গান কি? গান কাকে বলে?-
এটি মানবমনের অনন্ত জিজ্ঞাসা। শুধু সুর করে গলাকে নানান খাঁদে নামিয়ে কিছু ছন্দবদ্ধ কথা বললেই গান হয়ে উঠে না। একটি বাণী বা কথাকে গান হয়ে উঠতে গেলে সেই বাণী বা কথাকে মানতে হবে নানাবিধ শর্ত।
পৃথিবীতে গান কখন এসেছিলো? বাংলা গান কিভাবে সৃষ্টি হলো? বাংলা গানের ভাব- সম্পদের কারা রথী বা মহারথী? বাংলা গানের বয়স কি হাজার বছর অর্থ্যাৎ চর্যাপদ থেকে নাকি ছয়শো বছর কৃঞ্চকীর্তন থেকে? বাংলা গান কি বিদেশ থেকে ধার করা নাকি এটি এদেশের নিজস্বতার বহিঃপ্রকাশ? এসব বহুবিধ প্রশ্ন- উত্তর দিয়ে সাজানো হয়েছে গ্রন্থটি।
গোলাম মুরশিদ বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সময়ের একজন অপরিহার্য গবেষক। তার গবেষণার বিষয়বস্তু বিচিত্র। তার গবেষণাকর্মের অন্যতম সংযোজন হলো আলোচ্য গ্রন্থ -'বাংলা গানের ইতিহাস'। ১৪২৮ বঙ্গীয় সনের ফাগুন মাসে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।
গোলাম মুরশিদের বহুলভাবে আলোচিত 'বাংলা গানের ইতিহাস' গ্রন্থটি মোট দশটি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রতিটি অধ্যায়ের আলোচ্যসূচী যেমন বিপুল তথ্যে সমৃদ্ধ তেমনি সমভাবে তা সুখপাঠ্য ও বৈচিত্র্যময়। একটি ভূমিকাসহ গ্রন্থটি ২৪৮ পৃষ্ঠার। আয়তনে বিশাল না হলেও বিষয়বস্তূর মানদণ্ডে গ্রন্থটি বাংলা গানের ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে অনন্য সংযোজন। বাংলা গানের ইতিহাস নিয়ে এর আগেও বহু গুণীজন বহুবিধ গ্রন্থ রচনা করেছেন কিন্তু সহজ কথায় সহজ করে সহজ মানুষদের বোধগম্যতার জন্য গোলাম মুরশিদের গ্রন্থটিই সেরা বলে আমার মনে হয়।
প্রথম অধ্যায়ের আলোচনাতেই গোলাম মুরশিদ পাঠকদের জন্য আলোচনা করে সহজবোধ্য করে বুঝিয়েছেন- গান কী আর সুর কাকে বলে। প্রথমেই তিনি সুর আর অসুরের বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছেন। এরপর বাংলা গানের সূচনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আদিবঙ্গের ভাষা এবং গান কেমন ছিলো, মধ্যযুগে এই বাংলায় গানের রাগ-রাগিনীর চর্চা কেমনতর ছিলো, - এসব সহজ ভাষায় তার পাঠকদের জানিয়েছেন। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অধ্যায়ের আলোচ্যসূচী বৈচিত্র্যময়। এই দুই অধ্যায়ে বাংলা গানের বিভিন্ন ধারার ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। আলোচনা করা হয়েছে কীর্তন, শ্যামাসংগীত,বাউলগান, পাঁচালী, কবিগান, রাগসংগীত, খেয়াল, ঠুমরী, গজল ও নাটকের গান নিয়ে। চতুর্থ অধ্যায় আলোচিত হয়েছে বাংলা গানের বিস্তারে ইউরোপের গানের প্রভাব এবং ঠাকুরবাড়ীর অবদান নিয়ে। পঞ্চম অধ্যায়ে শুধুই রবি ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়া যে বাংলা গান একটি অসম্ভব বিষয় - তা বিভিন্নভাবে সহজবোধ্য করে আলোচনা করা হয়েছে।
ষষ্ঠ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে পঞ্চকবির গান। বাংলা গানের ইতিহাসের অনেক অংশ তাদের নিজস্বতার ফসল, - এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সপ্তম ও অষ্টম অধ্যায়ে কাজী নজরুল আর শচীনদেব বর্মণ, সলিল চৌধুরীর বাংলা গানে অবদান ও বাংলা গানে তাদের প্রভাবে কি কি পরিবর্তন ঘটলো, তা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সে সময় বাংলা গানের মধ্যে কেমন করে বামপন্থী ধারা প্রবেশ হয়ে গান গণমানুষের জন্য চেতনাবিস্তারের বাহন হয়ে যায়, এসব নিয়ে আলোচনা আছে। আরো আছে ৫০ ও ৬০ এর দশকে বাংলা গানের বিবর্তন নিয়ে কথা।
নবম অধ্যায় আলোচিত হয়েছে মুসলিম সমাজে গানের প্রবেশ নিয়ে। মুসলমানদের ঘরে সঙ্গীতচর্চা নিয়ে কিভাবে বিতর্ক হলো আর কিভাবে তার সমাধানের পথ বের হলো,- তা নিয়ে আলোচনার সাথে আছে বিভিন্ন আঞ্চলিক গান নিয়ে কথা। দশম অধ্যায় পাঠে আমরা জানতে পারি দেশাত্মবোধক গানের ইতিহাস, ভাষাত্ববোধক গান বিষয়ে।
বাংলা গানের ইতিহাস জানার জন্য, বোঝার জন্য অতি সহজে সাধারণ কথায়, সরল ব্যাখ্যায়, নিজেদের ভাষায়, নিজেদের মতো করে যদি একটিমাত্র গ্রন্থের নাম আমরা আলোচনায় রাখি, তবে তা অবশ্যই গোলাম মুরশিদের 'বাংলা গানের ইতিহাস'। যাদের সংগীত বিষয়ে জানার আগ্রহ রয়েছে, তারা এবং যারা সংগীত চর্চা করতে যাচ্ছেন - উভয়ের জন্যই গ্রন্থটি অবশ্য-পাঠ্য হওয়া জরুরী।
প্রচ্ছদ: গুগল জেমিনি

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম