মনিরুল মনিরের কাব্যগ্রন্থ "শব্দের অনন্ত অন্তর": সংঘবাদী শ্বেত-ভল্লুকের উত্থান ও ধ্রুপদী চিন্তার পঁচন - সৌমেন দেবনাথ

মনিরুল মনিরের কাব্যগ্রন্থ "শব্দের অনন্ত অন্তর"

কবি মনিরুল মনির মূল্যবোধ-দায়বোধ, ত্যাগ-বিশ্বাস থেকে কবিতার পটচিত্র নির্মাণ করেন। তাঁর "শব্দের অনন্ত অন্তর" তারই চিহ্ন বহন করছে। কথাসর্বস্ব, শব্দসর্বস্ব মানুষের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, কর্মপাগলের সংখ্যা বিলুপ্তির পথ ধরেছে। বাগবাগিশের উলঙ্গ শিখায় মেতে নিত্য নতুন চাতুর্যতা করে চলেছে মানুষ। বিশ্ব মোড়লরা প্রতিদিনই নতুন নতুন জোট বাঁধছে, প্রতিদিনই মানবিক মূল্যবোধহীন বক্তব্য দিচ্ছে, এক অন্যের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে বাণিজ্য অবরোধ। পুঁজিবাদী শক্তির এই বৈশ্বিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জীবধাত্রী ধরিত্রীর বুকে চির অশান্তি বিরাজ করছে। এসব বাস্তব সংঘাত, সংগ্রাম, সমস্যা, সংকট, গ্লানি, ঘৃণা, দহন, পীড়ন, প্রেম, দর্শন, যন্ত্রণার মর্মমূলে কবি প্রবেশ করে ছন্দ, উপমা, রূপকতা, চিত্রকল্প, অলংকরণ, কাব্যময়তা, রহস্যময়তা, কবিতার ভেতর অনুপম গল্প সৃষ্টি করে "শব্দের অনন্ত অন্তর" রচনা করেছেন। কবির সংবেদনশীল হৃদয় থেকে স্বপ্ন, প্রেম, নারী, প্রকৃতি কিছুই বাদ পড়েনি। কবির কবিতায় অজানা সুখানুভব বিরাজ করছে শুধু তাঁর উপস্থাপনায় অভিনবত্ব গুণের জন্য। কবিতার দৃশ্যমান সৌন্দর্য স্পর্শ করা যায় না, উপলব্ধিতে বসন্ত সমীরণ খেলে যায়, সংশয় আর দ্বিধার দোলায় দোলায়িত হই। প্রতিটি কবিতাতে যে প্রচ্ছন্ন ভাব বিরাজ করছে তা উদ্ধার করতে পারলে তাপিত, বিস্মিত হতে হয়। প্রতিটি কবিতাতেই কবির জীবনের অগ্নিশুদ্ধ অহংকার বিচ্ছুরিত, দ্যুতি ছড়াচ্ছে। বহুমাত্রিককায় ঋদ্ধ কবি মনিরুল মনিরের "শব্দের অনন্ত অন্তর" কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ৩৯টি কবিতা আছে। পাঠ করে আমার যে উপলব্ধি হলো তা তুলে ধরলাম।

যে কবিতা অসীম শূন্যতার কথা বলে, হৃদয় সমুদ্রের অতলান্তের কথা বলে, বোধকে দূর নীলিমায় উড়িয়ে দেয়, অন্তরচক্ষুকে ধাক্কা মেরে উদবেলিত করে সেই কবিতা উত্তেজনা তৈরি করবে না মানা দায়। সংগ্রামী এক মেয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে কবির মন কেঁদে উঠে। কবির কলমে,
"পুরো শহরের দেয়ালে লাল লিখনগুলো লিখতে-লিখতে যে মেয়েটি লাল হয়েছিল, তার কথা ভেবে দেখো।
ঠিকমতো যুবতিও হতে পারে নি।"

মানুষ সভ্যতা আবিষ্কার করেছে, গড়েছে৷ পৃথিবীর প্রতি উদাসীন হলে সভ্যতা বিরোধ করে৷ সভ্যতা উদ্ভাসিত হয়, মানুষ জীবনের তিলোত্তমা হারায়। মানুষের দায়বদ্ধতা সভ্যতার কাছে, সভ্যতার উত্তরণে কাজ করতে হয়। কবি লেখেন,
" পৃথিবীর ভালোবাসা ফিকে হলে
সভ্যতা বিরোধ করে
মানুষের ঋণ সভ্যতার কাছে
অথচ ভাঙতে ভাঙতে তিলোত্তমা হারায়"(সভ্যতা ও মানুষ)

কবিতার অন্তর্লোক আবিষ্কার একেক  জনের একেক রকম, কবির আড়ালতা ধরার আপ্রাণ চেষ্টা থাকে একনিষ্ঠ পাঠকের। তুমি দৃশ্যের আপাতত আবিষ্কার হলেও প্রকৃত আবিষ্কার অনুদঘাটিত রয়ে যায়। কবি লেখেন,
"এক মন্বন্তরের পথে তোমাকে দেখেছি
বাতাসের মধ্য দিয়ে চলে গেছ,
কতটুকু মায়াময়, দ্বিধার অন্তরালে
এ পথে নখের আঁচড়!" (নোটিশ)

সাম্প্রদায়িক চিন্তার মানুষের সাথে নাস্তিকতাবাদের বিরোধ চিরকালের। নাস্তিকদের শহরে ধর্ষণ করে কারা, অন্য ধর্মের উপর অগ্নিসংযোগ করে কারা? কবির কলমে,
"বর্ণহীন সকালে পাখির জন্য খাবার হাতে
দাঁড়িয়ে থাকেন কম্যিউনাল পুরুষ" (ঈমানদার খুঁজে পাবে না)

আমাদের মগজ পঁচে গেছে, নতুবা মগজে মূত্র। মগজ পঁচলে আর দেহের মূল্য থাকে না। চেতনা ব্যবসায়ীর মগজের কি দাম থাকে? মগজ বর্গা দিয়ে সুশীল হওয়া যায় না। কবি লেখেন,
" বিক্রি হওয়ার পর ফেলে দিলে
ক্ষতি হয় ক্রেতার
সকলেই বিক্রি হচ্ছি
কম দরে অধিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে;
রাষ্ট্র, ক্রেতার মুনাফা স্থির করে দেশ বিক্রিতে যাবে!"(পচে যাচ্ছি বিক্রিতে যাবে)

যে দেশে মেধার লালন হয় না, কীর্তিমানের ঠাঁই নেই, যোগ্যরা কর্ম পায় না, সে দেশ তলিয়ে যাবে। আলোর বিপরীতে ছায়া দেখা না গেলে বুঝতে হবে অশনি আসছে। হালদা নদীতে যদি মাছ না জন্মে মাছ দেখতে জাদুঘরে যেতে হবে, একদিন প্রত্ন-ইতিহাস লেখা হবে মাছেদের নিয়ে। কবি বড় আক্ষেপ করে লেখেন,
"সহসায় অনেক অনেক প্রত্ন-ইতিহাস
লেখা হবে মাছেদের নিয়ে
পোনা ছাড়ছে না মা-মাছেরা
আর কতবার ধর্ষিত হবে মা?" (হালদা নদীর অস্পূর্ণ সেমিনার)

বিবেক বিক্রি করি, মাছের দরে পুকুর বিক্রি করি, চেতনা চৈতন্য জাগে না। অথচ জলাশয়ে প্রক্ষালন করে মৎস্যগন্ধ গায়ে মাখলে নিবারণের জন্য শাবান মেখে শুদ্ধ হতে ব্যাকুল। অন্তর যদি ময়লা মাখা থাকে শরীর স্নানে কতটুকু বিশুদ্ধ হবে! আশ্চর্য হয়ে কবি লেখেন,
"জলের বোতলে আমরা বিশুদ্ধ হতে চাই!" (জলের অ্যানাটমি)

মনের মুগুর উত্তেজিত হয় না নারী ও নগ্নতা নিয়ে আলোচনা না করলে। বালকের সুড়সুড়ি জাগাতে জেব্রাক্রসিং-এ লাফিয়ে উঠে বালিকা, প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনে, বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ডে বালিকাদের বুকের ঢেউ বখাটে বালকদের বেদনা ভোলায়। কবি লেখেন,
"এভাবে বিকারগ্রস্তদের আড্ডা প্রত্যহ শহরের নিরবতা ভাঙে
শ্রেণিকক্ষগুলো ফাঁকা হয়ে যায়,
হয়তোবা একদিন পৃথিবীর পাঠশালায় রবে না 'ইস্কুল' নামক উৎপাত" (বিকারগ্রস্তদের আড্ডা)

প্রতিটি মৃত্যু অকাম্য, কষ্টের। মানুষ মরলে অজান্তেই মনে তার জন্য সহমর্মিতা জন্মে। কিন্তু কেনো মরলো, কে মারলো কখনো সে অর্থ উদঘাটনে যাই না। পিলখানার বিডিআর বিদ্রোহে হত্যাযজ্ঞের একটা চিত্র পাওয়া যায় কবির কবিতায়। যেমন,
"হাতি-কাণ্ড লাগিয়েছে মহাভণ্ড
প্রভাত মুছে রাত এলে শুনি
সব লণ্ডভণ্ড " (পিলখানার হাতি-কাণ্ড মহাভণ্ড লণ্ডভণ্ড)

শিক্ষক অসংখ্য বর্ণমালা ব্লাকবোর্ডে লিখে শিখিয়ে আবার মুছে দেছেন, হৃদয়ঙ্গম হয়নি, মুছে গেছে হৃদয় থেকেও। পাঠ ও পীঠে হাতের লেখা ধারালো হলেও আকাশ দেখা হয়ে উঠে না। শিক্ষকের বেত্রাঘাত আর অবিরত পাঠ থেকে মুক্তির জন্য মিথ্যা কথা মুক্তি দিতো। কবি লেখেন,
"মুখস্ত হয় নি পাঠ-
শিক্ষক আর নিরন্তর পাঠ থেকে
মুক্তি দিয়েছে শত মিথ্যের অজুহাত" (অধ্যয়ন)

কানসাট নিহতদের স্মরণে লেখা কবিতা 'মজুরি' তে দেখা যায় কয়লা শ্রমিক মজুরি না পেলেও শিশুর সাহস বাড়ায়, শিশু জানে না। অনেক রক্তস্রোত পিতাকে মহৎ করেছে। কবি  লেখেন,
"অনেক অনেক রক্তস্রোতের
শিকারে পিতাকে মহৎ করেছে
তবুও অবনত বৃষ্টি ঝরে গেছে
খনির মজুরি পাবার আগে"। (মজুরি)

দখিনা পবন প্রশান্তির প্রতীক। নিম্নচাপ সজীবতার, প্রাণ জাগরণের, ধূলি ধূসরতা নিঃশেষের। সংকেত সন্ত্রস্ততা নয়, ক্ষোভ যাবে, শোক যাবে। কবি লেখন,
"জল চলে গেছে নিমিষেই
বদলে দিয়ে গতির সূচক
পৃথিবীর বিভাজন খেলায়
কখনও সমুদ্র ভরে উঠে
নাগরিক নিম্নচাপে; আর
সংকেত দেখাতে দেখাতে
এগিয়ে আসে ভৌত বাতাস"(পূর্বাভাস)

বৃষ্টি পাহাড়ে দাঁড়িয়াবান্দা খেলে, ভয়ংকর ধ্বস নামায়। মাটি সরে, পাহাড় তলে মানুষ চাপা পড়ে, মৃতের সংখ্যা গোণে পরিচ্ছন্ন কমিটি। নিরসনকল্পে আমরা উদাসীন। কবি লেখেন,
"পরিচয়ে আমরা অনির্বচনীয়, অযোগ্য হতে হতে
প্রতিদিন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছি, পচে যাওয়া স্বপ্নেরা
জেগে ওঠবে না কখনও
বৃষ্টির দিনে ধ্বস পাতালে, মাটির শরীরে,
বিষণ্ন বুকের গভীরে, নগরীর বৃক্ষ-গলিতে" (মানবিক বিপর্যয় বৃত্তান্ত)

সবাই ক্ষমতা দেখাতে ব্যস্ত, তান্ত্রিকগণও কাউকে স্বপ্নভঙ্গ হতে দেয় না, সেও সব জানে। সবাই নিজেকেই মেধাবী ভাবে আর মেধাবীরা ঈর্ষাণ্বিত থাকে। কবি লেখেন,
"মেধার পরিচয়ে ঝুঁকি নিতে তান্ত্রিকগণ
অন্ততঃ একটি দিনও স্বপ্নভঙ্গ হতে দেয়নি
অথচ সকলে জেনে গেছে মেধাবীরা ঈর্ষণীয় ;
ঈর্ষা আর লুট পাশাপাশি অধিষ্ঠিত "। (ঈর্ষা লুট ও স্বপ্ন)

পশুগুলোও সুশোভন মোড়কে মানুষ সেজে থাকে। মেঘের তীব্রতা মানুষের মাথায় ঠেকছে। সভ্যতাকে গ্রাস করছে, বিচার প্রার্থী হলে হিতে বিপরীত। কবি তবুও এই অপশক্তির বিনাশ হবে আশা করে লেখেন,
" হয়তো চিন্তার সহ্য ক্ষমতার বাইরে এসে যুক্তি
নির্মাণ করতে পারবো, ভালোবাসা দিয়ে জলের
ফোয়ারা বানাবো সকল কালো কালো চাদরে;"(নিষিদ্ধ রক্ত দিয়ে ভেজা পথ দীর্ঘকাল রঙিন)

দেশকে কাঁধে করে টানছে যে তার জীবনের আলেখ্য কোথাও নেই। খবরের কাগজপত্রে খবর আসে জীবনের খবর খুব কম। বোম্বে ললনাদের রূপ লাবণ্য কাগজের পাতাভর্তি অথচ সংগ্রামী গ্রামের মাটির প্রাসাদের খবর নেই কোথাও। কবি লেখেন,
"মুক্ত পৃথিবীর ধুলো আলোতে করে বুদবুদ,
আলোর পেছনে থেকে যায় অনন্ত সাহসের ঘসামাজা বুক"। (আবি তাক্ বাত নেহি হুয়া)

মায়াময় আর মোহময়তার জন্যই সংসারে যত কাজ। আবেগ-ভালোবাসা, প্রতি দিনের অভিনয় সবই কাউকে মায়ায় বিভোর করার জন্য, কারোর কাছ থেকে মায়ায় বিভোর হওয়ার জন্য, কারোর জন্য মোহে বা কারো মোহের শিকার হওয়ার জন্য। কবি লেখেন,
"আসলে আমরা কেন এমন ঔদার্যের পরিণতি চাই;
জগতে প্রকৃত সারস উড়ে গেলে সবই শূন্য" (মায়াময়-মোহময় বস্তুটি গুরুত্বপূর্ণ)

বিধ্বস্ত মানুষের চিন্তার মূল্য নেই, ক্ষমতার জ্যাকেটতলে যে তার চিন্তার স্বর্ণদাম। শাসনের ছড়ির কাছে সবাই অবরুদ্ধ, সুশীলের স্থান নেই। কবি লেখেন,
"শাসনের সরিষা বীজ এখন কৃষকের উঠোনে
পরিখা খননের জন্য জমিন প্রস্তুত
এখন বিপন্ন গ্রাম আর প্রান্তরের হাহাকার নিয়ে
বেঁচে আছে গ্রামের মানুষ" (অধিক ক্ষমতা আর অবরোধ)

নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ইতিহাসকে বিকৃত করে, নিজেদের মতো করে গড়ে চেতনাধারী সাজি, শেকড় ভুলে যাই। কবি খুব আক্ষেপ করে লেখেন,
"ন্যাড়া মাথায় তেল দিয়ে
আর কতকাল শোষণ পাবো
বিপন্নতার কথা বলে-
আমরা কবে মানুষ হবো?" (অনুভব)

প্রজ্ঞার মূল্য নেই, হত্যায় মাতে মানুষ। চোখে মুখে পুঁজিবাদের লালসা, বাণিজ্য অবরোধ, হিংসাত্মক কথাবার্তা বিশ্ব জুড়ে চলমান। শূন্যতা বাড়ে, মানবতার জয়রথে উড়ে না পতাকা। বিশ্ব রাজনীতির কাছে এই ধরিত্রী বড় অসহায়, কবে না পুড়ে ছারখার হয়। বিশ্বপ্রতিষ্ঠানের সুদের কারবারে ছোট ছোট দেশ পাচ্ছে না আলো। শুধু শব্দমালা, বাগবাগিশ, কথার কারুকার্যে তো বৈশ্বিক পতন ঠেকানো যাবে না। কবি লেখেন,
"রাষ্ট্রীয় কপালে জাতির কলঙ্ক
শব্দের মহাজন শরীরে মাখো
সাম্রাজ্যের সবল পতন;
মন্দার মাখামাখি দেশে দেশে" (শব্দের অনন্ত অন্তর)

যে বিশ্বাস শিকড়ে গ্রোথিত তাই মূল্যবোধ। ক্ষুধার্তরা রুটি পাবে, চাঁদকে ঝলসানো রুটি মনে হবে না, অমাবস্যা থাকবে না, পূর্ণিমা দরজায় আসবে। তার জন্য মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে, শ্রমীরা কখনো অনাহারে থাকে না। কবি লেখেন,
" আর কোন অমাবশ্যা দেখবো না
যদি প্রতি ভোরে জেগে ওঠে ভালবাসা
অনন্ত প্রজ্ঞার নাগরিক মূল্যবোধ"(মূল্যবোধ)

সাভারে ভবন ধসে নিহত সেলাই কর্মীদের নিয়ে লেখা কবিতা "পৃথিবী ঋণের চাপে"। যেখানে সেলাই কর্মীদের শহরতলীর পাখি বলা হয়েছে৷ সেলাই রণবিদ্যায় পারদর্শী সুতোর কারিগর ধ্বংসস্তূপে মারা গেছে, মানুষের আহাজারিতে আকাশও কাঁদে। কবি লেখেন,
"মায়ের কোলের কন্যা আগুন হাতে ফিরে
তাবৎ পৃথিবী ঋণের চাপে হাহাকার করে।
আহাজারি, আর্তনাদ বাতাস ভারী হয়ে উঠে
দ্বিগবিদিক অসহায় ছুটে"। (পৃথিবী ঋণের চাপে)

আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবর ব্যাপারটি পড়েছি বহুবার। আদার ব্যাপারীকে তুচ্ছ করে দেখার কিছু নেই, আদার দাম বেড়েছে, বরং তুমি আমি শূন্য থলি নিয়ে বাড়ি ফিরি। কবি লেখেন,
" আশাহত হলাম অবশেষে
ব্যাপারী বিখ্যাত কালোবাজারি
জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে
কথা বলেন ক্ষুদ্র অথবা মাঝারি"(মূর্খতা)

রাস্তায় ব্যাঙের শরীর পিষে থাকলে ব্যতিত হই না, বায়োলজিকেল নিরীক্ষার ব্যবচ্ছেদে ব্যাঙ কাটলে হৃদয় কাঁপে, হায় মানব হৃদয়! কবি লেখেন,
"রাস্তার পাশের রেস্টুরেন্টে রুটির কারিগর
হাতের তালুতে পৃথিবী নাচায়
আমরা নাচতে গ্রামে জটলা পাকালাম
ব্যাঙের ডাক শুনি নি, শুনেছি মৃতের আর্তনাদ" (ব্যাঙের অ্যানাটমি)

"পৃথিবীর তাবৎ হত্যার শেষ জ্যোতি" কবিতা থেকে-
"পাখিদের প্রার্থনা ভেঙে যাওয়ার ডরে
নীরবে নেমেছি পথে
এখন আমি আর ফড়িং
পৃথিবীর তাবৎ হত্যার শেষ জ্যোতি"

চাবুকের শাসন শেষ, এখন জলপাই গাড়ির হনহন আর বুটের শাসন, বুদ্ধির শাসন। বড় দেশগুলো শাসন করছে বিশ্ব আলয়। গোলামগিরি করছে ছোটদেশগুলো, রাজনৈতিক মারপ্যাচে হেরে যাচ্ছে মানবতার মুক্তি। কবি লেখেন,
" গণতন্ত্র না বুঝে
চিৎকার পাড়ে পন্থীবিদগণ
উত্তর কিংবা দক্ষিণপন্থায় বসে
মাত্রাতিরিক্ত বুদ্ধি বেচতে গেছে
ভনভন করা বিজ্ঞবুদবুদ"(ভনভন করা বিজ্ঞবুদবুদ)

কর্নেল হার্টস এর বাড়ি দেখে এসে অনুভুতি ব্যক্ত করতে যেয়ে কবি লেখেন,
"ছাদে ঝুলছে পুরনো দড়ি
প্রকাণ্ড বাড়ির ছাদটি অচেনা উঠোন; অন্ধকার" (পুরনো বাড়ি ও একজন কর্ণেল)

বর্ণবাদীদের উল্লাস দেখে বুঝি তারা সেবাব্রতে মন দেবে না কখনো। শিশু মৃত্যু কমবে কিভাবে যেখানে জেরুজালেমই রক্ষা পাচ্ছে না। কবি বসে বসে ভেবে লেখেন,
"গ্রামের পথে শিশু মৃত্যু কমাবেন
নাকি জেরুজালেম রক্ষা করবেন
যেখানে শিশুরা মাতৃদুগ্ধ পানের পূর্বেই বুলেটবিদ্ধ হয়" (বিরোধ)

যুদ্ধজর্জর পৃথিবীতে মানুষ যুদ্ধরীতি আর যুদ্ধনীতি নিয়ে আছে। শিশু খেলে, মা বাবার পাথর বুকে কান্না জমাট। অশনি ভবিষ্যৎ সামনে। কবি লেখেন,
"খুলির ভেতর স্বাধীনতা
সামনে হাঁটে মিছিল করে
পরস্পরের শ্বাসের ভারে
গেয়ে ওঠে মৃত্যুগান" (গুলতি খেলায় কামান ভাঙ্গে)

নিজ ভূমে উদ্বাস্তু হয়ে থাকেন ফিলিস্তিন, বিশ্ব বিবেক দেয় না মানচিত্র। গুটিকয়েক ধ্রুপদী চিন্তার মানুষের দৃঢ়তা নক্ষত্রের পতন ঠেকাতে পারে না। কবি লেখেন,
"লাল মাটি কালো বর্ণে বাঁচবার জন্য
বিলিয়ে দিল সহস্র বছরের উপাসনা"(রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে জেরুজালেমের মাটি)

যুদ্ধ বিধ্বস্ত ধরিত্রীতে সবুজের মূল্য নেই, সবুজের গায়ে ক্ষত। অনাগত ভবিষ্যৎ আরো খারাপ, বিশ্ব মোড়লরা উঠতি দেশকে শত্রু জ্ঞান করে, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে, রক্ত ঝরায়। কবি লেখেন,
"আহ! শিশুরা যুবক হবে না, হবে লাশ
লাশের শরীরে হরফের চাদর-তিমিরে নামে চাঁদ,
আমরা তবে নত মস্তকে প্রার্থনা করবো কার?
সে কি ঈশ্বর নাকি শয়তানের প্রতিবিম্ব?" (শিশুরা যুবক হবে না হবে লাশ)

জানার দরকার হয় না, জানিয়ে দেয় সবে। বিজ্ঞাপন সুন্দরীর ঠোঁট থেকে তথ্য ঝরে। জানার জানালা খোলা লাগে না। কবি লেখেন,
"বিজ্ঞাপনের চার দেয়ালে
ভাষা বুঝি ভুলে গেছো
ভালোবাসার আমলকি
বন ছেড়েছে মন কেড়েছে
এইতো এখন বেঁচে আছি
বিজ্ঞাপনের চার দেয়ালে" (বিজ্ঞাপনের চার দেয়াল ১)

বিলবোর্ডে লেপ্টে থাকা নারীর শরীর দেখে গাড়ী চালক থেকে শুরু করে উঠতি বালক অমাবস্যার ঘরে সুখ নেয়। সয়াবিন তেলের পুষ্টিগুণ জানতে যেয়ে পুষ্টিবিদ নারীর দেহ মেপেজুকে নিই। কবি লেখেন,
"সুখ নিয়েও বিদায় নিতে চান
ক্যাটওয়াকের পিতা-পতিগণ
আমরা সৌখিন দর্শনধারী
দর্শনে দর্শনে ধর্ষণের স্বাদ পাই" (বিজ্ঞাপনের চার দেয়াল ২)

পাহাড়ে মানুষের অভয় তবুও বন কেটে বিরাণ করছি। ঠুনকো স্বার্থে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে বিশ্ব তথ্য ঘাটলে হবে না। কবি লেখেন,
"কত-শত বৃক্ষ লুপ্ত হতে গিয়ে
হারিয়েছে আলোর পিদিম
আর আলোকিত মানুষের বাণিজ্য
উজ্জ্বল হচ্ছে বিশ্ব-মন্দার তথ্যচিত্রে" (বিশ্ব-মন্দার তথ্যচিত্র ১)

বৈশ্বিক সন্ত্রাস বিশ্বের ধ্বংস আনবে। পুঁজির মহাজাতকরা কৃষকের কান্না বোঝে না। মহাসুখে আছে জাতিসংঘ ইরাক কিংবা আফিগানিস্তানের রক্ত দেখে। ফিলিস্তিনির প্রতি সমবেদনা, অধিকার দেয় না। কবি লেখেন,
"অসংখ্য মৃতের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে
ফ্যাসিস্ট ইসরাইল" (বিশ্ব-মন্দার তথ্যচিত্র ২)

ধর্মে ধর্মে হানাহানি রাজনীতি। ঐক্যের ডাক কেউ দেয়নি। নামাজ ঘর পোড়ে, সিঁথির সিঁদুর মোছে, প্রবারণা পূর্ণিমার চাঁদ কাঁদে। কবি লেখেন,
"পথ কখনো সাপ ও বেজির মতো আবহ তৈরি করে নি,
আমরা কেবল পথ বাঁকা হয় মনে করে মতে-ই বিভক্ত হয়েছি।
আর কোন মতাদর্শগত ঐক্য নিয়ে রূপায়িত হয় নি, তীক্ষ্ণ ঘাতকের বল্লম"। (মতাদর্শ ঐক্য নিয়ে রূপায়িত হয় নি)


মানুষ এখন অত্যাচার সহ্য করে, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে, যুদ্ধ করছে। রাজনীতির মূলমন্ত্র কেউ ধারণ করে না। জলের মতো যেদিক প্রয়োজন সেদিক দৌঁড়ায়। কবি লেখেন,
"রাষ্ট্রীয় প্যারেড ময়দান দখল করে কয়েকজন ভণ্ডপীর ম্যহফিল জমিয়ে দ্বিধা আর বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছে।
আমরা কলের পুতুল, জল গড়াবার পূর্বেও নাচি শেষেও নাচি।
ঢঙ নিয়ে প্রতিবেশির অবিশ্বাস অর্জন করেছি, জাতের প্রশ্ন"। (বিপ্লব বলতে রাজনৈতিক ভাষা এখন আর পৃথিবীতে নেই)

দেবালয়ে প্রার্থনার চাষ হয় না, হয় হিংসার চাষ। শিশুদের পরাধীন করে রাখা হয়, শিশুদের নিয়ন্ত্রণ নাকি বৃদ্ধদের খুশীর। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই দলবাজি করেন, শিক্ষিত মানুষদের অশিক্ষিত দার্শনিকরা নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশে কত সমস্যা, সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই, মিডিয়ার বিশ্লেষণ সবজি চাষে। পরিশীলিত মগজ আছে, কিন্তু স্বার্থের দামে বিক্রিত সব। কবি লেখেন,
" কিনে নেবার জন্য বুদ্ধি আছে, বিক্রি যাবার জন্য জীবীকা আছে"।(বুদ্ধি আছে বিক্রি যাবার জন্য)

পুঁজিতন্ত্র মার্চফাস্ট চালায় সততার শরীরে। আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন খবরের কাগজ জুড়ে থাকে, শান্তি আসে না। রক্ত চোষক বালকদের গুলতি লড়াইয়ে লাতিন আমেরিকা সলতে জ্বালিয়ে রাখে। সরল-সংগ্রামী ফিদেল ক্যাস্ত্রোই সফল, তাঁর সিংহাসনই সম্ভ্রান্ত, অন্যায়ে টলেনি, ঢলে পড়েনি। তেল সামলাতে গিয়ে পানি-বায়ু-অশ্রু ঝরায়নি। কবি লেখেন,
"তেল-যুদ্ধ দেখাতে দেখাতে পৃথিবী পানি-বায়ু-অশ্রু শূন্য
পাথর বুকে দাঁড়িয়ে গেছে মানব-প্রাসাদ
চেতনা চিরবিশ্বস্ত" (সম্ভ্রান্ত সিংহাসন)

পাঠান্তে, প্রতিটি কবিতায় কবির উর্বর মস্তিষ্কের ফসল। কবির শুদ্ধ চিন্তা থেকে জারিত কবিতার পঙক্তি জুড়ে যে হতাশা-ক্ষোভের উচ্চারণ তা অবচেতন মনকেও জাগিয়ে তোলে। ব্যর্থ অনুকরণ ও অসংলগ্ন উপস্থাপনামুক্ত কবির কবিতা যাপিত জীবনের নানান অসংগতি বিসংগতির চিত্রমঞ্চ। সাধারণ পাঠকের ভাবনার জগৎকে তুমুলভাবে আলোকিত করে, কবির ভাবধারার সাথে একাত্ম হয়ে পাঠক খুঁজে পান জীবনের দিশা। কবির কবিতার জয় হোক, কবি কাব্যগগনে উড়ে বেড়াক অনন্তকাল, কাব্য জীবন সার্থক হোক, অবিস্মরণীয় হোক ধরণীর মাঝে।

====================

শব্দের অনন্ত অন্তর
মনিরুল মনির


প্রকাশক- লায়লা সিদ্দিকী
প্রচ্ছদ- খালিদ আহসান ও শারমিন শেলী
প্রকাশনী - নান্দনিক, ঢাকা
প্রকাশ- একুশে বইমেলা,২০১০
পৃষ্ঠা  - ৪৮
মূল্য - ৭৫ টাকা
ISBN- 978-984-8865-14-9

2/আপনার মতামত?/টি মন্তব্য

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পড়ুন। ই-মেইল ফর্ম।

  1. অনেক অনেক শুভকামনা জানাই। খুব বড় আকারে লেখা হয়েছে, বিস্তারিত লেখা হয়েছে, খুব সুন্দর করে লেখা হয়েছে। অভিনন্দন জানাই।

    উত্তর দিনমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পড়ুন। ই-মেইল ফর্ম।

নবীনতর পূর্বতন