‘ইন্দিরাকে বাবা জওহরলাল নেহেরুর চিঠি’ গ্রন্থটি লিখেছেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু। ভাষান্তর করেছেন কাজী মো. সিদ্দিকুর রহমান। নেহেরু ১৯২৮ সালে তাঁর মেয়ে ইন্দিরাকে লেখা এই চিঠিগুলো সম্পর্কে বলেছেন যে, অন্যান্য ছেলেমেয়েরা যারা এই চিঠিগুলো পড়বে তারা পৃথিবীটাকে বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে এক বিরাট পরিবারের মতো ভাবতে শুরু করবে। মোট ৩০ টি চিঠিতে পৃথিবীর প্রাথমিক ইতিহাস কিভাবে পড়তে হয়, পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাব, মানুষের আবির্ভাব, জাতি গঠন, ভাষা-লেখা-সংখ্যার আবিষ্কার, সভ্যতার সৃষ্টি, ধর্মের উদ্ভব, শ্রমবিভাজন, রাজা-সভাসদ-শ্রমজীবী মানুষের শ্রেণিবিভাগ, নগর-মহানগরের পত্তন, বিভিন্ন সভ্যতার সৃষ্টি ও ধ্বংস, রাজা, মন্দির ও পুরোহিতের আন্ত:সম্পর্ক, আর্যদের ভারতে আগমন, রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনি নিয়ে সহজ-সরল অথচ বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করে লক্ষ লক্ষ বছরের ইতিহাস তুলে ধরেছেন।
১. প্রকৃতির পাঠ:
প্রথম চিঠিতে তিনি তাঁর মেয়েকে বলেছেন যে, এই পৃথিবী সম্পর্কে জানতে হলে সবগুলো জাতি সম্পর্কে জানতে হবে। শুধু ইংল্যান্ডের মতো ছোট একটা দ্বীপ এবং পৃথিবীর তুলনায় অনেক ছোট আয়তনের ভারতবর্ষ সম্পর্কে জানলেই হবেনা। তিনি যে সামান্য ইতিহাস জানাবেন তা পাঠ করলেই সারা পৃথিবীর মানুষকে নিজের ভাইবোনের মতো ভাবতে শেখাবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী পৃথিবী এতো বেশি উষ্ণ ছিল যে, তাতে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব ছিল না। সেই সময়ের কোনো পুস্তক নেই যা পাঠ করে আমরা তখনকার ইতিহাস জানতে পারি। সেক্ষেত্রে তিনি প্রকৃতি পাঠের জন্য পাহাড়-পর্বত-সাগর-নদী-মরুভূমি-তারকারাশি-প্রাচীন প্রাণীর জীবাশ্ম-শিলা ইত্যাদিকে পৃথিবীর উষালগ্নের পুস্তক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেকোনো ভাষা পড়তে হলে তার বর্ণমালা জানতে হয়। একটা শিলাখন্ড কিভাবে পাহাড়-নদী পেরিয়ে স্রোতে ভেসে অমসৃণ শিলাখন্ড থেকে মসৃণ শিলাখন্ড হলো এবং তা নদীর তীরের কাছাকাছি বা সাগরের বেলাভূমিতে আশ্রয় নিল, এ বিষয়ে যৌক্তিক কল্পনাই হতে পারে প্রকৃতি পাঠের অন্যতম উদাহরণ। এ রকম আমাদের চারপাশের বিভিন্ন জিনিস দেখে আমরা পৃথিবী সম্পর্কে অনেক কিছু পড়তে পারি।
২. কিভাবে আদি ইতিহাস লেখা হয়েছিল
দ্বিতীয় চিঠিতে তিনি বলেছেন যে, আমরা প্রকৃতি পাঠ করতে জানলে অনেক মজার মজার কাহিনী জানতে পারতাম যা আসলে পরীদের কাহিনীর চাইতেও মজার হতো। দূর অতীতে মানুষ বা কোনো প্রাণী বাস করতোনা। প্রথমে একদল প্রাণী আসলো। এরপর ক্রমে ক্রমে অন্যান্য প্রাণী ও মানুষেরা আসলো। তখনকার মানুষের সাথে অন্যান্য প্রাণীদের খুব বেশি পার্থক্য ছিলনা। এজন্য তাদেরকে বলা হয় বর্বর। পরে চিন্তা করার ক্ষমতা তাদেরকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করে। বুদ্ধিমত্তার বিকাশের কারণে ছোট্ট মানুষ হাতির পিঠে চড়ে হাতিকে পরিচালনা করতে শেখে। তারা একে একে আগুন আবিষ্কার করে, কৃষি কাজ করে খাদ্য উৎপাদন করতে শেখে। তার আগে মানুষ প্রাণী বধ করতো এবং ফলমূল সংগ্রহ করে খেত। কলাকৌশল শিখে তারা নগর গড়ে তুলল। ভাষা আবিষ্কার হলো। মানুষ লেখা আবিষ্কার করে তালপাতায়, গাছের ছালে বই বা পুস্তক রচনা করলো। অবশ্য সেগুলোর অনেক বা একাধিক কপি নাই। নগরের সম্প্রসারণের ফলে নতুন নতুন দেশ ও জাতি গঠিত হলো। প্রাচীন পুস্তকে আমরা তাদের ইতিহাস দেখতে পাই। কিন্তু সেগুলোর সংখ্যা খুবই অল্প। প্রাচীন কালে রাজা ও সম্রাটগণ প্রস্তর ফলকে ও স্তম্ভে তাদের বিবরণ লিখে রাখতো। প্রাচীন পুস্তক পাঠে আমরা জানতে পারি ইউরোপে যখন অসভ্য উপজাতির লোক বাস করতো তখনো চীন ও মিশরে বড় বড় বিষয় মানুষের দ্বারা সম্পন্ন হয়েছিল। রামায়ণ ও মহাভারত পাঠের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি ভারতের অতীতের গৌরবগাঁথা। ভারত ছিল একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী দেশ।
৩. পৃথিবীর সৃষ্টি:
সূর্য এবং গ্রহ-উপগ্রহ মিলে গঠিত হয়েছে সৌরজগত নামের সুখী পরিবার। আমরা আকাশে অসংখ্য তারা বা নক্ষত্র দেখতে পাই। নক্ষত্রগুলো গ্রহের তুলনায় অনেক বড়। কিন্তু বাস্তবে গ্রহগুলো বেশি জ্বলজ্বল করে। কারণ সেগুলো আমাদের অনেক কাছে অবস্থান করছে। চাঁদ পৃথিবীর একটি উপগ্রহ যাকে আমাদের অনেক আলোকিত মনে হয়। জ্যোতির্বিদদের মতে পৃথিবী ও সৌরজগতের গ্রহগুলো এক সময় সূর্যের অংশ ছিল। এগুলো সূর্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শূন্যে ছড়িয়ে পড়ে একটা বিশেষ আকর্ষণে শূন্যে ঝুলে থেকেই সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। সূর্য আসলে জ্বলন্ত বস্তু ও প্রচন্ড উত্তপ্ত। সেজন্য গ্রহ ও উপগ্রহগুলোও ছিল প্রচন্ড উত্তপ্ত। ধীরে ধীরে পৃথিবী শীতল হতে থাকে। সূর্যও শীতল হচ্ছে ধীরে ধীরে। সূর্য সম্পূর্ণ শীতল হতে লক্ষ কোটি বছর লাগবে। উত্তপ্ত অবস্থায় পৃথিবীতে গাছপালা ও প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব ছিল না। পৃথিবী থেকে বিচ্যুত হয়ে চাঁদ সৃষ্টি হয়েছিল। আমেরিকা ও জাপানের মাঝখানে বিরাট ফাঁকা জায়গা যেখান থেকে চাঁদ সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে এখন প্রশান্ত মহাসাগর। পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ এখনো অনেক গরম। চাঁদ শীতল হতে হতে হিমবাহ ও বরফে পরিণত হয়েছে। পৃথিবী শীতল হলো, জলীয় বাস্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ হলো। পরে বৃষ্টি হয়ে নিচে নেমে সাগর-মহাসাগর সৃষ্টি করলো। পৃথিবীতে প্রাণীদের টিকে থাকার অবস্থা তৈরি হলো।
৪. প্রথম প্রাণী:
পৃথিবীতে প্রথম প্রাণী কে ছিল? প্রাণী ও উদ্ভিদকে পৃথক করা কঠিন কাজ। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমাণ করেছেন উদ্ভিদের প্রাণ আছে এবং এমনকি পাথর ও শিলারও প্রাণ আছে এবং তারা ব্যথা অনুভব করে। হাতি, বানর অথবা পিঁপড়েরা চালাক প্রাণী। মাছ ও সমুদ্রের অনেক প্রাণী আছে যারা বোকা ও নিম্ন পর্যায়ের প্রাণী। স্পঞ্জ, জেলি অর্ধেক প্রাণী এবং অর্ধেক উদ্ভিদ। প্রাচীন শিলায় জীবজন্তুর হাড় দেখতে পাওয়া যায়। এগুলোকে জীবাশ্ম বলে। জীবাশ্ম পরীক্ষা করে জানা যায় জীজন্তুগুলো কখন জীবিত ছিল। প্রাণীরা শূন্য থেকে এক সাথে সৃষ্টি হয়নি, একে একে তাদের আবির্ভাব ঘটে। প্রথম আসে সরল শ্রেণির প্রাণী, তারপর কিছুটা উচ্চ শ্রেণির প্রাণী, ক্রমে অধিকত জটিলতর প্রাণী, পরে সর্বোচ্চ শ্রেণির প্রাণী মানুষের আবির্ভাব ঘটে। সম্ভবত পৃথিবী শীতল হলে প্রথম প্রাণী ছিল নরম জেলির মতো পদার্থ যার কোনো হাড় ছিলনা, বিধায় কোনো জীবাশ্ম পাওয়া যায় না। এগুলো প্রাণের অত্যন্ত সরল ও নম্র প্রতিনিধি ছিল। এরপর আসে শেওলা, শেলফিস, কাঁকড়া, পোকামাকড়। তারপর আসে মাছ। এসব প্রাণীর হাড় ও খোলস বালি ও কাদার চাপে যে শিলা তৈরি করে সেগুলো পর্যালোচনা করে আমরা মানুষ আসার আগের পৃথিবী সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি।
৫. প্রাণীর আবির্ভাব:
সম্ভবত সাধারণ ক্ষুদ্র প্রাণী ও জলজ উদ্ভিদ জীবনের প্রথম চিহ্ন। পৃথিবী শীতল হয় ও শুষ্ক হতে থাকে। প্রাণীরা পারিপার্শ্বিকতার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয় বা নেয়ার চেষ্টা করে। যারা তা করতে পারে তারা টিকে থাকে। পরিবর্তন এতো ধীরে ধীরে হয় যে, আমরা আমাদের স্বল্পকালের জীবনে তা দেখতে পারিনা। এভাবে প্রাণীগুলো উচ্চতর শ্রেণিতে পরিণত হয় এবং লক্ষ লক্ষ বছর পরে মানুষের আবির্ভাব হয়। নরম জেলিফিশ ভূমিতে টিকে থাকতে পারেনা, কিন্ত যারা একটু শক্ত তারা অন্যদের চাইতে বেশি সময় টিকে থাকতে পারে। এভাবে যাদের আবরণ শক্ত তারা সংখ্যায় বাড়তে থাকে এবং নরমরা সংখ্যায় কমতে থাকে। শীতের দেশে অনেক প্রাণীর গায়ে পশম জন্মায়। আবার গরমের দেশে সবুজের সমারোহ দেখা যায়। পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে খাওয়াতে প্রাণী নিম্ন শ্রেণি থেকে উচ্চ শ্রেণিতে পরিণত হয়। পৃথিবীতে ক্রমে জলবায়ুর পরিবর্তন হতে থাকে। জলবায়ুর সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে একে একে প্রথমে সরল সামুদ্রিক প্রাণী, পরে জটিল সামুদ্রিক প্রাণী, উভচর প্রাণী, স্থলচর প্রাণী, তারপর এল পাখি বা শূন্যে উড়তে পারে এরকম প্রাণী। যেমন ব্যাঙ ছিল মাছের মতো। পরে তারা স্থলচর প্রাণীর মতো হলো। তারপর আসলো সাপ, টিকটিকি, কুমির। তারপর আসে স্তন্যপায়ী প্রাণী যেগুলো আকারে বড় ছিল। গরিলা, শিম্পাঞ্জি, বানরের সাথে মানুষের মিল আছে। শারীরিক ও বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তন ও উন্নতি ঘটিয়ে আজকে মানুষ বর্তমান অবস্থায় এসেছে এবং সে নিজেকে অন্য প্রাণীদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে করছে। আসলে কিন্তু তা নয়।
৬. মানুষের আবির্ভাব:
সরল প্রাণ লক্ষ কোটি বছরের বিবর্তনে বিকশিত হতে হতে জটিলতর হয়ে ওঠে। সরল প্রাণীদের অস্থি ছিলনা, পরে প্রাণীদের অস্থি দেখা যায়। মাছ, মুরগি এরা ডিম পাড়ে এবং তাদের বাচ্চার সংখ্যা বেশি। তারা কিছুদিন পরে বাচ্চাদের ছেড়ে যায়। স্তন্যপায়ী প্রাণী কুকুর, বিড়াল, খরগোশ, হাতি ডিম পাড়েনা, পেট থেকে বাচ্চা জন্ম হয়, সংখ্যায়ও কম। যত্নও তারা বেশি করে। উন্নত প্রাণীরা ডিম পাড়েনা, বাচ্চা প্রসব করে। মানুষ একটি উন্নত প্রাণী, যে তার সন্তানদের অনেক ভালোবাসে। নিম্ন শ্রেণির প্রাণী থেকে পরিবর্তন হতে হতে আজকের মানুষ এসেছে। সম্ভবত সে এক সময় অর্ধেক মানুষ অর্ধেক বানরের মতো ছিল। বরফ যুগে মানুষ অনেক কষ্টে জীবনযাপন করতো। যেখানে হিমবাহ নেই সেখানেই শুধু বাস করতো। বিজ্ঞানীরা বলেন যে, ভূমধ্য সাগর, লোহিত সাগর তখন ছিল না, সমস্তটাই ভূমি ছিল ও ছোট হ্রদ ছিল। প্রথম মানুষ এসে দেখল তার চারপাশে অনেক বড় বড়, ভয়ঙ্কর প্রাণী। বুদ্ধিমত্তা ও মস্তিস্কের বিকাশের ফলে অনেক প্রাণিকে পোষ মানালো। বর্তমানে মানুষ সর্বাপেক্ষো শক্তিশালী হয়েছে মেধার জোরে। সম্ভবত তার প্রথম বড় আবিষ্কার আগুন। প্রকৃতিতে ঘর্ষণের ফলে যে আগুনের সৃষ্টি হয় সেটা মানুষ শিখলো, অন্য জীবজন্তুরা শিখতে পারলোনা বুদ্ধিমত্তার পার্থক্যের কারণে।
৭. আদিম মানুষ:
ধীরে ধীরে বরফ যুগ শেষ হলো, মধ্য ইউরোপ ও এশিয়া হতে হিমবাহ অদৃশ্য হলো, উষ্ণতা বেড়ে গেলে মানুষ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। মানুষের বাসস্থান ছিল না, কৃষি কাজ জানতো। গুহায় বাস করতো, শিকার করতো। অবশ্য ছবি আঁকতো তারা। তাদের ছিল পাথরের সূচ ও সূচালো যন্ত্রপাতি। তারা গুহার দেয়ালে ছবি আঁকত ও আঁচড় কাটতো। এদেরকে বলা হয় প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষ। জলবায়ুর আরো পরিবর্তন ঘটলো। উষ্ণতা আরো বেড়ে গেল। মধ্য এশিয়া ও ইউরোপে জঙ্গলে পরিপূর্ণ হলো। এ সময়ের মানুষেরা পূর্বের তুলনায় বেশি চালাক ছিল, মাটির পাত্র বানাতে শিখল, পশুপালন করতে শিখল। কৃষিকাজের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন হলো এবং তাদের দৈনন্দিন খাদ্য সংগ্রহের চাপ কমে গেল। মাটির পাত্রে রান্নার কাজ শিখল। কাপড় বোনাও শিখল। তারা হ্রদের মাঝখানে কুঁড়েঘর বানাতো পশু ইত্যাদির হাত থেকে রক্ষা পেতে। জেনেভা জাদুঘরে হ্রদ বাসগৃহের সুন্দর মডেল আছে। এই মানুষেরা চামড়া অথবা শণের মোটা অমসৃণ পোশাক পড়তো। মানুষ ক্রমশ উন্নতির মাধ্যমে তামা ও ব্রোঞ্জের যন্ত্রপাতি তৈরি করা আরম্ভ করলো। এ সময় তারা সোনার ব্যবহার শিখলেও অলংকার তৈরিতে ব্যর্থ হলো। এসব ঘটেছিল প্রায় দশ হাজার বছর পূর্বে বা সঠিক সময় আমরা জানি না। নিওলিথিক মেন বা নব্য প্রস্তরযুগের মানুষের একটা বড় বিপর্যয় ঘটে। আটলান্টিক মহাসাগরের পানিতে পূর্ণ হয়ে আজকের ভূমধ্যসাগর সৃষ্টি হয়। সেখানে বসবাসরত মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী পানিতে ডুবে গেল। ধর্মগ্রন্থগুলোতে মহাপ্লাবনের কথা আমরা শুনে থাকি। হয়তো বেঁচে যাওয়া মানুষের বংশ পরস্পরার আলাপ থেকেই তা জানা যায়।
৮. বিভিন্ন জাতির মানুষ
শ্বেতকায়, পীতকায়, তাম্রবর্ণ এবং কৃষ্ণকায় বিভিন্ন ধরনের মানুষ এখন আমরা দেখতে পাই। নিশ্চয়ই কোনো এক সময়ে তাদের পূর্বপুরুষ একই ছিল। পরিবর্তন হয়েছে পারিপার্শ্বিকতার সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে। অত্যধিক শীতে যারা বাস করে এবং গরমে যারা বাস করে তাদের নিশ্চয়ই ভিন্ন অভ্যাস, অভিযোজন ক্ষমতা তৈরি হয়। এস্কিমোরা শীত সহ্য করে অভ্যস্ত। তারা গরমে আসলে সুস্থভাবে বাস করতে তাদের কষ্ট হবে। তেমনি আফ্রিকা বা বিষুব রেখার কাছাকাছি মানুষেরা গরমে কালো হয়ে যায়। ভারতের কৃষকেরা সারা জীবন রোদে কাজ করে কালো হতে বাধ্য হয়। কাশ্মীর ও পাঞ্জাবের মানুষের গায়ের রঙ ফর্সা। ভারতের দক্ষিণে মাদ্রাজ, সিংহলে মানুষের গায়ের রঙ কালো। সুতরাং জলবায়ুর উপর নির্ভর করে মানুষের গায়ের রঙ। অবশ্য ভারতে আগত বিভিন্ন জাতির মিশ্রণের কারণেও গায়ের রঙের পার্থক্য হয়েছে।
৯. মানুষের জাতি ও ভাষা:
বরফ যুগের বিশাল হিমবাহগুলো গলে উত্তর মেরুর দিকে ফিরে যাচ্ছিল, তখন মানুষ উষ্ণতর অঞ্চলে বাস করতো। বিস্তীর্ণ বৃক্ষহীন বিশুষ্ক তৃণপ্রধান প্রান্তর দেখা গেল। পশুর জন্য, এক অঞ্চলে ঘাস শেষ হলে আরেক অঞ্চলে ঘাসের সন্ধানে যেতো মানুষ। তারা কৃষি কাজের সুবিধার্থে নদী কেন্দ্রিক বসতি স্থাপন করলো। গঙ্গা, টাইগ্রীস, ইউফ্রেটিস, নীল নদের তীরে ও চীনে নদীর ধারে বসতি গড়ে উঠল। ভারতে সর্বপ্রাচীন জাতি হলো দ্রাবিড়। তাদের নিজস্ব ভাষা ছিল। মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপে আর্য নামে একটি জাতি বাস করতো। আর্য মানে ভদ্রলোক বা উচ্চ বংশজাত। তারা নিজেদেরকে উন্নত জাতি মনে করতো। তাদের সংখ্যা বেড়ে গেলে খাদ্য সংস্থানের জন্য ভারত, পারস্য, ইউরোপে ছড়িয়ে পড়লো। মঙ্গোলিয়ানরা চীন, জাপান, তিব্বত, শ্যাম, বার্মায় ছড়িয়ে পড়লো। নিগ্রোরা আফ্রিকাসহ কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আরব ও হিব্রুরা আরেকটি জাতির অন্তর্ভুক্ত। এসব জাতি হাজার হাজার বছর ধরে অনেক ছোট ছোট জাতিতে বিভক্ত হয়। ফলে তাদের ভাষাগুলো থেকে অনেক ভাষার উৎপত্তি হয়। ভাষাগুলো একই পরিবারভুক্ত একই পিতার সন্তানের মতো। সংস্কৃত, ল্যাটিন, গ্রিক, ইংরেজি, ফরাসী, জার্মানী, ইতালীয়সহ আরো কয়েকটি ভাষা আর্য পরিবারভুক্ত। হিন্দি, উর্দু, বাংলা, মারাঠী, গুজরাটী সংস্কৃতের সন্তান। চীনা, বার্মিজ, তিব্বতীয়, শ্যাম দেশীয়রা হলো চীনা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। আরবি ও হিব্রু হলো সেমেটিক গ্রুপের। তামিল, তেলেগু, মালায়ালাম, ক্যানারীও দ্রাবিড় পরিবারের। জাপানি ও তুর্কি ভাষা এই তিনটি দলের একটিরও নয়।
১০. বিভিন্ন ভাষার পারস্পরিক সম্পর্ক:
আর্যরা অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেকটি দল নতুন অভ্যাস, প্রথা, জলবায়ু, অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। নতুন নতুন ভাষা শিখে আগের ভাষার সাথে মিলে নতুন আরেক ধরনের ভাষা সৃষ্টি হয়। দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগহীনতার কারণে নতুন অভিজ্ঞতা তারা শেয়ার করতে পারেনা। ফলে ভাষায় ভিন্নতা তৈরি হয়। বহু বছর পরেও ভিন্নতা সত্বেও কিছু কিছু সাদৃশ্য রয়ে যায়। সংস্কৃতে পিতা ও মাতা, ইংরেজিতে ফাদার ও মাদার, ল্যাটিন ভাষায় পেইটার ও মেইটার। এ থেকে বুঝা যায় বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বিভিন্ন ভাষায় কথা বলা মানুষদের পূর্বপুরুষেরা এক সময় একই বৃহৎ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই সম্পর্কগুলো ভুলে গিয়ে ইংরেজ, জার্মান, ফরাসী ও অন্যান্য জাতিরা বর্তমানে জাত্যাভিমানে ভুগছে। আসলে সবার মধ্যেই কিছু ভালো গুণ আছে, আবার কিছু মন্দ আছে। অন্যদের ভালোটা আমাদের গ্রহণ করা উচিত।
১১. সভ্যতা কী?
বর্বরতা থেকে দূরে সরে আসার নামই সভ্যতা। মানুষ এক সময় অন্য জীবজন্তুর চেয়ে সামান্য উন্নত ছিল। সেজন্য তখনকার সময়কে বর্বর যুগ বলা হয়। জঙ্গলে মানুষেরা যেমন পরস্পর যুদ্ধ করতো, দেশগুলো যদি পরস্পর যুদ্ধ করে মানুষ হত্যা করে তাহলে তাদেরকে কতটুকু সভ্য বলা যেতে পারে। পৃথিবী এ পর্যন্ত দু’টি বিশ্বযুদ্ধ ও লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা দেখেছে। সুন্দর অট্টালিকা, সুন্দর ছবি, সুন্দর বই সভ্যতার পরিচায়ক। এরচেয়েও সভ্যতার ভালো উদাহরণ হলো একজন মানুষ সবার সাথে নিঃস্বার্থভাবে সামষ্টিক কল্যাণের জন্য কাজ করে।
১২. গোষ্ঠীর জন্ম:
জীবজন্তুর আক্রমণ ও অন্যান্য মানুষের আক্রমণ থেকে বাঁচতে মানুষ একত্রে বাস করতে থাকে। একতা মানুষকে শক্তিশালী করে। এভাবে দলবদ্ধতা থেকে মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ হয়। শৃংখলা বজায় রাখতে একজন নেতার সৃষ্টি হয়। নেতা না থাকলে নিজেরা নিজেরা মারামারি করে গোষ্ঠী ভেঙ্গে যেতে পারতো। অবশ্য এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠীর সাথে মারামারি করতো। প্রথমদিকে গোষ্ঠীগুলো বড় বড় পরিবারের মতো ছিল। সবাই সবার আত্মীয় ছিল। পরে পরিবারগুলো বড় হয়ে গোষ্ঠীর আকার বড় হয়। তাদের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত কঠিন। চারিদিকে শত্রু, প্রকৃতিও তাদের শত্রু ছিল। সম্ভবত পশুর চামড়া ছাড়া কোনো পোষাক ছিল না তাদের। খাদ্যের জন্য তাকে শিকার ও সংগ্রহ করতে হয়েছে প্রতিদিন। তার মেধা কম থাকায় শিলাবৃষ্টি, ভূমিকম্প, তুষারকে ভয় হতো যে কেউ হয়তো আড়াল থেকে তাকে আঘাত করছে। তাকে খুশি করার জন্য মাংস অথবা প্রাণীকে তার জন্য উৎসর্গ করতো। ভাবতো দেবতা অনেক সন্তুষ্ট হবে। অজ্ঞতাবশত তখন এবং এখনো এ কাজ করে মানুষ। তারা শিলাবৃষ্টি, তুষারপাত বা ভূমিকম্প হবার কারণ জানতোনা। যদিও আমরা এখন তা জানি।
১৩. কিভাবে ধর্ম ও শ্রমের শ্রেণিবিভাগ শুরু হলো:
ধর্মের শুরুটা যেভাবে হলো সেটা ছিল খুব চিত্তাকর্ষক। বন্যা, ভূমিকম্প, কোনো ব্যাধি, যেভাবেই মানুষ মারা যেত বা ক্ষতির শিকার হতো, তারা ভীত হতো এবং ভাবতো দেবতারা ক্রুদ্ধ হয়েছেন। পাহাড়, নদী, জঙ্গল, মেঘ সবকিছুতেই মানুষের ভয় কাজ করতো। প্রতিটি দুর্ভাগ্যের জন্য ভাবতো দেবতার ক্রোধ ও ইর্ষা তৈরি হয়েছে। সুতরাং তারা দেবতাদের খুশি করার জন্য মানুষ বলি এমনকি নিজের সন্তানকেও হত্যা করতো। অতএব দেখা যাচ্ছে ভয় হতে ধর্মের শুরু। ভয় হতে যা করা হয় সেটা খারাপ। এখন ধর্ম সুন্দর সুন্দর কথা বলে। তারপরেও ধর্মকে কেন্দ্র করে পৃথিবীতে ভাল-মন্দ অনেক কিছু ঘটেছে। মারামারি হয়েছে, মাথা ফাটাফাটি হয়েছে। এখনো মানুষ কোনো কাল্পনিক অস্তিত্বকে সন্তুষ্ট করার জন্য নানা ধরনের চেষ্টা চালায় এবং পশু-প্রাণী উৎসর্গ করে।
সে সময়ে মানুষকে নিত্য অনেক কষ্ট করে শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ করতে হতো। এসময় অলসদের টিকে থাকার সুযোগ ছিলনা। সম্ভবত পুরুষরা শিকার করতো আর নারীরা শিশুদের দেখাশোনা ও ফলমূল সংগ্রহের কাজ করতো। কৃষিকাজ শুরু হবার পরে সম্ভবত কিছু মানুষ শিকার করতো, কিছু মানুষ ক্ষেতে কাজ করতো এবং নারীরা গরু-ছাগল ইত্যাদি দেখার কাজ করতো। তারা দুধ দোয়াতো। আজকে আমরা পৃথিবীতে মানুষকে অসংখ্য পেশায় কাজ করতে দেখি। কৃষিকাজ আরম্ভ হবার পরেই প্রাচীন সমাজে শ্রমবভিাজন হলো।
১৪. কৃষিকার্য প্রবর্তনে সংঘটিত পরিবর্তন:
প্রথমদিকে মানুষ শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ করার কারণে তেমন শ্রম বিভাজন ছিল না। মানুষের অতিরিক্ত খাবার বলতে কিছু ছিল না। ফলে তা জমিয়ে রাখার জন্য আজকের মতো ব্যাংক বা অন্য কিছুর প্রয়োজন হয়নি। বর্তমানে অনেক শ্রমের বিভাজন ঘটেছে। মানুষ অতিরিক্ত সম্পদ-অর্থ সঞ্চিত করে রাখছে। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম যারা করছে তারা অতিরিক্ত সম্পদের সঠিক ভাগ না পেলেও যারা পরিশ্রম করে না তারাই অতিরিক্ত সম্পদের মালিক হচ্ছে। এই বাজে ব্যবস্থার কারণে পৃথিবীতে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। মানুষ যখন কৃষি কাজ আরম্ভ করে, তখন শিকার, সংগ্রহ ও পশুপালনের জন্য যাযাবরের মতো জীবনযাপন বন্ধ হয়ে গেল। সে কিছুটা স্থায়ী হলো। কৃষিতে বেশি খাদ্য ফলিয়ে দৈনন্দিন খাদ্যের চাহিদার নিরাপত্তা তৈরি হলো। এই সময় আমরা অতিরিক্ত খাদ্য ও তা মজুদের কথা জানতে পারি।
১৫. পিতৃতন্ত্র-কীভাবে তা শুরু হলো:
মানুষ তার নিরাপত্তার জন্য সংঘবদ্ধ হলো এবং গোষ্ঠী গঠন করলো। গোষ্ঠীকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বয়োজ্যেষ্ঠ অথবা সাহসী কাউকে দলনেতা বা গোষ্ঠীপতি বানালো। প্রথমদিকে অন্যদের সাথে গোষ্ঠীপতির কাজ ও খাদ্য ভাগাভাগিতে কোনো পার্থক্য ছিল না। আর একজন ব্যক্তি যা উপার্জন করতো তার মালিক ছিল গোষ্ঠী। গোষ্ঠীপতি অথবা গোষ্ঠীর সংগঠক তা ভাগ করে দিতো। ধীরে ধীরে পরিবর্তন হলো। কৃষিকাজ আরম্ভ হবার পরে গোষ্ঠীর কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে গোষ্ঠীপতি ও তার সংগঠন সাধারণ সদস্যদের মতো শ্রমের কাজগুলো করা বাদ দিলো। সাধারণরা ক্ষেতে কাজ করতো, শিকার করতো, যুদ্ধ করতো, পশুপালন ও বাচ্চা পালনের কাজ করতো। আর গোষ্ঠীপতি তার সংগঠন ও মানুষকে কাজ করতে আদেশ দিতো। তখন গোষ্ঠীপতি প্রধান হলো আর মানুষ দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল। এক ভাগে সংগঠন আরেক ভাগে সাধারণ কর্মী। যুদ্ধের সময় গোষ্ঠীপতির গুরুত্ব আরো বেড়ে গেল। এভাবে সমাজে শ্রমবিভাজন ও জটিলতা আরম্ভ হলো।
১৬. নৃপতি-তার উন্নতি:
প্রথমদিকে গোষ্ঠীপতি ও সংগঠন অন্য সদস্যদের মতোই সম্পদের ভাগ পেতো। যখন তার ক্ষমতা বাড়তে থাকলো তখন সে গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকেই গোষ্ঠী ভাবতে থাকলো এবং সম্পদের মালিক ভাবতে থাকলো। গোষ্ঠীপতি মারা গেলে তার পরিবারের সদস্যদের অভিজ্ঞতা থাকায় এবং গোষ্ঠীপতির ইচ্ছায় তাদের মধ্য থেকেই পরবর্তী গোষ্ঠীপতি নির্ধারিত হতো। এভাবে দিনে দিনে গোষ্ঠীপতি পদটি বংশানুক্রমিক হয়ে গেল। গোষ্ঠীর অতিরিক্ত সম্পত্তিরও মালিক গোষ্ঠীপতি হয়ে গেল। অথচ শুরুতে সবাই সবকিছু একভাবে ভাগ করে খেতো। ধনী-দরিদ্র বলে কিছু ছিল না। কিন্ত গোষ্ঠীপতি যখন সম্পত্তি আত্মসাৎ করা শুরু করলো তখন থেকেই ধনী-দরিদ্র সৃষ্টি হলো।
১৭. গোষ্ঠীপতি রাজা হলেন:
রাজা কিভাবে আসলো। গোষ্ঠীপতি থেকে রাজতন্ত্রের সৃস্টি হলো যখন গোষ্ঠীপতির ছেলে গোষ্ঠীপতি হতে থাকলো। তারা সব সম্পদের মালিকানা দখল করলো। তাদের মধ্যে এই ধারণা জন্মালো যে, রাজা মানেই দেশ। একজন ফরাসী রাজা বলেছিলেন, 'আমিই রাষ্ট্র'। তারা ভুলে গেলেন যে, তাদেরকে গোষ্ঠীপতি বানানো হয়েছিল খাদ্য ও অন্যান্য জিনিস দেখভাল করা ও গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করার জন্য। তারা দাবি করে বসলেন যে, স্বয়ং ঈশ্বর তাদের রাজা বানিয়েছেন। অতএব মানুষ তাদেরকে মানতে বাধ্য। আমরা জানি ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লস -এর বিরুদ্ধে মানুষ বিদ্রোহ করে এবং তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়। ফরাসী বিপ্লবের সময় রাজার পরিবারকে কারাগারে আটক করা হয়। রাশিয়ায় জারদের বিতাড়িত করা হয়েছিল। ঐসব দেশে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সরকার পরিচালনা করে, সেজন্য তাদেরকে প্রজাতন্ত্র বলা হয়। ভারতবর্ষেও রাজা-মহারাজা-নবাব আছে। তারা আসলে জনগণের করের টাকায় বিলাসিতা করে। এসব দিয়ে জনকল্যাণমূলক কাজ করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।
১৮. প্রাচীন সভ্যতা:
আমরা প্রাচীন প্রস্তর যুগ ও নব প্রস্তর যুগ সম্পর্কে যতটুকু জানি তার চেয়ে অনেক বেশি জানি প্রাচীন যুগের মানুষদের সম্বন্ধে, মানে প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে। তাদের মন্দির, অট্টালিকা, প্রাসাদ তথা ধ্বংসাবশেষ থেকে আমরা তাদের স্থাপত্য কৌশল, ধর্মচিন্তা, পোশাক, খাদ্য, অন্যান্য বিষয়ে জানতে পারি। আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারিনা মানুষ কোথায় প্রথম বসতি গড়ে, সভ্যতা তৈরি করে। কেউ কেউ বলেন আমেরিকায় বড় বড় সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। মেক্সিকো, পেরুতে প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না। মেসোপটেমিয়া, মিশর, ক্রিট, ভারতবর্ষ ও চীনদেশে প্রাচীন সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। কৃষি কাজের প্রয়োজনে পানির জন্য মানুষ নদীর কাছে বসতি স্থাপন করলো। নীল নদ, টাইগ্রিস, ইউফ্রেটিস, সিন্ধু, গঙ্গা, যমুনা ইত্যাদি বড় বড় নদীর তীরে সভ্যতা গড়ে উঠল। নদী তাদের পানি দিত আর পলি দিয়ে জমি উর্বর করতো। এজন্য মানুষ তাদেরকে পুণ্যময় মনে করতো। নীল নদকে তারা ‘পিতা’ আর গঙ্গাকে তারা ‘মাতা’ বলতো।
১৯. প্রাচীন বিশ্বের মহানগরী:
প্রাচীন মহানগরগুলো নদীর তীরে গড়ে ওঠে। মেসোপটেমিয়ায় ছিল ব্যাবিলন, নিনিভা ও অ্যাসার। এগুলোর অস্তিত্ব অনেক আগেই মুছে যায়। এসব নগরে মানুষ হয়তো বহুদিন বাস করার পরে কোনো কারণে পরিত্যাক্ত হলে তা ধুলোবালি জমতে জমতে চাপা পড়ে যায়। পরবর্তী মানুষেরা জানেনা বিধায় এর কোনোটির উপরে আবারও নগরের পত্তন ঘটে এবং একসময় আবারও পরিত্যাক্ত হয়। ধুলোবালি জমে আবারও চাপা পড়ে। এসব জানতে হলে মাটি খনন করে জানতে হবে। একটি নগর গড়ে উঠে ধ্বংস হয়ে আবার তার উপর আরেকটি নগর গড়ে উঠতে হাজার হাজার বছর সময় লাগে। বর্তমান পৃথিবীতে দামাস্কাস সম্ভবত প্রাচীন নগরী। ভারতে ইন্দ্রপ্রস্থ, বেনারস, কাশী প্রাচীনতম নগরী। এলাহাবাদ, কানপুর, পাটনা এগুলো নদীর তীরেই অবস্থিত। চীন দেশে এরকম অনেক প্রাচীন নগর আছে।
২০. মিশর ও ক্রীট:
মিশরে পিরামিড, স্ফিংকস ও বড় বড় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাই। স্ত্রীলোকের মাথাবিশিষ্ট একটি সিংহ যার রহস্য বোঝা যায় না। ফারাও সম্রাটদের মৃতুর পরে মমি করে পিড়ামিডে রেখে দেয়া হতো। টুটেনখামেন নামে একজন রাজার পিরামিডে দামী ও সুন্দর সুন্দর জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া তারা কৃষিকাজের জন্য হ্রদ ও খাল নির্মাণ করেছিল। ভূমধ্যসাগরের ক্রীটে বিরাট এক রাজপ্রাসাদ ছিল। সেখানে স্ননাগার ও পানির পাইপ ছিল। এখানে মৃৎশিল্প, চিত্রাঙ্কন, ভাস্কর্য, ধাতুর কাজ ও হাতির দাঁতের কাজ ছিল। এইখানকার রাজা মিডাস হাত দিলেই সবকিছু সোনা হয়ে যেত। আর প্রচলিত ছিল মাইনটর দানবকে (অর্ধেক দানব ও অর্ধেক ষাড়) খুশি করতে বালক-বালিকাদের উৎসর্গ করা হতো। নীল নদে মেয়েদের নিক্ষেপ করতো। এ সবই ঘটতো দেবতাদের সন্তষ্ট করতে ভয়ের কারণে। এখন আর মানুষ উৎসর্গ করা হয় না। তবে ঈশ্বরকে খুশি করতে এখনো প্রাণী হত্যা করা হয়। এ এক অদ্ভূত পদ্ধতি।
২১. চীন ও ভারতবর্ষ:
মেসোপটেমিয়া, মিশর ও ক্রীটে সভ্যতা গড়ে ওঠে, কাছাকাছি সময়েই চীন ও ভারতবর্ষে মহান সভ্যতা গড়ে ইঠেছিল। চীনে ব্রোঞ্জ ও লোহার ব্যবহার ছিল, তারা খাল কাটতো, সুরম্য অট্টালিকা বানিয়েছিল। তাদের ছবির মাধ্যমে লিখন পদ্ধতি ছিল যাকে হায়ারোগ্লিফিক বলা হয়। মিশরে ও পাশ্চাত্যে প্রাচীন বাড়ির গায়ে এগুলো দেখা যায়। তবে চীনে এখনো ছবি দিয়ে লেখার প্রচলন আছে। এ পদ্ধতিতে উপর থেকে নিচে লেখা হয়। ভারতবর্ষে মাটি খুড়ে হরপ্পা সভ্যতার সন্ধান পাওয়া গেছে। তারা মেসোপটেমিয়া ও মিশরের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য ও আদান-প্রদান করতো। চীন ও ভারত উভয় দেশে ছোট ছোট নগরকেন্দ্রিক রাষ্ট্র ছিল। নগর রাষ্ট্রগুলোতে কোনো রাজা ছিল না। পঞ্চায়েতরা কার্য পরিচালনা করতো। নগর রাষ্ট্রগুলো একে অপরেকে সহযোগিতা করতো। কখনো কোনো একটা বড় নগর রাষ্ট্র অন্যদের নেতা হয়ে উঠতো। চীনে সেভাবেই বড় রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্য তৈরি হলো। তারা মঙ্গোলীয় জাতির প্রবেশ ঠেকাতে ১৪০০ মাইল দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ করেছে।
২২. সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্য:
ফিনিশীয়রা আরব ও ইহুদি জাতির মতো একই জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভূমধ্যসাগরের তীরে এইকার টায়ার ও সিডন নামের শহর ছিল তাদের। ফিনিশীয়রা বর্তমানে এশিয়া মাইনর তথা তুর্কীর পশ্চিম উপকূলে বাস করতো। তারা সমুদ্রপথে ভূমধ্যসাগরের সর্বত্র এবং ইংল্যান্ডেও যেতো। গাছের বড় বড় গুড়ি ব্যবহার করে সমুদ্র ভ্রমণ ও বাণিজ্য করতো তখন মানুষ। এই যাত্রা ছিল অত্যন্ত বিপদসংকূল। খাবার ফুরিয়ে গেলে সমুদ্রের মাঝখানে তাদের মাছ ও পাখি ধরে খেতে হতো। সমুদ্রযাত্রা নিয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। ভ্রমণের নেশা এবং সোনা ও অর্থ উপার্জনের আশায় মানুষ দুঃসাহসিক সমুদ্র অভিযানে বের হতো। ব্যবসা ও বাণিজ্য কিভাবে শুরু হয় তার ধারণা পাই আমরা। আমরা ভারতে বসে দোকানগুলোতে দূরের তথা জাপান, চীন, ইংল্যান্ড, প্যারিসে তৈরি জিনিসগুলো কিভাবে পাই? জাহাজ ভরে এক জায়গার পণ্য আরেক জায়গায় যায়। ভারতবর্ষের তুলা ইংল্যান্ডে যায়, আবার সেখান থেকে জাহাজে কাপড় ভরে তা ভারতে আসে। ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়টা একটু জটিল। মানুষ যখন কম ছিল তখন নিজেদের পণ্য নিজেরাই তৈরি করতো। পওে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য প্রথা চালু হয়। তারপর সোনা-রূপা, এরও অনেক পরে মুদ্রার বিনিময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য চালু হয়। তবে মুদ্রার আসলে নিজস্ব কোনো ব্যবহার নাই যদি তা আমাদেরকে প্রয়োজনীয় জিনিসটি দিতে না পারে।
২৩. ভাষা-লেখা ও সংখ্যা:
জন্তু জানোয়ার কিছু শব্দ করে। তারা ভয় পেলে শব্দ করে একজন আরেকজনকে সতর্ক করতে চায়। সম্ভবত মানুষও এভাবেই ভাষার ব্যবহার আরম্ভ করে। তাদের প্রথমদিকের ভাষাগুলো নিশ্চয়ই সাধারণ ভয় পাওয়া ও সতর্ক করার চিৎকার ছিল। সেখান থেকে ক্রমে পানি, আগুন, ঘোড়া, ভালুক এই নাম বা বিশেষ্য শব্দগুলো ব্যবহার শুরু করলো। একটা ভালুক দেখলে হয়তো সতর্ক করতে বলতো ‘ভালুক’; এবং তা ছিল আজকের শিশুদের মতোই। ভাষার উন্নতি হলো। ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার শুরু হলো। সম্ভবত শুরুর দিকে সব মানুষ একই ভাষা ব্যবহার করতোনা। আবার এখনকার মতো অনেকগুলো ভাষাও তখন ছিল না। অল্প কয়েকটি ভাষা ছিল। আমরা আগেই দেখেছি যে, সেই অল্প কয়েকটি ভাষা একেকটি ভাষা পরিবারে পরিণত হলো। এখান থেকে যথেষ্ট উন্নতি করলে মানুষ গান রচনা করতো। আমরা দেখি যে, তারা তাদের বীরদের জন্য বীরগাঁথা রচনা করতো। যুদ্ধ করতে ভালোবাসতো তারা। গানগুলো ছিল যুদ্ধের সাহসিকতা সম্পর্কে। এরপর আসে লেখার ব্যাপারটা। মানুষ হয়তো ছবি এঁকে বুঝানোর চেষ্টা করতো ময়ুর বা বাঘকে। এক পর্যায়ে ছবি আকার মাধ্যমে লেখার বিষয়টা আসলো। আমরা হায়ারোগ্লিফিকের কথা বলেছি। অনেকদিন পরে বর্ণমালা আবিষ্কার হলো এবং তা বিকশিত হলো। সংখ্যা আবিষ্কারের কাজটি ছিল বড় একটা কাজ। ইউরোপে রোমান সংখ্যায় লেখা হতো। বর্তমানে আমরা যে সংখ্যা ব্যবহার করি ১, ২, ৩, ৪ ইত্যাদি তা অনেক উন্নত। ইউরোপ এসব শিখেছিল আরবদের কাছ থেকে। সেজন্য তারা বলতো ‘আরবী সংখ্যা’। আদতে আরবীয়রা তা শিখেছিল ভারতীয়দের কাছ থেকে। সুতরাং এগুলোকে ‘ভারতীয় সংখ্যা’ বলাই সমীচীন হবে।
২৪. নানান শ্রেণির মানুষ:
ইতিহাস মানে শুধু রাজা-বাদশাহ’র ইতিহাস নয়। সাধারণ মানুষের আনন্দ বেদনা, তাদের বাধাবিপত্তি এবং সেসব জয়ের বিবরণ আমাদের অনেক কিছু জানাবে এবং আমাদের বিপদে পথ দেখাবে। আসলে প্রথম দিকের মানুষ নিয়ে আমরা যে আলোচনা করেছি তা খুবই সামান্য। অনেক প্রাচীনকালের আলোচনাগুলোকে ইতিহাস বলা কঠিন। সেগুলোকে আমরা ইতিহাসের প্রারম্ভ বা উষালগ্ন বলতে পারি। আমরা দেখেছি কিভাবে গোষ্ঠীপতি, তার পরিবার আলাদা হয়ে গেল অন্য মানুষ থেকে। মানুষ ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে থাকলো। রাজা, সভাসদ ও তার পরিবার সৃষ্টি হলো। মন্দির ও পুরোহিত শ্রেণি আসলো যারা রাজাকে সহযোগিতা করতো। বণিক শ্রেণির সৃষ্টি হলো যারা দোকানে ও অন্যদেশের সাথে পণ্য কেনাবেচা করতো। আর যারা কাপড় বোনা, মাটির পাত্র তৈরি, পিতলের জিনিস তৈরিসহ অন্যান্য পণ্য তৈরি কররো তারা কারিগর শ্রেণি হলো। ক্ষেতে-খামারে কাজ করে কৃষক-শ্রমিক শ্রেণি গড়ে উঠল।
২৫. রাজা, মন্দির ও পুরোহিত:
আমরা দেখলাম মানুষ পাঁচ শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে গেল। কৃষক ও শ্রমিকরা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতো। কিন্তু উৎপাদিত পণ্যগুলোর মূল্য তারা খুব কম পেতো। এগুলো চলে যেত অন্যদের কাছে, রাজাদের কাছে ও হোমরাচোমড়াদের কাছে। রাজতন্ত্র শক্তিশালী হলে রাজারা জানিয়ে দিল, তারাই জমির মালিক। ফলে উৎপাদিত পণ্যের বেশির ভাগ পেল জমিদার। কোনো কোনো মন্দিরেরও জমি ছিল। তারাও জমিদার হয়ে গেল। প্রাচীন মানুষ অনেক কিছু বুঝতে পারতোনা বলে নদী, পাহাড়, সূর্য সবকিছুকেই দেবতা মনে করতো। দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করতো। দেবতাদের জন্য মন্দির তৈরি করা হলো। মন্দিরের বেদিতে দেবতার মূর্তি স্থাপন করলো। তখনকার মানুষ ছিল শিশুদের মতো। দৃশ্যমান কিছু ছাড়া তাদের পূজা করা সম্ভব হতোনা। সেজন্য মূর্তি স্থাপন করতো। মূর্তিগুলো ছিল সাধারণত ভয়ানক বিশ্রী। কখনো কখনো অর্ধেক মানুষ অর্ধেক পশু। এখনকার মতো একেশ্বরে তারা বিশ্বাস করতোনা। ভিন ভিন্ন দেবতাও ছিল। পুরোহিতরা তখন অন্যদের চাইতে বেশি জ্ঞানী ছিল। তারা রাজাকে মন্ত্রণা দিত এবং মানুষকে বিপদে, রোগে সাহায্য করতো। মানুষকে তারা বিভ্রান্তও করতো। মানুষ তাদের ভয় পেতো। কখনো পুরোহিতরাই মানুষদের শাসন করতো। পরে রাজারা তাদের স্থান দখল করে নিল। কোনো কোনো স্থানে রাজা ও পুরোহিত একই ব্যক্তি ছিল, যেমন মিশরের ফারাওরা। জীবিত অবস্থাতেই তাদের অর্ধ ঈশ্বর ও অর্ধস্বর্গীয় মনে করা হতো।
২৬. পিছন ফিরে দেখা:
এই চিঠিতে তিনি আগের লেখা বিষয়গুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন। সূর্য থেকে পৃথিবী সৃষ্টি হলো। লক্ষ লক্ষ বছর তাতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল না। পৃথিবী শীতল হলো। অনুন্নত প্রাণী দিয়ে প্রাণের যাত্রা শুরু হলো। জলচর, উভচর, স্থলচর জীবজন্তু পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতো। এ সময় তাদেরকে গুলি করে মেরে ফেলার কেউ ছিলনা। এরপর আসলো মানুষ। হাজার হাজার বছর ধরে বুদ্ধি ও শক্তি সঞ্চয় করে জগতের প্রভু হয়ে গেল। লক্ষ লক্ষ বছর পেরিয়ে আমরা এখন চার/পাচ হাজার বছর আগে এসে পৌঁছেছি। ইতিহাস শুরু ও তার বিকাশ এই চার হাজার বছরেই।
২৭. জীবাশ্ম ও ধ্বংসাবশেষ:
এই চিঠিতে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন মিউজিয়ামে যে জীবাশ্ম ও জীবাশ্মের ছবি দেখেছিলেন সেগুলো নিয়ে কথা বলেছেন। আগেকার জীবজন্তু আকারে বড় ছিল। মানুষের মতো বড় ব্যাঙ, বিরাট আকৃতির বাদুর, গাছের মতো বিশাল ইগুয়ানোডন ছিল। সরীসৃপদের পরে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আগমন আগে। বিরাট শুড়ওয়ালা হাতি ছিল আর মস্ত বড় ভালুক ছিল। তিনি থীবজের মিশরীয় প্রাচীন সমাধি, মন্দির, প্রাসাদের চিত্রের কথা বলেছেন। এসব ধ্বংসাবশেষ থেকে বোঝা যায় তাদের যথেষ্ট প্রকৌশল জ্ঞান ছিল।
২৮. আর্যরা ভারতে এল:
আমরা প্রাগৈতিহাসিক কালের কথা বলছি। তখন ভারতে দ্রাবিড়রা বসবাস করতো। আর্যরা মধ্য এশিয়ায় বাস করতো। খাদ্যের সংকটের কারণে তারা পারস্য ও গ্রীসে চলে যায় এবং কিছু সংখ্যক কাশ্মীরের কাছে পাহাড় পেরিয়ে ভারতে আসে। আর্যরা শক্তিশালী ছিল। দ্রাবিড়দের সাথে প্রথমে যুদ্ধ হলেও তারা আর্যদের সাথে পেরে ওঠেনি। দ্রাবিড়রা ক্রমে দক্ষিণে সরতে থাকে। প্রথমে আফগানিস্তান ও পাঞ্জাবে তাদের বসতি গড়ে ওঠে। পরে যুক্তপ্রদেশ, আরো পরে বিন্ধ্য পর্বত পর্যন্ত বিস্তৃত হলো আর্যরা। এই পর্বতের গভীরে ছিল জঙ্গল। সুতরাং তা অতিক্রম করা সহজ ছিল না। ফলে দক্ষিণ ভারত দ্রাবিড় প্রধান থেকে যায়। প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ, বেদ-পুরাণ থেকে আর্যদের বিস্তৃতি সম্পর্কে জানা যায়। তারা যখন শুধু আফগানিস্তান ও পাঞ্জাবে বাস করতো তখন এই স্থানকে বলা হলো ‘ব্রহ্মবর্ত’। আর আফগানিস্তানের নাম ছিল ‘গান্ধার’। বর্তমানে আফগানিস্তান ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দেশ। এরপর তারা নেমে আসে গঙ্গা-যমুনার সমভূমিতে এবং সমগ্র উত্তর ভারতের নাম দিল ‘আর্যাবর্ত’। প্রাচীনকালের অন্যান্য মানুষের মতো আর্যরাও নদী তীরবর্তী শহরে বসতি স্থাপন করলো। কাশী, বেনারস, প্রয়াগ ইত্যাদি শহরগুলো নদীর তীরে অবস্থিত।
২৯. ভারতে আর্যরা কেমন ছিল:
আর্যরা দলবেধে একসাথে আসেনি। তারা বছরের পর বছর, শত বছর ধরে এখানে আসে। তাদের লেখা বেদ গ্রন্থ থেকে আমরা তাদের সম্পর্কে জানতে পারি। প্রথমদিকে এটি মানুষ মুখস্থ করে স্মৃতিতে রেখে ছিল। পরে এটি লেখা হয়। প্রথম বেদ গ্রন্থ হলো ঋগবেদ। এতে আছে স্তব স্তোত্র এবং গান। আর্য শব্দের অর্থ হলো ভদ্রলোক, একজন উন্নত শ্রেণির মানুষ। তারা নিজেদের সম্পর্কে খুব গর্বিত ছিল। তারা যোদ্ধা ছিল, কিছুটা বিজ্ঞান জানতো এবং কৃষিকাজ জানতো। পানির জন্য তারা নদীকে ভালোবাসতো। কৃষিকাজে সাহায্য করায় এবং দুধ দেয়ায় ষাঁড় ও গাভীগুলোর বিশেষ যত্ন নিত এবং প্রশংসা করতো। দীর্ঘকাল পরে মানুষ গরুর যত্ন নেয়ার কারণ ভুলে গিয়ে তার পূজা করা শুরু করে দিল। অন্যদের সাথে মিশে যাওয়ার ভয়ে তারা আইন করে বিয়ের বিষয়ে বিভিন্ন বাধা তৈরি করলো। অনেক পরে এ প্রথাই জাতিভেদ প্রথায় রূপান্তরিত হলো।
৩০. রামায়ণ ও মহাভারত:
বৈদিক যুগের পরে আসলো রামায়ণ ও মহাভারত। একে মহাকাব্যের যুগ বলা হয়। রামায়ণের মূল গল্পটি সংস্কৃত ভাষায় বাল্মীকির লেখা। হতে পারে আর্যদের সাথে দক্ষিণ ভারতের মানুষের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল, তা নিয়েই রচিত হয়েছে এটি। দক্ষিণ ভারতের নেতাই হয়তো ছিল রাবণ। রামায়ণের অনেক পরে আসে মহাভারত। তা পড়ে আমরা আর্যদের সাথে আর্যদের যুদ্ধের কাহিনী জানতে পারি। এতে আছে অমূল্য কাব্যরত্ন ভাগবত গীতা। হাজার হাজার বছর আগে ভারতবর্ষে মহামানবরা এই বইগুলো রচনা করেছে।
_*_*_*_*_*_*_
ইন্দিরাকে বাবা জওহরলাল নেহরুর চিঠি
ভাষান্তর: কাজী মো. সিদ্দিকুর রহমান
প্রচ্ছদ ও চিত্রালংকরণ: সব্যসাচী হাজরা
প্রকাশনী: আলবাট্রস পাবলিকেশন, ঢাকা
প্রকাশকাল: ২০১৭
পৃষ্ঠা: ১২৩
মূল্য: ২৫০ টাকা
ISBN: 984-70021-0015-1
_*_*_*_*_*_*_
একই বইয়ের আরেকটি আলোচনা পড়ুন নিচের লিংকে -

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম