সাম্য রাইয়ানের চোখে "দ্বিতীয় আয়না"য় দেখা 'দেবাশীষ ধরে'র কবিতা

কবি সাম্য রাইয়ানের চোখে "দ্বিতীয় আয়না"য় দেখা 'দেবাশীষ ধরে'র কবিতা

জানি, এভাবে প্রতিটি নীরব ভাষা একটি নতুন ভাষা হয়ে দাঁড়াবে

(…এবং ভাষা / পৃষ্ঠা ৩১)

কবি দেবাশীষ ধর এর প্রথম কবিতাবই ‘ফসিলের কারুকাজ’ (২০১৬); আমি হাতে পাইনি৷ উপরের কবিতাটি উদ্ধৃত করলাম কবির দ্বিতীয় কবিতাবই ‘দ্বিতীয় আয়না’ থেকে, যা খড়িমাটি প্রকাশনী থেকে ২০১৮ এ প্রকাশিত হয়েছে৷ চৌত্রিশটি কবিতা নিয়ে এ বই৷

নাগরিক জীবনের আশা–আকাঙ্ক্ষা, প্রেম–ব্যর্থতা, দ্বন্দ্ব, পলিটিক্স মূর্ত হয়ে উঠেছে এই বইতে৷ মনে হয়েছে, তিনি লিখেছেন তারই জীবনচিত্র; আহত আত্মার কবিতা৷ তাঁর কবিতার শিরোনামের দিকে লক্ষ্য করলে বিষয়টি বোঝা যায়; ‘ডেথমেটাল ও লাল চা’, ‘ল্যাম্পপোস্ট’, ‘ফ্লাইওভার’, ‘ফ্রিজ’, ‘কার্পেট’, ‘মাননীয় স্পিকার’, ‘ট্রাম’, ‘কফিশপ’, ‘রাষ্ট্র’, ‘সীমানা’ ইত্যাদি৷

আমি পোলারিত হচ্ছি প্রতিদিন, আমাকে দেখে আপনিও হচ্ছেন৷
আর রাষ্ট্রতো এভাবে আমাদের পোলারায়ন৷
(রাষ্ট্র / পৃষ্ঠা ৪৬)

রাষ্ট্রকে কবি কীভাবে দ্যাখেন তা এই কবিতার মাধ্যমে আমাদের কাছে পরিষ্কার৷

যে প্রকৃতি আমাদের আশ্রয়দাতা, সেই প্রকৃতির সাথে আমাদের যে অসহিষ্ণু সম্পর্ক, প্রকৃতির বালিতে–মাটিতে যে মমতা–মায়াময় জগৎ— অথচ আমাদের জীবনে তা নেই, বরং ঘরে ঘরে রক্তের উৎসব, কবি তা বর্ণনা করেছেন ‘সীমানা’ কবিতায়৷

ব্যাসার্ধের মাথা এখনো পর্যন্ত কৃষ্ণ গহ্বরের জ্ঞানকাগজে, কেন্দ্র হতে কোটি কোটি বৃত্ত নিজের অস্তিত্বের যুদ্ধ করে গেল৷ পৃথিবীর বালিতে কবিতার ঘর আর প্রতিটি ঘরে ঘরে রক্ত মানুষের রক্তে হোলি৷

একটা বিশাল বৃত্ত আঁকতে গিয়ে কম্পাস ভেঙে যায় প্রতিবার, ব্যাসার্ধের আগায় মানুষ পৌঁছালেই এর সীমানা তৈরি হবে৷
(সীমানা / পৃষ্ঠা ৪৭)

কয়েকটি কবিতায় কবি সরাসরি বইয়ের কথা উল্লেখ করেছেন, লেখকের নামসহ৷ কবিতার পংক্তি করে তুলেছেন৷ এরকম তিনটি কবিতার অংশবিশেষ উল্লেখ করছি৷

শেষরাতে মদের বোতলটিতে অল্প ছিলো, এটি নিয়ে এসেছিলো গত রাতে এক কবি৷ নাম জানি না তার, শুধু দেখেছি তার হাতে মার্কস সাহেবের ‘পুঁজির উদ্ভব’ এর বাংলা অনুবাদ বইটি সাথে লোরকার কবিতার বই৷
(মদের বোতল / পৃষ্ঠা ১৬)

শুকনো হলুদ গোলাপেরা হাত থেকে হাতের শিরায় প্রবেশ; পাতাগুলো বিনয়বাবুর ‘ফিরে এসো চাকা’র ভেতর পিশে গেছে৷ বেসলেটটা ঝুলে ছিল হয়তো তার ভেতর৷ চুলগুলো উড়ে যায়, বুক হতে স্তনেরা খুলে পড়ে, ঠোঁট ঝুলে থাকে গাছের বুকে, নাভির পিঠে বসে পৃথিবীর ডায়েরি লিখছে হলুদ চিঠিগুলো৷
কাফকা’র গ্রাম্য ডাক্তার সেই তখন থেকেই এক রুগির চিকিৎসা করে যাচ্ছেন, রাতগুলো প্রতিবার শুক্রবার হয়ে যায়, আর চুলগুলো শরীরটাকেই ঢেকে রাখে৷ শরীরের নাম চার পৃষ্ঠার হলুদ চিঠি৷
(মার্চের তিন তারিখ এবং গল্পগুলো শুক্রবার – ৫ / পৃষ্ঠা ২০)

ডিমলাইটের আলোয় প্রহর কেটে প্রহরের বুকে উৎপলকুমার বসু’র ‘কবিতাসমগ্র’, যেরকম একদিন শুক্রবারের মধ্যরাতে মেলোডিনের ছান্দিক উপসর্গে তবলার আঘাত৷
(দুই ফুট চুলের গোছা / পৃষ্ঠা ২২)

বইজুড়ে বিমূর্ত চিত্রকল্পের ছড়াছড়ি৷ চিত্রকল্পগুলো কষ্টকল্পিত মনে হয়েছে৷ ইংরেজি শব্দের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো৷ সাবলীল নয়৷ আটকে যেতে হয়৷ এ প্রসঙ্গে ‘হলুদ গোলাপ’ কবিতায় বারংবার ‘গার্লফ্রেণ্ড’ শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্যনীয়৷

‘স্পর্শ’ কবিতাটি তুলনামূলক ভাল লেগেছে৷ কবিতাটি উদ্ধৃত করছি৷

লাল জবার ভেতর কালো চুলেরা আশ্রয় নিয়েছে, সারা রাত কাটলো অথচ আমি এখনো স্পর্শ করতে পারিনি৷
(স্পর্শ / পৃষ্ঠা ৩৫)

ঝড় পরবর্তী ঘটনা নিয়ে একটি কবিতা ‘ঝড়’৷ ছন্দপতন ঘটলেও কবিতার প্রথম পংক্তিটি দারুণ৷

গ্যাসোলিন বোতলে তোমাকে রাখিনি কখনো যে ঝাঁকাবো আর নিজেকে মাতাল করবো৷ এই তো ঘরের পাশে কাঁদা মাটির উপর কিছু কথা পুঁতানো৷ গতরাতে ঘর ভিজে গেলো, ডুবে গেলাম৷ এখনো কোন ফ্যাক্স আসেনি, কোন সংবাদ এলো না৷ সবই পুঁতে ফেলছো৷
(ঝড় / পৃষ্ঠা ৩৪)

কবি দেবাশীষ ধরের কবিতাগুলো আমার কাছে প্রাণহীন ধর মনে হয়েছে৷ কেবলই যেন শব্দের কচকচানি৷ বাক্যে বাক্যে ছন্দপতন পাঠে বাধা সৃষ্টি করে৷ এই বইয়ের প্রায় সকল কবিতাই আমার কাছে বেসুরো মনে হয়েছে৷ আমি এতক্ষণ যা লিখলাম তা একান্তই আমার ব্যক্তিগত পাঠ পরবর্তী মন্তব্য৷ আমি পাঠকের প্রতি অনুরোধ করবো আপনি নিজে বইটি পড়ুন৷ আর কবিতা প্রসঙ্গে শেষ কথা সময়ই বলবে৷ আমি সামান্য পাঠক হিসেবে হয়তো বেশিই বলে ফেললাম৷ তার জন্য কবির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাই৷


দ্বিতীয় আয়না
দেবাশীষ ধর
প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৮
প্রকাশক: খড়িমাটি, চট্টগ্রাম৷
মূল্য: ১২০ টাকা

২টি মন্তব্য:

  1. সাম্য রাইয়ানের চোখে >> কবি দেবাশীষ ধরের কবিতাগুলো আমার কাছে প্রাণহীন ধর মনে হয়েছে৷ কেবলই যেন শব্দের কচকচানি৷ বাক্যে বাক্যে ছন্দপতন পাঠে বাধা সৃষ্টি করে৷ এই বইয়ের প্রায় সকল কবিতাই আমার কাছে বেসুরো মনে হয়েছে৷

    উত্তরমুছুন

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।