হুয়ান কার্লোস ওনেত্তির 'কুয়ো' উপন্যাসের আলোচনা- রিটন খান

উরুগুয়ের লেখক হুয়ান কার্লোস ওনেত্তির 'কুয়ো' উপন্যাসের আলোচনা- রিটন খান

হুয়ান কার্লোস ওনেত্তির কুয়ো এক ধরনের মানসিক দুর্ঘটনার রিপোর্ট। গল্পের ছদ্মবেশে লেখা একখানা নোটিস, যেখানে শুরুতেই জানিয়ে দেওয়া হয়: এখানে আলো নেই, উদ্ধারকারী দল আসবে না, আর নীচে তাকালে নিজের প্রতিবিম্ব দেখা যাবে না। দেখা যাবে কেবল ক্লান্তির ঘন কালো। নামটাও সেই কারণেই নিখুঁত। কুয়ো মানে কুয়া। একবার ঝুঁকলেই পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি। পড়ে গেলে আর ওঠার কোনও নৈতিক বাধ্যবাধকতা নেই।


লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে বুমের ঢাকঢোল পেটানোর অনেক আগেই এই বই বুঝে গিয়েছিল, বাস্তবকে আর একটু সাজিয়ে তুলতে ম্যাজিক লাগবে না। বাস্তব নিজেই যথেষ্ট বিকট। ওনেত্তির শহরে বৃষ্টি নামে না, আলো জ্বলে না, বিপ্লবও হয় না। এখানে আছে শুধু ধীরে ধীরে পচে যাওয়া সম্পর্ক, ঘড়ির কাঁটার মতো একঘেয়ে দিন, আর এমন এক নিঃসঙ্গতা যাকে ভুল করেও একাকীত্বের রোমান্টিক সংস্করণ ভাবা যায় না। এই মানুষগুলো একা নয় বলে কষ্ট পায় না। তারা কেবল অন্য কারও সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।



এই অক্ষমতার মুখপাত্র এলাদিও লিনাসেরো। মধ্যবয়স্ক, একা, নিজের মাথার ভিতর বন্দি। বাইরের দুনিয়ায় তার কিছুই ঘটছে না, কারণ ঘটার মতো কিছু সে আর প্রত্যাশাই করে না। সে লেখে, কিন্তু বিশ্বাস করে না। স্মৃতি লিখে, কিন্তু স্মৃতির সত্যতা নিয়েই সন্দিহান। শৈশবের এক সহিংস, অপমানজনক যৌন অভিজ্ঞতা, এক ব্যর্থ দাম্পত্য, প্রেমের ফুরিয়ে যাওয়া, আর শহরের অনিবার্য একঘেয়েমি; এই সবকিছু মিলিয়ে তার ডায়ারি জীবনের সঙ্গে হিসাব মেলাতে না-পারার নোটখাতা। ভাঙা ভাঙা অনুচ্ছেদ, অসমাপ্ত বাক্য, হঠাৎ থেমে যাওয়া ভাবনা; এ সব মানসিক বিশৃঙ্খলার অবিকৃত রেকর্ড।


রাজনীতির প্রতিও তার একই অনীহা। ফ্যাসিবাদ উঠছে, স্তালিনবাদ ছড়াচ্ছে; সব সে জানে। কিন্তু কিছুতেই আর উত্তেজিত হয় না। না প্রতিবাদে, না আশায়। এই উদাসীনতা এটা নৈতিক অবসাদের চূড়ান্ত পর্যায়। পৃথিবী নিয়ে মতামত রাখার শক্তিটুকুও ফুরিয়ে গেছে তার। প্রেম, আদর্শ, সামাজিক দায়িত্ব; সবই তার কাছে সন্দেহজনক, আর শেষ পর্যন্ত অর্থহীন।


সময় এখানে বর্তমান, অতীত আর কল্পনা একে অপরের মধ্যে ঢুকে পড়ে, আলাদা করা যায় না। পাঠক ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে, লিনাসেরোর বলা অনেক কিছুই হয়তো ঘটেনি। অথবা ঘটেছে, কিন্তু অন্যভাবে। এই অনিশ্চয়তাই বইয়ের আসল শক্তি। এখানে সত্য মানে যা চরিত্রটি নিজের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলতে পারে। এই দিক থেকেই কুয়ো আত্ম-আলোচনামূলক, প্রায় মেটাফিকশনাল, এবং পরবর্তী লাতিন আমেরিকান পরীক্ষামূলক গদ্যের একেবারে নীরব কিন্তু স্পষ্ট পূর্বাভাস।


আনা মারিয়ার সঙ্গে লিনাসেরোর সম্পর্ক বইয়ের সবচেয়ে বেপরোয়া অংশ। এটাকে ধর্ষণ বলা হবে কি না, সেই প্রশ্নটা ওনেত্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রাখেন। কিন্তু এই ঝুলিয়ে রাখাটাই সমস্যার কেন্দ্রে। এখানে পুরুষ সত্তা নিজেকে নির্মাণ করছে নারীর দেহকে নীরব, অপমানিত বস্তুতে পরিণত করে। ফলে কুয়ো আধুনিক পুরুষত্বের ভেতরের নৈতিক দেউলিয়াপনারও কঠিন পাঠ।


ভাষা সংক্ষিপ্ত, ধূসর, দমবন্ধ করা। বাইরে শহর, ভিতরে শূন্যতা। বাহ্যিক বর্ণনার চেয়ে অন্তর্গত চাপ বেশি। পড়তে আরাম নেই। থাকার কথাও নয়। এই অস্বস্তিই বইয়ের নৈতিক অবস্থান। পাঠককে স্বস্তি না দিয়ে চরিত্রের ক্লান্তি তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়াই এখানে শৈল্পিক সিদ্ধান্ত।


এই কারণেই মারিও ভার্গাস ইয়োসা-সহ অনেকেই কুয়ো-কে লাতিন আমেরিকান আধুনিক উপন্যাসের সূচনা-বিন্দু বলেছেন। সান্তা মারিয়া-চক্র, অন্তর্লোককেন্দ্রিক বর্ণনা, বাস্তব আর কল্পনার এই অস্বস্তিকর মিশ্রণ; সব কিছুর বীজ এখানে। বাস্তববাদ থেকে সরে এসে মনস্তাত্ত্বিক আধুনিকতায় যাওয়ার এক নীরব, দৃঢ় পদক্ষেপ।


কুয়ো পড়ে ভাল লাগে না। লাগার কথাও না। শেষ করার পর যে ক্লান্তি, শূন্যতা আর অস্বস্তি থেকে যায়, সেটাই এর সাফল্য। একই সঙ্গে আজকের চোখে বইটি বয়ান করে; নারীর প্রতি সহিংসতা, নৈরাশ্যের প্রতি প্রায় নিষ্ঠা, আর আত্মকেন্দ্রিকতার একঘেয়ে ঘোর নিয়ে। কিন্তু ঠিক এই কারণেই কুয়ো জরুরি। ওনেত্তি দেখিয়ে দেন, আধুনিকতার শুরুটা কোনও উৎসব দিয়ে হয়নি। হয়েছে গভীর এক কুয়োর দিকে তাকিয়ে।



প্রচ্ছদ: ChatGPT

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ