কবি বঙ্গ রাখালের কবিতা ও আমার বোধ: “হাওয়াই ডাঙার ট্রেন” সম্পর্কে 'কৃষক মাহমুদ'

কবি বঙ্গ রাখালের কবিতা ও আমার বোধ - “হাওয়াই ডাঙার ট্রেন” সম্পর্কে কৃষক মাহমুদ

কৃষক মাহমুদ

বাংলাদেশ যেমন নদীমাতৃক দেশ তেমনি কবি মাতৃক দেশও বটে এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এদেশের আলো বাতাস হৃদয়ে মেখে প্রত্যেক দশকেই জন্ম নেয় অজস্র কবি আর এদের মধ্যে থেকেই কিছু কবি তাদের নিজস্ব স্বর বা ধারা সৃষ্টি করে প্রত্যেকের হৃদয়ে টিকে থাকেন । জীবনানন্দ দাশ বলেছেন- প্রত্যেকে কবি না, কেউ কেউ কবি। অজস্র কবির জন্ম হলেও সবাইতো কবি না, টিকে থাকে কয়েকজন মাত্র। তেমনি দ্বিতীয় দশকের কবি বঙ্গ রাখাল। যার কবিতায় রয়েছে আলাদা স্বর আর নিজস্বতা। যা আমাদের বারংবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় মা, মাটির একান্ত কোলের সন্তান করে। তার কবিতা বলার ভঙ্গি অন্যদের থেকে আলাদা- একের মধ্যে বহুরসন্ধান। যাকে বলা হয় বহুস্বরের কবিতা।

বহুমাত্রিক সৃজনশীল লেখক ও কবি বঙ্গ রাখালের কবিতা পাঠ মানেই যেন এক আলাদা মেজাজের স্বাদ আস্বাদন করা যায়। আমরা জানি- কবিরা কবিতার জন্ম দেন। কবিতা হতে পারে সচেতন বা অবচেতন মনের মাধ্যমে যা কবির শিল্পবোধকে জাগ্রত করে চেতনাগত পরমপরা বিশ্বজনীন হিসেবে। এই কবি তার প্রত্যেক কবিতায় এক ধরনের আঁধার আর ঐন্দ্রজালিক বিষয় রেখে দেন যা অনেকবার পাঠের পর তার অর্থ বোঝা যায়। কবির কবিতার মধ্যে বাউলিয়ানা উপমার ব্যবহার একটু বেশি যা গভীরভাবে উপলব্ধিতজাত। ভূমি, পৃথিবী, নারী কবির “হাওয়ায় ডাঙার ট্রেন” নামক কাব্যগ্রন্থের প্রত্যেক কবিতার উপমার মূখ্য বিষয়। এসবের পরেও তিনি অনায়াসে কবিতায় এঁকে গেছেন নিজের কথা, বাংলার কৃষক, বাউল-ফকির, শহর-গ্রাম, শোষণ-নির্যাতন, রাষ্ট্রযন্ত্রের অনিয়ম তান্ত্রিকতা, মানুষের মানহীন জীবনযাপন ও রোহিঙ্গাদের উপর অমানবিক নির্যাতনের কথাও উঠে এসেছে এ কাব্যগ্রন্থে।  কবির চারপাশে ঘটে যাওয়া অতি সাধারণ বিষয়কেও তিনি উপকরণ বানিয়ে বুনে গেছেন কবিতার রসায়ন। যা কবির জীবনবোধ ও আত্মদর্শনকেই উপস্থাপন করে।

কবি বঙ্গ রাখালের কবিতায় এক ধরণের শূন্যতাবোধ, হতাশা, না পাওয়ার বেদনা কাজ করে আর সেসবকে আষ্টে-পিষ্টে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে থাকে- নারী আর যৌনতা। মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস এই যৌবন। যে মূল্যবান বস্তু মানুষকে জীবন দিয়ে রক্ষা করতে হয় আজ সেই যৌবন যেন হায়েনাদের ভোগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এজন্যই কবি বললেন-
রাতে তোমার বুকে মাথা রেখে জ্বেলে  দেবো আগুন।
কৃষক বেশে রাধিকার বুক জমিনে কর্ষণ চাষীর চাষা হয়ে বুনে দিয়ো শস্যের মলন। (ও কৃষ্ণ ও রাধা)

কবির অভিজ্ঞতা বহুমাত্রিক। তিনি ছোটবেলা থেকেই চষে বেড়িছেন গ্রাম হতে গ্রামে, শহর থেকে শহরে। কবি শহরের অলিগলিতে চলতে চলতে শিখে গেছেন কংক্রিটময় জীবন। এ জীবন বড় দূর্বিষহ। যেখানে ঠোঁট বাকিয়ে- “বেশ ভাল আছি” বলা ছাড়া আর কিছুই বলার থাকে না ।
এতোদিনে বুঝেছি যান্ত্রিক নগরে প্রত্যেকে একা কিংবা একা নয়
শুধু অভিনয়, ঠোঁট বাকিয়ে হাসার চেষ্টা...(শুধু হেঁটে চলি পথ)

কবির কবিতা যেন তার  হৃদয় নিঙড়ে নিঙড়ে লেখা। ছোটবেলায় পিতাকে হারিয়ে একান্ত বুকের কোণে পুষে রেখেছেন শূন্যতা। স্বামী হারা বিধবা মায়ের মুখ তাকে কষ্ট দেয়, তাই কবি তার কবিতায় বলে যান-
সেই বাল্যকালে বাবার মৃত মুখ, আহাজারিময় মার স্বামী হারা কষ্ট আর
 এক ট্রেন ছেঁড়ে অন্য  ট্রেনের বগি বেয়ে বাদামের ঝুলি বদলের ইতিহাস...(হাওয়াই ডাঙার ট্রেন)

কবি তার “জীবন” নামক কবিতায় গল্পের ছলে মেদহীনভাবে বলে চলেছেন- নিজের কথা, বাড়ি, গোয়ালঘর, ঢেঁকিঘর, নিমতলা যা কবির ঘরগৃহস্থালির বিষয়াদি কবিতার উপকরণ হয়ে কবিতাকে সুন্দর অবয়বে সাজিয়ে তুলেছেন-
আমাদের নিকোন উঠোন পার হলেই গোয়ালঘর, পাশে হেঁসেল।
 যে হেঁসেলকে ভালবেসে মা রাঁধুনী হতেন।
কবি হতাশা বা শূন্যতাকে বুকে পুষে রাখলেও প্রেমকে এড়িয়ে চলেননি। এতকিছুর পরেও তিনি তার কবিতায় প্রেমিক পুরুষের পরিচয় দিয়েছেন এবং তিনি যে প্রেমিক তার স্বাক্ষর রেখেছেন তার কবিতায়-

১. বটতলে প্রিয়তীর চুলে খোপা বেধে গড়িয়ে পড়বো সন্ধ্যার আধাঁরের কোলে।
শিকড়ের টানে, নৌকার ঘরে বাসর সাজাবো। (কিছু কথা কিছু সুখ)
২. প্রতি রাতে তোমার অপেক্ষায় কাটে ...
আমি তোমাকে দেখি, কাটাছেঁড়া করি আমাকে আর রাতের আধাঁর গাঢ় হলে-
বিছানায় শুয়ে, নিরব চোখে তোমাকেই দেখি।  (পেনোয়ার ফুল)
৩. আমিও দিতে পারি- ভাঙ্গা শরীর ভাঁজে লুকিয়ে রাখা কামনদী সাঁতার... (নদীবাহিত বাউলি শ্লাঘা)
৪.আমি তোমার কাছে প্রেম ভিখারি এক ক্ষেতহীন শুষ্ক, খরাবতী ভূমি।  (সোয়ামী)

কবি তার “কৈতর” কবিতায় আবেগ ও নারীর আকৃষ্ট হয়ে ভালোবাসার দূরদৃষ্টি ছঁড়ে দিয়ে খুব সাবলীল ভাষায় প্রকাশ করলেন-
বেলতলায় দাঁড়ায়ে উদম বুকের সানকিতে সাজিয়ে তুলিস তীরহীন সমুদ্দুরের ঢেউ।
কবি বঙ্গ রাখালের ব্যক্তি জীবনের মনুষ্যত্ব ও ব্যক্তি প্রতিভার সমন্বয় ও শূন্যতা কবিকে বার বার বিচলিত করে তোলে যে শূন্য কবিকে বিরহ ও দুঃখবোধের সঙ্গী করে ভেতরে ভেতরে শূন্যতা নৈঃশব্দের গ্রহ ধারণ করে পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে আসেন এবং আমাদের বুঝতে না দিয়ে প্রাণবন্ত ভাষায় সেটা তার কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করতে সক্ষম হন। কবির যে কষ্টগুলো কবিতায় উঠে উঠেছে সেটা ব্যতিক্রম কিছু না। যাপিত জীবনে সবার মধ্যেই কম বেশি দেখা যায় তবে কবিদের দুঃখ কষ্ট একটু বেশি আর এ কষ্ট যেন তাদের ম্রিয়মানতা নিঃসন্দেহে তাদের নব সৃষ্টি করতে সাহায্য করে। রোহিঙ্গাদের প্রতি যে চরম অমানবিক অন্যায়টা করা হয়েছে সেটা শহর বাস্তবতা, বেকারত্ব, ভিখারিদের দুর্বৃত্ত জীবনের কথা, এমনকি শহর ও শহরতলীর পতিতার জীবন ও জীবিকার কথা উঠে এসেছে কবির “ছায়া” কবিতায়।একই কবিতায় কবি আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন আবেগে বসবতি হয়ে। তার একান্ত নিজস্ব স্বর সৃষ্টির উল্লাসে এমন সব কথামালার শব্দগুচ্ছ ছুঁড়ছেন।
বর্ষার জলে কখনো ভেজেনি আমার আয়েশী কোমল পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের শরীর।
সেই শরীর আজ পড়ে থাকে ধুলো মাটির জলে।

কবি তার “ও অভিজিৎ ঘরে আছি” কবিতায় রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি ধীক্কার জানিয়েছেন। অভিজিৎদের মতো মুক্তমনা সংকৃতবানদের নির্মম মৃত্যু এবং তার সুন্দর বিচার আর কঠিনতম শাস্তির নিদর্শন না দেখতে পাওয়ায় অতি কষ্টে জরজরিত হয়ে বলিষ্ঠ ভাষায় কবি বলেছেন-
মূর্খ স্বদেশের মূর্খ রাজা। অভিজিৎ আমি ঘরে আছি।
এ রাজ্যে মূর্খ থাকাটাই বেশ।

কবিতার এমন আরো প্রতিবাদমূলক উচ্চারণ দেখা যায় তার “জন্ম জন্মান্তর” নামক কবিতায়-
লাশদের মিছিল দীর্ঘ হলে উচ্চারিত হয় প্রতিবাদী সুর।

অন্য কবিতায় কবি বললেন-
আমি আর লিখব না
 কেননা এবার পেশাবের জোয়াবে ভাসাব স্বদেশ।

কবির কিছু কবিতা ও কবিতার চরণ কবি শামসুর রাহমানের “একটি ফটোগ্রাফ” কবিতার ঢঙে লেখা  বা তার সাদৃশ্যতা খুঁজে পাওয়া যায় তার কিছু কবিতার চরণে- “এই যে আসুন দেখে যান ধান ক্ষেত। আবার “সাত মাথার বেহুলা” কবিতায় একই রকম উচ্চারণ- “এই যে আসুন, সাত মাথার জনগণ। “জন্ম জন্মান্তর” নামক কবিতায় এক স্থানে ঠিক একই রকম সুর দেখতে পাওয়া যায়।
 এই যে দেখুন শৈশবে পড়ে থাকা পিতার হৃদয়ে উৎপাটিত ইতিহাস।
কবি তার শাণিত কলম চালিয়েছেন শোষণ, শাসন অবিচারের বিরুদ্ধের গ্রামের অধিকার বঞ্চিত শ্রমিক কৃষক ও খেটে খাওয়া খাঁটি মানুষের স্বপক্ষে। বাংলার কৃষক শ্রমিক যে হাজার বছর ধরে শোষণ নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে চলে আসছে মাথায় নিয়ে বৃথা শ্রমের গ্লানি। কবি সেটাই প্রকাশ করেছেন তাই তার “চাষীর ঘরে ঝুলে থাকে সুলতানে ফটো” নামক কবিতায়-
ধানের শ্রমিক বুনে যায় সকালের শ্রম
মাথায় হাজার বছরের চিতার আগুন।

মানুষের ঘটনা বহুল জীবন। এ জীবনে মানুষ সঞ্চয় করে গোটা জীবনের অভিজ্ঞান আর আত্মরচনা মানুষকে আরাধ্য বাসনা মোহিমান্বিত করে। কবি “কৈতর” কবিতায় বললেন-
পাড়ার মোড়ে মোড়ে বৈঠকের ঢেঁকি ভানে নবান্নের ধান। বসন্ত রাত মাদুলি করে উড়ে যায় রাতের কৈতর।
মানুষ শেষ পর্যন্ত কি কৈতর হয়...। উড়ে যায় আকাশের কোলে পড়ে নেই রাত রহস্যের দিনপঞ্জিকা।

কবি তার কবিতায় অনেক বিষয়াদি নিয়ে নিরীক্ষা করেছেন এবং মানুষের ভাষায় যেন তার কবিতার মুখ্য ভাষ্য। কবির কবিতায় মানবিকতা যেভাবে মুদ্রিত তা সত্যিই আমাদের প্রেমিক করে তোলে এছাড়াও তিনি ঐতিহ্য সচেতন কবিও বটে। তার কবিতায় তুলে ধরেছেন আদি পিতা অ্যামিবার কথা। কবি বলেছেন যে আমার যা কিছু পাওয়া সবকিছু পিতা, পিতামহ ও প্রপিতা থেকে পাওয়া। শেকড় থেকে পাওয়া কবিতার “একই বৃক্ষের ফুল” নামক কবিতায় পুরোনো ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন।
দাদু শান দ্যায় বাটালে আর আমি শান দ্যায় চাঁদের হেলে পড়া ঠোঁটে।

কবির প্রপিতা কেরামতি দিয়ে বলেছে ভালোবাসিস নদী ও নারী, তাই দেখি নদী তার আদিম আশ্রয়। নারীর প্রতি ভালোবাসা, কামনা-বাসনা কার নেই। সবার মতো কবি নিজেও তবে তার কবিতায় অনেকটাই ভিন্ন স্বাদ আর আঙ্গিক লক্ষ্য করা যায়। তিনি তার কামনার দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন দাদির ঠোঁট। যেমনটি হয়ত তার দাদাও একসময় দেখেছিলেন। কিন্তু দাদা আদিম পাথর হতে পেরেছিল কিনা বলতে পারিনা তবে কবি হতে পেরেছে বলেই কবি একথা প্রকাশ করেছেন।
আমার দাদীর নোনতা ঠোঁটে ঠোঁট রাখলেই আমি হয়ে যায় আদিম পাথর।

আবার একই কবিতায় কবি নারী বন্দী জীবন আর পরাধীনতার কথা তুলে ধরেছেন-
দাদুর হাতেই দাদীর বন্দী জীবন।

কবি তার প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই একাধিক দিক এনেছেন। একটা কবিতায় শুধু একটা অর্থের অবতারণা না করে মিশিয়ে রেখেছেন একাধিক কাহিনি। কবির কবিতায় কবিত্ব প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন আঙ্গিকে যা ক্রমবিকাশ হতে হতে মরমিবাদীতে রুপান্তরিত হয়েছে। যা কবির নিজের গুঢ় স্বত্তার উপলব্ধিতা স্বনির্ভর সাধনায় প্রকাশিত হয়েছে। কবির ব্যক্তি অভিজ্ঞতাময় কবিতায় এসেছে- মৃত পিতার কথা, নিমগাছ, লেবু ফুল, গোয়াল, নদী, চাঁদ ইত্যাদি তার কবিতার উপাদান। কবি তার নিজের গ্রামের আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী ময়না পাগলের কথা কবিতায় তুলে ধরেছেন। এই ময়না পাগল ঘর ছাড়া, সংসার ছাড়া এক আধ্যাত্মিক প্রতিভাদীপ্ত সাধক। এই সাধকের কথা কবি প্রকাশ করলেন- “পাখি বাসনায় আকাশ কিনি” কবিতায়-
মনসকামনায় প্রাণ দেয় পাখিন্মুখ ময়না পাগল।
এভাবে কবি অতি সহজ সরল বাক্যে ব্যক্তি জীবনের টানাপোড়েন, হা-হাকারকে জীবন্ত করে তুলেছেন প্রতিটি কবিতার পরতে পরতে । কবির কবিতা পাঠকের শরীরকে শীতল করে তোলে আবার বেদনার বিষমাখানো যন্ত্রণাদগ্ধতা প্রেমানুভূতি সৃষ্টিতে সাহায্য করবে পাঠকের মনন বিনির্মাণে। জীবনের  মলিনতা আর জীবনের ক্লেদ যেন কবিকে একজন সত্যিকার কবি হতেই নানাভাবে সাহায্য করেছে যা পৃথিবীর যেকোন নারীর ভিতর দিয়ে মমতার বাক্য কবির কবিতা হয়ে জ্বলজ্বল করবে যুগ হতে যুগে, কাল হতে কালান্তরে।


হাওয়াই ডাঙার ট্রেন
বঙ্গ রাখাল
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর
প্রকাশনী: বলাকা
মূল্য: ১৩০



কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে হলে ই-মেইল করুন।