“বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন” -- নতুন লেখকদেরকে ‘বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ যে পরামর্শগুলো দিয়েছিলেন

"বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন"- নতুন কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, লেখক সাহিত্যিকদেরকে 'বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়' যে পরামর্শগুলো দিয়েছিলেন

সাহিত্য রচনার ভাষা কেমন হওয়া উচিত—সে প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘বাঙ্গালা ভাষা’ শীর্ষক একটি রচনা আমরা ‘গ্রন্থগত’ ওয়েবসাইটে পূর্বেই প্রকাশ করেছিলাম। সেই রচনায় বঙ্কিমচন্দ্র খুব সংক্ষেপে ও সহজভাবে সাহিত্যের উদ্দেশ্য, ভাষাভঙ্গি ইত্যাদি প্রসঙ্গে যে কথাগুলো বলেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আজ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত আরও একটি লেখা প্রকাশ করছি।

শতাধিক বছর আগে বাংলা ভাষার নবীন লেখকদের উদ্দেশে বঙ্কিমচন্দ্র যে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তার অনেকটাই আজও প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। নতুন কিছু লেখার সামর্থ্য অর্জন করলে নবীন লেখকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আনন্দ ও প্রকাশের আগ্রহ তৈরি হয়। কখনো কখনো সেই আবেগ এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, নিজের লেখাটিকে একজন পাঠক বা সমালোচকের দৃষ্টিতে পুনরায় বিচার করার অবকাশ থাকে না। ফলে সৃষ্টিসুখের উল্লাসে যে লেখা জন্ম নিয়েছে, তা কতটা সারবান হয়ে উঠেছে— এই প্রশ্নের চেয়ে তার প্রকাশ ও প্রচারের দিকেই মনোযোগ বেশি পড়ে।

এ প্রবণতা নতুন নয়। বঙ্কিমচন্দ্রের সময়েও নবীন লেখকদের মধ্যে এমন প্রবণতা ছিল, এবং সে কারণেই তিনি তাঁদের সাহিত্যচর্চা ও আত্মমূল্যায়ন সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছিলেন। ‘বিবিধ প্রবন্ধ’-এর দ্বিতীয় খণ্ডে সাহিত্য রচনা প্রসঙ্গে তাঁর সেই কথাগুলো শতাধিক বছর পরও আমাদের ভাবতে বাধ্য করে।

বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যবোধের সঙ্গে আমরা অনেকাংশে একমত বলেই ‘গ্রন্থগত’-এর পাঠকদের জন্য রচনাটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো। আশা করি, সমকালীন নবীন কবি, নাট্যকার, গল্পকার, ঔপন্যাসিকসহ লেখক-সাহিত্যিকেরা বঙ্কিমচন্দ্রের বক্তব্যের সঙ্গে নিজেদের সাহিত্যচর্চা ও আত্মমূল্যায়নের বিষয়টি মিলিয়ে দেখার সুযোগ পাবেন।


বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন
বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

  • ১। যশের জন্য লিখিবেন না। তাহা হইলে যশও হইবে না, লেখাও ভাল হইবে না। লেখা ভাল হইলে যশ আপনি আসিবে।
  • ২। টাকার জন্য লিখিবেন না। ইউরোপে এখন অনেক লোক টাকার জন্যই লেখে, এবং টাকাও পায়; লেখাও ভাল হয়। কিন্তু আমাদের এখনও সে দিন হয় নাই। এখন অর্থের উদ্দেশ্যে লিখিতে গেলে, লোক-রঞ্জন-প্রবৃত্তি প্রবল হইয়া পড়ে। এখন আমাদিগের দেশের সাধারণ পাঠকের রুচি ও শিক্ষা বিবেচনা করিয়া লোক-রঞ্জন করিতে গেলে রচনা বিকৃত ও অনিষ্টকর হইয়া উঠে।
  • ৩। যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করিতে পারেন, তবে অবশ্য লিখিবেন। যাঁহারা অন্য উদ্দেশ্য লেখেন, তাঁহাদিগকে যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীদিগের সঙ্গে গণ্য করা যাইতে পারে।
  • ৪। যাহা অসত্য, ধর্ম্মবিরুদ্ধ; পরনিন্দা বা পরপীড়ন বা স্বার্থসাধন যাহার উদ্দেশ্য, সে সকল প্রবন্ধ কখনও হিতকর হইতে পারে না, সুতরাং তাহা একেবারে পরিহার্য্য। সত্য ও ধর্ম্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য। অন্য উদ্দেশ্যে লেখনী-ধারণ মহাপাপ।
  • ৫। যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাৎ ছাপাইবেন না। কিছু কাল ফেলিয়া রাখিবেন। কিছু কাল পরে উহা সংশোধন করিবেন। তাহা হইলে দেখিবেন, প্রবন্ধে অনেক দোষ আছে। কাব্য নাটক উপন্যাস দুই এক বৎসর ফেলিয়া রাখিয়া তার পর সংশোধন করিলে বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করে। যাঁহারা সাময়িক সাহিত্যের কার্য্যে ব্রতী, তাঁহাদের পক্ষে এই নিয়ম রক্ষাটি ঘটিয়া উঠে না। এজন্য সাময়িক সাহিত্য, লেখকের পক্ষে অবনতিকর।
  • ৬। যে বিষয়ে যাহার অধিকার নাই, সে বিষয়ে তাহার হস্তক্ষেপ অকর্ত্তব্য। এটি সোজা কথা কিন্তু সাময়িক সাহিত্যতে এ নিয়মটি রক্ষিত হয় না।
  • ৭। বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা করিবেন না। বিদ্যা থাকিলে, তাহা আপনিই প্রকাশ পায়, চেষ্টা করিতে হয় না। বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা পাঠকের অতিশয় বিরক্তিকর, এবং রচনার পারিপাট্যের বিশেষ হানিজনক। এখনকার প্রবন্ধে ইংরাজি, সংস্কৃত, ফরাশি, জর্ম্মান্, কোটেশন্ বড় বেশী দেখিতে পাই। যে ভাষা আপনি জানেন না, পরের গ্রন্থের সাহায্যে সে ভাষা হইতে কদাচ উদ্ধৃত করিবেন না।
  • ৮। অলঙ্কার-প্রয়োগ বা রসিকতার জন্য চেষ্টিত হইবেন না। স্থানে স্থানে অলঙ্কার বা ব্যঙ্গের প্রয়োজন হয় বটে; লেখকের ভাণ্ডারে এ সামগ্রী থাকিলে, প্রয়োজন মতে আপনিই আসিয়া পৌঁছিবে—ভাণ্ডারে না থাকিলে মাথা কুটিলেও আসিবে না। অসময়ে বা শূন্য ভাণ্ডারে অলঙ্কার প্রয়োগের বা রসিকতার চেষ্টার মত কদর্য্য আর কিছুই নাই।
  • ৯। যে স্থানে অলঙ্কার বা ব্যঙ্গ বড় সুন্দর বলিয়া বোধ হইবে, সেই স্থানটি কাটিয়া দিবে, এটি প্রাচীন বিধি। আমি সে কথা বলি না। কিন্তু আমার পরামর্শ এই যে, সে স্থানটি বন্ধুবর্গকে পুনঃ পুনঃ পড়িয়া শুনাইবে। যদি ভাল না হইয়া থাকে, তবে দুই চারি বার পড়িলে লেখকের নিজেরই আর উহা ভাল লাগিবে না—বন্ধুবর্গের নিকট পড়িতে লজ্জা করিবে। তখন উহা কাটিয়া দিবে।
  • ১০। সকল অলঙ্কারের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার সরলতা। যিনি সোজা কথায় আপনার মনের ভাব সহজে পাঠককে বুঝাইতে পারেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক। কেন না, লেখার উদ্দেশ্য পাঠককে বুঝুন।
  • ১১। কাহারও অনুকরণ করিও না। অনুকরণে দোষগুলি অনুকৃত হয়, গুণগুলি হয় না। অমুক ইংরাজি বা সংস্কৃত বা বাঙ্গালা লেখক এইরূপ লিখিয়াছেন, আমিও এরূপ লিখিব, এ কথা কদাপি মনে স্থান দিও না।
  • ১২। যে কথার প্রমাণ দিতে পারিবে না, তাহা লিখিও না। প্রমাণগুলি প্রযুক্ত করা সকল সময়ে প্রয়োজন হয় না, কিন্তু হাতে থাকা চাই।
বাঙ্গালা সাহিত্য, বাঙ্গালার ভরসা। এই নিয়মগুলি বাঙ্গালা লেখকদিগের দ্বারা রক্ষিত হইলে, বাঙ্গালা সাহিত্যের উন্নতি বেগে হইতে থাকিবে।

প্রথম প্রকাশ: মাঘ, ১২৯১ বঙ্গাব্দ

সূত্র: বাঙ্গালার নব্য লেখকদের প্রতি নিবেদন, বঙ্কিম রচনাবলী
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবিসূত্র: উইকিপিডিয়া

মতামত:_

8 মন্তব্যসমূহ

  1. উত্তরগুলি
    1. সূত্র হিসেবে প্রদত্ত লিংকে ভ্রমণ করে পেজটি পিডিএফ হিসেবে সেভ করে নিন। তাহলে উপর্যুক্ত লেখাটির একটি সম্পূর্ণ পিডিএফ পেয়ে যাবেন। ধন্যবাদ

      মুছুন
  2. সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর

    উত্তরমুছুন
  3. লেখকের মতে সত্য ও ধর্ম ব্যতীত অন্য উদ্দেশ্য লেখনী ধারন কী

    উত্তরমুছুন
  4. অনুধাবন লিখ-
    যাহারা সাময়িক সাহিত্য ব্রতী তাহাদের পক্ষে এই নিয়মটি রক্ষা হয়ে উঠে না।কথা টি বিশ্লেষণ কর।

    উত্তরমুছুন
  5. বাঙ্গালার সাহিত্য বাঙ্গালার ভরসা। এই বাক্য লেখকের অন্তর্নিহিত ভাব কী

    উত্তরমুছুন

মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম