নতুন

[getBreaking results="10" label="recent"]

জাহানুর রহমান খোকনের চোখে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের "শেষ প্রশ্ন" উপন্যাসের কমলঃ বাঙালি সমাজের বাস্তব এক অগ্নিমূর্তি

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস "শেষ প্রশ্ন"
চরিত্র পরিচিতিঃ
বিভিন্ন উপলক্ষে উত্তর ভারতের আগ্রা শহরে বেশ কয়েকটি বাঙালি পরিবার এসে একত্রে বন্ধুত্বের পরশ নিয়ে বসবাস করছে। এদের মধ্যে কয়েকজন প্রফেসর। হঠাৎ একদিন আগ্রায় নতুন বন্ধুপ্রতিম হয়ে আশুবাবুর পরিবার যুক্ত হলো তাদের দলে। তার স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে বহুবছর আগে, সংসারে একমাত্র মেয়ে মনোরমা। উচ্চ শিক্ষিত। অন্যদিকে প্রফেসর অবিনাশ মুখার্জির স্ত্রী বিয়োগের পর দশ বছরের ছেলে ও শালীকা নীলিমাকে নিয়ে তার ছোট্ট পরিবার। পন্ডিত ও সংগীত সাধক শিবনাথ কলেজের প্রফেসর ছিলেন কিন্তু চারিত্রিক সমস্যার কারণে চাকুরী হারিয়েছেন। প্রথম রুগ্ন বৌকে ত্যাগ করে একজন চা বাগানের সুন্দরী মেয়ে কমলকে বিয়ে করেন। শিবনাথের কথায় কমল তাহার দাসীর মেয়ে এবং সে কমলের রূপ দেখেই তাকে বিয়ে করেছেন। যার নাম তিনি দিয়েছেন শিবানী।

হরেন্দ্র, শিক্ষিত এবং অবিবাহিত ব্রহ্মচারী মানুষ। অবিনাশের সাথে কলেজে চাকুরী করেন। আর হরেন্দ্র তার বাসায় কতকগুলো রোগা ও গরীব ছেলেকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন ব্রহ্মাশ্রম। রাজেন্দ্র তাদের দলেরই একজন।

পাঠ মূল্যায়নঃ
যদিও এই উপন্যাসে প্রত্যেকটি চরিত্রই খুব শক্তিশালী। হরেন্দ্র,অবিনাশ, নীলিমা, সতীশ, অক্ষয়, অজিত, শিবনাথ প্রত্যেকটি চরিত্রই এত উজ্জ্বল। রাজেন চরিত্রের বিস্তার উপন্যাসে তেমন না হলেও তার স্বল্প সময়ের উপস্থিতি এবং আকস্মিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পাঠকের হৃদয়ে তার ছায়া বিস্তার ঘটায়।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পঠিত অন্যান্য উপন্যাসের নারী চরিত্রের মতো ভেবেছিলাম কমল চরিত্রটি মমতা ও চিরায়ত নারী চরিত্রের মতোই হবে কিন্তু ক্রমে এ ভুল কেবল ভাঙলই না রীতিমতো হোঁচট খেলাম। বলা বাহুল্য শুরুতে আশুবাবুর মেয়ে মনোরমাকেই আমি মূল নায়িকা চরিত্র ভেবেছিলাম। আশুবাবু সংযম ও মমতার কর্ণধার, আশুবাবুর কন্যা মনোরমা, শিক্ষিত,  তবে শিক্ষার যে মূল উদ্দেশ্য সংকীর্ণতা না রাখা তা আমি তার মধ্যে দেখিনি, যা আজকের বহু নারী চরিত্রেই বিদ্যমান। হিংসা ও অহংবোধ তার শিক্ষাকে ম্লান করে। শেষে তার প্রতীক্ষার প্রাণেশ্বর অমিতকে রেখে শিবনাথের মতো দুশ্চরিত্র ব্যক্তিকে বিয়ে করেই তার অন্ধ শিক্ষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

শেষ প্রশ্ন উপন্যাসের বেশ কয়েটি চরিত্রকে মনে হয়েছে শরৎচন্দ্রের নিজের চরিত্র, এবং সমাজের সাথে আলাপনের জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন। যেনো পুরো আলাপটাই সমাজের প্রচলিত নিয়ম ভাঙাগড়ার খেলা। শরৎচন্দ্র কমলের হাত ধরে প্রাচীর ভাঙার সাহস যেমন দেখিয়েছেন, সমাজকে আহত করেছেন; আবার প্রবীণ আশুবাবুর হাত ধরে টেনে তুলেছেন পরিচিত গণ্ডির মধ্যে, সমাজকে সমীহ করেছেন।

কমল চরিত্র দিয়েই শরৎচন্দ্র একটি  নির্লিপ্ততা, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, সত্যকে সহজরূপে গ্রহণ করবার সামর্থ্য যে প্রতিটি মানুষের মাঝেই আছে তা তুলে ধরেছেন। যখন শিবনাথ কমলের সাথে শৈবমতের বিয়ে ভুলে গিয়ে মনোরমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন, কমলকে ত্যাগ করে আশুবাবুর গৃহে অবস্থান করেন অথচ কমলকে বলে ব্যবসার কাজে আগ্রার বাইরে আছেন। তখন হরেন্দ্র, সতিশ ও আশুবাবু মিলে শিবনাথের শাস্তির প্রস্তাব করলে কমল রাজি না হয়ে বরং বলে-

দুঃখ যে পাইনি তা বলিনে কিন্তু তাকেই জীবনের শেষ সত্য বলে মেনেও নিইনি। শিবনাথের যা দেবার ছিলো তিনি দিয়েছেন, আমার পাবার যা ছিল তা পেয়েছি। আনন্দের সেই ছোট ছোট ক্ষণগুলি মনের মধ্যে আমার মণি মাণিক্যের মত সঞ্চিত হয়ে আছে। নিষ্ফল চিত্তদাহে পুড়িয়ে তাদের ছাই করেও ফেলিনি, শুকনো ঝর্ণার নীচে গিয়ে ভিখে দাও বলে শূন্য দু’হাত পেতে দাঁড়িয়েও থাকিনি। তার ভালোবাসার আয়ু যখন ফুরলো তাকে শান্তমনেই বিদায় দিলাম। আক্ষেপ ও অভিযোগের ধোঁয়ায় আকাশ কালো করে তুলতে আমার প্রবৃত্তিই হলোনা। আপনারা তাকে ক্ষমা করুন।

বিয়ে না করেও যে দৃঢ় বন্ধন কমল খুঁজে পেয়েছিলো তা যদি শিবনাথ না পেয়ে থাকে তো সেটা তার ব্যর্থতা তাই বলে কমল তাকে ছোটো করেনি। এখানেই কমলের আসল চরিত্র ফুটে উঠে। হয়তো এজন্য সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শের হওয়া সত্ত্বেও আশুবাবু হরেন্দ্র এবং শেষমেশ অক্ষয়ও যে কমলকে শ্রদ্ধা করতো তার প্রমাণ মেলে কমলের বিদায়ের আগের রাতে অক্ষয় যখন কমলকে প্রস্তাব করে তার বাসায় একদিন নিমন্ত্রণ নিতে। এ কমলের আশ্চর্য চরিত্রবলেই সে অর্জন করে। যাকে একদিনও ভালোবাসা যায় তাকে যে কোনোদিন, কোনোভাবেই, কোনো পরিস্থিতিতেই ছোটো করা যায়না এই সত্যটিই প্রায় মরতে বসেছে আমাদের সমাজে।

যখন বড় ভ্রাতা তুল্য হরেন্দ্র রাজন্দ্রকে তার আশ্রম থেকে বের করে দেয় এবং কোথাও রাজেন্দ্রর ঠাঁই হলো না তখন শক্ত, স্বচ্ছ, সংযমী, ভয়ানক আত্মমর্যাদাবান কমলই আবার মমতাময়ী মাতার মতো দু'দিনের পরিচয়ে রাজেনকে গৃহে স্থান দিয়েছিলো কোনোকিছু না ভেবেই। আর আগ্রা থেকে বিদায়ের ঠিক আগ মুহুর্তে সেই রাজেনের করুণ মৃত্যু সংবাদ শুনে কমল শান্ত হয়ে যান। শোকাচ্ছন স্তব্ধ নীরবতার মধ্যে অজিতকে নিয়ে কমলের প্রস্থানের পূর্বে হরেন্দ্রকে উদ্দেশ্য করে বলেন-

দুঃখ কিসের? সে বৈকুন্ঠে গেছে, কাঁদবেন না হরেনবাবু, অজ্ঞানের বলি চিরদিন এমনি করেই আদায় হয়।

যদিও এই সংবাদে তিনিই সবচেয়ে বেশি দুঃখ পেয়েছিলেন তবুও এইরূপ তার সংযম, আত্ম আদর্শের প্রতি সমর্পণ, শ্রদ্ধা এবং তা প্রতিষ্ঠার স্পৃহা শরৎচন্দ্র কমলের মধ্যে দিয়ে নারী সমাজকে দেখিয়েছেন।

পুরো উপন্যাস জুড়ে থাকা কমলের আশ্চর্য অনভিপ্রেত সব কথা, সিদ্ধান্ত, আচরণের প্রতিফলন দেখা যায় শেষটাতেও, অজিতের সাথে তার এই প্রস্থান এতটাই আকস্মিক যে কমল পুরো উপন্যাস জুড়ে হোঁচট খাওয়ালেও এই হোঁচটটা বেশ শক্তপোক্ত ভাবে পাঠকের মনে লাগে। তবে এমন আশ্চর্য সম্পর্কেও কমল তার নিজ বৈশিষ্ট্যগুণে চিরন্তন সত্য বলে মানেননি। অজিত সকলের সামনে কমলকে প্রচলিত প্রথায় বিয়ের প্রস্তাব দিলেও কমল প্রত্যাখ্যান করে। বলে আমি আপনাকে শক্ত বাঁধনে বাধতে চাইনে অজিতবাবু, আপনি মুক্ত থাকুন। কখনো যদি আপনার মোহ কেটে যায় তবে যেন সহজেই প্রস্তান করতে পারেন। বরং আমার প্রতি আপনার যে দুর্বলতা সেইটা দিয়েই আপনি আমাকে বেধে রাখেন।

এজন্য আশুবাবু বলেন-

আদর্শ, আইডিয়াল শুধু দু’চারজনের জন্যেই, তাই তার দাম, তাকে সাধারণ্যে টেনে আনলে সে হয় পাগলামি, তার শুভ ঘুচে যায় তার ভার হয় দুঃসহ।
তখন কমল উত্তর দেয়,
যে দুঃখকে ভয় করচেন কাকাবাবু তারই ভেতর দিয়ে আবার তারচেয়েও বড় আদর্শ জন্মলাভ করবে, আবার তারও যেদিন কাজ শেষ হবে সেই মৃতদেহের সার থেকে তার চেয়েও মহত্তর আদর্শের সৃষ্টি হবে। এমনি করেই সংসারে শুভ শুভতরের পায়ে আত্মবিসর্জন দিয়ে আপন ঋণ শোধ করে। এই তো মানুষের মুক্তির পথ।
এইভাবে এই শক্তিশালী নারী চরিত্রের প্রস্থান এই উপন্যাসে, অথচ আমার হৃদয়ে, দেবীরূপে তিনি থেকে গেলেন। পাঠকের হৃদয়ে জীবনে একবার হলেও কমল হয়ে উঠতে পারার গোপন ইচ্ছার বীজ বপন করে গেলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস "শেষ প্রশ্ন"
"শেষ প্রশ্ন" উপন্যাসটি 'শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়' রচনা সমগ্র-২ এর প্রথম উপন্যাস। ১২৭ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটি সহ রচনা সমগ্রটি প্রকাশ করেছে সালমা বুক ডিপো। যার মূল্য ২২৫ টাকা। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন সুখেন দাস।

4/আপনার মতামত?/টি মন্তব্য

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পড়ুন। ই-মেইল ফর্ম।

  1. আমার প্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সৃষ্টিশীল লেখনীর মাধ্যমে সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরেছেন। তার অনেক লেখাই আমার পড়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর শেষ প্রশ্ন পড়তে শুরু করেও শেষ করতে পারিনি।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. নামহীনমে ১৪, ২০২০

    কমল একজন চরিত্রহীন, আর সে আপনার চোখে শক্তিশালী ---- বিষয়ট ভালো লাগল না

    উত্তর দিনমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পড়ুন। ই-মেইল ফর্ম।

নবীনতর পূর্বতন