মোস্তফা অভি'র আলোচনায় আহমাদ মোস্তফা কামালের ‘সেইসব পলায়নের গল্প'

আহমাদ মোস্তফা কামালের লেখা  ‘সেইসব পলায়নের গল্প' আলোচনা করলেন মোস্তফা অভি



মানুষ কেন পালায়? ছোটবেলায় কেউ মার খেয়ে পালায়, বড় হলে কেউ হতাশা থেকে পালায়। আবার কেউবা জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে পালাতে চায়। আহমাদ মোস্তফা কামালের ‘সেইসব পলায়নের গল্প’ পড়ার সময় এটা মনে হচ্ছিল না যে, আমি কোনো বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছি। মনে হচ্ছিল, একজন মানুষ আমার সামনে বসে আছেন। তার চোখে ক্লান্তি, কণ্ঠে একরকম শুষ্ক হাসি আর বুকের ভেতর যেন একটা বিষণ্ণ গান বাজছে। গল্পটা শুরু হয়েছে একটা ইন্টারভিউ বোর্ড দিয়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় মানুষটা আসলে পুরো জীবনটাই কোনো এক অদৃশ্য ট্রেনের টিকিটছাড়া যাত্রী হয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে।


গল্পটাকে চারটা পর্বে ভাগ করলে মনে হয়, এটা যেন একটা মানুষের চার ধরনের পলায়নের ডায়েরি। প্রথম পর্বে সে পালায় ভবিষ্যতের দিকে। ইন্টারভিউ বোর্ডে বসা গম্ভীর মুখোমুখি মানুষগুলোকে সে বেপরোয়াভাবে বলে দেয়, দশ বছর পর আপনার জায়গায় দেখব। আর সত্যিই দশ বছর পর সে সেই চেয়ারে বসে। কিন্তু বিধিবাম! ঠিক তখনই খবর আসে তার কিডনি বিকল হয়ে যাচ্ছে। এই পর্বে যেন দেখানো হয়, মানুষ যতই সামনে এগোতে চায়, ভাগ্য ততই পেছন থেকে কুড়ি মেরে টানে।


দ্বিতীয় পর্বটা একদম ছেলেমানুষি। ক্লাস নাইনের ছেলে টিফিনের পয়সা আর মায়ের ব্যাগ থেকে চুরি করা দু-পাঁচ টাকা জমিয়ে, স্কুলের ব্যাগে জামাকাপড় ভরে কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছায়। ট্রেনের সেই দুর্গন্ধযুক্ত টয়লেটে দাঁড়িয়ে স্কুলের মনোগ্রামওয়ালা শার্ট খুলে সাধারণ শার্ট পরার যে দৃশ্য, তা যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এরপর জানালার ধারে বসা সেই অনিন্দ্যসুন্দর মেয়েটি। কোলে শিশু, পাশে লোক—তাকে দেখে মনে হয়নি সে সাধারণ কোনো মানুষ, মনে হয়েছিল সে অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে। কিন্তু টিকিট-চেকারের ভয়ে ঘুমের ভান করতে গিয়ে যখন সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ে, তখন উঠে দেখে মেয়েটি নেই। আর যে স্টেশনে নেমেছিল, সেখানকার সেই অন্ধ গায়ক! যাত্রীরা কেউ তার গান শোনে না, সবাই বাড়ি ফেরার জন্য ছুটে যায়। কিন্তু পলায়নকারী ছেলেটি শোনে। কারণ, সেই গানের কথাগুলো যেন তার নিজের কথা—

 

কে যেন আমারে অতি সাধ করে... কাছে টেনে নিতে চায়।


তৃতীয় পর্বে পলায়নটা হয় দায়িত্ব থেকে। প্রেম করেছিল ঠিকই, কিন্তু মেয়েটি যখন বিয়ের কথা বলে, সংসার, বাচ্চাকাচ্চার কথা বলে, তখন তার মনে হয় যেন কোনো ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছে। সে পালায়। কয়েক বছর পর মেয়েটির বাড়িতে গিয়ে শোনে সে শ্বশুরবাড়িতে। সেই মুহূর্তে যেন তার চারপাশটা একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়। তারপর মায়ের পছন্দ করা লক্ষ্মী-টাইপ মেয়েকে বিয়ে করে সে যেন নিজেকে সমাজের একটা নির্দিষ্ট বেড়ির ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। মনে মনে সে ভাবত, হয়তো কোনো এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে প্রেমিকার সাথে দেখা হবে, হুডখোলা রিকশায় চড়ে দুজনে কাঁদবে। কিন্তু বাস্তবে সেই বৃষ্টি আর আসেনি।


শেষ পর্বটা সবচেয়ে কষ্টের। এবার সে পালায় জীবন থেকে। কিডনি বিকল হয়ে যাওয়ার খবরটা যেন তার জন্য মৃত্যুর একটা নিশ্চিত তারিখ জানিয়ে দেওয়া। কিন্তু কবে? দুই বছর নাকি বিশ বছর? এই অনিশ্চিত অপেক্ষাটাই যেন সবচেয়ে নিষ্ঠুর। সে কাউকে কিছু বলে না, একা একা এই মৃত্যুর খবরটা বয়ে বেড়ায়।


এই মানুষটাকে মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সে আসলে খুব ভীরু। বাইরে থেকে সে বেপরোয়া, সব সময় বলে ‘ড্যাম কেয়ার’। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ভয় পায়। ক্লাস নাইনে পালানোর আসল কারণটা সে নিজেও জানে না, যেমনটা মা জিজ্ঞেস করেছিলেন। আসলে সে ভয় পেয়েছিল বাঁধা পড়ার। বাড়ির সেই ছোট ফ্ল্যাটে, ভাইবোনদের সঙ্গে গাদাগাদি করে থাকার মধ্যে তার যেন একটা শ্বাসরুদ্ধকর অনুভূতি হচ্ছিল। প্রেমিকার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা। মেয়েটি যখন বিয়ের কথা বলল, তখন তার মনে হলো এটা যেন একটা ফাঁদ। সে ভয় পেয়েছিল সংসারের নিয়মকানুন থেকে। আর এখন, যখন তার শরীর ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে, তখন সে ভয় পেয়েছে তার পরিবারকে। স্ত্রী, দুটো সন্তান—কারো চোখের দিকে তাকাতে পারে না। সবার কাছ থেকে সে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। পুরো জীবনে সে শুধু একটা কথাই খুঁজেছে—কীভাবে কারো গ্রাস থেকে বেরিয়ে আসা যায়।


লেখক খুব সাধারণ জিনিস দিয়ে বিশাল কথা বলেছেন। ট্রেনটা এখানে শুধু যানবাহন নয়, ট্রেনটা যেন জীবনের প্রতীক। টিকিট ছাড়া এই ট্রেনে উঠেছে মানুষটা, মানে জীবনের কোনো ঠিকঠাক পরিকল্পনা নিয়ে সে আসেনি। আর সেই অন্ধ গায়ক? কেন তার গান শুনে ছেলেটি তিনদিন স্টেশনে পড়ে রইল? কারণ অন্ধ গায়কটা যেন মৃত্যুর মতো। মৃত্যু যে কারো গান শোনে না, কারো দিকে তাকায় না, ঠিক সময়ে এসে তার একতারা বাজায়। আর বৃষ্টির কথা? সেটা তো শুদ্ধির প্রতীক। মনের সব ময়লা ধুয়ে যাওয়ার। কিন্তু বাস্তবে সেই বৃষ্টি হয়নি। শেষে মায়ের কবরের পাশে বেলিফুলের কথা এসেছে। বেলিফুলের সুগন্ধ যে কিছুক্ষণের জন্য হলেও যেন মৃত্যুকে সুন্দর করে তোলে। মানুষটা বেঁচে থাকতে যে শান্তি পায়নি, মনে হয় মায়ের কবরের পাশে শুয়ে সেই শান্তিটা খুঁজছে।


গল্পের ভাষার যে সাবলীলতা, সেটাই সবচেয়ে বড় শক্তি। কোনো আজগুবি শব্দ নেই, কোনো দেখানোর চেষ্টা নেই। মনে হয়, লেখক যেন রাতের অন্ধকারে আপনার পাশে বসে কানে কানে তার জীবনের গোপন কথাগুলো বলছেন। প্রথম পুরুষে লেখা হয়েছে বলেই পাঠক খুব সহজেই নায়কের ভেতরে ঢুকে যায়। ইন্টারভিউ বোর্ডের সংলাপ, মায়ের সঙ্গে রাতের সেই ফিসফিস করে কথা বলা, প্রেমিকার সঙ্গে বচসা—সবকিছু এত স্বাভাবিকভাবে লেখা হয়েছে যে, চোখ বন্ধ করলেই সব দেখা যায়। বিশেষ করে মায়ের সেই কান্নার দৃশ্য, যখন মা জিজ্ঞেস করেছিলেন

সত্যিই হারিয়েছিলি, না পালিয়েছিলি?


—এই লাইনটার পেছনে যে মায়ের বুক ফাটা ব্যথা লুকিয়ে আছে, তা পড়ার সময় গায়ে কাঁটা দেয়।


আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের জীবনের একটা বড় অংশ যেন এই গল্পে ধরা আছে। অফিসের বড় পদ, সুন্দর সংসার, স্ত্রী সন্তান—সবকিছু থাকার পরও মানুষ কেন অসহায় হয়ে যায়? মানুষের তো মন আছে, সেখানে কিন্তু অনেক আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকে। সমাজ বলে বিয়ে করো, সংসার করো, মানুষটা সব করেছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে যেন একটা খাঁচার পাখি। আর যখন শরীর বলে দেয় যে এখন আর পারবে না, তখন সে সবাইকে এড়িয়ে একা হয়ে যায়। সন্তানদের মুখের দিকে তাকাতে পারে না, কারণ সে জানে সে তাদের ছেড়ে যাচ্ছে। এই যে নিজের অসুখের কথা কাউকে না বলে একা বয়ে বেড়ানো, এটা আসলে আমাদের সমাজের একটা বড় রোগের মতো। মানুষ নিজের দুর্বলতা কাউকে দেখাতে চায় না।


শেষ পর্যন্ত গল্পটা পড়ে কিন্তু কোনো ঘৃণা বা আফসোস কাজ করে না। কারণ, মানুষটা আসলে কারো সাথে ইচ্ছা করে খারাপ করেনি। সে শুধু প্রতিটি পর্যায়ে নিজের ভেতরের ভয়কে এড়িয়ে গেছে। শেষে যখন সে গায়ে জ্বরে কাঁথা গায়ে জড়িয়ে ধরে মায়ের কোলের কল্পনা করে, তখন তার ওই ছেলেমানুষিটা বেরিয়ে আসে। আর মায়ের কবরের পাশে শুয়ে বেলিফুলের সুগন্ধ খোঁজার যে কথা বলেছে, তাতে মনে হয় এটাই ছিল তার শেষ পলায়ন। জীবন থেকে মৃত্যুর দিকে, আর মৃত্যু থেকে মায়ের কাছে ফিরে যাওয়া। আহমাদ মোস্তফা কামাল চমৎকারভাবে বুঝিয়েছেন যে, মানুষের জীবনটা আসলে একটা দীর্ঘ পলায়নের গল্প। আর এই পলায়নের শেষ গন্তব্য কিন্তু কোনো আনন্দময় স্টেশন নয়।


কোনো গল্পকে খুব কাছ থেকে দেখলে, যেন গল্পের পাতাগুলো নরম হয়ে যায়। আমাদের চোখের সামনে যেন শুধু শব্দগুলো নয়, চরিত্রগুলোর নিঃশ্বাস পড়ার শব্দটাও শোনা যায়। আহমাদ মোস্তফা কামালের এই গল্পটা এমনই একটা অভিজ্ঞতা দেয়। শুধু ঘটনা বলার জন্য গল্পটা লেখা হয়নি, বরং জীবনের যে ক্ষয়-ক্ষতি, যে নিঃসঙ্গতা, সেটাকে যেন একটা শিল্পের রূপ দেওয়া হয়েছে।


গল্পের ভাষা নিয়ে প্রথমেই যে কথা মনে আসে, তা হলো এর অসাধারণ স্বচ্ছতা। কোনো আজগুবি শব্দ নেই, কোনো দেখানোর বাচনভঙ্গি নেই। ভাষা ঠিক এমন, যেমনটা আমরা রাতের বেলা নিজের খুব কাছের বন্ধুটাকে বা নিজের মনে মনে বলি। ‘ড্যাম কেয়ার’ বা ‘টুক করে’—এমন শব্দগুলো গল্পের ভেতর ঢুকে যেন একটা আসল, বাস্তব মানুষের ছায়া ফেলে। স্কুলের শার্টের পকেটে মনোগ্রাম থাকার যে ছোটখাটো বিষয়টা, লেখক সেটাকে এমন সাবলীলভাবে বলেছেন যে, মনে হচ্ছে আমরা নিজেরাই সেদিন টয়লেটে দাঁড়িয়ে শার্ট বদলাচ্ছিলাম। ভাষার এই সরলতা আসলে লেখকের বিশাল সাহসের পরিচয় দেয়। কারণ, জীবনের সবচেয়ে কঠিন ব্যথাগুলোকে সহজ করে বলাই সবচেয়ে কঠিন।


এবার যদি গল্পের শিল্পরূপের দিকে তাকাই, তখন দেখব এটা কোনো সাধারণ বাঁকানো গল্প নয়। গল্পটা যেন চারটা খণ্ড বা ছবির মতো। প্রথম খণ্ডে একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন, দ্বিতীয় খণ্ডে কৈশোরের অস্থিরতা, তৃতীয় খণ্ডে প্রেমের ফাঁদ আর চতুর্থ খণ্ডে মৃত্যুর অপেক্ষা। এই চারটা খণ্ডকে লেখক কোনো আঠালো বা জোর করে বেঁধে রাখেননি। এগুলো যেন নদীর ভাঙা কুয়াশার মতো একটার পর একটা ভেসে এসেছে। আর এই ভেসে আসাটাই তো আসল মজা। মানুষের জীবনটাও তো ঠিক এরকমই। আমরা কিন্তু আগে থেকে ঠিক করে রাখি না যে কালকে কোন স্মৃতিটা মনে পড়বে। একটা গান শুনলেই, বা জ্বরে কাঁথা গায়ে জড়িয়ে ধরলেই হঠাৎ করে অনেক আগের কিছু মনে পড়ে যায়। গল্পের এই ছড়ানো শিল্পরূপটা মানুষের মনের গতিপথের হুবহু ছায়া।


লেখকের সবচেয়ে বড় কৌশল বলে আমি মনে করি তার চরিত্রের সঙ্গে পাঠককে ঠকিয়ে দেওয়া। গল্পের শুরুতে আমরা দেখি একজন দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাসী তরুণ, যে পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে ইন্টারভিউ বোর্ডকে চ্যালেঞ্জ করে। আমরা মনে মনে তার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হই। কিন্তু পরের পরিচ্ছেদেই তাকে ভেঙে চুরচুর হতে দেখি। এই যে ধাক্কাটা, এটা পাঠককে বেশ কষ্ট দেয়। আরেকটা বড় কৌশল হলো লেখক নিজে কোনো মতামত দেননি। কোথাও বলেননি যে ওই ছেলেটা পালানো ভুল করেছে, বা প্রেমিকাকে ফেলে দেওয়া খারাপ কাজ ছিল। লেখক যেন শুধু একটা আয়না ধরে আছেন, বলছেন— 

তুমি দেখো, এই যে মানুষটা, এর জীবনটা দেখো!


আর আমরা নিজেরাই বিচার করে নিই।


এখন গল্পের একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এখানে অনেক কথাই বলা হয়নি, কিন্তু তারপরও মনে হয় চরিত্রগুলো যেন চিৎকার করে কথা বলছে। এই যে ‘সংলাপহীনতার ভেতরেও কথা বলা’—এটা একটা চমৎকার শিল্পের মতো। ইন্টারভিউ বোর্ডে সেই ভদ্রলোক যখন মৃদু হেসেছিলেন, তখন কি তিনি কিছু বলেছিলেন? না। কিন্তু সেই হাসিটা যেন বলে দিচ্ছিল—

তোমার এই অহংকার, এই বেপরোয়াপনা, একদিন জীবন ঠিক ভাঙবে।


আবার মায়ের কথা ধরা যাক। মা যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, 

সত্যিই হারিয়েছিলি, না পালিয়েছিলি?


—এই একটা লাইনের পেছনে কত শত কথা লুকিয়ে ছিল! মায়ের সেই কান্নার ফোঁয়ারা যেন বলছিল—

আমি জানি তুই পালিয়েছিস, তবুও তোকে বলতে দে না, কারণ তোর সেই অপমানে আমার বুক ফেটে যাবে।


প্রেমিকার ক্ষেত্রেও তো তাই। সে বলেছিল, ‘আচ্ছা, দুদিন পরেই জানিয়ো।’ এই মুচকি হাসির পেছনে যেন তার একটা দুর্বলতা বা নারীসুলভ একটা অপেক্ষা কাজ করছিল, যেটা আমরা পড়ে বুঝতে পারছি। আর শেষের দিকে স্ত্রী যখন বাচ্চাদের নিয়ে নাতি-নাতনির জন্য আবদার করে, আর ছেলেমেয়েরা লজ্জা পেয়ে বলে ‘ধুর মা’ —এই ছোট্ট একটা দৃশ্যের মধ্যে যেন পুরো একটা সুখী পরিবারের ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই যে কথা না বলেও কথা বোঝানোর ক্ষমতা, এটাই তো লেখকের আসল শিল্প।


আর এসবের ভেতর দিয়ে যে জীবনের পরম বাস্তবতাটা বেরিয়ে এসেছে, সেটা খুব নিষ্ঠুর। সেই বাস্তবতাটা হলো— পালানোর কোনো শেষ নেই। আমরা ভাবি, এক জায়গা থেকে পালিয়ে গেলে হয়তো শান্তি পাব। কিন্তু জীবন তো একটা ফাঁদের মতো। বাড়ি থেকে পালিয়ে ট্রেনে উঠলেও দেখা যায় টিকিট-চেকারের ভয়, প্রেম থেকে পালিয়ে গেলেও দেখা যায় সমাজের বাধাধরা নিয়মে আটকে পড়তে হয়। আর শেষমেশ যখন শরীরটাই আর সঙ্গ দেয় না, তখন বুঝতে পারি যে জীবন থেকে পালানোর একমাত্র উপায় হলো মৃত্যু। কিন্তু সেই মৃত্যুটাও যে কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে! ঠিক করে বলে দেওয়া নয় যে কালকে তুমি মারা যাবে, বরং একটু একটু করে ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাওয়ার যে অপেক্ষা—এটা বোধহয় সবচেয়ে খারাপ।


গল্পের শেষে যেন আর কোনো কথাই বাকি থাকে না। মানুষটা জ্বরে কাঁথা গায়ে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে, মনে করছে মায়ের কবরের পাশের বেলিফুলগুলো হয়তো তাকে কিছুটা সুগন্ধ দেবে। এই যে একা একা জ্বরে কাঁথা গায়ে জড়িয়ে থাকাটা, এটাই তো জীবনের শেষ বাস্তবতা। মানুষ সবাইকে বলতে পারে না যে তার কেমন লাগছে। সবাই ভাবে, ও তো এজিএম, ওর সুন্দর সংসার, ওর তো কোনো অভাব নেই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে মানুষটা যে কতটা ভাঙা, সেটা সে একা বয়ে বেড়ায়।


আহমাদ মোস্তফা কামাল যেন এই গল্প দিয়ে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন— মানুষের জীবনটা আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী, আর মানুষের ভেতরের এই পলায়নের বাসনাটা কতটা নিরর্থক। আর এই বাস্তবতাকে যে কত সুন্দর করে, নিঃশব্দে, কোনো রচনাতাত্ত্বিক জটিলতা ছাড়াই উপস্থাপন করা যায়—সেটাই এই গল্পের সবচেয়ে বড় শিল্পকৌশল বলে মনে হয় আমার।


..................
প্রচ্ছদ: ChatGPT

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ