Poetry, accompanied by the idea, is perfect music, and cannot be anything else. -
Stéfan Mallarmé
"ঈষৎ-ময়ূর যেন, বসে আছে জারুলের ডালে
গুঁড়ো গুঁড়ো ভেঙে পড়ে কেকা
ও রং ও রং তুমি ফাগুয়া তিথির মেয়ে
পাতলা কোমরজলে ঢেউ
সেপথে হেঁটেছে গল্প
পায়ে তার গুলালের দাগ
ভাসন্তী কুমারী
অস্থানে চুম্বন ঝরে যায়
দেখি ওই পড়ে আছে শাড়ি
রুপোলি জরির থেকে উঁকি দেয় শ্মশানভৈরব
চোয়াল-কবজা খুলে সে দেখায় উখোর ধারালো
ঠা - ঠা হেসে ফেটে যায় ঝুনো নারকেল
বমিতে চোবানো খুলি
তমসাখেতের মাঝে একক জোনাকি
মহাপয়ারের পথে বারুদবালক
রাত শুধু পাখিডাক
যমডাকিনির ঠোঁটে মৃত্যুআভাস
ফেনা ওঠে গল্প-গেলাসে"
( যমডাকিনি / "রৌদ্রগণিকার পথ")
যখন এই কবিতা পড়ি তখন মালার্মে-কথিত সেই সঙ্গীতের এক আচ্ছন্ন করা চলন অনুভব করি।
এই সময়ের বিশিষ্ট কবি সৌমনা দাশগুপ্ত। তাঁর "রৌদ্রগণিকার পথ" পড়েছি গত বছর। লেখার ইচ্ছে ছিল আগেই। সেই লেখা এতদিনে এল। নিজেকে শূন্য দশকের কবি বলেছেন সৌমনা এই বইয়ের ব্লার্বে।
উত্তরবঙ্গের কন্যা তিনি। যাঁরা উত্তরবঙ্গে থেকেছেন (ব্যক্তিগতভাবে আমি ছিলাম বলে জানি) তাঁরা সেখানকার প্রকৃতিকে একটু অন্যভাবে চেনেন। আমাদের দক্ষিণবঙ্গের মতো, কিন্তু সেখানে যেন উত্তরের হিমালয়ের ছায়া পড়ে থাকে সবসময়। এই ছায়া ভেতরে এক মেদুর অনুভূতি দেয়। এই মেদুর প্রকৃতি সৌমনার কবিতায় তীব্রভাবে উপস্থিত।
"মধুপত্রী" কবিতায় যখন তিনি লিখছেন
এ - শরীর হানাবাড়ি ; তক্ষক ডেকে যায়
হাসছে গুবরেপোকা ; ফুল খোলো সখী
নীরপতত্রী কুয়াশা, শীতডোবা রাত
যেমন রয়েছে ঝুলে বাইল্যার বাসা
গাড়ি-গ্রাম থেকে দূরে বহু দূরে
একলা খেজুরগাছে ঝুলে আছে হাঁড়ি
রসের ভাণ্ডটি চেটে খাচ্ছে পোকা
বসিয়ে দিয়েছি আমি মুখ-আন্ধারি
সন্ধেবেলাটিকে রাত্তিরের কোলে
আমরা বুঝতে পারি বাংলার গ্রামদেশের প্রকৃতিকে আত্মস্থ করে তাকে নিজস্ব বোধে জারিত করে অন্য এক বীক্ষণের দিকে যাচ্ছেন কবি। কিন্তু এ দেখা আমাদের দেখার অতীত এক দেখা যেখানে আমাদের জীবনের আলো-আঁধারি পার করে একটা ডিসটোপিয়ার পরত লেগে থাকে। এই ডিসটোপিয়া সৌমনার কাব্যভাষার প্রধান চিহ্ন বলে মনে হয় আমার। ডিসটোপিয়া আমাদের, ব্যক্তিগতভাবে এই সময়ের বহু কবি, শিল্পীর লেখার ও কাজের খুব গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। কিন্তু সৌমনার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও ক্ষমতা এখানেই যে তিনি শব্দ ও তার ধ্বনিময়তাকে এক অপার সৌন্দর্যে নিয়ে চলে যান যেখানে শুধু শব্দের উচ্চারণ, কবিতা-শরীরে তার অবস্থানটিই তাঁর ডিসটোপিক ক্যানভাসটিকে মূর্ত করে দিতে সক্ষম। শুধু কয়েকটা তুলির আঁচড়ের মতো শব্দকে ব্যবহার করেন তিনি। এখানেই সৌমনার ম্যাজিক যা বাংলা কবিতায় বিরল বলে মনে হয়।
"বিষয় কুকুর হয়ে ঘোরে" কবিতায় উপরে বর্ণনা করা এই বিশেষ গুণটি কিভাবে ফুটে উঠছে পাঠক লক্ষ্য করুন :
লাল জিভ
মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে দাঁত
বিষয় কুকুর হয়ে ঘোরে
ভূমার চোখের জল নদী
হ্লাদিনী কমলা এক সূর্য
বিকেলের স্রোতে ভেসে
আংরা বমনের পথে পথে
কবিতায় শব্দ এভাবে সর্বস্ব হয়ে একটা নিদর্শন হয়ে ওঠে যেখানে এক একটা শব্দ তার নিজের জোরে ব্রাশস্ট্রোকের মত আছড়ে পড়ছে আমাদের চেতনায়, বোধে, আর নির্মিত হয়ে চলে এক আলাদা ভুবন, অনন্য অস্তিত্ব।
আবার "মায়াকবুতর" এ লেখেন
আলখাল্লার ভাঁজে ভাঁজে মায়াকবুতর
তিরছি নজর মেরে উড়ে যায় অনন্ত ভূমায়
মহাবট, তাকে ঘিরে তিথিতে তিথিতে
পাক খায় আদিগন্ত শাড়ি
এখানে আদিগন্ত শাড়ি আমাদের গভীরতর অস্তিত্বের প্রতীক, আমাদেএ গৃহের প্রতীক যা আমাদের আশ্রয়, আমাদের বসন তার সবকিছুর প্রতীক। শাড়ি কথাটা খুব স্বাভাবিকভাবে এসেছে। কারণ নারীবাদী কোনো বীক্ষার চমক দেখিনা সৌমনার কবিতায়। সেখানে কবিতা লিঙ্গ ও ব্যক্তি-নিরপেক্ষ এক জগতের সন্ধানে চলেছে যে জগত আমাদের সবার কাছেই অসহ, কিন্তু তাকে আমরা আমাদের সত্তায় বহন করে যেতে বাধ্য। সিসিফাসের অনুষঙ্গ মনে পড়ে তাঁর কবিতা পড়লে। এক অনতিক্রম্য ধূসরতা যেন মহাভার, অথচ সে ভারবহনের মধ্যে রয়েছে দ্বন্দ্বমুখরতা, অজস্র শেড, ভেঙে পড়া, আবার জেগে ওঠা।
খোঁজ তো প্রকৃত কবিরই অণ্বিষ্ট। সৌমনা খোঁজেন তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে :
জলাভূমির ভেতর যাকে পুঁতে রেখে এসে
নিশ্চিন্তে খেয়ে ধুয়ে আঁচিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি
সে কে, কে ছিল, কে ছিল বলো
আমার আরশিখানা সেই থেকে ঘুরে ঘুরে আমাকেই খোঁজে
কে তাহলে কাকে খুঁজছে? আমার আয়না আমাকেই খুঁজছে। এখানেই এক অভিনবত্ব পাই কবির বোধের। অর্থাৎ সব খোঁজই এক আন্তঃসম্পর্কের স্তরের মাধ্যমে ক্রমশ তার শরীর পায়। আমার প্রতিফলকও আমাকে খুঁজে চলে নিজের অস্তিত্বকে টিঁকিয়ে রাখতে। সত্যিই, এ ভাবনা অভিনব।
শব্দ থেকে যখন অন্য শব্দে চলে যান তিনি, যা আমরা পাঠক হিসাবে আকাঙ্ক্ষা করি, অর্থাৎ সেই কাঙ্ক্ষিত যতিটির, সেই স্পেসের ব্যবহার অবাক করে। সৌমনা তাঁর বেশিরভাগ লেখাতেই স্পেসকে ব্যবহার করেছেন কবিতার অংশ হিসাবে যেখানে চিত্রকল্প থেকে অন্য চিত্রকল্পে উড়ানের মধ্যবর্তী সেই শূন্যতা যা পাঠককে তার শ্বাসপতনের শব্দ অনুভব করতে দেয় যে শ্বাস জারিত হয়ে চলেছে পাঠের প্রক্রিয়ার মধ্যেই। সৌমনার লেখায় এই জারণ যেমন তাঁর কাব্যভাষার বীজ, তেমন তিনি পাঠককে এই জারণপ্রক্রিয়ার অংশ করে নেন দ্যুতিময় মেধাবী শব্দের বিন্যাসে। এই দ্যুতি কিন্তু আমাদের চেনা বীক্ষণকে একটা মরবিড হাইড্র্যান্টের মধ্যে দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। আমরা দেখি সূর্য ও পৃথিবীর আরো অন্যতর উদ্ভাস ও মায়ার আঁকাবাঁকা প্রলেপ যখন আমরা আমাদের অভ্যাসের বাইরে ছিটকে পড়ি তাঁর শব্দের অভিঘাতে। মননকে তিনি আভাসিত হতে দেন নতুন চৈতন্যে যা জন্ম নেয় আমাদের চেনা পরিধির মধ্যেই এক অনন্য যন্ত্রণামুখরতায়, যে মুখরতা আমাদের আবিষ্ট করে, মূঢ় করে, আর তার ভাষাটিকে প্রস্ফুটিত হতে দেখি সৌমনার কবিতায়।
এ আলোচনার প্রথমেই মালার্মে-কথিত সেই সাঙ্গীতিকতার কথা বলেছিলাম। এই সাঙ্গীতিকতা আমাদের ভেতরের ছেঁড়া তার দিয়ে নির্মিত যেন যে তার আমাদের অস্তিত্বের অংশভাক।
সৌমনার কবিতায় সঙ্গীতের এই মেজাজ আমাদের চিরাচরিত ধারণাকে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। শব্দের মধ্যে তিনি এক অব্যর্থ গতির সঞ্চার করেন যে গতির মুখোমুখি হতে পাঠককেও যেন নড়েচড়ে বসতে হয় কারণ এ গতি অনভ্যাসের গতি। একটা শব্দ থেকে আর একটা শব্দে যাওয়ার যে প্রতিভাস তিনি রচনা করেন তার অভিঘাত মায়াবী ও তীব্র, ফলে কখনো পাঠকের ধাঁধা লাগে, নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে প্রস্তুত হতে হয় পরবর্তী চিত্রকল্পের জন্য। কারণ ঢেউয়ের মতো চিত্রকল্পরা আসে। তাই সৌমনার কবিতা খুব আরামদায়ক পাঠের কবিতা নয়, এখানে তেমন শান্তির আশ্রয় নেই, কারণ কবি তা দিতে চাননি। তিনি তীব্র এক প্রদাহময় সময়কে ধরতে চেয়েছেন যে সময় আমাদের গায়ে ও গতরে লেগে থাকে, প্রতি পলে আত্মা অবধি ধাওয়া করে।
রিলকের কবিতায় পড়ি :
Does Time, as it passes, really destroy?
It may rip the fortress from its rock;
but can this heart, that belongs to God,
be torn from Him by circumstance?
কবি এখানে প্রশ্নদীর্ণ। সে তো বিগত শতকের প্রশ্ন। আজ তো আর সন্দেহের কোনো বাতাবরণ থাকেনা যে সময় কিভাবে একের পর এক ধ্বংসের বাতাবরণ নির্মাণ করে তার ভেতর নিজের সৌধটি নির্মাণ করে। সৌমনা সময়ের সেই বাতাবরণের চারণিক যেখানে আমরা পরতে পরতে আমাদের এক স্তর থেকে আর এক স্তরে সময়ের নির্মাণকে প্রত্যক্ষ করি তাঁর কবিতায় যখন আমরা পড়ি :
আমরা সব সফেন-মানুষ
আমরা সব সাবান-মানুষ
মেতে আছি স্নানকারাগারে
মাটি পেতে ভাত খাই
ভরা পেটে অমৃতও গোবর সমান
এসো স্বপ্ন বসো স্বপ্ন
তোমাদের গা-গতরে কামড় বসাই
( সুষুম্নার গাছ )
"রৌদ্রগণিকার পথ" কাব্যগ্রন্থটিতে এমন সব পংক্তি উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে থাকে যেখানে মৃত্যু আর জীবন পরস্পরের মধ্যে জড়িয়ে থাকে আর সব মিলিয়ে আমরা একটা সংশ্লেষ পাই যেখানে
ঘুম এক আশ্চর্য বাগান, সে বাগানে দোল খাই
পুড়াই জীবন আর পাতাপুতা। জমানো ভস্মের থেকে
একদিন ফুটে ওঠে ফুল। ঘুম এক অবাক বাগান
( ভরাকোটালের দিন )
সৌমনা লেখেন, আর সময় অনূদিত হয়ে চলে, যেন আমরা পৃথিবীর ভেতরেই কোনো আশ্চর্য বাগানে ঢুকে পড়ি যে বাগানে সৌন্দর্যের বিস্তার আমাদের দেখার লক্ষ্মণরেখা পার হয়ে যায় একটা তীব্রতায়, আর আমরা শুনতে পাই গান বাজছে, আমাদের শ্রবণ অধিকার করে নিচ্ছে একটা ধূসররঙের ক্যাকোফনি। এই ক্যাকোফনি কবির যাত্রাপথের ধ্বনি যার মাধ্যমে আমাদের দৈনন্দিনতাকে ভেঙে ফেলতে চান তিনি।
"আদিখর্পর" বলে যে দীর্ঘ কবিতা দিয়ে এ বই শেষ হয় তার প্রতিটি পংক্তিতে এই জীবনবোধের ঝলক আমরা দেখতে পাই। শব্দ ভাস্বর হয়ে উঠে নিজেকে অতিক্রম করে যায় এই কবিতায়। সব মিলিয়ে ১৭৭ পংক্তির এই কবিতায় প্রথমে যে ডিসটোপিয়ার কথা বলেছিলাম তা যেন নিজস্ব স্ফূটনাঙ্কে জেগে থাকে আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত। কবিতা পড়ার এক বিরল অভিজ্ঞতা হয় এই কবিতায় এসে যখন আমরা আমাদের চারপাশের প্রতিটি চিহ্নকে জেগে উঠতে দেখি এই কবিতায়। সমগ্র প্রকৃতি বিশ্বময়তার স্পর্ধা নিয়ে তার ডালপালা মেলে দিয়েছে এ লেখায়। একটা লাইন উদ্ধৃত করার লোভ সামলানো গেলনা :
ওম দাও। তার সান্দ্র করোটিজাত ওংকারে ভরে যাক সমস্ত বাজার
আমাদের বিনিময়ের পৃথিবীতে তিনি আবাহন করেছেন একটা ধ্বনির যে ধ্বনি মৃত্যুর সীমা পার হয়ে গিয়ে নতুন পৃথিবীর আবাহন চেয়েছে।
অজস্র চিত্রকল্প বন্যার মতো আছড়ে পড়েছে এই লেখায়। ঘোর লাগে পড়তে পড়তে। যা কটু, আপাত অসৌন্দর্যের সব চিহ্নকে ধারণ করে। র্যাঁবো থেকে বোদলেয়ার হয়ে যে ডিসটোপিয়ার প্রতিষ্ঠা আধুনিক কবিতার আকাশে তারই পতাকা বহন করেন সৌমনা আজ এই একবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, এই বাংলায়। এই বিশেষত্বটি নিয়ে সৌমনা স্বতন্ত্র চিহ্ন নির্মাণ করেন যা কবিতায় সময়ের অমোঘ চিহ্ন বলে আমাদের অন্য ভাবনার দিকে প্ররোচিত করে।
এ লেখা শেষ করি এ বইয়ের প্রথম দিকের কবিতা "সুষুম্নার গাছ" থেকে দুটি লাইন উদ্ধৃত করে :
অক্ষর কামড়ে নিয়ে ছুটে যাচ্ছে ইঁদুর
বাংলা ভাষার থেকে ধান ঝরে চরাচরে
আশ্চর্য এই গতি যেখানে দ্রুতি আর ধীরলয়ের এক সম্মোহন মিলেমিশে আমাদের বোধে এসে কাজ করে। আমরা ক্রমশ ঢুকে পড়ি আমাদের চেনা জগৎ থেকে দৃশাতীত সেই জগতে যেখানে এক স্বশাসন এসে আমাদের বন্ধ জানালা খুলে দিয়ে আমাদের নিয়ে যায় বহুরঙা এক সম্ভারের ভেতর।
হিরণ মিত্রের প্রচ্ছদটির কথা না বললেই নয়। সেখান থেকে রৌদ্রময় পথের গনগনে আঁচ মুখে এসে লাগে।
**********
রৌদ্রগণিকার পথ
সৌমনা দাশগুপ্ত
প্রকাশক : আদম
মূল্য: ১৫০ টাকা

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম