেলায় যাওয়া মানতে পারেন না। মেঘলার মা বাদলকে "বাপ" বলে ডাকেন, অনুনয় করেন। এই সম্বোধনেই পরিষ্কার হয়ে যায়, দুজনের মাঝে শ্রেণির যে দেয়াল, সেটা কতটা উঁচু। বাদল মেঘলাকে ভালোবাসতে পারে, কিন্তু সেই ভালোবাসাকে সমাজের সামনে নিয়ে আসতে পারে না। আর এটা শুধু বাদলের দোষ নয়, এটা আমাদের সমাজের দোষ। আমাদের সমাজে একটা ধনী ছেলে একটা দরিদ্র মেয়েকে ভালোবাসলে, সবাই বলে, "ওরা মিলবে না।" কেউ বলে না,
ভালোবাসার মাঝে শ্রেণি কোথায় থাকে?
বাদল সেই সমাজেরই সন্তান। সে তাই মেঘলার কান্না দেখেও দেখে না, মেঘলার টাকা ফিরিয়ে দিয়ে চলে আসে।
আর মেঘলা? মেঘলা গল্পের সবচেয়ে তীব্র চরিত্র। সে একজন যোদ্ধা, জীবনযুদ্ধে নেমে যাওয়া একজন কিশোরী যোদ্ধা। তার ভেতরে কবিমন আছে, শিল্পীসত্তা আছে, প্রচণ্ড জেদ আছে। সে জানে বাদল তাকে "তুই" করে ভালোবাসে, সখা হিসেবে, কিন্তু "তুমি" করে ভালোবাসবে না। তাই সে বাদলকে বলে,
কষ্টের স্মৃতিই মানুষের মনে থাকে।
এই কথাটা কতটা গভীর, সেটা ভাবলে গা ছমছম করে। মেঘলা জানত বাদল তাকে ছেড়ে যাবে। সে জানত এই সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তবুও সে শেষবারের মতো বাদলকে পাশে চাইছে, কষ্টের স্মৃতি জমানোর জন্য। একদিন বাদল যখন তার কথা মনে করবে, তখন শুধু সুখের কথা নয়, কষ্টের কথাও মনে পড়বে। আর সেই কষ্টের মাঝেই মেঘলার ছায়াটা বেঁচে থাকবে। এটা মেঘলার এক ধরনের আত্মরক্ষা, বাদলকে হারানোর ব্যথাকে স্মৃতির মাধ্যমে সযত্নে সংরক্ষণ করার চেষ্টা।
গল্পের শেষে যখন বর্তমানে ফিরে আসি, যখন বাদল আলমিরা খুলে সেই পিতলের পালকিটি বের করে আর টুম্পা জিজ্ঞেস করে, "তুমি মহিলাকে চেনো?" এই মুহূর্তটা একটা নীরব বিস্ফোরণের মতো। বাদল কিছু বলে না। কিন্তু তার চুপ থাকাটাই সবচেয়ে জোরালো উত্তর। সে চেনে, চিনেছে সেই কিশোর বয়স থেকে। সে চেনে সেই মেঘলাকে যে হাসিমুখে হেঁটে যেত ভাতারমারির মাঠ পেরিয়ে, যে কবিতা লিখত, যে বাদলের কেডস পরে মেলায় গেছিল। কিন্তু সেই মেঘলা এখন শিকলবাঁধা, পাগল। আর বাদল? বাদল আমেরিকায় বসে আছে, তার সুন্দর সংসার, তার স্ত্রী টুম্পা, তার আলমিরায় ঝকঝকে পিতলের পালকি, সবকিছু আছে। কিন্তু সেই পালকিটার ঝকঝকে ভাবটাই সবচেয়ে কষ্টের। জিনিসটা ঝকঝকে আছে, কিন্তু যে মানুষটা এটা দিয়েছিল, সে ঝকঝকে নেই, সে তো শিকলবাঁধা।
গল্পের ভাষা নিয়ে যদি কিছু বলি, তবে বলব, কাজী রাফির ভাষার সবচেয়ে বড় গুণ হলো এর সরলতা। কোনো আজগুবি শব্দ নেই, কোনো দেখানোর চেষ্টা নেই। মেঘলার মুখে যখন গ্রামের ভাষা ওঠে,
মানুষ নাই, জন নাই, এই মাঠে বাঘের সাথে হরিণকে পাঠানো আর কি!
তখন চোখের সামনে মেঘলাকে দেখা যায়। একটা কিশোরী, দিগন্তহীন মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, ভয়ে আর সাহসে কাঁপতে কাঁপতে কথাগুলো বলছে। আর তাঁবুর গন্ধের যে বর্ণনা,
থেমে যাওয়া সময়ে পচা গুল্মের ভিতর জ্বলন্ত সিগারেট কেউ ফেলে দিয়ে গেছে কত কত কাল!
এই ধরনের উপমা আসলে কবিতার মতো। গদ্যের ভেতর কবিতা লুকিয়ে আছে। এই ভাষাগত দ্বৈততাটাও চমৎকার। একদিকে মেঘলার গ্রামের আঞ্চলিক ভাষা, অন্যদিকে বাদলের শিক্ষিত মাঝারি শ্রেণির ভাষা। এই দুটো ভাষার মাঝেই দুটো জগতের দূরত্ব ফুটে ওঠে।
কিন্তু গল্পের যে জায়গাটা আমাকে সবচেয়ে বেশি তাড়িত করেছে, সেটা হলো মেঘলার শেষ অবস্থা। শিকলবাঁধা, পাগল। সমাজ তাকে পাগল বলেছে। কিন্তু সে কি পাগল? না। সে পাগল নয়, সে শৃঙ্খলিত। শিকল তার পায়ে নয়, তার জীবনে, তার অস্তিত্বে। সমাজ তাকে পাগল বানিয়ে দিয়েছে কারণ সে নিজের জীবন বেছে নিয়েছিল। সে যাত্রাপালায় গেছিল, সার্কাসে গেছিল, নিজের শরীর দিয়ে জীবন চালিয়েছিল। আর এই অপরাধে সমাজ তাকে শাস্তি দিয়েছে। টুম্পার সেই কথাটা মনে পড়ে যায়,
বাংলাদেশের পুরুষগুলো এক একটা ধাঁড়ি শয়তান। নারীদের দেহ ভোগ করার সময় বেশ্যা বলে লজ্জা পায় না কেউ।
এই লাইনটা গোটা গল্পের সবচেয়ে নোংরা সত্যটা বলে দেয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর দেহ ভোগ করতে দ্বিধা করে না, কিন্তু সেই নারী যখন নিজের জীবন বেছে নেয়, তখন সমাজ তাকে "পাগল" বানিয়ে দেয়, শিকল পরিয়ে দেয়। মেঘলা আসলে বাংলাদেশের হাজারো মেঘলার প্রতিনিধি। যারা প্রতিদিন সমাজের চাকু খেয়ে বেঁচে আছে, কিন্তু কেউ তাদের কষ্ট দেখে না।
সার্কাসে ধারালো চাকুর সামনে মেঘলার দাঁড়ানো, এটা শুধু একটা শিল্পের অংশ নয়, নারীর জীবনের রূপক। প্রতিদিন সমাজ যেভাবে নানা ধরনের "চাকু" নিক্ষেপ করে নারীর দিকে, কুৎসা, অপবাদ, শারীরিক নির্যাতন, তারই প্রতীক সেই সার্কাস। মেঘলা যখন বাদলকে মনে মনে বলে,
এভাবে মরে যাওয়াও আনন্দের, বাদল
তখন সে আসলে নারীর অস্তিত্বের এক তীব্র প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। যে জীবনে সমাজ তোমাকে না বলে, অপমান করে, ধর্ষণ করে, সেই জীবনে বাঁচার চেয়ে মৃত্যু কি আনন্দের নয়? এই প্রশ্নটা গল্প পড়ার পরও কানে বাজতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত গল্পটা পড়ে কিন্তু কোনো ঘৃণা বা আফসোস কাজ করে না। বাদলের জন্যও না, মেঘলার জন্যও না। কারণ এই গল্পে কেউ ইচ্ছা করে খারাপ করেনি। বাদল পালায়নি, বাদল চলে আসে। কিন্তু সে চলে আসে কারণ সে মেঘলাকে সমান মানুষ হিসেবে দেখতে পারেনি। আর মেঘলা? মেঘলা শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছে। সমাজ তাকে বাঁচতে দেয়নি। গল্পের শেষে যখন বাদল আলমিরা খুলে সেই পিতলের পালকিটি বের করে, আর পাঠক জানে মেঘলা এখন শিকলবাঁধা, তখন যে যন্ত্রণাটা হয়, সেটা পাঠকের বুকে একটা ধারালো চাকুর মতো বিঁধে যায়। আর এটাই সাহিত্যের সবচেয়ে বড় সাফল্য, পাঠককে চিন্তায় ফেলা, পাঠকের বুকে ব্যথা দেওয়া।
কাজী রাফি এই গল্প দিয়ে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, আমাদের সমাজে ভালোবাসা নামক জিনিসটা কতটা দুর্বল, আর সমাজের নিষ্ঠুরতা কতটা শক্তিশালী। বাদল যতই মেঘলাকে ভালোবাসুক না কেন, সেই ভালোবাসা সমাজের শ্রেণির দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে গেছে। আর মেঘলা? মেঘলা সেই দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে শিকলবাঁধা হয়ে পড়ে আছে। আর এই বাস্তবতাকে যে কত সুন্দর করে, নিঃশব্দে, কোনো চেঁচামেচি ছাড়াই উপস্থাপন করা যায়, সেটাই এই গল্পের সবচেয়ে বড় শিল্পকৌশল বলে মনে হয় আমার।
--------
প্রচ্ছদ: Grok

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম