'সুলতানা নীলুফা’ রচিত 'পত্রালী নিকুঞ্জ বনে' কাব্যের কবিতায় প্রকৃত ও উত্তীর্ণ কবিতার আস্বাদ - দেবাশীষ ধর

সুলতানা নীলুফা’র কবিতায় প্রকৃত ও উত্তীর্ণ কবিতার আস্বাদ - দেবাশীষ ধর


কবিতা কী, কেন; কোথায় ; কীভাবে এই জটিল ও অমীমাংষিত বিষয় সমুদয়ের সদুত্তর বা ব্যাখ্যা অগ্রাহ্য করে, এই সিদ্ধান্তে চূড়ান্তভাবে উপনীত হওয়া যায় যে, কবিতা মানে হলো কবিতাই। যার ইন্দ্রিয়জ প্রতীতি হলো- ‘যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয় কবিতা কী,তখন আমি বলি- অন্ধকারের গহনে তাড়িয়ে বহু পথের দৃষ্টিনির্যাস হয়ে অরণ্যের গালিচায় কবিতার বাগান। আমি সেই বাগানে ঘোর অন্ধকারময় হয়ে ব্যঞ্জনা বাজাতে থাকি। কখনো কখনো হারিয়ে যাই আরো অনেকের ইন্দ্রিয়সুরে।

সেই সুরের ব্যাপারটা ওঠে এলো এই কারণে যে, কবি সুলতানা নীলুফার দ্বিতীয় কবিতার বই ’পত্রালী নিকুঞ্জ বনে’ পাঠ অভিজ্ঞতা আলোকে উত্তীর্ণ কবিতার শনাক্তকরণের রুপরেখা স্পষ্ট হয়। প্রথম কবিতার বই ’শাদা ফুলের রাত ’ –এ সুলতানা নীলুফা যে সম্ভাবনার দুয়োর উন্মোচন করেছিলেন, তার এই দ্বিতীয় গ্রন্থনায় সেই কাব্যময় ওডিসি -দূরযাত্রায় পরিভ্রমণ অত্র প্রকাশনার পরতে পরতে পরিস্ফুট – পরিপ্লাবিত । কী শব্দবোধে, কী ছন্দ্যোমনস্কতায়, কী নির্মাণ - বৈচিত্রে নীলুফা প্রত্যাশার চুড়ো স্পর্শ করতে সমর্থ হয়েছেন সুচারু ও সুযোগ্যভাবে।  এমত উপলদ্ধি ও চিত্রায়নের সারবত্তা কবি মনিরুল মনির এর জবানিতে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে- কবিতার জন্য ঘোর লাগে। গভীর ঘোর। পাগলামির মতো ঘোর। মাতাল হয়ে যাওয়া সব বিষয়।  তেমনি ঘোরগ্রস্ত থাকেন সুলতানা নীলুফা। সবসময় এই শব্দগুচ্ছের ঢেউ তাকে তাড়িত করে। ... এই আবেদন এই আয়োজন কবির কাছে নিরব ছায়া হয়ে ধরা দেয়। কবিতা আসলে এমনই আচমকা বয়ে য়ায় মনের মধ্যে।

'প্রসঙ্গগুলো ব্যাখ্যা করা যাক.. মাত্র এক পঙক্তির একটি কবিতা-

নাম: নীল। সুলতানার উচ্চারণ
বসন্ত -- নীলাভ অতিথি পাখি নাম যার।


কোকিল ও বসন্ত তো সমার্থক। বসন্ত মানে কোকিল; আর কোকিল মানেই বসন্ত। কোকিল তাই নীলুফা-র কাছে অতিথি পাখি। এই প্রতীকায়ন নিঃসন্দেহে অব্যর্থ কবিতারই  বা কাব্যসত্তারই পরিপূরক। এরকম দৃষ্টান্ত ইতিউতি আরো প্রচুর ছড়িয়ে আছে সমগ্র গ্রন্থজুড়ে।

সুলতানার ’বিষ’ কবিতা পড়া যাক –

হতো-
যদি দেখা
স্রেফ আরেকবার
চুমু ঠোঁট গলাগলি
আমাদের এই লুকোচুরি
সাঁতার, সাঁতার
পিঠের পিছনে বিষ
ধূলোমাখা পথ
কঠিন কন্টক তবু
তবে- জানা হলো
ইশকার দরগাহ।


আপাত সহজ– সরল  সাদামাঠা শব্দ ও ইমেজ। কিন্তু কবিতার অন্তিমে এসে এক দোর্দণ্ড মোচড়। যাতে সমস্ত রচনা – রূপবন্ধ পাল্টে পাল্টে যায়। এক ধরনের বৈপরীত্য -কূটাভাষ ও বিমূর্তায়নের সমস্ত আয়োজন এক শিল্পিত পরিণতি অর্জন করে এবং এখানেই কবিতা। সার্থক ও উত্তীর্ণ কবিতা। সুলতানা নীলুফা এই কাব্যের সদর্থক ও অনুঘটক হলো  লিরিক - লাবণ্য - মায়া। পক্ষান্তরে তার উচ্চারণ কখনো কখনো ’বাণী’র  মতো অবধারিত সত্যের পর্যায়ে পেীঁছে যায়। তিনি বলেন-

’শহরে শহরে আজ বেশ্যালয়
ভুল করে ভালোবাসা মনে হয়।
(কনফেশন)


কিংবা --

’নারীচর্চা, পরকীর্তন এবং পমেটম জীবন।
এই জীবন চুল বেঁধে যায় –
দুই বেলা রেধে যায় ...
(পমেটম জীবন)


কেবল বচনধর্মী পঙক্তি নয়, নিজের অন্তর্লীন দাহ / হতাশ্বাস / রোদন / আর্তি -- সর্বোপরি মনোবেদনা নয়ত মনস্কামনা ও মূর্ত হয় কোনো কোনো পঙক্তিতে। যেমন-

ঝরার যা কিছু
শূন্যতার বিষাদ ফুল
শাদা পাতাদের ভুল
(ঝরা বকুলের পাত্রে খাঁচা ভরা আদর)


কিংবা

‘ওদের চাই একটা লাশ
স্রেফ মানুষের মগজ
বাংলার হাঁট বন্দরে মৃত হয়ে পড়ে থাকা
স্রেফ একটা লাশ।'
(জীবনের উৎসব)


– এই যে এক ধরনের যন্ত্রণা বেঁচে থাকার যন্ত্রণার বোধের চিন্তন তাঁর কবিতায় উৎসরিত হচ্ছে। কিছু কিছু কবিতার শব্দের নান্দনিকতার ব্যঞ্জনায় বেসুরা মনে হয়েছে কিন্তু সামগ্রিক নিরিখে -- এবারের একুশে গ্রন্থমেলায় ঝাঁক ঝাঁক অকবিতা, অপকবিতা বিপুল কবিতাগ্রন্থের ভীড়ে সুলতানা নীলুফা রচিত ’পত্রালী নিকুঞ্জ বনে’ একটি উল্লেখ ও স্মরণীয় প্রকাশনা। কবিকে টুপিখোলা অভিবাদন। তার পরবর্তী এবং আরো পরিণত গ্রন্থের অপেক্ষায় থাকলাম।

'পত্রালী নিকুঞ্জ বনে’ কাব্যের শিল্পশোভন ও দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন সুলতানা নীলুফা নিজেই।  গ্রন্থটির প্রকাশক খড়িমাটি। মূল্য ১৫০ টাকা। এই গ্রন্থের বিপুল প্রচার কামনা করি। সুহদ পাঠকের উদ্দেশ্যে সুলতানা নীলুফার একটি কবিতা উদ্ধৃত করা হলো--

নিষ্পত্র ও নিষ্ফল গোলাপের গাছে
হয়তো কাহারো বেদনা জেগে আছে
ভাঙা ডাল আর দোমড়ানো গায়ে
কী ইতিবৃত্ত পোড় –খাওয়া প্রচ্ছায়ে।
তোমার নাম কী ওই  ভাঙা শাখা
ক্যানো ভাঙা সোনা তোর দুটো পাখা ।
আমি  ও বিবর্ণ সামনে আালো নেই
আসলে কোথাও কেউ ভালো নেই।


-০-০-০-০-০-০-

বইয়ের নামঃ   ’পত্রালী নিকুন্জ বনে’
লেখকের নামঃ ‘সুলতানা নীলুফা’
প্রচ্ছদশিল্পীঃ    সুলতানা নীলুফা
প্রকাশনীর নামঃ খড়িমাটি
প্রকাশকালঃ  ২০২২
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৪৮
মুল্যঃ ১৫০ টাকা
ISBN।ঃ 978-984-96570-1-9       

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ