“চিকিৎসা বিজ্ঞানে আবিষ্কারের কাহিনী” - শুভাগত চৌধুরী'র বর্ণনায় আকর্ষণীয় ইতিহাস

“চিকিৎসা বিজ্ঞানে আবিষ্কারের কাহিনী” - শুভাগত চৌধুরী'র বর্ণনায় আকর্ষণীয় ইতিহাস

চিকিৎসা বিজ্ঞানে আবিষ্কারের কাহিনী
শুভাগত চৌধুরী

মুক্তধারা, ঢাকা
প্রথম প্রকাশঃ ১৯৭৮
তৃতীয় প্রকাশঃ ১৯৮৮
প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জাঃ আইনুল হক
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৮৪
মূল্যঃ সাদা কাগজ- ৩০.০০
লেখক কাগজ- ২২.০০

আধুনিক যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অবদানের কারণে মানুষ রোগ-ব্যাধিকে অনেকাংশে জয় করতে পেরেছে। কিছু রোগ যা একশ বছর আগেও মহামারীর রূপ নিত, আজ তা পরিণত হয়েছে সাধারণ অসুস্থতায়। গুটি কয়েক ছাড়া মানুষের জানা বেশিরভাগ রোগ এখন সম্পূর্ণ নিরাময় এবং প্রতিরোধযোগ্য। চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিত্য নতুন আবিষ্কারের সহায়তায় মানুষ এখন প্রায় সব ধরণের ব্যাধির উপর কর্তৃত্ব ফলানোর ব্যাপারে আশাবাদী। বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রের মত চিকিৎসা শাস্ত্রের আবিষ্কারগুলোও অনেক কষ্টকর বিপদজনক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর সাফল্য পেয়েছে। কিছু কিছু আবিষ্কার আবার হঠাৎ করেও ঘটে গেছে। কিন্তু তার পিছনেও ছিল বিজ্ঞানীর কঠোর অধ্যাবসায়। নির্ঘুম কৌতুহল ও উদ্ভাবনের অদম্য বাসনা উদ্ভাবককে নিয়ে গেছে সাফল্যের চূড়ায়। সাধারণ মানুষ পেয়েছে রোগ ও আতংক থেকে মুক্তি।

অনেক দিনের সাধনা, ধৈর্য ও পরিশ্রম শেষে চিকিৎসা শাস্ত্রের যে মৌলিক আবিষ্কারগুলো হয়েছে তার মধ্যে কয়েকটি ঘটনা নিয়ে নতুন পাঠকদের উপযোগী করে শুভাগত চৌধুরী এই বই লিখেছেন। কিশোর কিশোরীদের মধ্যে গবেষণা তথা চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারের আগ্রহ ছড়িয়ে দিতেই তার এই প্রচেষ্টা। তার এই আশাবাদ প্রকাশ করেছেন বইটির ভূমিকায়।

“আমার কথা” শিরোনামের ভূমিকায় লেখক শুভাগত চৌধুরী বলেনঃ
আমাদের দেশে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, বিশেষতঃ চিকিৎসা বিজ্ঞানে মৌলিক আবিষ্কারের সংখ্যা খুবই কম। এ-সংখ্যা বাড়াতে হলে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে আরো জনপ্রিয় করে তুলতে হবে।

আমার বিশ্বাস, যে কিশোর-কিশোরীরা আজ বিজ্ঞান-শিক্ষার্থী, তারা অনেকেই ভবিষ্যত গবেষণার কাজে নিয়োজিত হবে। নূতন অনেক কিছু তারা আবিষ্কার করবে। দেশের মুখ হবে উজ্জ্বল। তাদের জন্যই আমার এ-কথাগুলো বলা, এ-বই লেখা।
মাত্র ছয়টি শিরোনামে সাজানো এই বই। সূচীপত্রেই যা স্পষ্ট।
  • ভয়ানক সেই স্ত্রী-মশাটির সন্ধানে
  • কাগজের চোঙা থেকে স্টেথসকোপ
  • এডভেঞ্চার থেকে আবিষ্কার
  • যে কাহিনী শুরু ও শেষ গোয়ালিনীকে নিয়ে
  • ছোট গাঁয়ের সেই ছোট ছেলেটি
  • অস্ত্রোপচারের নতুন যুগ
প্রথম কাহিনী “ভয়ানক সেই স্ত্রী-মশাটির সন্ধানে”। এই রচনায় ম্যালেরিয়া রোগ ও তার আসল কারণ আবিষ্কারের কাহিনী রয়েছে। হিংস্র প্রাণী বাঘ-সিংহ-সাপের কারণে যত মানুষ মারা যায়, তার চাইতে অনেক বেশি মানুষ মারা যায় ক্ষুদ্র প্রাণী মশার আক্রমণে। এনোফিলিস জাতীয় স্ত্রী মশা বাহিত রোগ ম্যালেরিয়া। যখন মানুষ শুধু অভিজ্ঞতা দিয়ে জ্ঞান অর্জন করত তখন তারা দেখেছিল পঁচা ডোবা-নালা-নর্দমা বা বদ্ধ জলাশয়ের পাশে যারা বাস করে তাদের এই রোগ বেশি হয়। তারা ভেবেছিলেন ডোবা-নালা থেকে ভেসে আসা বাজে গন্ধ নাকে লাগলে গায়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর হয়। তাই এই রোগের নাম ম্যালেরিয়া। প্রাচীন ইতালীয় ভাষায় ম্যালো (mala) অর্থ বাজে এবং এরিয়া (aria) অর্থ বাতাস; অর্থাৎ বাজে বাতাস। কেউ কেউ একে 'রাতের বাতাস' নামেও ডাকত। ৫০,০০০ হাজার বৎসর থেকে ১ লক্ষ বৎসর আগেও ম্যালেরিয়ার জীবাণুর অস্তিত্ব ছিল। ১০, ০০০ বৎসর আগে যখন মানুষ কৃষিজীবী জীবন যাপন করা শুরু করে এবং ঘনবসতি তৈরি হয়, তখন থেকে ম্যালেরিয়ার ব্যাপকতা শুরু হয়। রোম সাম্রাজ্যে ম্যালেরিয়া একটি অন্যতম সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। কিন্তু ঠিক কী কারণে ম্যালেরিয়া রোগ হত তার হদিস মানুষ জানত না।

১৮৮০ সালে লাভারেন (Charles Louis Alphonse Laveran (18 June 1845 – 18 May 1922) নামের একজন ফরাসী ডাক্তার প্রথম জানালেন যে এক ধরনের জীবাণুর আক্রমণে ম্যালেরিয়া রোগ হয়। ততোদিনে অনুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার হয়ে গেছে (অনুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের কাহিনী রয়েছে 'একটি কল্যাণকর দুর্ঘটনা' বইয়ের আলোচনায়)। ফলে তিনি ম্যালেরিয়া রোগীর রক্ত অনুবীক্ষণ যন্ত্রে পরীক্ষা করতে পেরেছিলেন। এই জীবাণুরা যে মশার মাধ্যমে সুস্থ মানুষের দেহে ছড়িয়ে পরে এমন ধারণাও তিনি প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু এক বিশেষ জাতীয় মশা যে এজন্য দায়ী তা তিনি বুঝতে পারেন নি।

১৮৯৭ সালে ডাক্তার রোনাল্ড রস (Sir Ronald Ross, 13 May 1857 – 16 September 1932) ভারতবর্ষে কাজ করতে আসেন। সেই সময়ে সারা ভারতে ম্যালেরিয়ার খুব প্রকোপ ছিল। একই বৎসরের ২০ আগস্ট তারিখে দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে তিনি সেই বিশেষ ধরনের মশাকে চিহ্নিত করতে পারেন যার পেটে ম্যালেরিয়া রোগ বাসা বেঁধে পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়। এই এনোফিলিস জাতের স্ত্রী মশার লালায় ম্যালেরিয়ার পূর্ণাঙ্গ জীবাণুগুলো জমা হয় ও কামড়ের মাধ্যমে সুস্থ মানুষের দেহে সংক্রামিত হতে থাকে। ডা. রোনাল্ড রস যে কষ্টকর গবেষণার মধ্য দিয়ে স্ত্রী এনোফিলিস মশাটিকে চিহ্নিত করতে পারেন গল্পের মতো করে তার ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে “ভয়ানক সেই স্ত্রী-মশাটির সন্ধানে” রচনাটিতে।

“কাগজের চোঙা থেকে স্টেথসকোপ”
নিবন্ধটি একটি মজার ঘটনা দিয়ে শুরু হয়েছে। ১৮১৬ সালের এক বিকেল। ডাক্তার থিওফিল লেনেক (René-Théophile-Hyacinthe Laennec, 17 February 1781 – 13 August 1826) এর কাছে এক মহিলা রোগী এসেছেন। তরুণ ডাক্তার পড়ে গেলেন মহাবিপদে। এতো মোটা মহিলা রোগীর বুকে কান লাগিয়ে ফুসফুসের শব্দ এবং হৃদস্পন্দন শুনতে হবে ভেবেই তিনি অস্থির হয়ে গেলেন। তিনি জানতেন যে শব্দ কোন নিরেট বস্তুর ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ভাবতে ভাবতেই তিনি একটি কাগজের চোঙা তৈরি করে ফেললেন। আপাতত সেই কাগজের চোঙা দিয়ে রোগীর বুক পরীক্ষার কাজ সারা হল। আর এই কাগজের চোঙা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে কাঠের নলে রূপান্তরিত হল। নিউমোনিয়া, হাঁপানী, যক্ষা রোগীর ফুসফুসের অবস্থা পরীক্ষা করা অনেক সহজ হয়ে গেল। তখন অনেকে মনে করত পেটের গোলমাল হল যাবতীয় রোগের কারণ। ফুসফুস বা শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও যে সমস্যা হতে পারে তা অনেক ডাক্তার মানতে চাইতেন না। তাই প্রথম দিকে থিওফিল লেনেকের আবিষ্কার অভিজ্ঞ ডাক্তাররা গ্রহণ করেন নি। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে সবাই স্টেথোসকোপ যন্ত্রের উপকারিতা বুঝতে পারে। আর এখন রোগীর অবস্থা বুঝতে প্রাথমিক যন্ত্রের গুরুত্ব পেয়েছে স্টেথোসকোপ।

আধুনিক এনাটমির ইতিহাসে ১৫৪৩ সালটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। এই বৎসরে ডা. অ্যান্ড্রিয়া ভেসালিয়াস (Andreas Vesalius, 1514-1564) প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত বই “De humani corporis fabrica” বা “The structure of the human body”। মানবদেহের অঙ্গসংস্থান বিষয়ে এটাই প্রথম বৈজ্ঞানিক তথ্যসমৃদ্ধ বই। গ্রীক দার্শনিক গ্যালেন (Aelius Galenus or Claudius Galenus 129 AD – 200/ 216) ১৫০ সালের দিকে শুকর ও বানরের মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে মানুষের অঙ্গসংস্থান ও শরীরের গঠন সম্পর্কে মত প্রকাশ করেন। সেসময় রোম সম্রাটের আদেশে মানুষের মৃত শরীর কাটাছেঁড়া করা নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তী প্রায় ১৩০০ বৎসর ধরে গ্যালেনের মতামত কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়নি।

১৫৪৩ সালে ভেসালিয়াসের বই প্রকাশের সাথে সাথে গ্যালেনের মতবাদ প্রশ্নের মুখে পরে। গ্যালেনপন্থীরা ভেসালিয়াসের বিরুদ্ধে একজোট হয়। গ্যালেন একজন ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত অপরাধীর কংকাল বিশ্লেষণ করে তার বই লিখেছিলেন। এছাড়াও তার অংকনশিল্পী বন্ধু ক্যালকার এর সাহায্য নিয়ে তাঁর বইতে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ, অস্থি, পেশী, হৃদপিন্ড, ফুসফুস প্রভৃতির প্রায় নিখুঁত ছবি যোগ করেছিলেন।

বেলজিয়ামে জন্ম নেয়া ভেসালিয়াস কী করে তার আবিষ্কার দিয়ে মানুষের অন্ধবিশ্বাস দূর করতে পেরেছিলেন; অপমান আর উপেক্ষার গ্লানি শেষে পুনরায় সম্মানিত হয়েছিলেন তার মনোজ্ঞ বর্ণনা রয়েছে এই “এডভেঞ্চার থেকে আবিষ্কার” কাহিনীটিতে।

“যে কাহিনীর শুরু ও শেষ গোয়ালিনীকে নিয়ে” শিরোনামের নিবন্ধে লেখক শুভাগত চৌধুরী বসন্তের টীকা আবিষ্কারের কাহিনী বলেছেন। দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণে ডা. এডওয়ার্ড জেনার (Edward Jenner, 17 May 1749 – 26 January 1823) বুঝতে পেরেছিলেন যে যাদের গো-বসন্ত (Cow Pox) হয়, তাদের আর জাত -বসন্ত (Small Pox) হয় না। গরুর সংস্পর্শে থাকার কারণে শুধু গোয়ালাদের গো বসন্ত হতো। আর এরা কেউই আর পরবর্তীতে জাত-বসন্ত দ্বারা আক্রান্ত হত না। জীবাণুতত্ত্ব না জানার কারণে ডা. জেনার আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারেন নি। শুধু ধারণা ও আত্মবিশ্বাসের উপর ভর করেই তিনি ১৭৯৫ সালের ১৪ মে তারিখে গো বসন্তে আক্রান্ত একজনের শরীর থেকে বসন্তের পুঁজ এক সুস্থ বালকের দেহে প্রবেশ করান। ছেলেটি গো বসন্তে আক্রান্ত হয় এবং এক সপ্তাহের ভেতরে সুস্থ হয়ে ওঠে। একই বৎসরের ১ জুলাই তারিখে আসল জাত বসন্তের জীবাণু তার শরীরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহেও তার শরীরে জাত বসন্ত বিকশিত হয় নি। ডা. জেনার আবিষ্কার করে ফেলেন বসন্তের টীকার মূল সূত্র। পরবর্তী যুগে জীবাণুর সাথে পরিচিতি হবার পর মানুষ বসন্ত রোগের আসল কারণ বুঝতে পারে। কিন্তু প্রতিরোধের যে উপায় ডা. জেনার আবিষ্কার করেছিলেন তার কোন পরিবর্তন ঘটেন। ডা. জেনারের আবিষ্কৃত পদ্ধতি পরবর্তী বৎসরগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বসন্ত রোগের আক্রমণ রথেকে রক্ষা করে। টীকা বা ভ্যাকসিনের মূল সূত্র ডা. জেনার যেভাবে প্রস্তাব করেছিলেন তা অবিকৃত থেকে গেছে।

আধুনিক জীবাণুতত্ত্ব ও রোগজীবাণুবিদ্যার প্রতিষ্ঠাতা হলেন লুই পাস্তুর (Louis Pasteur, December 27, 1822 – September 28, 1895)। তাঁর অনুসন্ধিৎসা, মানুষের উপকার করবার আকাঙ্ক্ষা তাকে এনে দিয়েছে সর্বোচ্চ সম্মান। তিনি পড়াশুনা করেছেন রসায়ন বিষয়ে। কিন্তু মানুষের উপকার করার বাসনা তাকে বেশ কিছু উপকারী আবিষ্কার করতে প্রেরণা দিয়েছে। “ছোট গাঁয়ের সেই ছোট ছেলেটি” নামের রচনাটির মূল উপাদান লুই পাস্তুরের জীবনের নানা ঘটনা।

১৮৮৫ সালে তিনি আবিষ্কার করেন জলাতংক রোগের ভ্যাকসিন। কৈশোরে তিনি কুকুরে কামড়ানো একজনকে দেখেছিলেন। সে যুগের প্রথা অনুযায়ী গনগনে গরম লোহার শিক দিয়ে ক্ষতস্থানের চিকিৎসা করা হয়েছিল। বালক বয়সেই তিনি কুকুরের কামড়ে সৃষ্ট জলাতংক রোগের ঔষধ আবিষ্কারের স্বপ্ন দেখেছিলেন। লুই পাস্তুরের কাছ থেকে মানুষ জানতে পারে দুধ ভালভাবে গরম করে নিলে তা আর সহজে নষ্ট হয় না। তার নামে এই পদ্ধতির নামকরন করা হয়েছে পাস্তুরাইজেশন (Pasteurization)। লুই পাস্তুরের জীবনের নানা ঘটনা, তার কৈশোর, যৌবন, পড়াশুনা, বিবাহ, বিভিন্ন আবিষ্কার, নিরসল গবেষণা, পরীক্ষা ইত্যাদি বহুবিদ বিষয় সংক্ষেপে সহজ ভাষায় “ছোট গাঁয়ের সেই ছোট ছেলেটি” রচনায় বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রসঙ্গের মধ্যে জলাতংক রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কারের প্রক্রিয়া পেয়েছে প্রাধান। ধাপে ধাপে এগিয়ে তিনি কীভাবে সাফল্য পেলেন তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। আলোচনা প্রসঙ্গে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্যের অবতারণা হলেও তা লেখকের অনবদ্য ভাষার গুণে হয়ে উঠেছে সহজবোধ্য ও সুখপাঠ্য।

“অস্ত্রোপচারের নতুন যুগ” নামের রচনায় ১৫০০ সালের চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। আজকের যুগের মত সেকালেও হাতুড়ে (Quack) ডাক্তারদের প্রাধান্য ছিল। বই পড়া ডাক্তাররা শুধু টাকাওয়ালা মানুষদের চিকিৎসা করতেন। তাদের কাছ থেকে চিকিৎসা পাবার কোন উপায় সাধারণ মানুষের ছিল না। ফলে রোগে- অসুস্থতায় বেশিরভাগ মানুষ অল্পজানা হাতুড়ে ডাক্তারদের শরণাপন্ন হত।

চিকিৎসা পদ্ধতিও ছিল বিদঘুটে। কারও হাত পা কেটে গেলে সেখানে আগুনে পুড়িয়ে গনগনে লাল হয়ে ওঠা লোহার রড দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়ে অথবা ফুটন্ত তেল ঢেলে দিয়ে রক্ত বন্ধ করা হত। কারও অঙ্গচ্ছেদ ঘটাতে হলে সম্পূর্ণ সজ্ঞান অবস্থায় তা করা হত। এছাড়া ছিল রক্তমোক্ষণ পদ্ধতি। বেশিরভাগ রোগে শরীর থেকে রক্ত বের করে দেয়ার এই প্রবণতা বেশ জনপ্রিয় ছিল। আসলে প্রাচীন অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মানুষের বের হয়ে আসার কোন পথ তাদের জানা ছিল না।

কাঁটা-ছেঁড়া, অস্ত্রোপচারের কাজকে খুবই অসম্মানের চোখে দেখা হত আর তাই এই কাজে নাপিতদের একচেটিয়া ব্যবসা ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের এই নাপিত সার্জনদের খুব কদর ছিল। যুদ্ধে আহত সৈন্যদের একমাত্র চিকিৎসা ছিল আহত অঙ্গ কেটে ফেলা। ক্ষতস্থানে গরম লোহার ছ্যাঁকা দিয়ে রক্তপাত বন্ধ করা হত, তারপর ঢালা হত টগবগ করে ফুটন্ত তেল। সম্পূর্ণ সজ্ঞান একজন মানুষের অঙ্গচ্ছেদ করার পর এভাবে রক্তপাত বন্ধ করা- এরই নাম ছিল সার্জারি। রোগীর যন্ত্রণা লাঘবের কোন চিন্তাই সেযুগের ডাক্তারদের ছিল না। এরপরও যে সব রোগী বেঁচে যেত তাহলে সবাই তার ভাগ্যের তারিফ করত। ধীরে ধীরে অবশ্য ক্ষতস্থান সেলাই করার পদ্ধতি মানুষ আবিষ্কার করতে পেরেছিল। কিন্তু মানুষের মৃত্যুর হার তেমন কমেনি। হাসপাতালের অবস্থাও ছিল তথৈবচ। অপারেশনের যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার কোন পদ্ধতি কারও জানা ছিল না। ফলে অপারেশনের পরে বেশিরভাগ রোগীর ক্ষতস্থান পঁচে গিয়ে গ্যাংগ্রিন হত। বেশিরভাগ রোগীই মারা যেত। ডাক্তাররা আত্মতৃপ্তি পেত এই ভেবে যে “রোগীর আয়ু ছিল না- আমার কীই বা করার আছে।”।

১৮২৭ সালে জন্ম জোসেফ লিস্টার (Joseph Lister, 5 April 1827 – 10 February 1912) এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটান। তার হাত ধরে জন্ম নেয় আধুনিক শল্যচিকিৎসা বিজ্ঞানে। চিকিৎসা শাস্ত্রের ইতিহাসে তিনি প্রথম রোগ মুক্তির সাথে সাথে রোগীর মৃত্যুহার সফলভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হন। লুই পাস্তুরের জীবাণুতত্ত্বের কথা তার কানে এসেছিল। তিনি সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যে, জীবাণুর আক্রমণে ক্ষতস্থানে পচন ধরে। তাই তিনি পুরনো প্রথা ভেঙ্গে অপারেশনের সময়ে পরিচ্ছন্ন কাপড় পড়া, ডাক্তার, নার্স, কর্মচারী সকলের হাত জীবাণুমুক্ত করা, অপারেশনের যন্ত্রপাতি যেমন সুই, সুতা, কাঁচি, চাকু ইত্যাদি ভালভাবে পরিষ্কার করার পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। রাতারাতি আহত রোগীর মৃত্যুর হার কমে আসে। অপারেশন থিয়েটারের বাতাস জীবাণুমুক্ত করার জন্য একটি নতুন যন্ত্র তিনি আবিষ্কার করেছিলেন। যদিও পরে এর প্রয়োজন আর হয়নি। বরং অপারেশনের উপাদানগুলো যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত করে নেয়াটাই বেশি কার্যকর হয়েছিল। আধুনিক যুগে অপারেশন কক্ষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এটাও তাঁর মতানুযায়ী করা হচ্ছে। এন্টিসেপ্টিক ধারণাটি তারই উদ্ভাবন। আর তাই জোসেফ লিস্টার তার জীবৎকালেই সন্মানের উচ্চ শিখরে অারোহন করেছিলেন। সারা বিশ্বের কিচিৎসা বিজ্ঞান মহলে তিনি 'এক কিংবদন্তীর নায়ক' হিসেবে পরিগণিত হয়েছিলেন।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্ধকার যুগ জোসেফ লিস্টারের হাতে শেষ হয়েছিল। হাসপাতালগুলোকে তিনি মৃত্যুগুহা থেকে সত্যিকারের আরোগ্য নিকেতনে পরিণত করেছিলেন। তার এই সাফল্য গাঁথা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে “অস্ত্রোপচারের নতুন যুগ” নামের নিবন্ধটিতে।

“চিকিৎসা বিজ্ঞানে আবিষ্কারের কাহিনী” বইতে শুভাগত চৌধুরী যে ইতিহাস বর্ণনা করেছেন তা বেশ তথ্যবহুল। কৌতুহলী পাঠক সহজবোধ্য ভাষার কারণে সাবলীলভাবে বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত এগিয়ে যেতে পারবেন। মাত্র ৮৪ পৃষ্ঠার এই বই লিখতে লেখককে বেশ কয়েকটি বই ঘাটতে হয়েছে। বাঙালী কিশোর পাঠকের উপযোগী করে তথ্যবহুল রচনা লিখতে গিয়ে যেসব বই লেখক পাঠ করেছেন, তার একটি তালিকা শেষ পৃষ্ঠায় রয়েছে। পাঠকের পাঠ আগ্রহকে বাড়িয়ে তোলার জন্য 'সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী'টি সম্পূর্ণ উল্লেখ করা হল। আশা করি “চিকিৎসা বিজ্ঞানে আবিষ্কারের কাহিনী” বইটি তরুণ ডাক্তারদের হৃদয়ে চিকিৎসা বিষয়ক মৌলিক কিছু আবিষ্কার করতে প্রেরণা দেবে।

“চিকিৎসা বিজ্ঞানে আবিষ্কারের কাহিনী” বই রচনায় সহায়ক গ্রন্থাবলীর তালিকাঃ
  1. Great men of Medicine - Ruth Fox.
  2. Milestones of Medicine - Ruth Fox.
  3. Tales of Human Endeavour – Ed. G. F. Lamb.
  4. Modern Medical Discoveries – Irmengarde Eberle.
  5. A History of Science, Technology and philosophy in the 16th and 17th Century – A Wolf.
  6. Microbe Hunters – Paul de kruif.
  7. Portraits of Nebel Laureates in Medicine and Physiology – Sarah R. Reidman and Elton T. Gustafson.
  8. The Conquerors of Disease – F. George Kay.
  9. An introduction to the history of Medicine – Fielding H. Garrison.
  10. A History of Medicine – Brian Inglis.
  11. The Book of Health – Compiled and Edited by R. Lee clark & Russel W. Cumley.
  12. A Short History of Medicine – Charles Singer and E. Ashworth underwood.
  13. The Great doctors – Robert Silverberg.
  14. A Short History of Medicine – Erwin H. Ackerkecht.
  15. A History of Preventive Medicine – Harry Wain.
  16. Hutchison’s Clinical Methods – Donald Hunter and R. R. Bomford.
  17. A Health Reader for Indian High Schools – Percival C. Wren.