কার্তিক মাসের এক গুমোট দুপুর। বৃষ্টি নামবে কি নামবে না, এই দ্বিধা নিয়ে আকাশ ভারী হয়ে বসে আছে। আর এই অপেক্ষার মাঝে শৈলবালার হাতের বটিতে পুঁইশাক কাটার শব্দটুকুই চারপাশের নিস্তব্ধতাকে আরও জোরালো করে তুলছে। প্রশান্ত মৃধার ‘যুধিষ্ঠিরের সঙ্গী’ গল্পটি এই নিস্তব্ধতা ভাঙার এক অদ্ভুত আর মর্মস্পর্শী প্রচেষ্টার গল্প। এখানে কোনো ঝোড়ো বৃষ্টি নেই, আছে বিষাদের একটা নিচু আওয়াজ, যা ধীরে ধীরে শৈলবালার বুকের ভেতরটা ভিজিয়ে দেয়।
গল্পের শুরুতেই আমরা শৈলবালার একটা খুব সাধারণ, কিন্তু গভীর উদ্বেগের মুখোমুখি হই। আমসত্ত্ব ভিজে যাওয়ার ভয়। কার্তিক মাসে আমসত্ত্ব শুকানোর পেছনে কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নেই, আছে শুধু মেয়ে কণিকার জন্য একটুখানি স্নেহের টুকরো জমানোর আকুতি। ওই আমসত্ত্বের একটা টুকরো মেয়ের পাতে দুধে ভিজিয়ে দেওয়ার স্বপ্নটা শৈলবালার বেঁচে থাকার একমাত্র অজুহাত। কী অসাধারণ একটা উপমা প্রশান্ত মৃধা এখানে ব্যবহার করেছেন! আমসত্ত্ব কেবল একটা শুকনো ফলের টুকরো নয়, এটি শৈলবালার নিজের শুকনো, রোদে পোড়া জীবনেরই প্রতীক। আর বৃষ্টির ফোঁটা? সেটা তার বুকের ভেতরের সেই চাপা কান্নার ফোঁটা, বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা।
এই আমসত্ত্বের স্মৃতি একটা বিষাদের বাক্স খুলে দেয়। কণিকার ছেলেবেলার সেই কবিতা,
আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলি দলি।
ছেলে কল্যাণ যখন তাকে বলল বুর্জোয়া কবি, তখন শৈলবালার বুকের ভেতরটা কতটা কেঁপে উঠেছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। একদিকে রবীন্দ্রনাথের সুন্দর একটা স্মৃতি, অন্যদিকে ছেলের রাজনৈতিক বিদ্বেষ। আর এই স্মৃতির সুতোটা ধরেই আমরা হারিয়ে যাই দেশভাগ, পাকিস্তান আমল আর মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতির ফেলে আসা এক ধ্বংসস্তূপে। কমলাক্ষের রাজনীতি, কল্যাণের কমিউনিজম, হিন্দু পরিবার হওয়ার কারণে কণিকার স্কুলে যাওয়ার পথে অপমান, এইসব কিছুই বড়ো কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে আসে না গল্পে, আসে একটা মায়ের রক্তাক্ত হৃদয় হিসেবে। যে মা তার মেয়েকে রাস্তায় একা ছাড়ে দিতে পারেনি, যে মায়ের কাছে দেশের বিভাগের চেয়ে বড়ো ছিল মেয়ের নিরাপত্তা, সেই মায়ের কাছে রাজনীতির লাভ লোকসান কোনো কথাই নয়। "দেশ ভাঙল। লাভডা হল কার?" কমলাক্ষের এই কথাটা শৈলবালার জীবনের চিরন্তন নিলাঞ্ছনা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মেয়েকে দেশের বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্তটা কতটা যন্ত্রণাদায়ক ছিল, তা বুঝতে হলে গল্পের শুরুতে ওই আমসত্ত্ব ভিজে যাওয়ার ভয়টাকেই অনুভব করতে হবে।
কণিকাকে হারিয়ে শৈলবালার জীবনে যে শূন্যতা এসেছে, তার ওপর একপ্রকার প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল ছেলে কল্যাণের বিলম্বিত বিবাহ। কিন্তু কল্যাণ আর সুনন্দার সংসারেও সুখ নেই। সন্তান নেই। বয়স হয়ে গেছে। এই নিঃসন্তানতা শৈলবালাকে আবার সেই একাকীত্বের কোলে ঠেলে দেয়। তার মনে হয়, সে আর কেউ নয়, এক পা শ্মশানে আর এক পা ছেলের সংসারে। মানুষ বাঁচলেও যে বাঁচে না, এই অসহ্য অনুভূতিটাই তো শৈলবালার দৈনন্দিন সঙ্গী। সুনন্দা ইস্কুলে যায়, কল্যাণ চাকরি করে। ওরা থাকলেও শৈলবালার চারপাশটা একটা ফাঁকা দইয়ের মালসার মতো, খালি, শুকনো আর নিষ্প্রাণ। এখানেই লেখকের ভাষার জাদু বিস্ময়কর। তিনি কষ্টকে বড়ো করে বলছেন না, ফাঁকা মালসার একটা অলংকার ব্যবহার করেই পুরো একটা শূন্য জীবনের ছবি এঁকে দিয়েছেন।
ঠিক এই মুহূর্তে, এই গুমোট বৃষ্টির দুপুরে গেটের বাইরে একটি পোয়াতি কুকুর ডাকে। গল্পের এই পর্যায়টি অসাধারণ। কুকুরটি কেবল একটা পশু নয়, এটি শৈলবালার নিজের অসহায়ত্বেরই এক প্রতিচ্ছবি। কুকুরটি গেট ভাঙার চেষ্টা করছে, কারণ তার বাচ্চা হতে চলেছে, তার আশ্রয় দরকার। আর শৈলবালা? তারও তো একসময় ঠিক এভাবেই জীবনের ঝড়ে গেট ভাঙার মতো অসহায় হয়ে পড়েছিল। প্রথমে সে কুকুরকে ভেতরে ঢুকতে চায় না। পাড়াপড়শির কথা ভাবে, বউয়ের বকা ভাবে, বাড়ির পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ভাবে। ওহ, এটা তো আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত মানসিকতারই চিরচেনা ছবি! আমরা সবাই এই শৈলবালা, আমাদের নিজেদের সুবিধার কথা ভেবে অনেক সময় বিপদের গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকি।
কিন্তু কুকুরটি যখন গেট থেকে ধীরে ধীরে সরে যায়, তখন শৈলবালার ভেতরের কোনো একটা সুপ্ত মানুষ জেগে ওঠে। সে গেট খুলে দেয়। কুকুরটি ঘরের ভেতরে না গিয়ে বড্ড বুদ্ধিমানের মতো চালের নিচের একটা শুকনো জায়গায় গিয়ে বসে পড়ে। এই ঘটনাটি শৈলবালাকে অবাক করে। সে ভাবে, কুকুরটা কি জানত যে বাড়ির ভেতরে ঢোকা যাবে না, তাই ওই নিরাপদ জায়গায় বসেছে? নাকি জানত যে এই জায়গাটাই হয়তো বাচ্চা দেওয়ার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ?
এখানেই গল্পের শিরোনামের অসামান্য প্রাসঙ্গিকতা। শৈলবালার মনে পড়ে যায় মহাভারতের যুধিষ্ঠিরের কথা। মহাপ্রস্থানের পথে সবাই পড়ে গেলেও যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে একটি কুকুর ছিল। স্বর্গে যাওয়ার সময় ইন্দ্র যখন কুকুরটাকে ফেলে যেতে বলেন, যুধিষ্ঠির রাজি হননি। সেই কুকুরটি ছিল আসলে ধর্মের রূপ। শৈলবালা হঠাৎ করে নিজেকে যুধিষ্ঠির ভেবে নেয়। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেই নিজেকে হাসিয়ে দেয়, কোথায় কুকুরবেশী ধর্ম আর কোথায় এই মাদি কুকুর!
এই হাসিটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। শৈলবালা জানে, তার করা কাজটি কোনো মহান পুণ্য নয়। ধর্ম বলতে আসলে মানুষের যা ধারণা, তাই ধর্ম। তার ধারণা বলছে, বৃষ্টির দিনে একটা পোয়াতি কুকুরকে বাইরে তাড়ানো অধর্ম। কিন্তু সেই সাথে তার আরেকটা বাস্তব ধারণা আছে, বউ এসে বকবে, কুকুর বাচ্চা দিলে বাড়ির নোংরা হবে। এই দ্বন্দ্বের মাঝেই মানুষের অসল পরিচয়। শৈলবালা যখন কুকুরটিকে খাওয়ানোর জন্য ফ্যান ভাত দেয়, তখন মনে হয় সে নিজের জীবনের শূন্যতাটাকেই একটু খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। হারানো মেয়ের জন্য, নিজের অবহেলিত জীবনের জন্য একটু সান্ত্বনা খুঁজে নিচ্ছে।
গল্পের শেষে পরের দিন সকালে যখন শৈলবালা দেখে যে কুকুরটি জবা গাছের নিচে তিনটি বাচ্চার জন্ম দিয়েছে আর একটি মরা বাচ্চাকে গেটের কাছে ফেলে রেখেছে, তখন গল্পটা একটা ভিন্ন মাত্রা পায়। এই দৃশ্যটা চোখের সামনে একটা জীবন্ত ক্যানভাসের মতো ভেসে ওঠে। ভোরের হালকা আলো, জবা গাছের সবুজ পাতায় রাতের শিশির বিন্দু, তার নিচে কুকুরের তিনটি নরম বাচ্চা আর গেটের কাছে নিঃসঙ্গভাবে পড়ে থাকা সেই মৃত বাচ্চাটি। মানুষের জীবনও ঠিক এরকমই। একটা মরা স্বপ্ন, একটা হারানো সন্তানকে গেটের বাইরে ফেলে রেখে জীবন পেছনের আড়ালে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করে। শৈলবালার শেষের সেই উক্তি,
বহু বহুদিন পরে এ বাড়িতে দেখার মতো কিছু একটা জন্মাইচে!
এই কথাটা শুধু কুকুরের বাচ্চার জন্য বলা নয়। একটা শূন্য, নিঃসঙ্গ, বয়স্ক মানুষের বুকের ভেতরে যে জীবনের আশা বহুদিন ধরে মরা ছিল, এই বৃষ্টির দিনে সেই আশাটাও নতুন করে জন্ম নিল। কী অসাধারণ একটা উৎসব এসে হাজির হলো এই শূন্য আঙিনায়!
এবার একটু গভীরে গিয়ে প্রশান্ত মৃধার এই গল্পের ভাববাচ্য আর দার্শনিক তত্ত্ব খনন করা যাক। গল্পের বাইরের ঘটনা হলো একটি কুকুরকে আশ্রয় দেওয়া। কিন্তু ভাববাচ্য বা লুকিয়ে থাকা অর্থ কি তাই? লেখক আসলে মানুষের অস্তিত্বের এক গভীর অসহায়ত্বের কথা বলছেন। আমরা সবাই কোনো না কোনো ভয়ে আতঙ্কে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে কুকুরের মতো গোঁ ধরে কাঁদি। ভেতর থেকে কেউ একজন যখন গেট খুলে দেয়, তখন আমরা ঠিক ওই কুকুরের মতো বুদ্ধিমানের সুযোগটা নিই, কারো অসুবিধা না করে নিজের জন্য একটু শুকনো জায়গা খুঁজে নিই। এখানে ধর্ম বলতে কোনো আচার অনুষ্ঠান নয়, ধর্ম হলো জীবনের প্রতি একটু সরল মায়া। নিজের কষ্টের মাঝেও অন্যের কষ্ট দেখতে পারা, সেটাই এখানে সবচেয়ে বড়ো দর্শন।
এই গল্পটি পড়লে মনে হয়, এর সাথে বিদেশি সাহিত্যের কিছু অমূল্য রত্নের অদ্ভুত মিল আছে। ক্যাথরিন ম্যানসফিল্ডের বিখ্যাত গল্প 'দ্য গার্ডেন পার্টি'র কথা মনে পড়ে যায়। সেখানে ধনী ঘরের মেয়ে লরা তাদের বাড়ির নিচে একজন গরীব মানুষের মৃত্যু দেখতে পায় আর জীবনের যে অসাম্য তা বুঝতে পারে। শৈলবালাও ঠিক তেমনই গেটের কাছে মৃত কুকুরের বাচ্চাটি দেখে বুঝতে পারে, জীবন মানে শুধু বাঁচা নয়, মাঝে মাঝে কিছু মরে যাওয়াও জীবনের একটা অঙ্গ। আবার আলবার কাম্যুর বিখ্যাত উপন্যাস 'দ্য আউটসাইডার' বা গল্প 'দ্য গেস্ট'র কথাও মনে পড়ে। সেখানে মূল চরিত্রটি সমাজের নিয়মের বাইরে গিয়ে একজন বিপজ্জনক বন্দিকে আশ্রয় দেয়, ঠিক যেমন শৈলবালা সমাজের নিয়মের তোয়াক্কা না করে একটি পথকুকুরকে আশ্রয় দিলো। এই অসাধারণ মিলগুলো প্রমাণ করে, মানুষের অস্তিত্বের দ্বন্দ্ব আর একাকীত্ব কোনো দেশের বাউন্ডারি মানে না, এটা সারা পৃথিবীতে সমান।
এখন একটু কথা বলা যাক গল্পের রসতত্ত্ব নিয়ে। পুরো গল্পটা জুড়ে যে রস বিরাজ করছে সেটা হলো করুণ রস। কিন্তু এই করুণ রস কোথাও নিচু হয়ে যায় না, কোথাও কেঁদে ভাসায় না। শেষে যখন বাচ্চা কুকুরগুলো জন্ম নেয়, তখন এই করুণ রসের মাঝে একটা শান্ত রসের সুর বেজে ওঠে। ঝড়ের পর একটা শান্ত সকালের মতো শান্তি। আর গল্পের রূপশিল্প? প্রশান্ত মৃধা কোনো সাধারণ ফ্ল্যাশব্যাক ব্যবহার করেননি। শৈলবালার বর্তমানের কাজের সাথে সাথেই অতীত একটা নদীর মতো ভেসে আসছে। পুঁইশাক কাটার শব্দের সাথে মিলেমিশে যাচ্ছে কণিকার শিশুকাল, আমসত্ত্ব ভিজানোর চিন্তার সাথে মিলেমিশে যাচ্ছে দেশভাগের বেদনা। এটা চমৎকার একটা কাঠামো।
ভাষার ব্যবহার গল্পের আরেকটা চরিত্রের মতো কাজ করেছে। পূর্ব বাংলার হিন্দু পরিবারগুলোর যে স্বতন্ত্র গদ্যশৈলী আছে, সেটা এখানে অসাধারণ দক্ষতায় ধরা পড়েছে।
"দেশ ভাঙল, লাভডা হল কার", "কই রিকশা দেখলাম না", "ওমা, কুকুরটা তো আছে"
এইসব কথার মাঝে যে স্বাভাবিকতা, সেটা কোনো কৃত্রিমতা ছাড়াই গল্পকে জীবন্ত করে তুলেছে। আর উপমা আর অলংকারের ব্যবহার? টিনের চাল বেয়ে বৃষ্টির জল পড়াকে তুলনা করা হয়েছে উপর থেকে জল ঢেলে দেওয়ার সাথে, শৈলবালার শূন্য জীবনকে তুলনা করা হয়েছে ফাঁকা দইয়ের মালসার সাথে। এইসব উপমা খুব সহজ, কিন্তু প্রচণ্ড কার্যকরী।
প্রশান্ত মৃধার গল্পের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হলো তার পারিপার্শ্বিক অবলোকন। তিনি কোথাও আবেগকে বিস্ফোরিত করেন নি, কোথাও সরাসরি কষ্টের কথা বলেন নি। কার্তিকের এই বৃষ্টি, টিনের চালে জল পড়ার শব্দ, রান্নাঘরের গোলপাতা, কুলার ওপর পলিথিন আর কুকুরের গোঁ ধরা চেঁচামেচি, এই ছোটখাটো সব উপাদান মিলে একটা অদ্ভুত শিল্পের সৃষ্টি করেছে, যা পড়ার পর আমাদের নিজেদেরই একাকীত্বের দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করে।
'যুধিষ্ঠিরের সঙ্গী' কেবল একটি বৃদ্ধার গল্প নয়, এটি আমাদের সবার গল্প। যেকোনো মানুষের জীবনের শেষ পর্যায়ে যখন সব রাজনীতি, সব সমাজব্যবস্থা, সব আত্মীয়তা অবান্তর হয়ে যায়, তখন মানুষের যে ক্ষুদ্র একটা মানবিকতার ওপর ভর করে বাঁচতে হয়, সেইটুকুই তো আসলে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গী, সেইটুকুই তো আসল ধর্ম। একজন বৃদ্ধা, একটা পোয়াতি কুকুর আর কার্তিকের বৃষ্টি, এই তিনটে উপাদান দিয়ে প্রশান্ত মৃধা যে জীবন্ত ছবিটা এঁকেছেন, সেটা আমাদের হৃদয়ে চিরকালের জন্য গেঁথে থাকলো। একটু বৃষ্টির দিনে হঠাৎ করে কোনো কুকুর গেটের বাইরে ডাকলে, আমরা হয়তো আর তাকে তাড়াতে পারবো না, এই গল্পের সবচেয়ে বড়ো অর্জন হয়তো এটাই!
..................
প্রচ্ছদ: ChatGPT

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম