বইটি সংগ্রহের আগে পড়া ছিলো কেবল 'মেটামরফোসিস', 'রায়', 'আইনের দরজায়' বা আরো দু'চারটা ছোট গল্প যা এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না।
এবার একটু আয়োজন করে কাফকা পড়বো ব'লেই বইটি সংগ্রহ করা। শুরুতে অনুবাদক বলেছেন তাঁর কুড়ি বছরের সাধনার কথা যার ফলাফল ছবির বইটি। এটি প্রকাশিত হওয়ার পরেই দ্বিতীয় খণ্ডের প্রস্তুতির পরিকল্পনা ছিলো অনুবাদকের। এই পর্বে আমরা জানতে পারি কাফকার নিজস্ব (অদ্ভুত) কিছু বিরামচিহ্নরীতি ছিলো। মূল জার্মান ভাষায় কাফকা যে বিরামচিহ্নরীতি ও প্যারাগ্রাফিং অনুসরণ করেছিলেন অনুবাদের সময় সেটাই মানা হয়েছে।
এই অংশটুকুতে অনুবাদক এটি রচনা ও প্রকাশকালে যাঁদের কাছ থেকে নানাভাবে উৎসাহ ও সহযোগিতা পেয়েছেন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
'ভুমিকার আগে' শিরোনামে একটা পর্বে দেয়া হয়েছে কাফকা ও কাফকার সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে একটা প্রাক ধারণা। কাফকার নবীন পাঠকদের জন্য এটি বেশ কার্যকরী হতে পারে। এখানে ত্রিশটির মতো রেফারেন্স ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিকা যোগ হয়েছে। যেমন মার্কেজের সাক্ষাৎকারের অংশ বিশেষ ও কাফকার বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে লেখা সেই বিখ্যাত চিঠি যেখানে তিনি তাঁর সব লেখা পুড়িয়ে ফেলতে বলেছিলেন।
বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকাটা লেখা হয়েছে তিনটি পর্বে; 'প্রস্তাবনা', 'জীবন' ও 'ফরাসিরা কেন কাফকা পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিল?' শিরোনামে।
কাফকার জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এসেছে কাফকার পরিবার, শিক্ষা, কর্মজীবনের সাথে সাথে তাঁর ব্যক্তিজীবন ও সাহিত্যে যৌন অনুষঙ্গ। কাফকার ব্যক্তিত্ব, তাঁর রাজনীতি ও রাজনৈতিক ভূমিকা না জানলে কাফকার জীবন সম্পর্কে জানাটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, আর জানলে সহজ হতে পারে কাফকার সাহিত্যের সাথে পাঠকের বোঝাপড়া। অতএব এসেছে এসব বিষয়। ইহুদিত্ব ও জায়োনিজমের সাথে কাফকার সম্পর্ক জানাটা কাফকাকে জানার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। কাফকার পিতা হারমান কাফকা শুধু কাফকার জীবনকে নয় প্রভাবিত করেছিলেন কাফকার সাহিত্যকেও তাই অবধারিতভাবে তিনিও এসেছেন আলোচনায়। কান টানলে যেমন মাথা আসে তেমনি পিতার সাথে সাথে এসেছেন মাতাও। কোমলমতি মা ইউলি কাফকা যদিও ছিলেন কেবল পিতার ছায়ার মতো। কাফকার মৃত্যু কাফকার সাহিত্যের মতোই ক্লাসিক। তা দিয়েই শেষ হলো ভূমিকাতে লেখা কাফকার 'জীবন' পর্বটি।
কাফকার সাহিত্যকে ভয় পেয়েছিলো ফরাসি কম্যুনিস্টরা অন্যদিকে কাফকা বলতেন তিনি সাহিত্য রচনা করেন না বরং তিনিই সাহিত্য। তাই তিনি যা কিছু লিখেছেন তা-ই হয়েছে অমূল্য সাহিত্য। জীবিত কাফকা ছিলেন অসমাধানকৃত ধাঁধা, মৃত্যুর পরও তিনি তা। কাফকার রচনাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, হয়েছে নানান ধর্মীয় ব্যাখ্যা। কখনও সেটা ইহুদি দৃষ্টিকোণ থেকে, কখনও খ্রীষ্টিয়। নানা ব্যাখ্যা দাঁড় করালেও এটি কখনওই স্পষ্ট হয়নি যে তিনি ধর্মের স্তুতি করলেন না কি সমালোচনা। আর তাই খোদ কাফকাই হয়ে উঠলেন এক অপার রহস্য, এক গোলকধাঁধা। এ পর্যায়ে আমার মনে হলো কাফকা হয়তো কেবল কাফকাই, মানুষই কেবল জল ঘোলা করেছে। ভূমিকার শেষে অনুবাদক কাফকাকে নিয়ে রচিত তেরো হাজার বই থেকে কেবল গুটিকয়েক বাছাইকৃত বইয়ের তালিকা দিয়েছেন। কাফকার ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইন হতে পারে।
ভূমিকার পরেই সংযোজিত হয়েছে কাফকাকে নিয়ে লেখা হোরহে লুইস বোরহেসের একটি প্রবন্ধ। যেখানে তিনি কাফকা আদতেই তাঁর সব লেখা পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন কি না সে ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন। তার মতের পক্ষে যুক্তিও পেশ করেন।
কাফকার সাহিত্য বোঝার জন্য ঠিক কতখানি বুদ্ধ্যঙ্ক প্রয়োজন হয় তা আমি নিশ্চিত নই। বইতে অন্তর্ভুক্ত কাফকা সাহিত্যে প্রবেশের পথে প্রথমেই পড়তে হলো দু'টি কথোপকথন। যার একটি এক প্রার্থনাকারীর সাথে অপরটি এক মাতালের সাথে। এই কথপোকথন হতে খুব যে কিছু পাঠোদ্ধার করতে পেরেছি তা নয়। তবে মনে হলো কথোপকথনের প্রথম পুরুষ যদি স্বয়ং কাফকা হয়ে থাকেন বা ধরুন সেই কাফকা হলেন আমাদেরই মতো এক স্বতন্ত্র সত্তার প্রতিনিধি তবে প্রার্থনাকারী হতে পারে সেই স্বয়ংয়ের ব্যর্থ সত্তা। যে ব্যর্থতা নিয়তই দৃষ্টিগোচরে আসতে সচেষ্ট থাকে যাকে সহ্য করা দুরূহ। 'সংশয়' সম্ভবত কাফকা সাহিত্যের অন্যতম অনুষঙ্গ তাই যেকোনো সহজ ঘটনার বিকল্প বাস্তবতা তাড়া করে বেড়ায় অবচেতনে। আর তাই মনে হয় যা কিছু ঘটছে চোখের সম্মুখে আসলে তা ঘটছে না বা ঘটছে অন্যকিছু।
পরের কথোপকথনে দ্বিতীয় সত্তা আসে মাতালরূপে। এ বেশ সক্রিয়, আলাপচারিতায় তাদের ঘিরে থাকে এক অস্বাভাবিক গন্ধ। চারপাশের আলো ঝলমলে মানুষগুলোই সেই আলাপের বিষয়। তারা আছে অথবা নেই। অথবা তাদের যেভাবে দেখা যায় তারা ঠিক সেভাবে নেই আছে অন্য কোনোভাবে। আমি জানি না এই কথোপকথন দ্বারা কাফকা সমান্তরাল বাস্তবতার দিকটিই তুলে ধরতে চাইলেন কি না।
(পুনশ্চ: বইয়ের শেষাংশে বা পরিশিষ্ট শিরোনামে আছে বইয়ে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলো সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য, পাঠ- পর্যালোচনা ও টিকা। তাতে দেখা যায় 'দুটি কথোপকথন' আদতে 'একটি সংগ্রামের বিবরণ' শিরোনামে রচিত একটি নভেলার অংশ বিশেষ। নভেলাটি গল্প সমগ্রের দ্বিতীয় খণ্ডে প্রকাশিত হবে। টিকায় স্যার স্যালকম প্যাসলির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে 'দুটি কথোপকথন ' কাফকার খুব অল্প বয়সে লেখা এবং বেশ অপরিপক্ক লেখা।)
'ব্রেস্ সায় উড়োজাহাজ' মূলত উড়োজাহাজ চালানোর এক মহা প্রতিযোগিতার বর্ণনা। ১৯০৯ সালে কাফকা গ্রীষ্মের ছুটিতে বন্ধু ম্যাক্স ব্রড ও তার ভাই ওটো ব্রডের সাথে ইটালি ভ্রমণে গেলে সেখানে তা প্রত্যক্ষ করেন। এই প্রতিযোগিতার একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব হলো এই প্রতিযোগিতার মাত্র এক বছর আগে রাইট ভাতৃদ্বয় বিমান জনসমক্ষে আনেন এবং এই প্রতিযোগিতার মাত্র দু'মাস আগে ফরাসি বৈমানিক লুই ব্লেরিও প্রথমবার বিমান নিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়েছেন। এটি একারণেও গুরুত্বপূর্ণ যে এই প্রতিযোগিতার বর্ণনা লিখতে গিয়ে কাফকা তাঁর একটি সাময়িক রাইটার্স ব্লক কাটিয়ে উঠেছেন।
'প্রথম দীর্ঘ রেল ভ্রমণ' হলো 'রিচার্ড ও স্যামুয়েল' নামক একটি অসম্পূর্ণ ভ্রমণ উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় যা ১৯১২ সালের একটি সাময়িকির মে সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। কাফকা ও ম্যাক্স ব্রডের পরিকল্পনা ছিলো ইউরোপে তাঁদের একটা দীর্ঘ রেল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জনের সময় তাঁরা একটা যৌথ উপন্যাস লিখবেন। স্যামুয়েল ও রিচার্ড হলো সেই উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্র ও বন্ধু যাঁরা একত্রে রেলভ্রমণ করছেন। তার অর্থ এই নয় যে রিচার্ড কিংবা স্যামুয়েল সুনির্দিষ্ট ভাবে কাফকা কিংবা ম্যাক্স ব্রডকে প্রতিনিধিত্ব করে গেছে। উপন্যাসের খণ্ডিত অংশ হলেও লেখাটি বেশ উপভোগ্য। এখানে রিচার্ড বলছে( লিখেছে) ,
রেলগাড়ির কামরার মতো অন্য আর কোনো জায়গা বোধহয় নেই যেখানে জীবনের একদম উল্টো দুটো দিক এভাবে এত কাছাকাছি, সরাসরি ও বিস্ময়কর নৈকট্যের মধ্যে চলে আসে; আর যাত্রীরা একে অন্যকে এরকম অনবরত দেখতে থাকার কারণে দেখা যায় সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে একজন আরেকজনকে প্রভাবিত করে বসছে।
জীবন যেখানে নিজেই এক দীর্ঘতম যাত্রা সেখানে রেল কিংবা সড়ক, জল কিংবা আকাশ পথের দীর্ঘ যাত্রার কোনো গুরুত্ব থাকবে না তা হয় না। উল্লিখিত যাত্রার শুরুতে ডোরা লিপপার্ট নামের এক মেয়ের সাথে তাদের পরিচয় হয় মাঝপথে যার যাত্রা ভিন্ন পথ ধরে কিন্তু রিচার্ডের স্মৃতিতে রয়ে যায় ডোরা। নারী ও পুরুষ যেখানে একে অপরের পরিপূরক হয় সেখানে একজন পুরুষের কাছে তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুটিও বেকার, এই বোধ দিয়ে শেষ হয় অসম্পূর্ণ উপন্যাসের এই সুন্দর পর্বটি।
'বিরাট শোরগোল' একটা ছোট অনুচ্ছেদে বা অল্পকথায় লেখা একটি ছোটগল্প। পরিশিষ্টে অনুবাদক একে অভিযোগপত্র বলছেন কারণ এতে কাফকা কোনো রাখঢাক না রেখেই নিজ বাড়ির বিরক্তিকর পরিবেশ উন্মোচিত করেছেন। কিন্তু আমার মনে হলো অবাঞ্চিত হট্টগোলের প্রতি মানুষের চিরায়ত বিরক্তিই কাফকা অল্প কথায় দারুণ কার্যকরীভাবে ফুটিয়েছেন। আমার এ-ও মনে হলো কাফকার নির্ঘাত মাইগ্রেন ছিলো। আর কাফকার ভাষা!
.. আজই প্রথম না, আমি আগেও ভেবেছি আমার ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক করে, সাপের মতো বুকে ভর দিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে, পেটের উপর উপুড় আর হেঁটমুখ হয়ে আমার বোন ও তার কাজের মেয়েটার কাছে ভিক্ষা চাইবো যে তোমরা চুপ করো।
আমি কাফকার ভাষার স্বাদ পেতে শুরু করলাম। কিন্তু তার বোন বেচারা ভাল্লি! আমার নিজের ভাইয়ের কথা মনে পড়ে যায়। শৈশবে যখন গলা ছেড়ে গাইবার চেষ্টা করতাম, ছোট ভাইয়া তখন কামরা থেকে বেরিয়ে হাওয়াকে শুনিয়ে বলতো, 'বেসুরো গান কর্ণে পীড়াদায়ক।' এই না বলে ভালো মানুষটির মতো সুরুৎ করে নিজের কামরায় ঢুকে যেতো।
ধেয়ান বা ধ্যান ( মেডিটেশন)
এটি কাফকার প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। গল্প বলা হলেও এগুলো মূলত অণুগল্প, কোনোটিকে আবার মুক্তগদ্য বলা চলে। মোট আঠারোটি গল্প/ অণুগল্প বা মুক্তগদ্য দিয়ে রচিত হয়েছে গ্রন্থটি। আমার ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকায় আছে বারোটি। পরিশিষ্টে অনুবাদক গল্পগুলোকে বিশ্লেষণ করার যে প্রয়াস নিয়েছেন তা আকারে ও ওজনে মূল রচনাকে ছাড়িয়ে গেলে মনে হলো এসব লেখা গল্পসমগ্রটিকে প্রয়োজনের চাইতে বেশি ভারী করে তুলেছে। তাছাড়া এইসব কথন কাফকা পাঠে ও অনুধাবনে পাঠকের স্বাধীন চিন্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
'রায়', কাফকার বহুল পঠিত ও আলোচিত গল্প ও আমার ভাবনা:
অন্য অনেকের মতো এই বহুল পঠিত গল্পটি আমারও পূর্ব পঠিত। 'রায়' গল্পটি কাফকারও প্রিয় গল্প কারণ এটি তাঁকে লেখক হিসেবে আত্মবিশ্বাসী করেছিলো।
গল্পে মূলচরিত্র চারটি গেয়র্গ, তার পিতা, বাগদত্তা ফ্রিডা ও রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে বসবাসরত বন্ধু। ( প্রসঙ্গত বলে রাখি গেয়র্গ নামে কাফকার একজন ভাই ছিলো যে পনেরো মাস বয়সে মারা যায়)।
গেয়র্গের পিতার মতো পাঠক হিসেবে আমারও মনে হয়েছে সেন্ট পিটার্সবার্গে তার কোনো বন্ধুর অস্তিত্ব নেই বরং ওটা গেয়র্গেরই অল্টাল ইগো। বিয়েশাদি করে সংসারী হওয়ার ইচ্ছে ( খোদ কাফকার মতোই) পোষণ করা গেয়র্গ তার বাগদানের কথা বন্ধুর ( অল্টার ইগোর) কাছে গোপন রাখতে চান কারণ বিয়ে করার বিষয়ে তার নিজেরও সংশয় আছে। অথচ অযুহাত হিসেবে কারণ দর্শালেন যে বন্ধু বিয়ের খবর শুনলে মনে কষ্ট পাবে যার কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। আদতে তাঁর আশঙ্কা ছিলো বিয়েতে বাধা আসবে তাঁর নিজেরই আরেক সত্তার কাছ থেকে যার কাছে সে বাগদানের খবরটি গোপন রাখতে চায়। আমরা দেখতে পাই ব্যক্তি জীবনেও কাফকা একাধিকবার বাগদান সম্পন্ন করলেও শেষ পর্যন্ত বিয়ে করেন নি।
অন্যদিকে বন্ধুকে বিয়ের খবর দিতে অনীহা প্রকাশ করায় বাগদত্তা ফ্রিডা স্পষ্টতঃই জানায়,
কিন্তু গেয়র্গ, তোমার যদি এই ধরনের বন্ধুবান্ধব থাকে, তাহলে আমি বলবো তোমার কখনোই বিয়ের চিন্তা মাথায় আনা ঠিক হয়নি।
এতে অল্টার ইগো হিসেবে বন্ধুর ইতি ঘটে। আমরা দেখি গেয়র্গ সিদ্ধান্ত পাল্টে বন্ধুকে বিয়ের খবর জানিয়ে চিঠি লেখে। কিন্তু বন্ধুর অনস্তিত্ব আবারও প্রমাণিত হয় যখন চিঠিটি পোস্ট না করে গেয়র্গ এ বিষয়ে কথা বলতে পিতার কাছে যায়। পিতাকে নিয়েও তার মনে কাজ করছে অপরাধবোধ। দিনের পর দিন বৃদ্ধ পিতাকে অবহেলা করা, তাঁর যত্ন আত্তি না করা এমন কি সময়ও না দেয়ার ফলে গেয়র্গের মনে জমে ওঠে সীমাহীন অপরাধবোধ। চিঠির ( বিয়ের স্বীকারোক্তি) সুবাদে বন্ধুরূপী অল্টার ইগো দূর হলেও তা ফিরে আসে পিতার রূপ ধরে। দৃশ্যত একদা প্রতাপশালী পিতা তাঁকে পানি তে ডুবে মরতে বললেও এই মৃত্যুদণ্ডের রায়টি মূলত আসে গেয়র্গের অল্টার ইগোর কাছ থেকে। বিয়ে করার দুর্নিবার ইচ্ছে সত্ত্বেও এ নিয়ে গভীর সংশয় ও অপরাধবোধ গেয়র্গকে বাঁচার অনুমোদন দেয় নি।
একটি গল্পকে নানান পাঠক নানা ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। ওতে মিল যেমন থাকতে পারে তেমনি অমিলও থাকতে পারে। যেমন পরিশিষ্টে লেখা অনুবাদকের ভাবনার সাথে মেলে না আমার ভাবনা।
'দ্য স্টোকার' কাফকার উপন্যাস 'আমেরিকা'/ 'নিঁখোজ মানুষ' উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়। একটি স্বতন্ত্র গল্প হিসেবেও এটি চমৎকার। কার্ল নামের এক কিশোর যে চাইল্ড এবিউজিংয়ের শিকার হয়ে উল্টো দেশ থেকে, পরিবার হতে নির্বাসিত হয়েছে, তার সাথে একজন স্টোকারের ( জাহাজের বয়লারে কাজ করা শ্রমিক) সম্পর্কের রসায়ন এই গল্পের প্রাণ। স্টোকারের সাথে কার্লের সম্পর্ক খুব অল্প সময়ের কিন্তু তার আবেগীয় প্রভাব সুগভীর। পুরো গল্পটি যেন ছোট ছোট তরঙ্গকে একের পর এক সাজিয়ে এক সুনিপুণ সাগর সৃষ্টি। কাফকার গল্প বলার চিরায়ত ভঙ্গি থেকে সরে গিয়ে এই গল্প আলিঙ্গন করেছে চার্লস ডিকেন্সের সাহিত্য ধারা। অর্থাৎ এই গল্প লেখার ভঙ্গিতে চার্লস ডিকেন্সের সাহিত্যের প্রভাব রয়েছে এমনটা দাবী অনুবাদকের।
কাফকার সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে গেলে সবার আগে যা স্মরণে আসে তা হলো 'রূপান্তর' বা 'মেটামরফোসিস'। অনুবাদক জানিয়েছেন এই গল্পটিকে কাফকা নভেলা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। গল্প কিংবা নভেলা যাই হোক এর শিল্পীত সৌন্দর্য এত ব্যাপক যে তা ঠিকঠাকভাবে বর্ণন করা বেশ চ্যালঞ্জিং। ফ্যান্টাসি আর অন্তর্লীন বেদনার হাত ধরাধরি করে চলা এমন সাহিত্যকর্ম বিরল। কাফকা সমগ্রের লেখক মাসরুর আরেফিনের লেখা থেকেই জানতে পারি সাহিত্যে জাদু বাস্তবতার দানব (আদরনীয় ব'লেই বলছি) গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের জাদুবাস্তবতাময় লেখার অনুপ্রেরণা ছিলো প্রিয় কাফকার মেটামরফোসিস (রূপান্তর)। এ ব্যাপারে স্বয়ং মার্কেজ কী বলেছেন আসুন তা আপনাদের সাথে শেয়ার করি,
আমি যখন কলেজে ভর্তি হই, সাহিত্যের সাধারণ পড়াশোনা আমার ভালোরকমই ছিলো, আমাদের বন্ধুদের চেয়ে গড়পরতা অনেক বেশি। বোগোতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার নতুন নতুন বন্ধু তৈরি হতে থাকে, যারা আমাকে সমকালীন লেখকদের সঙ্গে পরিচিত করানো শুরু করে। একরাতে এক বন্ধু আমাকে ফ্রানৎস কাফকার ছোটগল্পের একটি বই ধার দেয়। আমি যে মেসে থাকতাম, সেখানে যাই, সে রাতেই কাফকার 'রূপান্তর' গল্পটি পড়া শুরু করি। প্রথম লাইনটা পড়া মাত্র আমার প্রায় বিছানা থেকে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। কী যে অবাক হই আমি! প্রথম লাইনটা ছিলো :
' এক ভোরে গ্রেগর সামসা অসুখি সব স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে দেখে সে তার বিছানায় প্রকাণ্ড এক পোকায় রূপান্তরিত হয়ে পড়ে আছে..। '
আমি লাইনটা নিজেকে পড়ে শোনাতে লাগলাম, ভাবলাম, এভাবে যে কেউ লিখতে পারে তা-ই তো জানা ছিলো না; যদি জানতাম, তাহলে আমি নিশ্চয় আরো কত আগেই লেখালেখি শুরু করতাম। তারপরই, দেরি না করেই, আমি ছোট গল্প লেখা শুরু করলাম।
- দি প্যারিস রিভিউ, ৮২তম সংখ্যা ১৯৮১।
ফ্রানৎস কাফকা গল্প সমগ্র ( পৃ: ৩২)
এরপর এই অধমের আর কী বলার থাকতে পারে! বইটির পাঠ পর্যালোচনা অংশে অনুবাদক মাসরুর আরেফিন তাঁর নিজের একটি চমৎকার আলোচনা যোগ করেছেন ( সব গল্প নিয়েই করেছেন)। সেটি পড়ার পরও মনে হয়েছে আরো কিছু হয়তো বলার ছিলো।
'দণ্ড উপনিবেশে' গল্পটি পড়ার সময় আক্ষরিক অর্থে অসুস্থবোধ করেছি। এক পর্যায় কাফকাকে সাইকোপ্যাথ মনে হয়েছে। কিন্তু এ-ও তো জানি, সাহিত্য করতে গেলে লেখককে ফেরেশতা থেকে ইবলিস সবই হতে হয় কারণ পৃথিবী কিংবা জীবন কোনোটাই আমরা ঠিক যেমন প্রত্যাশা করি তেমন নয়। কাফকা নিজেই বলেছেন, "যে সময়টিতে বাস করছি সেটিইতো যন্ত্রণাদায়ক।" গল্পে অফিসারের বর্ণিত যন্ত্রণাদায়ক যন্ত্রটি ব্যক্তিগত, সামাজিক বা জাতিগত যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি হতে পারে। সময়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে দেখা যায় আজকের সভ্যতা পর্যন্ত আসার জন্য মানুষকে কালে কালে কত কত বিভৎস যন্ত্রণার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকগুলো কতভাবেই না তাদের বর্বরতার নমুনা দেখিয়ে গেছে।
গল্পের শেষটা স্বস্তি দিলেও আলোকপ্রাপ্তির কটাক্ষ করে তিনি হয়তো কোনো বিশ্বাসকেই আঘাত করতে চেয়েছেন। পরিশিষ্টে অনুবাদকের দেয়া পাঠ পর্যালোচনা পড়ে পাঠকের নিজের ভাবনার সাথে মিলিয়ে নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
'এক গ্রাম্য ডাক্তার' মোট চৌদ্দটি গল্পের সংকলন। প্রথম গল্প 'নতুন উকিল' শিরোনামে প্যারাবলটি শুরুতেই বাজিমাৎ করে দেয়, আমরা বুঝতে পারি এই গল্প সংকলনটি কেন খোদ কাফকার খুব পছন্দের ছিলো। এ আমাদের দেখায় ঘোড়া যদি বিদ্বান মানবে রূপান্তরিত হতে পারে তবে আমাদেরওতো সুযোগ আছে নিজের চাইতে ভালো মানুষটি হয়ে ওঠার। এ গল্পটি নিয়ে অনুবাদকের পাঠ পর্যালোচনাটিও দারুণ উপভাগ্য।
নামগল্প 'এক গ্রাম্য ডাক্তার', গল্পটির সারবস্তু লুকিয়ে আছে এর অন্যতম চরিত্র, গৃহপরিচারিকা রোজার উক্তির মাঝে। রোজা বলেছিলো, -
নিজের ঘরের মধ্যে কী লুকানো আছে তা নিজেরই কখনো জানার উপায় নেই।
অনুবাদকের পাঠ পর্যালোচনা পড়া না হলে গল্পটি হয়তো সম্পূর্ণ বোধগম্য হতো না। অন্যদিকে দেখতে পাই, পরবর্তী গল্পে ('উপরে গ্যালারিতে') শেষাংশের ব্যাখ্যা অনুবাদকের কাছেও নেই।
'পুরনো পান্ডুলিপির একটি পাতা' চীনের পটভূমিতে একটি চমৎকার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সংকটের রূপকধর্মী গল্প। 'আইনের দরজায়' কাফকার বহুল পঠিত ও জনপ্রিয় প্যারাবল। এটি 'বিচার' উপন্যাসের অংশ হলেও স্বতন্ত্র গল্প হিসেবে এর তাৎপর্য অনেক বেশি গুরুত্ববাহী। 'শেয়াল ও আরব' গল্পে ফুটে ওঠে আরবদের সাথে ইহুদিদের চিরকালীন দ্বন্দ্ব ও আরবদের স্বরূপ। সেইসাথে রূপকার শেয়ালরূপী ইহুদি স্বরূপও তুলে ধরেন। 'খনি প্রদর্শন' গল্পটির মাধ্যমে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের মানুষের পারস্পরিক আচরণ প্রস্ফুটিত হয়েছে। 'পাশের গ্রাম' খুবই সংক্ষিপ্ত ও সাদামাটা একটি গল্প। 'সম্রাটের কাছে বার্তা' অপূর্ব সুন্দর একটি গল্প যেখানে শাসক ও শাসিতের মাঝে অলঙ্ঘনীয় এক দূরত্ব উদ্ভাসিত হয়েছে।
'পরিবারের প্রধানের জন্য একটি সমস্যা' গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র/বস্তু হলো 'ওড্রাডেক'।'ওড্রাডেক ' ( হয়তো রবি ঠাকুরের 'হিংটিংছট' য়ের মত) শব্দটির মানে কাফকা/ গল্পের ন্যারেটর বলতে পারেন নি। গল্পে হয়তো জীবনের নানা বাঁকে উদ্ভুত সমস্যা/ বিশেষ পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়েছে যার সমাধান/ মোকাবেলা উত্তর পুরুষের জন্য করে যেতে পারে না কোনো পূর্বপুরুষ। এরকমই কোনো পরিস্থিতিতে পুরুষানুক্রমে মানুষের জীবনে উপস্থিত হয় মৃত্যু যাকে এড়ানো যায় না।
'এগারো ছেলে' গল্পটি আমার দারুণ লেগেছে। বিবিধ মানব চরিত্রকে বর্ণিত হতে দেখি এ গল্পে। বাংলায় একটি ফ্রেজ আছে ' বারো রকমের মানুষ', কাফকা সম্ভবত এই বিবিধ মানবচরিত্রকে সামনে আনতে চেয়েছেন। বারোতম মানুষটি হয়তো গল্পের উত্তম পুরুষটি। মাসরুর আরেফিনের পাঠ পর্যালোচনা পড়ে নতুন আঙ্গিকের কথা জানলাম। বলা হচ্ছে 'এগারো ছেলে' হলো কাফকারই এগারটি গল্পের রূপছবি। ব্যাখ্যাও দেয়া হলো যা মেনে নেয়া কষ্টকর। মনে হলো এই ব্যাখ্যা গল্পটির সৌন্দর্যকে হত্যা করেছে।
'ভাইয়ের হত্যা' গল্পে একটি খুনের দৃশ্য বর্ণিত হলো। নেপথ্যের গল্পটি পাঠকের কল্পনা শক্তির কাছে ছেড়ে দেয়া হলো। 'একটি স্বপ্ন', এটি মৃত্যু থেকে কবর পর্যন্ত যাত্রার গল্প। যেহেতু স্বপ্ন দেখা দৃশ্য তাই হয়তো শেষকৃত্য নেই এবং এই যাত্রা প্রথাগত শবযাত্রার মত নয়।
'অ্যাকাডেমির জন্য প্রতিবেদন' এক গ্রাম্য ডাক্তার বইটির শেষ গল্প। এক শিম্পাঞ্জির মুখ থেকে শোনা যায় কীভাবে সে বন্দী হয় আর মানুষকে অনুকরণ করে তার সভ্য ((!)) হয়ে ওঠার বয়ান। অন্যদিকে তাকে প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে এক মানবের শিম্পাঞ্জিকে অনুকরণ করার গল্প। শেষমেশ যার ঠাঁই হয় মানসিক হাসপাতালে।
'কয়লা বালতির সওয়ার' গল্পটি উক্ত বইতে ( এক গ্রাম্য ডাক্তার) প্রথমে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে কাফকা কোনো অজ্ঞাত কারণে তা বাদ দেন। গল্পে কয়লার অভাবে শীতার্ত এক লোক কয়লা বনিকের দ্বারস্থ হয় কিন্তু কয়লা কেনার পয়সা তার থাকে না এবং উক্ত বণিকের স্ত্রীর নির্দয়তার শিকার হয়। গল্পে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কিন্তু গল্পটিতো লিখেছেন কাফকা, তাঁর সিগনেচার বা অভিনবত্ব থাকবে না সেটা হতে পারে না। তাই গল্পের সেই চরিত্র কয়লা আনতে বের হয় কয়লার বালতিতেই চড়ে বসে। বালতির হাতলটি তখন হয়ে ওঠে ঘোড়ার লাগাম, আর চলতে শুরু করে বালতি। এই যে কাফকার গল্পে কয়লার বালতি হয়ে ওঠে ছুটন্ত ঘোড়া, সেই ঘোড়াকে কি আমরা ভেবে নেবো সওয়ারির কয়লা পাওয়ার অদম্য ইচ্ছে হিসেবে!
কাফকা গল্পসমগ্রে অন্তর্ভূক্ত শেষ বইটি হলো 'এক অনশন-শিল্পী'। নাম গল্পটি ছাড়াও আছে আরো তিনটি গল্প। প্রথম গল্পটি হলো 'প্রথম দুঃখ'। শিল্পের উৎকর্ষতা প্রশ্নে একজন শিল্পী শেষ পর্যন্ত এক অতৃপ্ত আত্মা হয়েই থাকেন। একজন ট্র্যাপিজ- শিল্পীর কান্নার মধ্য দিয়ে শিল্পের জন্য শিল্পীর এই অন্তহীন বেদনার কথা বলা হয়েছে। গল্পটি সুন্দর! কাফকা যদিও একে বলেছেন 'বিরক্তিকর!'। কাফকাকে যাঁরা খানিক বুঝে উঠেছেন তাঁরা ঠিকই ধরে ফেলবেন এক এক উক্তির গভীরে শায়িত ভিন্ন ব্যঞ্জনাটি। 'এক ছোটখাটো মহিলা' গল্পটি বলা হয় উত্তম পুরুষে। তারই বয়ানে পাঠক জানতে পারে ঐ ছোটখাটো মহিলা কোনো কারণে বক্তার উপর মহাবিরক্ত কিন্তু কারণটি আর উদঘাটিত হয় না। কিন্তু গল্পের সেই উত্তম পুরুষ নানান বিকল্প চিন্তা করতে থাকে যেমন সে ভাবে এমন কিছু করার কথা যাতে মহিলার বিরক্তি প্রশমিত হয় কিন্তু পাঠক এ-ও জানতে পারে মহিলা কোথাও কোনো অভিযোগ করেনি বক্তা যদিও এর জন্য মহিলার অহংকে দায়ী করে। অন্যদিকে সে ( বক্তা) নিজের অর্জিত সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা যেমন করে তেমনি সে অজানা (পাঠকের) কিছু ধামাচাপা দেয়ার কথাও ভাবে। পুরো গল্পটিতে আমরা দেখতে পাই যা কিছু হয় বা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয় তার সবই কেবল সেই উত্তম পুরুষের মনোজগতেই ঘটে থাকে। নাম গল্প 'এক অনশন শিল্পী', গল্পে তখনকার দিনে প্রচলিত সার্কাসের মতোই মানুষের চিত্ত বিনোদনের এক উপাদান অনশন ও তার শিল্পীর অবস্থা বর্ণিত হয়। অদ্ভুত এই বিনোদনের মূল নায়ক অনশন শিল্পীর ভাবনা, তার মর্যাদাবোধ ও অদ্ভুত এই খেলাকে শিল্পের উৎকর্ষতায় নিয়ে যাওয়ার বাসনা এসবই এই গল্পের উপাদান।
'গায়িকা জোসেফিন অথবা ইঁদুর-জাতি' একটি রূপকধর্মী গল্প যেখানে গায়িকা জোসেফিনের আড়ে এক অবিসংবাদিত নেতা ও তাঁর নেতৃত্ব এবং ইঁদুর-জাতির আড়ে এক অক্রিয়াশীল নিষ্প্রভ জাতিকে চিত্রায়িত করা হয়েছে। গল্পে জাতি, জাতীয়তাবোধ, নেতা - নেতৃত্ব, জানগণ ও তাদের নিষ্ক্রিয়তা সেই সাথে নেতার সাথে জনগনের সম্পর্ক উঠে এসেছে। আমরা দেখলাম অতি মূল্যায়িত হওয়ার কারণে নেতা ( গায়িকা জোসেফিন) ভুলে যান যে জাতির ইতিহাসে একজন নেতা কেবলই একটি ক্ষুদ্র অংশ। নেতার উত্থান যেমন আছে পতনও আছে, এমন কি জাতি বা জনগণ যতই নিষ্ক্রিয় হোক না কেন এই পতন রুখবার নয়। নেতা ও জনগণের রসায়ন দেখানোর সাথে সাথে সমাজে বিরাজমান নানান অসংগতি কাফকা তুলে ধরেছেন তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে। যেমন শিশুদের স্বাধীন বিকাশের কথা বলা হলেও এমন কি এ বিষয়ে কারো কোনো দ্বিমত না থাকলেও এই ধারণার প্রবক্তা এবং সম্মতি প্রদানকারীরাই নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে শিশুদের স্বাধীন বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। গল্পে আরও দেখি, একটি নিষ্ক্রিয় সমাজেও কেউ নেতা হয়ে ওঠে কারণ জনগণ এই বৈরী পৃথিবীর মাঝখানে নেতাকে নিজেদের সকরুণ অস্তিত্বের অংশ মনে করে। কাফকার বেশিরভাগ গল্পের মতোই এটি পাঠে গভীর মনোযোগ ধরে না রাখলে পাঠকের খেই হারানোর সম্ভাবনা থেকে যায়।
পাঠ পর্যালোচনায় অনুবাদক যথারীতি তাঁর নিজের এবং সংগৃহিত আলোচনা যুক্ত করেছেন।
পরিশিষ্ট অংশে কাফকার করা তিনটি সাহিত্য সমালোচনা আছে। এগুলো পড়ে কাফকাকে খানিক নির্দয় ( বেশি না) সমালোচক ভাবা যেতে পারে।
প্রথম সমালোচনাটি হলো ফেলিক্স স্টারন্হাইমের উপন্যাস The story of Young Oswald। কাফকা সমালোচনাটি করেছেন 'একটি তারুণ্যের উপন্যাস' শিরোনামে। এটি মূলত একটি পত্রোপন্যাস।
দ্বিতীয় সমালোচনাটি হলো প্রুশিয়ান লেখক হাইনরিখ ফন ক্লাইস্টের বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক গল্পগুলো নিয়ে যার শিরোনাম 'ক্লাইস্টের ছোট, বাস্তব কাহিনীগুলো'।
শেষের সমালোচনাটি আদতে একটা দ্বিমাসিক সাহিত্য পত্রিকা সম্পর্কে সমাধিপত্রের ঢংয়ে লেখা রচনা। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি এটা লেখেন। এর শিরোনাম ছিলো, ' হুইপেরিয়ান- এক বিগত জার্নাল।'
পাঠ পর্যালোচনা লেখার জন্য অনুবাদক মাসরুর আরেফিন যেসব উৎসের সাহায্য নিয়েছেন সেগুলোর একটা তালিকা দিয়ে ঋণ স্বীকার করে নিয়েছেন। পরিশিষ্টের পরে ফ্রানৎস কাফকার একটা কালপঞ্জি যোগ করেছেন যা এক নজরে কাফকাকে জানতে সহায়তা করে।
সবশেষে কাফকার চমৎকার কিছু পারিবারিক ও বন্ধু মহলের ছবি জুড়ে দিয়ে অনুবাদক কাফকাপ্রেমিদের অগাধ তৃষ্ণা মেটানোর প্রয়াস নিয়েছেন।
বইটি প্রকাশ করেছে পাঠক সমাবেশ ও প্রচ্ছদ করেছেন সেলিম আহমেদ। দুই মলাটের ভেতর কাফকার রূপান্তর ( মেটামরফোসিস)গল্পের পান্ডুলিপির ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে এটি একটি মূল্যবান গ্রন্থ তাতে সন্দেহ নেই। কাফকা ভক্তরা এটি অবশ্যই সংগ্রহে রাখতে পারেন৷ আমি পরের খণ্ডটি পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম।
পুনশ্চ:
কিছু অসঙ্গতি ( খুব সামান্যই, আশাকরি পরবর্তী মুদ্রণে থাকবে না)
- 'লেখনী' শব্দটির ভুল ব্যবহার হয়েছে বেশ কয়েকটি জায়গায়। অনেকেই আমরা জানি যে 'লেখনী' বলতে যা দিয়ে লেখা হয়, যেমন: কলম, পেন্সিল ইত্যাদি বোঝায়। আবার অনেকে আছেন যাঁরা জানেন না। কিন্তু এরকমও কেউ কেউ আছে জানেন তবু অলক্ষ্যে ভুলটি করে বসেন।
- 'নতুন উকিল' গল্পটিতে 'কুশলতাটাক' বলতে কী বোঝানো হলো তা বোধগম্য হলো না। 'কুশল' বলতে সাধারণত আমরা 'সৌজন্য-বার্তা' বুঝি। আলোচ্য লাইনটিতে অনুবাদক সম্ভবত 'কৌশলটুকু' বোঝাতে চেয়েছিলেন।
- লাইনটি তুলে ধরা হলো-
- ".. এমনকি ভোজসভার টেবিলে কীভাবে অন্য পাশে বসা বন্ধুকে বর্শা দিয়ে বিদ্ধ করে মারতে হয় সেই কুশলতাটাকু আজও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি;"
*********
ফ্রানৎস কাফকা গল্পসমগ্র
ভূমিকা, অনুবাদ, পাঠ-পর্যালোচনা: মাসরুর আরেফিন
প্রচ্ছদ: সেলিম আহমেদ
প্রকাশক: পাঠক সমাবেশ, ঢাকা
প্রকাশকাল: ২০১৪
পৃষ্ঠা: ৪৭৩
মূল্য: ১১৯৫.০০ টাকা
ISBN: 9789848866672
*********
প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় পড়তে পারেন-

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম