জীবনে মাত্র দু’টি বই প্রকাশ করে যিনি ‘গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ’ কিংবা ‘হোর্হে লুইস বোর্হেসে’র মতো লেখকদের গুরু বনে যান তিনি ‘হুয়ান রুলফো’। লিখেছেন একটি মাত্র উপন্যাস- ‘পেদ্রো পারামো’ এবং সতেরটি গল্পের একটি ‘সংকলন’।
মেক্সিকান তথা বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম এই প্রভাবশালী লেখকের সতেরটি গল্প নিয়ে এই সমগ্র অনুবাদ করেছেন কথাসাহিত্যিক শাহাব আহমেদ।
হুয়ান রুলফোর গল্পের মূল ভিত্তি মেক্সিকোর ধূসর মরুভূমি। মেক্সিকান বিপ্লব পরবর্তী সময়কালকেই তিনি ধরেছেন তার লেখায়। এসব গল্পে কোনো চটকদার রোমান্টিকতা নেই। আছে চরম, নিষ্ঠুর, বাস্তবতা। ধুধু মরুভূমি, ধুলোঝড়, তীব্র খরা, ভয়ানক বন্যা, আর একাকীত্ব। পড়তে গেলে কখনও মনে হয় অভাব, খরা, বন্যা আর লড়াইয়ের রূপ পৃথিবীর সর্বত্র একইরকম। সবখানেই এরাই গল্পের এবং বাস্তবতার প্রধান চরিত্র।
‘আসলে আমরা খুবই গরীব’ গল্পে বন্যার আশ্রয়ে যখন নদীটি ফুলে ফেঁপে উঠে, যখন তার গর্জনটা আরও আরও নিকটতম হয়, তখন দাবানলের গন্ধের মতো নদীর পচা জলের দুর্গন্ধটা নাকে ঝাঁপটা মারে। কনিষ্ঠা কন্যাকে তার বড় দু’বোনের মতো বেশ্যা হওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য বাবা একটি গরু উপহার দিয়েছিল। রাক্ষুসে নদী সেই গরুকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলে কন্যা তাচা’র অবস্থা পাঠককে কাঁদায়। মনে হয়-তাচা কি পারবে বোনেদের পথ পরিহার করতে! কীভাবে পারবে! আরও মনে হয় জগতে এত অসহায়ত্ব না থাকলেও পারত।
নরকের শুদ্ধিলয়ের আত্মাদের উদ্দেশ্যে গির্জার ঘন্টা ধ্বনি থামার আগেই রাইফেলের বাট দিয়ে বোন জামাইকে খুন করে উরবানো নামক মানুষটি ধরার পড়ার পর-
নিজেই নিজের গলায় দড়ি পরায় এবং তার পছন্দের গাছটি দেখিয়ে দেয় ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য।
- এটি 'মনে করে দেখ’ গল্পের শেষাংশ।
এমনিভাবে,
মাকারিও, ওরা আমাদের জমি দিয়েছে, কোমাদ্রেস পাহাড়ের ঢালে, আসলে আমরা খুবই গরীব, লোকটি, সূর্যোদয়ের কালে, তালপা, লেলিহান প্রান্তর, ওদের বল আমাকে যেন না মারে, লুভিনা, যে রাতে ওরা তাকে একা ফেলে গেল, মনে করে দেখ, কোথাও কোনো কুকুর ডাকে না, উত্তরের পথ, আনাক্লেতো মরোনেস, ধসের দিন, মাতিল্দা আরকানহেলের উত্তরাধিকার নামক সতেরটি গল্প একসময় শেষ হয়।
সতেরটি গল্পই যে একেবারে হৃদয়ের গভীরে রেখাপাত করে তা কিন্তু নয়। সেটা বোধহয় হয়ও না। তবে গল্পগুলোর সাথে আমাদের মাটি, মানুষ, লড়াই এবং অভাবের সাযুজ্য অনেক বেশি।
মেক্সিকান বিপ্লব কৃষকদের যে সোনালী স্বপ্ন দেখিয়েছিল, বাস্তবতার তারা যে কিছুই পায়নি তা বারবার উঠে এসেছে এই আখ্যানগুলোতে।
গল্পে দেখা যায়, সরকার কৃষকদের এক টুকরো জমি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা হলো এক উত্তপ্ত, পাথুরে মরুভূমি, যেখানে একফোঁটা জলও নেই।
গল্পের চরিত্রগুলি প্রায়ই অপরাধবোধে ভোগে। জীবদ্দশাতেই তারা যেন নরককুণ্ডে বাস করে। এখানে জীবিত আর মৃতের সীমানা বড় আবছা।
লেখকের ভাষা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, ধারালো এবং কাব্যিক। মেদহীন গদ্যে একটি শব্দও বাড়তি মনে হয় না। অতিপ্রাকৃত বিষয়গুলিকে এমনভাবে বাস্তবতার সাথে মিশিয়ে দেন যে তা অবিশ্বাস্য মনে হয় না। কঠিন শব্দ কিংবা প্যাঁচানো বাক্য নেই আর অনুবাদও ঝরঝরে।
গল্পগুলো পড়ার পর বিষণ্ণতায় ডুবিয়ে দেয়। মানুষের বেঁচে থাকার আদিম লড়াই, ক্ষুধা এবং মেক্সিকোর রুক্ষ মাটির যে নিখুঁত চিত্র তিনি এঁকেছেন, তা এক কথায় অনবদ্য।
তিনি ছিলেন নিঃশব্দ যন্ত্রণার ভাষ্যকার ।
১৬ মে ১৯১৭ সালে মেক্সিকোর সায়ুলাতে জন্মগ্রহণ করে মৃত্যু হয় ৭ জানুয়ারি ১৯৮৬, মেক্সিকো সিটিতে।
হুয়ান রুলফো মূলত গল্পকার ও ঔপন্যাসিক। তাঁর সাহিত্য জীবন খুব দীর্ঘ না হলেও, মাত্র দুটি প্রধান রচনা দিয়েই তিনি সাহিত্যের উচ্চতর স্তরে পৌঁছেছেন।
**********
গল্প সমগ্র
হুয়ান রুলফো
অনুবাদ - শাহাব আহমেদ
সম্পাদনা - আনিসুজ জামান
প্রকাশক- কবি প্রকাশনী, ঢাকা।
প্রচ্ছদ: কবি প্রেস
মূল্য: ৩০০ টাকা
পৃষ্ঠা: ১২৮
ISBN: 978-984-2250-04-0

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম