কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা - সাজ্জাদ সাঈফ


কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা - সাজ্জাদ সাঈফ

রেজওয়ানুল হাসান

কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা
সাজ্জাদ সাঈফ


প্রকাশক: তিউড়ি প্রকাশন
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারী, ২০১৭
প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪৭
মূল্য: ১৩৫.০০
ISBN: ৯৭৮-৯৮৪-৯২৮২০-৭-৫

‘কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা’ কাব্যগ্রন্থটি কবি সাজ্জাদ সাঈফ এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। যীশুকে একজন আধ্যাত্মিক পুরুষ হিসাবে দেখানো হয়েছে খ্রীষ্টান ধর্মে। যীশুকে খ্রীষ্টান ও মুসলমানরা সন্মান করে থাকেন। তার যুগে প্রচলিত মিথ্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। শারীরিক অত্যাচার সহ্য করেছেন তবুও সত্য থেকে বিচ্যুত হননি। সেই সময়ের পাদ্রীদের ফতোয়ায় সম্রাটের সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে ক্রুসবিদ্ধ হতে হয়েছিল যীশুকে।

বর্তমানের যুগের পরিপ্রেক্ষিতে কবি যীশুর যন্ত্রণা নিতে প্রস্তুত। মানসিক দিক দিয়ে কবি প্রস্তুত হয়েছেন সত্যকে ধারণ করার। সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব আগে যেমন ছিল বর্তমানেও তেমনি আছে। মিথ্যার বিরুদ্ধে দাড়ানোর সৎ সাহস তেমন একটা দেখা যায় না। যীশু শুধুমাত্র আদর্শ প্রচার করেননি, জীবন দিয়ে আদর্শকে সমুন্নত করেছেন। এখন দেখার বিষয় যে বর্তমানের ক্রুস কবি কতদূর পর্যন্ত বহন করতে সক্ষম হন। কাব্যগ্রন্থের নামের সঙ্গে কবিতার বিষয়বলী কতটুকু সামঞ্জস্য আছে।

যাপিত জীবনের চিত্রকল্প তুলে ধরেছেন কবি। এই দৃশ্য শুধুমাত্র কবির যাপন নয় আপামর বাঙ্গালীর জীবনের বয়ান। শিকারী মানুষ থেকে মাছ যেভাবে ডুব দিয়ে ঘাপটি মেরে বাঁচে সেইভাবেই কবি স্বার্থপর মানুষগুলি থেকে পলায়ন করেন। উপমার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন নিজেকে।

জীবন ব্যর্থ নয়, লোক অহেতু বলে গালমন্দ করলেও কবি হতাশ হন না। পৃথিবী ও আকাশকে মিলিয়েছেন হাইওয়ের যাত্রা দিয়ে। প্রকৃতি ঝড়-বাদলায় হাইওয়েকে গাছরা যেভাবে আগলিয়ে রাখে। ঠিক তেমনি লোকের গালাগাল থেকে জীবনকে আগলিয়ে রাখেন কবি। কবি এখানে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন আমাদের জন্মযাত্রা সত্যি, ভ্রম নাকি ভ্রমণ।

টানা গদ্যে লিখেছেন, আমরা গদ্যছন্দের আঙ্গীকে পাঠ করতে পারি। প্রচলিত ছন্দ বা সংস্কৃতি ছন্দেও পাঠকরা এতে একটু হতাশ হবেন। কবিতা যে শুধুমাত্র ছন্দের খেলা নয় সেটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন কবি।

পূর্ব দিকে যাবার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন শিশুদের মতন লাটিম ঘুরাতে ঘুরাতে। সেই রাস্তা ঘেরা থাকে ধানগাছে, রাস্তার ছড়ানো থাকে বটফলে।

খালি হাতে বিষণ্ণ ভিখারীরা যেদিকে গেছে কবিও সেই দিকে যেতে ইচ্ছুক। জেলেপল্লীগুলো লিখে কবি কবিতার শিরোনাম প্রশ্নবিদ্ধ হবে পাঠকদের কাছে। সাধারণ দৃষ্টিতে অনেক জেলেপল্লী দেখা সম্ভব নয়।

কপোতাক্ষ নদ যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্তকে অনুপ্রাণিত করত তেমনি বুড়িগঙ্গা কবিকে অনুপ্রাণিত করেছে। বুড়িগঙ্গার ঘাট ঢেউয়ের ধ্বনিতে মুখর ছিল জুলাইয়ের কোন এক চাঁদনী রাতে। পাখিদের সংলাপ স্বাগত জানিয়েছিল জুলাই মাসকে।

কবি জুলাইয়ের জাতক জানিয়ে দিলেন তার পাঠকদের। এই নদী সিরিজ কবিতায় একটি নতুন শব্দ পাবে পাঠক। অন্য কোন কবি এই শব্দ পূর্বে ব্যবহার করেনি “বয়সগাছ”।

মেঘনা বন্দরকে জ্বরাসক্ত অসুখী শরীরের সঙ্গে তুলনা করেছেন কবি। জ্বর আসলে যেভাবে মানবের শরীরে ছড়িয়ে পরে ঠিক সেইভাবে আছড়ে পড়ে নদীর শরীরে।

এই সব ভাবতে ভাবতে ঘুম আসে। নিঃশ্বাস জড়ো হতে থাকে হৃদয়ের পাশে। এর ভিতরে বৃষ্টি আসে। মাছ ধরার টেটা উঠানে ভেজে একা।

নগরীর মিনারে মিনারে উপাসনার আহ্বান ধ্বনি ভেসে আসে। কবির বোধে বুঝতে পারে মানুষ শেকল দ্বারা বন্দি। কবির ভিতর ও বাহিরের মানুষ হেসে উঠে। কারণ সে নিজেও সেই শেকল পরিহিত।

কবির ভিতরে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছে। নিজেকে অবতার রূপে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। অবতারের সঙ্গা কবি হয়ত ভুলে গেছেন। অবতার অন্যকে জাগানোর জন্য এই ধরাধামে অবতরণ করেন। ইমাম বাড়ীর ছেলে তসবি জপে সেই সুরে ভোর আসে। মানুষ ছায়ার মতই অস্পষ্ট, যেখানে নিয়তি ছায়া রূপে পাশে থাকে।

সেলুনের পাশে আড্ডা দিতে দিতে কবি শোনে চুল ছাঁটার শব্দ। আড্ডায় উঠে আসে স্বপ্নের কথা, ছোট খালার কথা, যুদ্ধ শেষে আস্তাবলে ফেরত আসা ঘোড়ার কথা, আহত যোদ্ধাদের চিৎকার। আকাশ মেঘের বাবল ছুরে মারে। ছাতা হাতে প্রেমিকা দাঁড়িয়ে কারো ফেরার অপেক্ষায়।

কবি শহীদ কাদরীকে উৎসর্গ করেছেন কবি চায়ের দোকান থেকে দিগন্ত। পাখির পিঠ থেকে পালক ঝরছে, নিখোঁজ মানুষের ডাকের মত অনিশ্চিত। শনের খড়ির আগুনে তাপে চায়ের লিকার গরম হয়। আজানের ধ্বনি উপচে মেঘের গর্জন কানে প্রবেশ করে।

টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে খুব। স্মৃতির ভিতর বিড়াল সরে যাওয়ার দৃশ্য, ঘাসফড়িং ভিজতে থাকা এবং বনভূমিতে ভিজছে একটি লোক। লোকটাকে উন্মাদ অচেনা। তার বন্ধু মানিক বলছে জাদুকর। তার চোখের চাহনি ঠান্ডা হাসির শব্দ মোহময়। শিশুদের প্রিয় খেলা কাগজ দিয়ে নৌকা বানিয়ে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া। সম্পর্কের ভিতরে কবি নৌকা বানায়। সেই জলে পোনা মাছ লাফিয়ে ডুবে যায়। নির্ঝরাকে গোপন সিন্দুক খুলে দেখাতে চায় মমির মত অন্তরাত্মাকে। বেঁচে থাকার ভিতর সমস্ত ঘটে যাচ্ছে অল্প অল্প করে। সমাধি ফলকে লেখার মত অভিজ্ঞান ও ভাষা পাবে কার কাছে।

পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে এইটা আমার সমালোচনা বা পাঠপ্রতিক্রিয়া না। “কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা” কবিতাগ্রন্থে কবি কি বলেছেন তারই সারাংশ। যদিও একেক জন পাঠকের কাছে একেক রকম পাঠাভিজ্ঞা হবে। কবির যাপিত জীবন এবং অন্তরদ্বন্দ্বই প্রকট হয়ে উঠেছে। এই লেখার মাধ্যমে আপনাদেরকে গ্রন্থটি সন্মন্ধে সামান্য ধারণা দেবার চেষ্টা করেছি মাত্র। কবিতা গ্রন্থটির রস উপভোগ করতে হলে পুরা গ্রন্থটি পাঠ করা আবশ্যক। কবিতাগ্রন্থটি সফল নাকি ব্যর্থ তা শুধু মাত্র সময়ই বলতে পারে। আমরা শুধু মাত্র রসাস্বাদ্বন করতে পারি। কবি ও পাঠকের মেল বন্ধন তৈরী হোক এই আমার চাওয়া।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। বিস্তারিতভাবে কিছু জানাতে চাইলে এখানে ক্লিক করে ই-মেইল করুন।