নাসরীন জাহানের গল্পসমগ্র ১ এর আলোচনা: ফাহমিনা নূর

নাসরীন জাহানের গল্পসমগ্র ১ প্রসঙ্গে ফাহমিনা নূরের আলোচনা সমালোচনা

কথা সাহিত্যিক নাসরীন জাহান আপার গল্পসমগ্র- ১ পড়তে শুরু করেছিলাম মার্চ মাসে। শেষ করা হয়নি, তখনই গল্পগুলো (যেগুলো পড়েছি) ঘিরে কিছু পাঠানুভূতি লিখে রেখেছিলাম। আজ মনে হলো শেয়ার করি।  

এ বইতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মোট পাঁচটি গ্রন্থের চৌত্রিশটি গল্প। বইগুলো হলো-

  • স্থবির যৌবন
  • বিচূর্ণ ছায়া
  • সূর্য তামসি
  • পথ হে পথ
  • সারারাত বেড়ালের শব্দ



বইগুলোর নাম কী সুন্দর! কথাসাহিত্যিক কবিতার পথেও যে মুক্তো ফলান এ যেন তারই ইঙ্গিত।  


গল্পগুলোর আদি পরিচয় অর্থাৎ কোনটি কোন বইয়ের গল্প তা সূচিতেই স্পষ্ট করে দেয়ার বিষয়টি ভালো লেগেছে। সাধারণত গল্পসমগ্রে এটি পরিষ্কার উল্লেখ না থাকলে লেখকের সাহিত্যকর্মের আকাশে পাঠকের একরকম সূতো ছেঁড়া ঘুড়ির অনুভূতি হয়। সেই মৃদু যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবার কারণে প্রকাশক জলধিকে ধন্যবাদ জানাই। 


স্থবির যৌবন:


ছয়টি গল্পের প্রথমটিই প্রথমে পড়লাম। 'দাহ' এক নিরীহ বর্গাচাষীর দাহ্য যন্ত্রণার গল্প। আগুনপোড়া যন্ত্রণার সাথে গল্পে যুক্ত হয়েছে অবহেলার বিষ-যন্ত্রণা। আছে গ্রাম্য রাজনীতির বিষ-দংশন। গল্প হয়তো খুব অচেনা নয় কিন্তু তার যন্ত্রণা প্রকাশে ভাষা কারিগরের শক্তিমত্তা যেন পুরো গল্প জুড়ে দামামা বাজিয়ে গিয়েছে। নাসরীন জাহানের লেখালেখির সাথে যেহেতু খানিক পরিচয় ছিলো এই বাজনাটুকু প্রত্যাশিতই ছিলো। বইটির আরেকটি বিষয় যা ভালো লেগেছে তা হলো গল্পশেষে সেগুলোর সৃষ্টিকালের উল্লেখ। এই যেমন আলোচ্য গল্পটি লেখা হয়েছে ১৯৮৩ সালে।


'পরগাছা' গল্পটি শুরু হয় নাদের আলীকে দিয়ে। নাদের আলী এক মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহভৃত্য। কিছুদূর পড়ার পর ভুল ভাঙলো, ভৃত্য নয়, সে আশ্রিত। নাম দেখে মনে হলো ভুলটাই পাঠকের পক্ষে অনুচিত ছিলো। যা হোক গল্প এগিয়ে চলে। গল্প সহজ নয়, গল্পের ভেতর যে গল্প তা ভয়ানক। ওদিকে পা না বাড়াই, খোদ লেখকই বাড়ান নি। পাঠক তাই গল্পের খোলসের গল্পেই আটকে থাকি, লেখকও তা-ই। সত্যি বলতে কি এমন বমন উদ্রেককারী বর্ণনা পড়ে এক পর্যায় ইস্তফা দেবো কি না ভাবছিলাম। এক ফাঁকে দেখি ফ্রয়েডও গল্পে একটু উঁকি দিয়ে গেলেন। নাসরীন জাহানের গল্পে সবমিলিয়ে পাঠকের দু'হাত ভরে নেবার মতো প্রাপ্তি থাকেই। শেষটা সুন্দর! দারুণ সুন্দর! রচনাকাল: ১৯৮২।


'জনক' ( ১৯৮৯) গল্পটি পড়ার সময় মনে হলো গল্পের শিরোনাম 'জননী' হলো না কেন! উত্তর পেয়ে গেলাম গল্প শেষে। হ্যাটস অফ টু কথা নাসরীন জাহান! ভীতু, বিকারগস্ত লোকের ক্রমাবনতির গল্প 'বিকার' অন্যদিকে গর্ভকালীন কোনো বিশেষ খাবারের প্রতি অতি আকর্ষণকে বিষয় করে লেখা গল্প 'জঠরবন্দি'। বিষয় বিবেচনায় গল্প দু'টি চমৎকার লাগলেও মনে হলো কথা সাহিত্যিক নাসরীন জাহানের হাত ধরেই গল্প দু'টো আরো প্রাণবন্ত হতে পারতো। নাসরীন জাহানের ছোট গল্পগুলোর বিষয় চমকিত করার মতো, দৃশ্য কিংবা অনুভূতির বর্ণনায় লেখককে আমার খানিক নিষ্ঠুর মনে হলো, এই নিষ্ঠুরতা চরিত্রে নয় পাঠকের প্রতি। একই কথা আরো ধীর লয়ে বলা হলে পাঠকের হজমে সহায়ক হতো ব'লে মনে করি। অন্যথায় গল্পের গতির সাথে দৌড়াতে দৌড়াতে পাঠক যা পড়ছে তা হৃদয়ে ধারণ করার দমটুকুও পায় না। শেষের গল্প 'আত্মসমর্পণ' আমার দারুণ লেগেছে এবং বাস্তবসম্মত সমাপ্তি ঘটেছে বলেই মনে করি। এ বাস্তবতা দর্শন লেখকের গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার সাক্ষ্য বহন করে। তিনটি গল্পই আশির দশকে লিখিত। এই দিয়েই শেষ হলো গল্পসমগ্রে অন্তর্ভুক্ত প্রথম বইয়ের গল্পগুলো।


বিচূর্ণ ছায়া


গল্প সমগ্রের দ্বিতীয় গ্রন্থ 'বিচূর্ণ ছায়া' র প্রথম গল্প 'পুরুষ'। এক পঙ্গু পুরুষের পুরুষত্বের প্রতি আশেপাশের মানুষের অবজ্ঞাহেতু সৃষ্ট আক্রোশ এই গল্পের বিষয়।  নাসরীন জাহানের পর্যবেক্ষণের বিষয় ও ক্ষমতা সাধারণের ঊর্ধ্বে তা আরেকবার অনুভূত হলো।


'সুন্দর লাশ' গল্পটি একটি মৃত্যু মুহুর্ত দিয়ে শুরু হয়, পড়তে পড়তে জানা হয় এক দম্পতির গল্প যেখানে স্বামী প্রবরটি আবার সমকামী। শুরু হয় জটিল মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ। সুন্দর এক যুবকের লাশকে কেন্দ্র করে পরাবাস্তব ধুম্রজালে শেষ হয় গল্প, যার হয়তো মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকে।


পরবর্তী গল্প এক বৃদ্ধের। মৃত্যপথযাত্রী এক বৃদ্ধকে নিয়ে লেখা এই গল্পে বেঁচে থাকার অসীম ইচ্ছায় বারবার ফিরে আসে সেই বৃদ্ধ যার পুরো জীবন ছিলো বিষয়-আশয়ের প্রতি সমর্পিত। দুর্দান্ত এ গল্পটি ভালো না লেগে উপায় নেই।


একটা স্যুরিয়েল আবহে শুরু হলো 'বিচূর্ণ ছায়া' গ্রন্থের অন্যতম গল্প 'বিবসনা'। এটি হোসেন আলী নামের এক বাইশ বছরের যুবকের যৌন ফ্যান্টাসি ও নারীগমনের গল্প যে একই সাথে ধার্মিকও। এ গল্প বড় বেশি জৈবিক, বড় বেশি রক্তমাংসের মানুষের। এর রচনাকাল: ১৯৮৭, একই বছর লেখা 'রজ্জু' গল্পটিও তেমন টানলো না, মনে হলো কী যেন বলতে চেয়ে বলা হলো না। তবে  গল্পের মূল চরিত্রের নিঃসঙ্গতার চিত্র খুব অচেনা কিছু নয়। পরবর্তী গল্পটিও ধর্মীয় উম্মাদনা ও নৃশংসতা কেন্দ্রিক, নাসরীন জাহানের লেখা গল্প বলেই হয়তো এর প্লট ও বুনন ভিন্নধর্মী এবং অভিনব। গ্রন্থের সর্বশেষ গল্প 'কুকুর'। চরিত্র এখানে চারটি, একটি রাত, একটি পথ, একটি কুকুর ও একজন কিশোরী। কিশোরীর 'কুকুর ভীতি' গল্পের আপাত বিষয় হলেও একে ব্যাখ্যা করা যায় নানাভাবে। অন্যরকম গল্প, আমার ভালো লেগেছে।


গল্প সমগ্রের তৃতীয় গ্রন্থ 'সূর্য তামসি'


যথাক্রমে প্রথম ও শেষ গল্প দুটিই আগে পড়া হলো। 'ল্যাম্পপোস্ট' গল্পটিতে  সেই জন্ডিস-বাতির নিচে বর্জ্যের মাঝে দেখা পাওয়া লাশের জেগে ওঠা অতঃপর তাকে দীঘল হাতের এক প্রাণীরূপে আবিষ্কার জাদুবাস্তবতার আবহ সৃষ্টি করলেও এটি মূলত পঙ্কিল সমাজের প্রতিভূ দুর্নীতি পরায়ণ মোশতাক আহমেদের মনোজগতের গল্প। বর্ণনায় কিছুটা ঘিনঘিনে বিষয় যুক্ত হয়েছে। হবে না-ইবা কেন এ যে পাপাচারেরই গল্প। শেষগল্প 'নিশাচর' সহায়-সম্বল ও আত্মীয়-পরিজনহীন গ্রাম্য নারী জাহেদা ও এক মাতব্বর শ্রেণির পুরুষের গল্প। এ ধরণের গল্পগুলো যেভাবে শুরু ও শেষ হতে পারে এটিও তার ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। তবে বিশেষত্ব এনেছেন লেখক তাঁর বর্ণনগুণে। রাতের রহস্য ও আঁধারের এমন জীবন্ত বর্ণনা এটিকে সাহিত্যের মর্যাদা দিয়ে নিছক গল্প থেকে পৃথক করেছে।

'বিলীয়মান হলুদ নীল স্বপ্নগুলো' গল্পটি শারীরিক ত্রুটিজনিত কারণে সৃষ্ট হীনম্মন্যতা বা তদসৃষ্ট জটিলতার গল্প আবার একই সাথে এটি পিতামাতার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের ফলে সৃষ্ট তরুণ মনের জটিল সমীকরণের গল্প। এখানে যৌনতার ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে ওঠে অবদমনজাত সাপের ফণার মতো। মনোজগতের ফ্যান্টাসি ধূলোয় মিশে যেতে পারে দিবালোকের মতো ঝলমলে বাস্তবতার নিরিখে। গল্পের শেষটা তাই সুন্দর। দিনের আলোয় রাতের রহস্য দূর হবেই, এটি সহজ সত্য। তবু সেই সহজ সত্যই থেকে যায় আমাদের লোচনের বাইরে থেকে যায় অধরা। গল্পলেখক সেই সহজ সত্যটিই উন্মোচন করেছেন যথাসময়ে, দিয়েছেন ভাষা, টেনেছেন উপসংহার। গল্প বহু দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে কোথায় যেন যেতে চাইলো কিন্তু এসে থামলো বাড়িরই নিকানো উঠোনে। 

মন বিষণ্ণ করে তোলা এক বিষণ্ণ গল্প 'কাঁটাতার'। নাসরীন জাহানের গল্পে সমাজ-সংসার থাকে, তার চাইতে বেশি উদ্ভাসিত থাকে চরিত্রের অন্তর্গত চরিত্র। 'কাঁটাতার' গল্পটি ব্যতিক্রম যেখানে মনোজাগতিক বিশ্লেষণ নয় গল্পকে জীবন্ত করে তুলেছে গল্পের আবহ। গল্পকার চরিত্রের মনোজগত নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন তবে এখানে তিনি সে কাজটি করতে গিয়েও পিছিয়ে এসেছেন। পাঠক হিসেবে এটিকে আমি তাঁর পরিমিতিবোধ হিসেবেই দেখি। সকল মুন্সিয়ানা সকলক্ষেত্রে দেখাতে গেলে পুরো বিষয়টি ক্লিশে হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে।


'বালিকা রমনী' এক পথশিশুর কিশোরী থেকে রমনী হয়ে ওঠার ও মন খারাপ করা গল্প। রুক্ষতায় ভরা এই গল্প এক কিশোরীর হলেও তাতে কৈশোরের চাপল্য, স্নিগ্ধতা কোনোটাই নেই। আছে ভাতৃহারা হওয়ার এক ঝাপসা করুণ স্মৃতি। জীবনটা তার পথের কিশোরীর অথচ যৌন নিপীড়নের শিকার হবে না এমন অবাস্তব পৃথিবী পুরুষেরা সৃজন করে নি। কাজেই গল্প পড়ে মন ভালো থাকার উপায় নেই।


পরবর্তী গল্প 'প্রেতাত্মা' নারী নিগ্রহ আর দারিদ্রের এক করুণ চিত্রপট। গরীবের সুন্দরী কন্যার মতো বড় বোঝা বোধকরি আর হয় না তদুপরি কন্যা যদি হয় সংখ্যালঘু পরিবারের তাহলেতো কথাই নেই। এ আগুন যত না পোড়ায় পোড়ে তারচেয়ে ঢের বেশি। এ-ও এক চেনা গল্প তবে নাসরীন জাহানের অন্যান্য গল্পের মতো চাবুক না ঘুরিয়ে এ গল্প বলা হয়েছে কিছুটা নমিত স্বরে। পাঠক তাই পড়তে গিয়ে কিছুটা আরাম বোধ করবেন।

'খোলস' গল্পটি পড়তে পড়তে 'মেঘে ঢাকা তারা' সিনেমাটির কথা মনে পড়ে গেলো। সংসারের ঘানি টানা অবিবাহিত নারী চরিত্রের প্রতি পাঠক বা দর্শকের পক্ষপাতিত্ব থাকে, এটিও ব্যতিক্রম নয়। নীনা চরিত্রকে খুব ছোট ক্যানভাসেই বড় রূপে পাঠ করলাম। গল্প বলার ঢংটাও অন্য গল্পগুলো থেকে আলাদা। চমকটি অন্য জায়গায়, গল্পের নাম যেহেতু 'খোলস 'এটি একটি ট্রান্সজেন্ডারের গল্প সে ইঙ্গিত পাওয়া যায় বেশ কয়েকটি জায়গায়। বর্ণিত সাতটি গল্পের সাথে সমাপ্ত হয় গল্পগ্রন্থ 'সূর্য তামসি'


পথ হে পথ

পথ হে পথে প্রবেশ করলাম প্রথম গল্প 'অনুসরণ' পাঠে।  আরেকটি গল্প যেখানে নাসরীন জাহান মনোজগৎ নিয়ে কাজ করেছেন। এবারের গল্পের চরিত্র এক কলেজ পড়ুয়া ছেলে যাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে কল্পিত হন্তারকের ছায়া। গল্প শুধু ফোবিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই সাথে যোগ হয়েছে সাহসের অভাবজনিত কারণে সৃষ্ট হীনম্মন্যতা। গল্পের সাইডলাইনে এসেছে কোনো এক মামীর প্রতি তার আকর্ষণ। পথচলার বর্ণনায়, পরিবেশ ফুটিয়ে তোলার মুন্সিয়ানায় নাসরীন জাহান তুলনারহিত।


দ্বিতীয় গল্প 'শিবমন্দির' একটি ক্লাসিক গল্প। অভাব, লোভ আর বিশ্বাসের মতো বাহুতে ভর করে গল্পটি যে ত্রিভুজ রচনা করে মাঝপথে তাতে যোগ হয় আতঙ্কের চতুর্থভূজ। এ পর্যায় দেখি গল্পের চতুর্ভূজে সর্প-গরলের আড়ালে ছড়িয়ে আছে সাম্প্রায়িকতার বিষ। একসময় অন্ধকার কাটে,আতঙ্ক দূর হয়, আবির্ভূত হয় সুন্দর সকাল। গল্পের ডাইনামিক্সের তুলনায় সমাপ্তি কিছুটা ম্যাড়ম্যাড়ে হলেও এটি একটি ক্লাসিক গল্প।


প্রাণ- প্রকৃতি সাবাড় করে চলেছে সর্বভূক মানুষ। তারই প্রতিবাদে অশীতিপর বৃদ্ধ কালু অদ্ভুত এক অবস্থান নিয়েছে খাদ্যশৃঙ্খলে। শেষরক্ষা হয়নি, নিজের কবর তাই নিজেকেই খুঁড়তে হয়। পেছনে পড়ে থাকে স্বার্থানেষী মানুষের স্মৃতি, বিকলাঙ্গ সমাজ। এই নিয়ে গল্প 'মাটির আদম'। কাকে এখানে অপ্রকৃতস্থ বলবো কালুকে না কি যাদের কারণে কালু এমন কালু হয়েছে তাদের! চমৎকার গল্প।


এ পর্যন্ত পড়া এই বইয়ের একমাত্র প্রেমের গল্প 'একটি অসীম মুহূর্ত', মোটামুটি লেগেছে। পরবর্তী 'পাখিওয়ালা' একটি অদ্ভুত সুন্দর গল্প। গল্পের মূল চরিত্রে আছে দু'জন। একজন অশীতিপর বৃদ্ধ বিগত জৌলুসময় জীবনের অবশিষ্টাংশে যার দিন কাটছে একটি পাখির সাথে নিবিড় বন্ধনে। নিঃসঙ্গ এই বৃদ্ধের আছে পঙ্কিল ইতিহাস যা তাকে তাড়া করে। অপর চরিত্র এক স্বল্পভাষী, অদ্ভুত ভিখারী। বয়সে সে-ও প্রবীণ, তার আছে দানবীয় অভাবের অতীত ও বর্তমান। দু'জনের মাঝে যোগসূত্র গড়ে ওঠে পাখির মাধ্যমে। আহা পাখি, আদরের পাখি। ভ্রান্তির ছলনে ভুল হাতে কন্যা সম্প্রদানের কথা মনে করিয়ে দেয়।


নামগল্প 'পথ হে পথ' একটি দাম্পত্যের গল্প। সমান্তরালে চলে স্বামী ও স্ত্রীটির আলাদা গল্প; মনো-দৈহিক বহুগামিতা, দ্বিধা, বিবেক এর উপাদান। গল্পের শেষের দিকে পথেই সমর্পিত অর্ধ-মাতাল, অর্ধ-বেহুশ মঈন যখন বহুপথের গলিতে গলিতে দিশেহারা হয়ে সঠিক পথটি খুঁজে বেড়ায় পাঠকের তখন মানব মস্তিষ্কের বহু শিরা উপশিরায় বহমান স্রোতে বহু প্রশ্নোত্তর অনুসন্ধান করার সময়।


সারারাত বেড়ালের শব্দ


সৈয়দ শামসুল হককে উৎসর্গ করা গল্পগ্রন্থ 'সারারাত বেড়ালের শব্দ', গল্পসমগ্র-১ এ অন্তর্ভুক্ত শেষ গল্পগ্রন্থ। গল্পের বইয়ের নামটা কী অপূর্ব! 'সারারাত বেড়ালের শব্দ' নামটা আমাদের মনোজগতের কত কথাই না সামনে নিয়ে আসার ইঙ্গিত দেয়! প্রথম গল্পটিই বাজিমাৎ করলো, কী তার প্লট, কী তার বিষয় কী তার উপস্থাপনা আর বুনন। তন্ময় হয়ে গল্পের সাথে পাঠকের পথচলা নির্জন রাতে, গ্রামের ঘ্রাণ মগজে নিয়ে। আধিভৌতিক পরিবেশে দেখা হওয়া এক গল্প বলিয়ে যে ছিল সঙ্গোপনে কারো নির্বাক নিউরনে। পাঠককে এমন বিহ্বল করে এক পরাবাস্তব জগতে নিয়ে যাওয়া যাকে একটাবারের জন্যও আরোপিত মনে হয়নি। এই গল্প বহুদিন মনে থাকবে।


 গল্প গ্রন্থের দ্বিতীয় গল্প 'অস্পষ্ট আলোর ছবি' একটা অদ্ভুতুরে গল্প। পাঠের পর এবং পাঠকালীন সময় ঠিক প্রথম গল্পটির বিপরীত অনুভূতি হলো। গল্পের প্লট , বুনন সবই আরোপিত লাগলো। প্যারাসাইকোলজির গল্প যারা পছন্দ করে তাদের ভালো লাগবে হয়তো । পড়তে গিয়ে আমার মিসির আলীর কথাই মনে হচ্ছিল যদিও তেমন চরিত্র এই গল্পে অনুপস্থিত। কিছুটা বিক্ষিপ্ত এই গল্পে আমার মনোযোগও ছিলো বিক্ষিপ্ত। ভালো লেগেছে অসম্পূর্ণ চিত্রকর্মের মোমবাতির আলোতে বা চাঁদের আলোতে পূর্ণতা পাওয়ার ধারণাটি।


'শাদা ভাস্কর্য' এক সাইকোপ্যাথের গল্প কিন্তু সাইকোপ্যাথ কি একজন নাকি দু'জন? এমনওতো হতে পারে যে তিনজনই সাইকোপ্যাথ। পাঠকের চিন্তাতে এমন বিবিধ খোরাক যোগান দিয়ে যাওয়া গল্পটি পড়ে একটুতো বিরাম নিতে হয়।


পরের গল্প 'খড়কুটো'। গল্প সামান্যই,  একটা নৌকা ঝড়ে উল্টে গেলে এক বৃদ্ধ তলিয়ে যান। এক বৃদ্ধের হেঁটে নৌকায় ওঠা তারপর তলিয়ে যাওয়া গল্প  এখানেই শুরু এখানেই শেষ অথচ পাঠককে মোহিত করবে তার বয়ান। 


জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দেখা হয় এক নর ও এক নারীর। জীবনের দরজা দিয়ে তাদের আর জীবনে ফেরা হয় না। দু'জনের জীবনেই ছিল ভিন্ন অতীত যা দুঃসহ। তাই ফেরার আগ্রহ নাই। ভিন্ন স্বাদের গল্প 'টবের অশ্বত্থ'। 


সাতটি ভিন্ন ভিন্ন অন্ধকারের গল্প 'একগুচ্ছে অন্ধকার' গল্পগুলোকে একটি সূতোয় বেঁধে রাখে যে অপশক্তি তা অন্ধকারই।


বইয়ের শেষ গল্প 'আলো পাথরের টান'। এটি একজন ভাস্কর ও তার শিল্পভাবনা বা শিল্প সৃষ্টির গল্প। লিঙ্গিয় পরিচয়ে তিনি একজন নারী। গল্পে তাকে ঘিরে চার বন্ধু লিঙ্গিয় পরিচয়ে যারা পুরুষ তাদের কথা এসেছে। যাদের মাঝে একজন আবার বিশেষ বন্ধু, প্রচলিত ভাষায় যাকে আমরা প্রেমিক বলি। প্রেমটা আসলে কী! গল্পের শিল্পীর চোখে যদি দেখেন তাহলে বলতে হয় একটা মানুষের অপরাধ স্বীকার করে নেয়ার সরল ভঙ্গিটির প্রেমে আপনি পড়তে পারেন। একটা মানুষের চারপাশ সম্পর্কে নিস্পৃহ থাকার যে ক্ষমতা সেই ক্ষমতার প্রেমে আপনি পড়তে পারেন। সেই অর্থে তাহলে এককভাবে কোনো মানুষের প্রেমে আপনি পড়তে পারেন না। কথা হচ্ছে প্রেম নিয়ে, কমিটমেন্ট, যৌনতা বা নৈতিকতা নিয়ে নয়। যা'হোক গল্পের মূল বিষয় প্রেমের জটিল বিশ্লেষণ নয়। গল্পের বিষয় একজন শিল্পীর শিল্প-ভাবনা কীভাবে সক্রিয় হয় তার ক্রিয়া-বিক্রিয়া। বিষয় হিসেব দারুণ, সন্দেহ নেই। গল্প ঝরঝরে, বিষয় যত উচ্চমার্গীয় গল্পের ভাষা ততটা নয়। গল্পকার ইচ্ছে করেই তা করেছেন তাঁর অন্য গল্পগুলো পড়া থাকলে সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না।

 

'খড়কুটো' গল্পটিতে দেখেছিলাম ঠিক তার বিপরীত চিত্র। এক বৃদ্ধ ঝড়বৃষ্টিতে হেঁটে নৌকায় উঠলেন, নদীতে নৌকা উল্টে গেলে বৃদ্ধ তলিয়ে গেলেন হাতে লাঠিটি ধরা ছিল। ঘটনা এটুকুই কিন্তু ভাষা ও বিবরণে গল্পকার তার জাল বিস্তার ক'রে শেষপর্যন্ত যা গুটিয়ে এনেছেন তা অত্যন্ত মানসম্মত একটি ছোট গল্প, একটা উন্নত সাহিত্য। তো সাহিত্য হতে হলে কি সর্বদা ভাষার এমন জাল বিস্তার করার প্রয়োজন আছে? মনে হয়, নাই। তারই প্রমাণ 'আলো পাথরের টান' গল্পটি। 'সব সুন্দরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় কুৎসিত ঘাগুলি।' এই নির্মম বাস্তবতা চিত্রিত হয় ভাস্করের শিল্পে। গল্পকার এতটাই সাবলীল ভাবে গল্পে তা ফুটিয়ে তুলেছেন যে মনে হলো আমার মতো এক আমপাঠকের হাতে তুলে দিলেন এক গভীর দর্শনের চাবি। গল্পকারকে অশেষ শুভেচ্ছা।



**********

গল্পসমগ্র ১
নাসরীন জাহান


প্রকাশনী : জলধি, ঢাকা, বাংলাদেশ।
প্রকাশকাল : ১৯৯৮
পৃষ্ঠা : ৩৭৪
মূল্য: ৬৫০ টাকা

আইএসবিএন : 978-984-96427-4-9

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ