'খান আতাউর রহমান' এর "স্মৃতির পাখিরা" অনেককেই স্মৃতিকাতর করে তুলবে

'খান আতাউর রহমান' এর "স্মৃতির পাখিরা" অনেককেই স্মৃতিকাতর করে তুলবে

বাংলাদেশ অংশে আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতির সূচনালগ্নে যে সকল নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন; তাঁদের মধ্যে খান আতাউর রহমান অন্যতম। তাঁর সৃজনশীল কর্মকাণ্ড বাংলা সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করেছে; দিয়েছে নতুন নতুন দিকে বিকাশের অপার সম্ভাবনা। শিল্পী জীবনের আড়ালে চাপা পরে গেছে তাঁর ব্যক্তিজীবন। এই ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন ঘটনা দিয়ে সাজানো খান আতাউর রহমান রচিত বই "স্মৃতির পাখিরা"। রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হবার দিনগুলিতে তিনি তরুণ জীবন যাপন করছিলেন। সে সময়ের অনেক স্মৃতির পাখি বয়স্ক পাঠককে  নষ্টালজিক করে তুলবে।

চৌদ্দটি অংশে খান আতাউর রহমান তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের অনেক ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ অকপটে প্রকাশ করেছেন। বইয়ের সূচনায় কোনরকম আনুষ্ঠানিকতার ভিতর দিয়ে না গিয়ে সরাসরি জীবনচিত্রে চলে গেছেন। তাঁর বর্ণনা সরস, জীবনের গতির মত লেখার গতিও সাবলীল।

বইয়ের সুচীপত্র নিম্নরূপ:
  • ভাঙনের ঢেউ
  • আমার তৃপ্তি বৌদি
  • শিল্পীর মন
  • নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব
  • অপরাধ
  • কেউ ভোলে না কেউ ভোলে
  • আমরা সেকেলে
  • অমানুষ
  • কবির মৃত্যু
  • ভুলের মাশুল
  • স্মৃতি
  • ঋণের বোঝা
  • মকরাণী কন্যা মক্‌তবা
  • জাহাঙ্গীর রোড ইস্ট
ছাত্রাবস্থায় ছিলেন সরাসরি সংস্কৃতি কর্মী। তখন ছিল পাকিস্তানী আমল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বাঙালির পাশাপাশি পাকিস্তানীদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষনীয়। তাদের সাথে কাজ করতে গিয়ে পাওয়া বিভিন্ন অভিজ্ঞতাও তাঁর আত্মজীবনীতে স্থান দিয়েছেন।

ভূমিকাতে বলেন:-
“রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা--”। এ ধন তো স্মৃতির মণিকোঠাতেই সঞ্চিত থাকে। সেখান থেকেই কিছু সুখ, কিছু দুঃখের কথা লিপিবদ্ধ করলাম 'স্মৃতির পাখিরা' গ্রন্থে।
ছাত্রাবস্থায় রেডিওতে সংবাদ পাঠকের কাজ করতে গিয়ে পাকিস্তানী সহকর্মীর সাথে হাতাহাতির ঘটনা তাঁর স্মৃতির পাখিদের প্রথম চিত্র। জীবনবিবৃতির প্রথম রচনাগুলোতে শত্রু হিসেবে পাকিস্তানীদের দেখা মেলে, কিন্তু শেষের দিকের চিত্রে পাওয়া যায় বন্ধুবৎসল পাকিস্তানীদের কথা। এক পাঞ্জাবী বন্ধুর বন্ধুত্বের অঙ্গীকার তাঁকে আজীবন আন্দোলিত করেছিল। এক রূপবতী মকতবা নারী তাঁর হৃদয়ে বেদনার কাঁটা গেঁথে দিয়েছিল। সেকথা কোন রকম রাখঢাক না রেখে বইতে বর্ণনা করেছেন।

তাঁর জীবন ছিল ঘটনাবহুল। সবসময়ই সক্রিয় জীবন যাপন করতেন। একবার পাকিস্তানী ট্রেন ড্রাইভারকে ঘুষি মারার অপরাধে জেলে যান। সেখানে দেখা পান স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর। খান আতাউর রহমান চিত্র পরিচালক হিসেবে শচীন সেনের সিরাজউদ্দৌলা নাটকটিকে সিনেমায় রূপান্তর করেছিলেন। এই সিনেমার বেশ কয়েকটি অংশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার সাথে মিল রাখা হয়েছিল। সে বিষয়টি বঙ্গবন্ধুও জানতেন। জেলের ভিতর সেকথা জিজ্ঞাসাও করেছিলেন। খান আতাউর এর দুঃখ একটাই যে বঙ্গবন্ধুকে 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা' সিনেমাটি দেখাতে পারেন নি।

গতিশীল জীবনের বাঁকে বাঁকে তাঁর হয়েছে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা। বাড়ির সামনের খোলা ম্যানহোলে পড়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়। নিজের বাড়ির সামনের ঘটনা হওয়ায় তিনি স্বতঃস্ফুর্তভাবে অর্থযোগেও সাহায্য করেন। কিন্তু ফলাফল ভিন্ন দিকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পাশের বাড়ির উকিলের পরামর্শে ছেলেটির পিতা তাকেই দোষী সাব্যাস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। নিষ্ঠাবান মানবিক বোধসম্পন্ন তরুণ পুলিশ অফিসার তাঁকে সব জানায়। মানুষ ও অমানুষের পার্থক্য তাঁকে আন্দোলিত করে। সারা দিন সারা রাতের পরিশ্রম শেষে ভোরে বাড়িতে ফিরে তাঁর মনে এক দার্শনিক উপলব্ধির জন্ম হয়। তিনি উপলব্ধি করেন: -
এমন পিতাও তাহলে হয়? এমন উকিল নামক বুদ্ধিজীবীও তাহলে হয়, সেই ধাঙ্গর ছেলেদের মতো বেপরোয়া কিশোরও তাহলে হয়, সর্বজন নিন্দিত পুলিশ সমাজে সেই হৃদয়বান দারোগাটিও হয়? পৃষ্ঠা- ৪০
বোম্বাই চলচ্চিত্র শিল্পের একজন চলচ্চিত্র কুশলী হবার আশায় শুধুমাত্র ঠিকানা সম্বল করে এক পরিচিত বাঙালি বন্ধুর কাছে গিয়েছিলেন। শহরের উচ্চ মধ্যবিত্ত হোটেলে খান আতাউরের থাকার ব্যবস্থা কয়ে দিয়েছিল সেই বাঙালি বন্ধু। তিনি অভিজাত জীবন যাপন করতেন। তাঁর আচার-আচরণ, চাকর-পেয়াদার দৌড়াদৌড়ি সব ছিল খান আতাউরের চোখে অভাবনীয়। সেই বন্ধুর পোষাক ছিল এরকম:-
দামী গেবার্ডিনের স্যুট, মেরুন রঙের টাই, ধবধবে সাদা সার্ট পরা। পৃষ্ঠা-৫৪
তিনি যাপন করতেন সুবেশী উচ্চ মধ্যবিত্তের জীবন। ওরকম একটা হোটেলের সবাই তাকে চেনে ও মানে। খান আতাউরের থাকা-খাওয়ার চিন্তা ছিল না। বোম্বাই শহর ঘুরে বেড়াতেন ও বিভিন্ন স্টুডিওতে কোন কাজ পাওয়া যায় কি না সেই সুযোগের খোঁজ করতেন। বেশ নিশ্চিত জীবন ছিল তার। হঠাৎ একদিন জানা গেল সেই সুবেশী বাঙালি তার অন্যান্য বন্ধুসহ পুলিশের হাতে ধরা পরেছে। এরা ছিল পকেটমার। সমাজের উঁচু জগতে তাদের যাতায়াত। সুবেশী অর্থবান আশ্রয়দাতার গ্রেফতার হওয়ায় খান আতাউর রহমান পরেন অকুল পাথারে। জ্যোতি স্টুডিওতে বিনা বেতনে মাসের পর মাস খাটুনি ও রাত্রিকালে ফুটপাতে কাগজের তোষকে রাত্রিবাস। শেষে দয়ালু বৃদ্ধ দোকানীর দেয়া একশত টাকায় মেলে মুক্তি। খান আতাউরের জীবনে ঘটে যাওয়া এরকম অনেক ঘটনা আমাদের সামনে মনুষ্যজীবনের বিভিন্ন দিককে তুলে ধরে। 'ঋণের বোঝা' অধ্যায়ে জাহাজের ডেকে বসে তিনি সে কথাই ভেবেছিলেন-
সেই বাঙালী বন্ধু, দেবেনদা, বিটঠাল, সেই নিরাশ্রয় রাত্রে দেহপসারিণীদের দালাল লোকটি, সেই দোকানী দয়ালু লোকটির একশ টাকা। এতসব ঋণের বোঝা যে জীবনেও শোধ হবে না তাও জানি। আজ এসব কথা অকপটে স্বীকার করে, প্রকাশ করে যেন মনে হচ্ছে সে ঋণের বোঝা কিছুটা লাঘব হলো। পৃষ্ঠা- ৬১
চৌদ্দটি অধ্যায়ের প্রতিটিতে রয়েছে খান আতাউরের জীবনে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু চমকপ্রদ অভিজ্ঞতার কথা। খারাপ অভিজ্ঞতার অভিঘাত লেখকের উপর দিয়ে বয়ে গেলেও মনোযোগী শিক্ষিত পাঠক ঘটনার নির্যাস বুঝতে পারেন, অনুধাবন করতে পারেন ফলাফল, সচেতন হয়ে পরেন নিজের জীবনে। সতর্ক হয়ে যান মানবজীবনের নানাবিধ প্রতিমূর্তি দেখে।

‘স্মৃতি' নামক অধ্যায়ে রয়েছে লেখকের হিন্দু বন্ধু ও তার দিদির কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতার কথা। দৃশ্যমান কোন বিভ্রান্তি না থাকলেও মায়ের কথায় খান আতাউর রহমান তার হিন্দু বন্ধুকে সন্দেহ করেন। হিন্দু বন্ধুর দিদি নিজের সাদা শাড়ি দিয়ে তাঁর ক্ষতস্থানের রক্ত পড়া বন্ধ করলেও তার বিদ্বেষ যায় না। তিনি যেন চিরকালীন প্রশ্ন রেখে গেলেন তাঁর হিন্দু বন্ধু ও দিদি সম্পর্কে। কিন্তু তিনি নিজে উত্তরটি জানেন না বা পরবর্তীতে জেনেছেন বা আর কখনও জানার চেষ্টা করেছেন কী না তার কোন উল্লেখ বইয়ের কোন অধ্যায়েই করেন নি। তবে হিন্দু জনগোষ্ঠীর কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর জীবনে সম্মানের আসনে রয়েছেন। তেমন কয়েকজন হলেন সেকালের বিখ্যাত অভিনয়শিল্পী 'তৃপ্তি বৌদি', 'অধ্যাপক পূর্ণেন্দু স্যার', প্রাইমারি স্কুলের 'যোগীন্দ্রনাথ মাস্টারমশায়' প্রমুখ। এদের প্রত্যেকের কথাই যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে স্মৃতিকথায় স্থান পেয়েছে। কিন্তু সেই হিন্দু বন্ধু ও দিদি সম্পর্কে তাঁর মা যে সাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গি প্রকাশ করেছিলেন সে ঘটনার আর কোন সমাধান লেখক কোথাও প্রকাশ করেন নি।

খান আতাউর রহমানের বর্ণাঢ্য শিল্পী জীবনের খুব অল্প কয়েকটি প্রসঙ্গ "স্মৃতির পাখিরা" বইতে এসেছে। আরও বেশ কয়েকটি আসতে পারত। তাঁর কর্মজীবনের আরও অনেক ঘটনা জানতে পারলে পাঠক উপকৃত হত। পাকিস্তান আমলে কতটা বিপত্তি ও অপমান-অবদমনের মধ্য দিয়ে বাংলা সংস্কৃতি বহমান ছিল, পাকিস্তানীদের হাতে এদেশের সহজ সরল বাঙালি জনগোষ্ঠী কিভাবে মূল্যায়িত হত এসবের আংশিক চিত্র অবশ্য তিনি উল্লেখ করেছেন। সমকালের বাঙালি পাঠক এসব ঘটনা থেকে সেকালের বাংলাদেশের সামাজিক চিত্রকে কিছুটা হলেও চিনতে পারবে।

খান আতাউর রহমান সম্পর্কে আমার জানার আগ্রহ ছিল। তিনি ছিলেন একাধারে চলচ্চিত্র অভিনেতা, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, কাহিনীকার এবং প্রযোজক। তাঁর 'নবাব সিরাজউদ্দৌলা', ‘আবার তোরা মানুষ হ', 'জীবন থেকে নেয়া' প্রভৃতি সিনেমা এবং 'এ কি সোনার আলোয়', ‘শ্যামল বরণ মেয়েটি', ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে', ‘এ খাঁচা ভাঙবো আমি কেমন করে' ইত্যাদি গানগুলো বিখ্যাত। গানগুলো বহুবার শুনেছি, নিজের মনে গুণগুণ করে গেয়েছি; সুরমূর্ছনায় আলোড়িত, আনন্দিত হয়েছি। তাঁর ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে কৌতুহল ছিল। আজকের আলোচ্য বইটি পাঠে আমার অনেক আগ্রহ তৃপ্ত হয়েছে। খান আতাউর রহমানের সংস্কৃতিমান জীবনের নানা দিক জানতে পেরেছি। তার রচনাভঙ্গি দ্রুতলয়ের ও ভাষাভঙ্গি সহজ সরল। ফলে পড়তে গিয়ে নিজের অজান্তেই পড়ার গতি বেড়ে যায়। মজার মজার ও আকর্ষণীয় ঘটনার পিছনে ছুটতে গিয়ে সময় কোনদিক দিয়ে বয়ে যাবে তা টের পাওয়া যাবে না। এক বসাতেই বইটি শেষ করে দিতে ইচ্ছা করবে। অবশ্য পৃষ্ঠা সংখ্যা মাত্র সত্তরটি হওয়ায় তা সম্ভবও বটে। তবে এক পড়াতে বইটি শেষ হবে না। বারবার পড়তে ইচ্ছা করবে। এখানেই "স্মৃতির পাখিরা" বইটির সাফল্য; খান আতাউর রহমানের রচনাসৌকর্যের সার্থকতা।

-০-০-০-০-০-০-০-০-০-০-

স্মৃতির পাখিরা
খান আতাউর রহমান


প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
প্রথম প্রকাশ: ভাদ্র ১৪০০
প্রথম আজকাল সংস্করণ: ১৯৯৮
প্রকাশনী: আজকাল প্রকাশনী, ঢাকা।
পৃষ্ঠা: ৭০
মূল্য: ৫০ টাকা
ISBN: 984-569-02602

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে করলে ই-মেইল করতে পারেন।