চঞ্চল নাঈমের ‘নুন আর মসলার ঘ্রাণ’ কাব্যগ্রন্থটি আসলে এক দীর্ঘ ও গভীর আত্মখননের নামান্তর, যা কেবল শব্দের পিঠে শব্দ সাজানো নয়, বরং নাগরিক জীবনের এক জটিল ও নিঃসঙ্গ মানচিত্র। কবির শব্দ চয়ন এবং পঙ্ক্তিমালা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি খুব সাধারণ অনুষঙ্গকে এক অপার্থিব বিষাদে রূপান্তর করেছেন।
গ্রন্থের নামকবিতা ‘নুন আর মসলার ঘ্রাণ’-এ কবি যখন বলেন,
এখানে কেমন নিরুত্তর বাঁচি, তা কি সূক্ষ্ম বোঝ? ছিন্ন মুহূর্তের প্রায় জনশূন্য প্রতিটি নৈঃশব্দ্য আমার মৌনতা থেকে কত কিছু কান্তিমান ফেরে
—তখন তিনি আসলে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সেই যান্ত্রিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। যেখানে আমরা সবাই ভিড়ের মধ্যে থেকেও আসলে একা। কবি তথ্যের ভিড়ে জীবনের সেই আদি ও অকৃত্রিম স্বাদকে খুঁজে ফেরেন, যা শেষমেশ ট্যুরিস্টের ছায়াপথের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। মানুষের এই যে না-পাওয়া আর অবসাদ, তাকেই কবি এক ধরণের শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন।
কবিতাগুলোতে এক ধরণের অস্থিরতা ও শান্ত নীরবতার সহাবস্থান অত্যন্ত প্রখর।
‘বয়স আর মানুষ’ কবিতায় কবির পর্যবেক্ষণ আমাদের অস্তিত্বের নড়বড়ে ভিতকে মনে করিয়ে দেয়। তিনি লিখেছেন—
মানুষ বয়স লুকানোর আয়োজন করে
বয়সও মানুষের সীমাবদ্ধতাগুলোই আঁকে।
এই দুটি চরণের মধ্য দিয়ে কবি মানুষের চিরন্তন এক অসহায়ত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। আমরা যতই কৃত্রিমতায় নিজেকে সাজাই না কেন, সময় আমাদের শরীরের ভাঁজে আর জীবনের সীমাবদ্ধতায় তার অমোঘ স্বাক্ষর রেখে যায়। কবির মতে, মৃত্যু হলো সেই নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী, যে মানুষ আর বয়সের এই দ্বন্দ্বের সমাধান করে দেয়। এখানে জীবনকে এক ‘চক্র-চুক্তি’ হিসেবে দেখা হয়েছে, যা পাঠকের মনে গভীর এক অস্তিত্ববাদী ভাবনার জন্ম দেয়।
আবার ‘শূন্যে মরীচিকা থ হয়ে থাকবে’ কবিতায় কবি যখন বলেন,
পরিত্যক্ত সহস্র কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হবে শূন্যের শব্দরা,
তখন বোঝা যায় তিনি শূন্যতাকে কেবল অভাব হিসেবে দেখেন না, বরং এক পরম সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
প্রেমের ক্ষেত্রে চঞ্চল নাঈম প্রচলিত আবেগের চেয়ে দর্শনের আশ্রয় নিয়েছেন বেশি। ‘বাঁক’ কবিতায় তিনি এক অসামান্য আক্ষেপের সুর তুলেছেন এই বলে—
বাঁক না নিলে হয়তো তুমিও আমার হতে।
এই লাইনটি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, মানুষের জীবনে এমন কিছু মোড় বা পরিস্থিতি আসে যা চাইলেও নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কবি এখানে নিজের মনকে সেই বাঁকের ভেতর বসে থাকা এক পথিকের সাথে তুলনা করেছেন—
আমার মনটা তোমারই বাঁকে বাঁকে বসে থাকে।
প্রিয়জনের সান্নিধ্য না পাওয়ার বেদনাকে তিনি কোনো উচ্চকিত হাহাকারে প্রকাশ না করে বরং প্রকৃতির এক অনিবার্য পরিবর্তনের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন। একইভাবে ‘মীনফাঁদ’ কবিতায় তিনি যখন বলেন,
প্রাকৃতিক শরীরীর মীন ফাঁদে ফেব্রুয়ারি পড়ে
আর অনায়াসে নিয়মিত সম্পর্কের মেলামেশা বুঝি
—তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মানুষের সম্পর্কগুলোও আজ এক ধরণের যান্ত্রিক ছকে বন্দি হয়ে পড়েছে।
‘স্তন থেকে মুগ্ধতা আসে’ কবিতায় তিনি এক সাহসী ও দার্শনিক উচ্চারণ করেন—
হৃদয় থেকে বের হয় আমার মৌনতা
সে তো বিশাল একটা প্রবন্ধ।
এখানে শরীরী মুগ্ধতার চেয়েও মনের গহীন স্তরের নীরবতাকে তিনি বড় করে দেখেছেন।
কবির সমাজ ভাবনা ও রাজনৈতিক সচেতনতাও এই গ্রন্থে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে বিদ্যমান। ‘সরকারের পা’ কবিতায় তিনি সরাসরি ব্যবস্থার অসঙ্গতিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। তিনি যখন লেখেন—
ভোট কেনা গেলেও
জনগণের সরল মন কেনা যায় না
—তখন তা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক রূঢ় সত্য হয়ে সামনে আসে। ‘পরিস্থিতি’ কবিতায় তিনি সাবধান করে দেন—
সরকার নিয়ে কথা বলা রিক্স
ধরতেই পারেন আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার সমকোন ব্যাপার-স্যাপার।
এই ব্যঙ্গাত্মক সুরের আড়ালে কবি আসলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর বর্তমান সময়ের এক গভীর ভীতিকে তুলে ধরেছেন।
‘বাস্তবতা’ কবিতায় তিনি রাজনীতি আর মানুষের জীবনকে মাছ ও ভাতের চিরন্তন সম্পর্কের সাথে তুলনা করেছেন—
ভাত ছাড়া জনগণ দিগন্তের রোদ
মাছ ছাড়া দেহ-মন আমিষহীন বাস্তব।
এই রূপকের মাধ্যমে তিনি ক্ষুধার সংগ্রাম আর অধিকার হরণের এক নিপুণ চিত্র এঁকেছেন।
‘পেনশন ফাইল’ কবিতাটি এই গ্রন্থের এক অনন্য জীবন-দলিল। জীবনের শেষ বেলায় এসে একজন সাধারণ মানুষের যে করুণ অভিজ্ঞতা হয়, কবি তার ‘ক, খ, গ, ঘ’ অক্ষরের মাধ্যমে এক ভয়াবহ চক্র হিসেবে দেখিয়েছেন।
ক কর্কশ কণ্ঠে বললো খ নিকট যাও। খ আমাকে নেড়ে-চেড়ে বললো গ নিকট যাও
—এই বর্ণনাটি কেবল একটি ফাইলের গল্প নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের এক নগ্ন অসারতার চিত্র। মানুষের জীবন যখন ফাইলে বন্দি হয়, তখন তার মানবিকতা যে কীভাবে লোপ পায়, কবি তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এঁকেছেন। এই ক্লান্তি থেকেই হয়তো কবি ‘বর্ষার কবিতা’র আশ্রয় নেন, যেখানে তিনি ‘সংবাদ পত্রিকার নির্জনতা’র মাঝে নিজেকে খুঁজে ফেরেন এবং ক্রসফায়ারের গল্পের আড়ালে মানুষের নিঃসঙ্গতাকে পাঠ করেন।‘স্তন থেকে মুগ্ধতা আসে’
শৈশব ও স্মৃতির প্রতি কবির এক গভীর টান ‘বয়ঃসন্ধি দূরস্মৃতি’ কবিতায় স্পষ্ট হয়। তিনি লিখেছেন—
আমার হারানো কতো বন্ধুতার হৃৎযন্ত্র এই চরাচরে একা হাঁটে।
এখানে হারানো বন্ধুত্বের প্রতি যে আর্তি ফুটে উঠেছে, তা কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং সময়ের নিষ্ঠুরতায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া প্রতিটি মানুষের গল্প। ‘চায়ের টেবিলের সরল ফুঁ’ কবিতায় তিনি আধুনিক জীবনের জটিলতাকে চায়ের দোকানের আড্ডার সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন—
চা স্টলের নিজস্ব কোনো পাসওয়ার্ড নেই
তবে ব্যবহার উপযোগী কয়েকটা আড্ডা আলাপে ধারাবাহিক পাসওয়ার্ড তৈরীতে উন্মুক্ত সহায়তা করে।
অর্থাৎ, আমাদের জীবনের অনেক জটিল সমস্যার সমাধান হয়তো এই সহজ আড্ডাগুলোতেই লুকিয়ে থাকে। কবির নিজস্ব এক শিল্প-দর্শন ফুটে উঠেছে ‘আমি কোন দশকের কবি?’ কবিতায়। তিনি পরিষ্কার করেছেন যে তিনি দশকের কোনো ধরাবাঁধা গণ্ডিতে বিশ্বাসী নন। তিনি বলেছেন—
দশক না, আমি আমারই জন্য কিছু কবিতার সরল পথ নির্মাণ করি।
এই লাইনটির ভেতরেই একজন খাঁটি শিল্পীর আত্মপ্রকাশ লুকিয়ে আছে।
সবশেষে বলা যায়, চঞ্চল নাঈমের এই কবিতাগুচ্ছের প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে আছে নাগরিক মানুষের ক্লান্তি, বয়ঃসন্ধির হারানো স্মৃতি আর এক অদ্ভুত রকমের সৃষ্টিশীল শূন্যতা। ‘নুন আর মসলার ঘ্রাণ’ কাব্যগ্রন্থটি তাই কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান যে জগতগুলো আছে, সেগুলোকে নতুন করে অনুভব করার জন্য এক অনন্য শৈল্পিক দলিল। কবি এখানে শব্দ দিয়ে এমন এক দৃশ্যপট এঁকেছেন যেখানে প্রতিটি শূন্যতাও যেন কোনো এক গূঢ় অর্থ বহন করে। জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী যে ধূসর পথ, চঞ্চল নাঈম সেই পথের এক সার্থক ও সংবেদনশীল রূপকার। তাঁর কবিতা শেষ পর্যন্ত আমাদের হৃদয়ে এক ‘ব্যথার সুঘ্রাণ’ রেখে যায়, যা এক স্বচ্ছতম ভালোবাসার জন্ম দেয়। কবির এই সহজ ও সাবলীল প্রকাশভঙ্গিই ‘নুন আর মসলার ঘ্রাণ’কে বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র আসন দিয়েছে।
----------

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম