সাজ্জাদ সাঈফের কবিতা ও সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার উত্তরণ : অয়ন্ত ইমরুল

সাজ্জাদ সাঈফের কবিতা ও সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার উত্তরণ : অয়ন্ত ইমরুল

আমরা 'গ্রন্থগত' ওয়েবসাইটে এর আগে সাজ্জাদ সাঈফের "কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা" কাব্যটির একটি আলোচনা 'রেজওয়ানুল হাসান' এর ভাষ্যে প্রকাশ করেছিলাম। আজ প্রকাশ করছি একই কাব্য সম্পর্কে 'অয়ন্ত ইমরুল' এর মনোভঙ্গি।
আমাকে রক্তাক্ত করে যে কাঁটার পত্রালি, আমি তার গাছ ঘরেই কাছেই এনে লাগিয়েছি- কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা
কবি সাজ্জাদ সাঈফের সাথে আমার পরিচয় ফেসবুকের কল্যাণে। কখনও দেখা হয় নাই তার সাথে।তবে যতটুকু জেনেছি, উনি নিভৃতচারী-সংঘহীন।কারো সাতে-পাঁচে নেই।তবে সত্য উচ্চারণে দ্বিধাহীন। তার অবয়বের অনেকটা ফুটে উঠেছে "কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা" নামের প্রথম কবিতার বইটিতে। স্বাধীনতা পরবর্তীতে বাংলা কবিতায় একটা পরিবর্তিত অবস্থা লক্ষ্য করার মতো। এমন পরিস্থিতিতে যারা কবিতা যাপন করে চলেছেন, তাদের উদ্দেশ্য হল কবিতায় একটা নতুন স্বর সৃষ্টি বা নতুন নির্মাণ। এই নতুন স্বর নির্মাণে-সৃজনকলার অন্য অনেক সারথির মতো কবি সাজ্জাদ সাঈফও জগতের শব্দ-নৈঃশব্দ ও সৌন্দর্যের সংবেদে নিজেকে নিজের মতো করে বাজিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টার মধ্যদিয়ে, একনিষ্ঠ মনে, ধ্যান ও দ্রষ্টালোকে গেঁথে চলেছেন কথামালা। কবি সত্য ও সুন্দরে সময়ের সচেতন প্রতিনিধি। ধারক ও বাহক। কবির কলমে যেমন কাল কথা বলে, তেমনি ভবিষ্যতের দ্রষ্টাও একজন কবিই। মানুষ যেমন আড্ডা প্রিয় তেমনি আবার আড্ডাবিমুখ কেউ কেউ আছেন। আবার অনেক বন্ধু মহল থেকে দেখা যায় নিজেকে আলাদা করার তাগিদ। অথবা স্বার্থান্বেষীদের এড়িয়ে কেউ কেউ একার সন্ন্যাসের দিকেও পা বাড়ায়। কবি সাজ্জাদ সাঈফ একটা সময় হয়তো আড্ডা দিতে খুব ভালবাসতেন। সে স্মৃতি যদিও অপসৃত।সম্ভবত স্মৃতি-কাতরতায় উচ্চারিত হয়। সেই অপসৃত দিনের বেদনা, যা বেদনা হয়েই ফুটে থাকে কখনো কখনো। চলে কাগজ ও কলমের সঙ্গম।
যার ফসল--
 গান ছিল, আজ সংঘবহির্ভূত স্মৃতির দম্ভে শুধু খসখসে পাতা ঝরে পড়ে
...আমাকে ডেকেছে আজ নীরবতা-রাগ
একটি সহজ সুরের বাজনা। কিন্তু করুণ এক ভায়োলিনের দিকে আমাদের নিয়ে যায়। আমরাও যেতে বাধ্য হই এই কবির সাথে। যাপন কবিতাটিতে এক অদ্ভুত টান অনুভূত হয়। যেখানে ভাতের ধোঁয়া ওড়ে, মায়ের হাতের সল্লি, পাতিলকে ঠেলে দেয় অন্যান্য উন্মাদনায়। বহুদিন পর যেন আমাকে পেয়ে কবুতররাও উঠোন মাতিয়ে তুলছে। কবির উচ্চারণ—
দ্রুত ডুবে গিয়ে মানুষ কে ফাঁকি দেয়া মাছগুলি ঘাপটি মেরেছে কোথাও, এতসব কিছুর মাঝেই আমার বেঁচে থাকা তল্পিতল্পা সহ, জীবন অহেতু বলে গালমন্দ করে লোকে, নিজেকে বুঝে সুঝে রাখি; ঝড় বাদলায়-শীতে 
কবি সাজ্জাদ সাঈফ বক্তব্য প্রকাশে সংহত ও শব্দের ব্যবহারে যেমন মিতব্যয়ী তেমনি সতর্কও বটে। অতিকথনের দায়ভারে তার কবিতা কখনো ন্যুজ নয়। কেবল অনিবার্য শব্দপুঞ্জ, অনিবার্য বিন্যাসে পাঠকাগ্রহ দাবী করতেই পারে। ভাষার বিভিন্নতা যেমন পরিলক্ষিত হয় এই কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা বইটিতে তেমনি গ্রামীণ চিত্রকল্প অভিনবত্বের আভাস দিয়ে যায়। ইচ্ছে করে কবির সাথেই বেরিয়ে পড়ি।
আমারও যাওয়ার কথা নিশ্চয়,  বটফল দানা ছড়ানো ছিটানো থাকে, দূর গ্রহ থেকে বুলবুলি এসে পরানে পিয়ানো বাজায়— কিংবা
এই সব গাছের গায়ে বহু দাগে নাম লিখে গেছে, কাটাকুটি আরও কত কথা, পথিকেরা ছায়ার বিছানা পেয়ে [কবিতা-জেলেপল্লীগুলা] 
বহুবিধ বিষয় তুলে আনাতে এখানে পাঠক একঘেয়েমির দায় থেকে তাকে মুক্তি দিতে পারবেন। যদিও কবিতাকে আমি বিষয়ের ঊর্ধ্বে রাখি। তবু বলতে হয় বা কেউ কেউ বলে সমাজ বা রাষ্ট্র, এবং মানুষ।এসবের মধ্য দিয়েই কবি। তিনি তার দায় এড়িয়েও যাননি। তার কবিতায় উঠে এসেছে সমাজ-রাষ্ট্রে সংঘটিত ঘটনা-দূর্ঘটনার বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার চিত্র। নানা দুর্যোগে এ এক আত্ম-আবিস্কারের প্রবণতা। খেয়াল করা যায় বস্তু ও নির্বস্তুর মধ্যে সরল বা বক্রতায় সম্পর্ক নির্ণয়ের এক অগাধ প্রচেষ্টা—
তখন প্রচন্ড বাতাস উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে পড়ে চাঁদ, আড়াল করে তারাদের প্রদাহ, মায়ের হাতের মুঠি থেকে ফসকে গিয়ে হঠাৎই তলিয়ে যায় শিশু বানের পানিতে। সারা পৃথিবীতে যেমন মানবতার জয়-জয়কার গান। তেমনি সৈকতেও শিশুর লাশ ভেসে ওঠায় থমকে দাঁড়ানোর মুহূর্তও গানের বিপরীতে দাঁড় করায় পাঠককে। কবি সাজ্জাদ সাঈফ শিশুর শ্বাস চাপা চিৎকার তুলে আনেন তার কণ্ঠস্বরে-
রক্তজমাট বাঁধা করোটির হাহাকার থেকে এসে এই বাক্যবিরাম বাড়িয়ে দিয়েছে বাহু, তোমাদের জয়োৎসবে নিঃসঙ্গ, এই সেই আলেখ্য বিশ্রাম... বহুকাল চেতনালুপ্ত, যেন, কোমা থেকে নড়ে ওঠে একটি আঙুল একা! [একটি আঙুল একা] 
কবি আঙুল নাড়িয়ে চিহ্নিত করেন — এ এখন নড়ে ওঠার সময়। যীশুকে মুসলিমরা যেমন সম্মান করে তেমন খৃষ্টানরাও সম্মান করেন। তিনি একজন আধ্যাত্মিক পুরুষই শুধু নন মুসলিমদের রাসূলও। তিনি প্রচলিত মিথ্যার বিরুদ্ধে যেমন সোচ্চার ছিলেন তেমনি অনুসারীদের দেখিয়েছেন সত্য ও সুন্দরের পথ। পাদ্রীদের ফতোয়ার জন্য তাকে সহ্য করতে হয়েছে বিভিন্ন শারীরিক নির্যাতন এমনকি মৃত্যু। তবু সত্য থেকে পিছপা হননি বরং হত্যাকে মেনে নিয়েছিলেন। যেহেতু "কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা" তাই কবিও মানসিকভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছেন সত্যকে ধারণ করার। সুন্দরকে সম্মান করার। আমরা পড়ে দেখি প্যালেস্টাইন নামের কবিতাটির অংশবিশেষ---
ভোরের কলধ্বনি শুনি, কোনও রূপকথা হতে পেতলের কলসে করে জনপদে ভেসে এলো সূর্য, সিন্ধুঘনিষ্ঠ এ মরু!
সমস্ত হাওয়ায় বারুদগন্ধের অভ্যর্থনাও টের পায় মানুষ, অজেয় রক্ষাকবচ বুঝি এইসব মারণব্যস্ততা এইসব অপঘাত; সকরুণ মেঘমালা ওড়ে, সকৌতুকে!
গাছের খোড়লে এসে পাখি আর ডাকে না যেখানে, অন্তর্যামী আর তাসের রাজা দৃশ্যপটে পায়চারী করে গেল, সারাটি দিন-
শব্দালংকার, অর্থালংকার ও ভাষার সহজাত ব্যবহার লক্ষ্য করলে কবিতায় তার শক্তিমত্তা, নিবিড়যোগ, এবং মর্মার্থ উপলব্ধি খুব একটা কঠিন নয়। কবির আছে সমাজ সচেতনতা, দার্শনিক প্রত্যয় ও সত্য উপস্থাপনের তাড়া। চারপাশের মানুষ যেন কেমন এড়িয়ে যেতে চায়, গুটিয়ে নিতে চায় নিজেকে কোন ঘটনা বা দূর্ঘটনা থেকে। কিন্ত কবি তা পারেন না। তার কবিতায় সমাজের সংগতি- অসংগতি আসে প্রচ্ছন্নভাবে, স্লোগান সর্বস্ব হয়ে নয়। মানুষের এড়িয়ে যাবার প্রবণতা দেখে তিনি উচ্চারণ করেন-
এইসব ফায়ারপ্লেসের নিকট মানুষেরা উপভোগ করে আগুন, ঝাউবনে ঝিঁঝিদের জেগে ওঠে সংগীতের অনুভূতি, নিশিডাক অপরিমেয় লাগে; কৃতি ও করুণার কাছাকাছি সমস্ত জীবন বিছিয়ে দিয়ে গল্প করে আর কাঁদে, কৃতদার পুরুষেরা; - তারকাতরুর তলে এই রাত, এই অনশ্বর দ্যুতিবর্শার ফলা যাতনাদীপ্ত, ক্রমে৷ (বলিরেখা)
সবারই থাকে একটা মধুমাখা শৈশব। এক্কাদোক্কা, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, লাটিমের দীর্ঘ ঝিম, লত্তির প্যাঁচ। যা জীবনকে সারাজীবন আলোড়িত করে। এ কবি শৈশবকাতর। কি এক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে উচ্চারণ করেন-
মিহিন আলোর ভোরে কতগুলি কুঁজো লোক বসেছে নদীর ধারে—
চলাচল রহিত রেখে,  সেইখানে, শৈশবের লাটিম দেখার ছলে শিরিষ গাছের তলে আজ আমার বহুদিন পর বসা। [লাটিম-কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা]
কখনো কখনো বোর্ডিং জীবনের কথা এ কবি ভেবে পীড়িত হন। মায়ের মুখ ভীড় করে যাপনের আয়নায়। মায়ের বলা কথাগুলা কানে বাজে। জিয়ল মাছের কথা ওঠে। মায়ের চোখে ছেলেরা সব সময় রোগাই থাকে। তাই তো মা বলেন- "কতদিন পর আইলি এইবার তুই, রোগা হয়ে গেছত বাবা।" মা যে তার কাছে শতমুখি ফুলের বাগান। কবি চেতনার কথা বলেন। বলেন অতিচেতনার কথা। কাব্যগ্রন্থের নামের সাথে কবিতার বিষয়াবলীর মিল অনেকাংশে লক্ষণীয়। কবির জীবনাদর্শনে প্রতিফলিত যে দৃশ্য, তা হল মানুষের পায়ে পায়ে বেড়ি। শিকলপ্রিয়তা। তবে শৃঙ্খলের শিকল পরেও তো নৃত্য করা যায়।
প্রচন্ড বাতাস উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে পড়েছে চাঁদ,আড়াল করে তারাদের প্রদাহ!
নাও শিরদাঁড়া,নাও কর্কটস্নায়ু, নাও মজ্জায় ভিড়তে থাকা হারমোনিকার সুর....
এ তো আমাদের জীবনবয়নের চিত্র। এজন্যেই কবির যাপিত জীবন আপামর মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের জীবন, সমাজের জীবন মিলেমিশে একাকার। বিশ্ব রাজনীতির যে অভিজ্ঞান, তা সুক্ষ্ম রুচিবোধের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে তার কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা বইটিতে। স্বদেশীয় প্রেক্ষাপট ও স্থানিক বিষয়ের এ এক অনিবার্য সম্মেলন। মানুষের সভ্যতা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের যে অধ্যায় তা রক্তে রঞ্জিত। যখন রুদ্ধ হয়ে যায় বাক স্বাধীনতা তখন প্রতিক আর রূপকের মধ্য দিয়ে শিল্পীরা তাদের মনোভাব ফুটিয়ে তোলেন। শিল্প হচ্ছে সৌন্দর্য রচনা, যা মানুষকে মুগ্ধ করে, বিস্মিতও করে এবং ঘোরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। শিল্পীর অনুভবের অকপট ও প্রাকৃতিক প্রকাশ হচ্ছে শিল্পবস্তু। যাকে সম্যক বুঝে ফেলার আগেই একপ্রকার যোগাযোগ ঘটে যায় ভোক্তা ও উপভোক্তার মনে।
ইনজীল, সেই অবারিত উদ্যান, যীশুর প্রণতিসমূহ নিয়ে গসপেলগুলো অধীত বৃক্ষ তার- ঝর্নাপ্রবাহ যেন, প্রসূতি মেরিকে ঘিরে ছায়াবৃত্ত প্রসারিত হলো, আর যীশু, অনর্গল কথা কন, সদ্যজন্মের আলো নিয়ে, উপাসনা এমনও অলীক! (মসীহ—কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা) 
ওই যে বলেছিলাম —কবি যীশুর যন্ত্রণা নেবেন—
হৃদপিন্ডে একটা চড়ের আঘাতে আমার মৃত্যু হবে- প্রচন্ড ভিড় ঠেলে হিন্দুপাড়ার বটগাছে এসে বসবে অচেনা জাতের পেঁচা, কিশোরেরা স্কুলমাঠে আগত শীতে কাতর; আইল্যান্ডে, শহীদ মিনারে থাকবে না কোনও দ্বিজ পায়রা-(হৃৎপিণ্ড) 
নিজের বাচনভঙ্গিটা নির্ধারণ করা না গেলে বা আপনি যা ভাবছেন, যা শব্দ দিয়ে সাজাচ্ছেন কিংবা যা লালন করছেন এসবের মধ্য দিয়ে পাঠক নিজকে দেখতে পাচ্ছেন কি না, আপনি প্রভাবিত হোন অসুবিধে নেই কিন্তু উত্তরিত কিনা এই প্রশ্নের সচেতন পাঠক আপনাকেই হতে হবে। নিজস্ব বাচনভঙ্গি তৈরির সংগ্রামে কবি সাজ্জাদ সাঈফ যে ব্যর্থ নন— কবি নেবে যীশুর যন্ত্রণা বইটি তার উদাহরণ হতে পারে।
আকাশ ছুঁড়েছে মেঘের বাবল; আর গৃহস্থালির অবসরে, গৃহে, বৃষ্টির গল্প উঠামাত্র ছাতা হাতে উঠানের ধারে এসে দাঁড়াও তুমি, যেন কেউ ফিরবে এখন বাড়ি-
যদিও শিল্পীর কোনও জাগতিক প্রাপ্তি জোটেনা আর এই না জোটাটাই শিল্পসম্মত। লাভহীন বিনিয়োগের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো শিল্প। আত্মার আনন্দ বেদনার ইবাদতখানা শিল্পীর হৃদয়, পরম নির্দ্বিধায় নেমে আসেন সেই ঘরে। বড় পবিত্র সেই ঘর। কবি সাজ্জাদ সাঈফ এই ঘরেই থেকে যান উত্তর কালকে দোলায়িত করে এই কামনায় থাকা যায়।


২টি মন্তব্য:

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা পাঠ আবশ্যক। বিস্তারিতভাবে কিছু জানাতে চাইলে এখানে ক্লিক করে ই-মেইল করুন।