ইতিহাসের গন্ধ আছে বলেই মানুষ পোড়া বাড়ি, ভাঙা দালান দেখতে যায়। নতুবা মানুষ সেসবের দিকে একবার ফিরেও তাকাত না।
সহযোগী অধ্যাপক জনাব মো. মঈনুল হাসান ইতিহাসের গন্ধ বুঝতে পারেন। আর তাইতো তিনি ইতিহাসের পিছনে ছুটছেন। মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বুদ্ধিজীবী: প্রেক্ষিত কুড়িগ্রাম জেলা বইটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা কুড়িগ্রাম জেলার বীর সন্তানদের নিয়ে মঈনুল হাসানের সর্বশেষ লেখা ইতিহাসের দলিল। লাল-সবুজের বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কালো থাবার প্রতীক চিহ্নিত করে আইয়ুব আল আমিনের প্রচ্ছদে বইটি প্রকাশ করা হয়েছে। বইটির প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান 'অনুভব'।
ভূমিকা, চারটি অধ্যায়, ছক, পরিশিষ্ট এবং আলোকচিত্র, গ্রন্থপঞ্জী ও তথ্যবিবরণী মিলে ১২৮ পৃষ্ঠার এই বইটির গায়ের মূল্য ৩২০ টাকা।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের অবদান অনস্বীকার্য হলেও প্রান্তিক অঞ্চলের বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে কম। এই অভাব পূরণের লক্ষ্যেই মো. মঈনুল হাসান রচিত “মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বুদ্ধিজীবী: প্রেক্ষিত কুড়িগ্রাম জেলা” গ্রন্থটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বইটিতে লেখক উত্তরবঙ্গের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরার মাধ্যমে কুড়িগ্রাম জেলার অতীতকে বৃহত্তর ইতিহাসের সাথে সংযুক্ত করেছেন। ব্রিটিশ আমল, দেশভাগ এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় “উত্তরবঙ্গ” ধারণার বিবর্তন আলোচনা করে ভূমিকা অংশেই তিনি পাঠকের সামনে একটি সুসংগঠিত ঐতিহাসিক পটভূমি নির্মাণ করেছেন।
এরপর লেখক ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নির্মম বাস্তবতা বিশ্লেষণ করেছেন। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে একটি জাতিকে মেধাশূন্য করার যে অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল, তা এখানে তথ্যনির্ভরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষত ১৪ ডিসেম্বরের ঘটনাবলির প্রেক্ষাপট বইটিকে আরও তাৎপর্যমণ্ডিত করেছে।
গ্রন্থটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কুড়িগ্রাম জেলার শহিদ বুদ্ধিজীবীদের জীবন ও অবদানের বিস্তারিত বিবরণ। ভূমিকা অংশের পর সূচিপত্র বিন্যাস করার পর লেখক বইয়ের প্রথম অধ্যায় শুরু করার আগেই কুড়িগ্রাম জেলার একটি মানচিত্র দিয়েছেন। এতে করে পাঠকের কাছে সহজেই জেলার ভৌগলিক গুরুত্ব এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সীমাবদ্ধতা ফুটে উঠবে। এরপর প্রথম অধ্যায়ে লেখক কুড়িগ্রাম জেলা পরিচিতি তুলে ধরেছেন। 'মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বুদ্ধিজীবী' শিরোনামের এই বইয়ের সাথে জেলার পরিচিতির ইতিহাস যুক্ত করবার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু রয়েছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও জেলা সম্পর্কে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস এবং আমাদের পূর্বপুরুষদের শাসনামল এই অধ্যায়ে ফুটে উঠেছে। বইয়ের বিষয় বস্তুর সাথে কুড়িগ্রাম জেলার নামকরণ এবং ঐতিহাসিকভাবে কুড়িগ্রাম জেলার অবস্থান আলোচনা লেখকের পাণ্ডিত্ব প্রমাণে যথেষ্ট ভূমিকা রাখলেও মূল বিষয়ের সাথে সম্পর্কহীন ছিল। তবে বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে একাত্তরের শহিদ বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞা, তৃতীয় অধ্যায়ে শহিদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা ও কুড়িগ্রাম জেলার শহিদ বুদ্ধিজীবী লেখায় লেখক কিছুটা স্ববিরোধী লেখালেখি করেছেন। কিংবা একাত্তরের শহিদ বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞা কিছুটা পাশে রেখেই নিজের মতো বুদ্ধিজীবী তালিকা করেছেন বলে মনে হয়। যা ইতিহাসের পাঠককে ইতিহাস বিমুখ করতে পারে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহিদ বুদ্ধিজীবী সংজ্ঞা অনুসরণ করে করা তালিকা অনুযায়ী জেলায় মোট ৭ জন ব্যক্তিকে বুদ্ধিজীবীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এই তালিকা তৈরি করতে বাংলাদেশ সরকার চারটি গেজেট প্রকাশ করেছিল। মোট চারটি গেজেটে প্রকাশিত তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় দেশে মোট ৫৫৯ জন শহিদ বুদ্ধিজীবী রয়েছেন। এরমধ্যে কুড়িগ্রাম জেলার ৭ জন। কিন্তু লেখক ও গবেষক মঈনুল হাসান এখানে ১৩ জনের নামের বর্ণনা দিয়েছেন।
![]() |
| সরকারি গেজেটে প্রকাশিত কুড়িগ্রাম জেলার ৭ জন বুদ্ধিজীবীর নামের তালিকা |
এই বইয়ের ৩৫ নম্বর পৃষ্ঠায় প্রকাশিত ছকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত চারটি গেজেটে কুড়িগ্রাম জেলায় মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বুদ্ধিজীবী সংখ্যা ০৭ জনের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ৩৬ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখক কুড়িগ্রাম জেলার শহিদ বুদ্ধিজীবীর তালিকায় ১৩ জনকে স্থান দিয়েছেন। অতিরিক্ত ৬ জন রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পাননি। লেখক কোন বিবেচনায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন তার ব্যাখ্যা এই বইয়ের কোথাও নেই।
অধ্যাপক আব্দুর রহমান
'মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বুদ্ধিজীবী: প্রেক্ষিত কুড়িগ্রাম জেলা' বইটির আলোচনায় জেলার বুদ্ধিজীবীর তালিকায় প্রথমে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে অধ্যাপক আব্দুর রহমানের নাম রয়েছে। তিনি ছিলেন একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, যিনি শিক্ষার মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর জীবনকাহিনী একটি গ্রামীণ মেধাবী তরুণের সংগ্রাম ও সাফল্যের প্রতিচ্ছবি। তিনি নাগেশ্বরী উপজেলার সন্তোষপুর ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা গ্রামে জন্মেছিলেন। শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপনা করতেন রংপুরের কারমাইকেল কলেজে। ১৯৭১ সালের ২রা জুন তিনি রাজাকারের হাতে ধরা পড়েন। তবে কখন, কোথায় কিভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল তার সঠিক তথ্য প্রমাণ না থাকলেও ধারণা করা হয় তাঁকে রংপুরের দমদমা ব্রীজের কাছে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার
অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের জীবনও সংগ্রামময়। দেশভাগের অস্থিরতার মধ্যে বেড়ে ওঠা এই মেধাবী শিক্ষক পরবর্তীতে সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় আত্মোৎসর্গ করেন। তিনি ১৯৪৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের দিনহাটা মহকুমার বামনেরহাটে কালামাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তার বাবা কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার জয়মনিরহাট শিংঝাড় এলাকায় এসে বসবাস শুরু করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে শিক্ষকতা পেশা বেছে নেন। ১৯৬৫ সালে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপনা শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ৬ নম্বর সেক্টর বামনহাট ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নেন এবং বামনহাট বগনী নদীর তীরে সম্মুখ যুদ্ধে তিনি শহিদ হন।
ডা. আব্দুল গফুর আহমদ
ডা. আব্দুল গফুর আহমদ একজন মানবসেবায় নিবেদিত চিকিৎসক ছিলেন, যিনি মানুষের চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. আব্দুল গফুর আহমদ ১৯১৯ সালের ৩রা জানুয়ারি কুড়িগ্রামের চিলমারীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাজীবনে তিনি রেলওয়ে হাসপাতালের দক্ষ সার্জন হিসেবে সেতাবগঞ্জ, পার্বতীপুর, লালমনিরহাট, পাহাড়তলী ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করেন। মানবসেবায় নিবেদিতপ্রাণ এই চিকিৎসক ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল ও পরোপকারী।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পার্বতীপুরে কর্মরত অবস্থায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্মমতার শিকার হন। ১০ মে’র পর তিনি নিখোঁজ হন, যা তাঁর শহিদ হওয়ার দিন হিসেবে বিবেচিত।
আবদুর রউফ সরদার
শহিদ আবদুর রউফ সরদার একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের আলোকিত করার পাশাপাশি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ। কুড়িগ্রামের উলিপুরে জন্ম নেওয়া এই মেধাবী ব্যক্তি প্রাথমিক শিক্ষা শেষে রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ ও ঢাকা কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান পরিসংখ্যান ব্যুরো ও নিপায় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা রাখেন। ৬ ডিসেম্বর রাজাকার ও আলবদর বাহিনী তাকে রায়েরবাজারের বাসা থেকে অপহরণ করে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় দালালদের সহায়তায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। পরে রায়েরবাজারে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়।
আব্দুল জলিল ও মজিবর রহমান
আব্দুল জলিল ও মজিবর রহমান ছিলেন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব, যারা নাট্যচর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করতেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল জলিল ও মজিবর রহমান ছিলেন কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার মাচাবান্দা গ্রামের সাহসী দুই যোদ্ধা। তারা দুজনই স্থানীয় ‘কামেলের যাত্রাদল’-এর সাথে যুক্ত ছিলেন এবং সমাজ-রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। রৌমারী ও মেঘালয়ের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নজরুল কমান্ডারের নেতৃত্বে তারা একাধিক সফল অভিযানে অংশ নেন।
যুদ্ধ চলাকালে ব্যক্তিগত বিপর্যয়, পরিবারের নির্যাতন ও সন্তানের মৃত্যু—সত্ত্বেও আবদুল জলিল সংগ্রাম চালিয়ে যান। পরে গোপনে গ্রামে ফিরলে তাদের অবস্থান রাজাকারদের কাছে ফাঁস হয়ে যায়। রাজাকাররা তাদের ঘেরাও করে আটক করে রাজারভিটা ক্যাম্পে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালায়।
অবশেষে ১৯৭১ সালের ৭ জুলাই ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয় এবং লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
ডা. রমনীকান্ত নন্দী
ডা. রমনীকান্ত নন্দী একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও সমাজসেবক ছিলেন। তিনি নাগেশ্বরী উপজেলার কালিগঞ্জ ইউনিয়নের ভবানীরকুটি গ্রামে ১৯১৫ খ্রি. জন্মগ্রহণ করেন। রমণীকান্ত নন্দীর পিতা শ্রী রজনীকান্ত নন্দী ব্রিটিশ রেলওয়েতে চাকুরী করতেন। তিনি ঢাকার বিক্রমপুরের আদি বাসিন্দা ছিলেন। রমনীকান্ত নন্দী ভিতরবন্দ জেডি একাডেমি হাই স্কুলে পড়ালেখা করেছেন। পরে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে মাদাইখাল এলাকায় চিকিৎসা দিতেন। রমনীকান্ত নন্দী রাজনীতি সচেতন ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি গোপনে তরুণ যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে উদ্ধুদ্ধ করতেন। এসময় এলাকায় পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি সবাইকে ভারতে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে গ্রামে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ শুরু করেন। বিষয়টি পাক হানাদার বাহিনী ও রাজাকাররা বুঝতে পেরে ১৯৭১ সালের ২৮ মে তাকে নাগেশ্বরীতে পাকিস্তানি ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যায়। এসময় রমনীকান্ত নন্দীর গ্রামের ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ক্যাম্পে নিয়ে নন্দীকে তিন দিন কোন খাবার খেতে দেওয়া হয়নি। পরে ৩১ মে সকালে জনসম্মুখে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এছাড়াও গবেষক মঈনুল হাসানের এই বইয়ে অন্যান্য শহীদ বুদ্ধিজীবী হলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী আবুল কাশেম বিএসসি। তিনি ১৯৪৪ সালে উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ উলিপুর সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে আবুল কাশেম ওই পরিষদের সক্রিয় সদস্য হন। ১৯৭১ সালের ১৩ নভেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী বুড়াবুড়িতে অভিযান চালালে আবুল কাশেম বিএসসির বাসায় ছিলেন না। পরে অনেক খোজাখুঁজি করে তাঁকে জুম্মার দোলা নামক স্থানে খুঁজে পেয়ে সেখানেই গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন স্বীকৃতি পাননি। শহিদ আবদুল জব্বার আনসারী ১৯২৩ সালে উলিপুর উপজেলার দূর্গাপুর ফকিরপাড়া এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কুড়িগ্রাম রিভার ভিউ হাই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি দুর্গাপুরে অবস্থান করছিলেন। ১৯৭১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা তাঁকে ধরে নিয়ে পাঁচপীর রেলওয়ে স্টেশন ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে রাজাকার কমান্ডার আবদুল হামিদের উপস্থিতিতে তাঁর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ছাত্র ও যুবকদের উৎসাহিত করার অভিযোগ তোলা হয়। এসময় তিনি বলেন আমি সামান্য স্কুল শিক্ষক। আমি ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখা ছাড়া আর কিছুই শিখাই না। এসময় পাকিস্তানী আর্মি তাঁকে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বললে তিনি সেটি বলতে অস্বীকার করেন। উল্টো জয় বাংলা বলেন। এসময় ১০টি গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন স্বীকৃতি পাননি।
এছাড়াও মোজাম্মেল হক, ডা. তারাকান্ত ভৌমিক, ডা. রইছ উদ্দিন শিকদার, ডা. সফর উদ্দিন আহমদসহ আরও অনেকেই এই জেলার বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিক পরিমণ্ডলকে সমৃদ্ধ করেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। কিন্তু তারা কেউ বুদ্ধিজীবীর স্বীকৃতি পাননি।
লেখক অত্যন্ত যত্নসহকারে এই শহিদ বুদ্ধিজীবীগণের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক পটভূমি, শিক্ষাজীবন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন। তাঁর উপস্থাপনায় তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আবেগ ও মানবিকতার স্পর্শ, যা পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
বইটির শেষভাগে লেখক মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের কিছু আলোকচিত্র তুলে ধরেছেন। গ্রন্থপঞ্জী ও তথ্য বিবরণী অংশে ৬৬ টি বইয়ের নাম, ৮টি পত্রপত্রিকা, ৯টি গেজেট এবং ৪১ জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা তুলে ধরেছেন।
সবশেষে বলা যায়, 'মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বুদ্ধিজীবী: প্রেক্ষিত কুড়িগ্রাম জেলা' শুধু একটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ নয়, বরং এটি একাত্তরের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। এই বই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে শুধু যোদ্ধাদের নয়, বরং বুদ্ধিজীবীদেরও অপরিসীম অবদান রয়েছে। প্রান্তিক অঞ্চলের এই ইতিহাস সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে।
~*~*~*~*~*~*~*~*~*~*~
'মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বুদ্ধিজীবী: প্রেক্ষিত কুড়িগ্রাম জেলা'
মঈনুল হাসান
প্রকাশক: অনুভব, ঢাকা
পৃষ্ঠা: ১২৮
মূল্য: ৩২০
ISBN No: 9789849672050


0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম