'ভালো জিনিস অল্পই ভালো'। লেখক কাজী লাবণ্যের উপন্যাস 'হাজারমুখী রোদসী' সম্পর্কে লিখতে গিয়ে সবার প্রথমে একথাই মনে এলো। মাত্র ৮৯ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের ছোট্ট কলেবরে রংপুরের মায়াময় আঞ্চলিক ভাষায় বর্ণিত হয়েছে কত সোনালী স্বপ্ন, রেশমী সুখ, বুক-চৌচির মতো বেদনা আর লজ্জাবতী বৃক্ষতুল্য স্পর্শকাতর বিষয়। সুখ দুঃখ এই মিলিয়েই মানুষের জীবন। তবু দুঃখের ভাগটাই যাদের জীবনে একচেটিয়া, আনন্দ বিষাদের আলো আঁধারি খেলার মধ্যে আঁধারের অংশটাই যাদের অদৃষ্টে মুখ্য তাদেরই একজন হাজারমুখী। এটা তার নাম নয়, বিশেষণ। সে গান গাইতে জানে সুমধুর কন্ঠে, পারে অনাত্মীয় কারো মৃত্যু শোকেও ব্যথা জাগানিয়া বিলাপ করতে আবার এই ব্যক্তিই সারাক্ষণ অনবরত বক বক করতে থাকে। তাই সংগ্রামী এই বিধবা নারী ময়নার নাম লোকে রেখেছে হাজারমুখী। স্বামীর মৃত্যুর পর শত অভাবের মাঝেও তার জীবনের অবলম্বন ছেলে মন্দেলকে নিয়ে সে বেঁচে আছে, একদিন ছেলে দুঃখ ঘোচাবে সেই আশায়। কিন্তু মাদ্রাসার হাফেজ ছেলে মায়ের জীবনের দুঃখ ঘোচানোর চেয়ে ধর্মচর্চায় বেশি ব্যস্ত এখন। তাই ছেলের চেয়েও মা বাবা হারানো বোনের ছেলে ছোট্ট রব্বানীকে আজকাল ময়নার বেশি আপন মনে হয়। ময়না, রব্বানী, মন্দাল এইতো এই তিনজনের জীবনকে ঘিরেই এগোয় হাজারমুখী রোদসীর কাহিনী।
শিরোনাম থেকেই আভাস পাওয়া যায় ময়নাই উপন্যাসের মূল চরিত্র। ভাগ্য তাকে বঞ্চনা করেছে দারিদ্র্য দিয়ে, অল্পবয়সে বিধবা করে। প্রযুক্তির হাত ধরে দ্রুত বদলে যাওয়া এই পৃথিবী যাদের শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিচ্ছে তাদের মধ্যে হাজারমুখী আছে। চাতালের বদলে অটো রাইসমিল হবার কারণে পেটে লাথি পড়া মানুষদের একজন সে। আবার একই সাথে শিক্ষা দীক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত।
কোথায় যেনো শুনেছিলাম,
গরিবের কেউ নেই, আল্লাহও নেই।
উপন্যাস পড়তে পড়তে এমনটি মনে হয়েছে কখনও কখনও। কিন্তু ময়না নিজেই একথার জবাব দিয়েছে, মাদ্রাসায় পড়া ছেলের মুখে দোযখের শাস্তির কথা শুনে আঞ্চলিক ভাষায় বলেছে, আল্লাহ এত নিষ্ঠুর না যে ইহকালে দোযখ যন্ত্রণা দিয়ে পরকালেও তুচ্ছ বিষয়ের জন্য শাস্তি দেবে। আল্লাহ লোকদেখানো মাওলানা নয় যে।
ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকদের মনস্তত্ত্ব, চৌদ্দ পুরুষের বেহেশতের টিকেট কেনার বিনিময়ে বাবা মা তাদের শিশু সন্তানদের কোথায় থাকতে বাধ্য করেন, কোন কোন ক্ষেত্রে মাদ্রাসার শিক্ষকদের অত্যাচার গণ্ডি ছড়িয়ে কোন পর্যায়ে পৌঁছায় এবং অত্যাচারিত ব্যক্তির মননে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সবকিছু কথামালায় সুনিপুণভাবে গেঁথেছেন লেখক কাজী লাবণ্য। একইসাথে এমন পৈশাচিক কর্মের সাথে ধর্মানুরাগের যে কোনো সম্পর্ক নেই, বরং স্বার্থান্বেষী ধর্মান্ধরাই এসবের ধারক ও বাহক সেকথা বলতেও ভোলেননি। যারা ধর্মকে বিলাস ব্যসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এহেন কুকর্ম নেই যা করেনা তাদের সাথে, ভাগ্যের সাথে, পুঁজিবাদের সাথে লড়াইয়ের কাহিনী 'হাজারমুখী রোদসী'। এই লড়াইয়ে সে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে তবু আত্মসম্মান, স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়নি। শেষ পর্যন্ত সে হেরেছে না জিতেছে সে প্রশ্ন বড় নয়, লড়াইটাই মুখ্য, অন্তত পাঠকের কাছে। যার জীবনের সর্বসুখ উজাড় হয় তার কথা অবশ্য আলাদা। সে তো আর আদর্শবাদের গালভরা বাণী আওড়াতে পারেনা। হয়তো সারাজীবন যার কাছে মাথা নোয়ায়নি তার অবসন্ন দেহমনে তার পায়ের কাছেই লুটিয়ে পড়ে । পায়ে পরে নেয় সেই শৃঙ্খল, যা পরাজিত হওয়ার আগে মেনে নেয়নি কোনোদিন। তবু আমার কাছে একদিক দিয়ে শেষটা গৌরবময় হাজারমুখীর দিক দিয়ে না হলেও অন্তত তার ছেলে মন্দালের জন্য। এর বেশি বলে স্পয়লার দেবোনা। একটানা পড়ে বইটা শেষ করেছি, রিনরিনে একটা ব্যথা রয়ে গেছে গভীরে কোথাও।
উপন্যাস পড়ে বলছি সূক্ষ্ম অনুভূতি বর্ণনায় লেখক মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। বিশ টাকা নিয়ে মেলায় রব্বানীর খেলনা কেনার দোলাচলে ভোগার ঘটনাটা তার প্রমাণ।
আরেকটি কথা কাহিনী বর্ণনায় উপন্যাসটিকে উপন্যাস না বলে অনায়াসেই চিত্রনাট্যও বলা যেতে পারে। ভালো পরিচালকের হাতে পড়লে হাজারমুখী রোদোসী উপন্যাসের মূল চরিত্র ময়নার জীবন সংগ্রাম 'মাটির ময়না' হতে সময় লাগবেনা।
সমালোচনা: বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলো। শুরুর কথাটার বিরুদ্ধাচারণ হচ্ছে জানি, তবু বলবো শেষটা আরেকটু বিবরণ সমৃদ্ধ হতে পারত। আর ময়নার পরাজয়টা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে।

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম