উপনিবেশবাদ বলতে আমরা সাধারণত বুঝি—একটি দেশ আরেকটি দেশকে দখল করেছে, তার সম্পদ লুট করেছে, প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং মানুষের ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু আশিস নন্দী আমাদের সামনে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন রাখেন—উপনিবেশবাদ কি সত্যিই শুধু ভূখণ্ড দখলের ঘটনা? নাকি এর চেয়েও গভীরে, মানুষের কল্পনা, আত্মপরিচয়, নৈতিকতা এবং নিজের সম্পর্কে ধারণার ওপরও একটি দীর্ঘস্থায়ী দখল প্রতিষ্ঠিত হয়?
এই প্রশ্ন থেকেই তাঁর বিখ্যাত বই The Intimate Enemy শুরু হয়। বইটির মূল বক্তব্য অত্যন্ত সরল, কিন্তু গভীরভাবে অস্বস্তিকর। উপনিবেশবাদ প্রথমে বন্দুক দিয়ে আসে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের মনের ভেতরেই তার স্থায়ী বাসা গড়ে তোলে। একসময় শাসকের আর উপস্থিত থাকারও প্রয়োজন হয় না। শাসিত মানুষ নিজেই শাসকের ভাষায় চিন্তা করতে শেখে, শাসকের মানদণ্ডে নিজেকে বিচার করে এবং নিজের সংস্কৃতিকেই তুচ্ছ মনে করতে শুরু করে।
নন্দীর কাছে উপনিবেশবাদ তাই কেবল রাজনৈতিক আধিপত্য নয়; এটি একটি মানসিক অবস্থা। মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার ভাষা, তার ইতিহাস, তার বিশ্বাস, তার জীবনযাপন এবং তার জ্ঞান পশ্চিমের তুলনায় নিম্নমানের—তখন উপনিবেশ সফল হয়।
এই কারণেই নন্দী বারবার বলেন, সবচেয়ে বিপজ্জনক উপনিবেশ হলো সেই উপনিবেশ, যাকে মানুষ আর উপনিবেশ বলে চিনতেই পারে না।
ঔপনিবেশিক শাসন ভারতকে শুধু প্রশাসনিকভাবে বদলায়নি; বদলে দিয়েছে ‘সভ্য’ হওয়ার সংজ্ঞা। পশ্চিমা শিক্ষা, বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ এবং উন্নয়নের ধারণাকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যে ধীরে ধীরে ভারতীয় শিক্ষিত সমাজ নিজের ঐতিহ্যের প্রতিই সন্দিহান হয়ে পড়ে। আধুনিক হওয়ার অর্থ হয়ে দাঁড়ায় পশ্চিমের মতো হওয়া।
নন্দী এই মানসিকতাকে সরলভাবে প্রত্যাখ্যান করেন না। তিনি আধুনিকতার সব অর্জন অস্বীকারও করেন না। বরং তিনি প্রশ্ন করেন—যদি আধুনিকতার মূল্য দিতে হয় নিজের স্মৃতি, আত্মপরিচয় এবং সাংস্কৃতিক কল্পনাশক্তি হারিয়ে, তবে সেই আধুনিকতা কি সত্যিই মুক্তির পথ?
তাঁর বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—উপনিবেশবাদ শাসককেও বিকৃত করে। যে শাসক নিজেকে সর্বদা শক্তিশালী, যুক্তিবাদী, পৌরুষসম্পন্ন এবং শ্রেষ্ঠ বলে ভাবতে শেখে, সেও একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের কারাগারে বন্দি হয়ে যায়। ফলে উপনিবেশবাদ কেবল শাসিতের নয়; শাসকেরও মানবিকতা নষ্ট করে।
এখানেই নন্দীর চিন্তা ক্ষমতার প্রচলিত বিশ্লেষণ থেকে আলাদা হয়ে যায়। তিনি রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী কিংবা অর্থনীতির আগে মানুষের মনোজগতের দিকে তাকান। কারণ তাঁর বিশ্বাস, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু মানসিক স্বাধীনতা অর্জন অনেক কঠিন।
আজকের পৃথিবীতে তাঁর এই বিশ্লেষণ নতুন অর্থ পায়। বিশ্বায়ন, ভোক্তাবাদ এবং ডিজিটাল সংস্কৃতির যুগে উপনিবেশের রূপ বদলেছে। এখন আর বিদেশি শাসক এসে আইন চাপিয়ে দেয় না। কিন্তু মানুষের রুচি, সৌন্দর্যবোধ, সাফল্যের সংজ্ঞা, ভাষা, পোশাক, এমনকি স্বপ্নও ক্রমশ বৈশ্বিক বাজারের দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে। মানুষ নিজের জীবনকে নিজের চোখে নয়, অন্যের চোখে দেখতে শিখছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রক্রিয়াকে আরও তীব্র করেছে। মানুষ নিজের অভিজ্ঞতার চেয়ে নিজের উপস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। নিজের সংস্কৃতিকে জানার আগেই সে বৈশ্বিক সংস্কৃতির অনুকরণ করছে। এই অনুকরণকে সে স্বাধীনতা মনে করছে, অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সেটি একটি নতুন ধরনের মানসিক নির্ভরতা।
নন্দী আমাদের মনে করিয়ে দেন—যে সমাজ নিজের স্মৃতিকে হারায়, সে সমাজ সহজেই অন্যের কল্পনার মধ্যে বাস করতে শুরু করে। তখন তার ইতিহাসও অন্যের ভাষায় লেখা হয়, ভবিষ্যৎও অন্যের পরিকল্পনায় নির্মিত হয়।
এই কারণেই তাঁর কাছে উপনিবেশমুক্তি শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; এটি আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের প্রকল্প। নিজের ভাষা, নিজের ইতিহাস, নিজের লোকজ জ্ঞান, নিজের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা—এসবকে নতুনভাবে আবিষ্কার না করলে স্বাধীনতাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এখানেই অধুনান্তিক মানুষের আরেকটি সংকট স্পষ্ট হয়। সে স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক, কিন্তু তার কল্পনা এখনও ধার করা; সে নিজের ভাষায় কথা বলে, কিন্তু নিজের চোখে পৃথিবীকে দেখতে শেখেনি। তার ভেতরের উপনিবেশ এখনও অটুট।
দেশীয় প্রতিধ্বনি : আত্মপরিচয়ের পুনরাবিষ্কার
আশিস নন্দীর এই চিন্তা বাংলা ও দক্ষিণ এশীয় বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীর সংলাপ তৈরি করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু আগে সতর্ক করেছিলেন যে পশ্চিমকে অন্ধভাবে অনুকরণ করলে মানুষ নিজের সৃজনশীল শক্তি হারায়। তাঁর কাছে শিক্ষা মানে ছিল আত্মার বিকাশ; নকল নয়। নন্দীর সমালোচনার সঙ্গে এই দৃষ্টিভঙ্গির গভীর মিল রয়েছে। দুজনেই মনে করেন, আধুনিকতা গ্রহণ করা যায়, কিন্তু আত্মবিস্মৃতি নয়।
মহাত্মা গান্ধী হিন্দ স্বরাজ-এ বলেছিলেন, পশ্চিমা সভ্যতা মানুষকে যন্ত্রের দাসে পরিণত করছে। তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি আত্মশাসনের কথা বলেন। নন্দী এই গান্ধীয় উত্তরাধিকারকেই নতুন ভাষায় পুনর্ব্যাখ্যা করেন। তাঁর কাছে উপনিবেশমুক্তি মানে শুধু ব্রিটিশ শাসনের অবসান নয়; ব্রিটিশ মানসিকতারও সমালোচনা।
লালন মানুষের পরিচয়কে জাত, ধর্ম বা সামাজিক মর্যাদায় সীমাবদ্ধ করেননি। তাঁর প্রশ্ন—“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।” অর্থাৎ সত্যিকার পরিচয় বাইরের নয়; অন্তরের। নন্দীর আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান এই মরমি ঐতিহ্যের সঙ্গে একটি অদৃশ্য সেতু নির্মাণ করে।
হাসন রাজার জীবনদর্শনও বাহ্যিক ঐশ্বর্যের চেয়ে অন্তর্জগতকে বড় করে দেখে। প্রাসাদ, সম্পদ কিংবা ক্ষমতা মানুষের প্রকৃত পরিচয় নয়। এই উপলব্ধি নন্দীর সেই বক্তব্যকে শক্তিশালী করে যে মানুষের মূল্য নির্ধারণের পশ্চিমা মানদণ্ডই একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না।
নাগার্জুন দেখিয়েছিলেন, মানুষ যখন কোনো পরিচয়কে চূড়ান্ত সত্য বলে আঁকড়ে ধরে, তখনই বন্ধনের জন্ম হয়। ঔপনিবেশিক পরিচয়ও তেমনই একটি নির্মাণ। নন্দী দেখান, উপনিবেশ মানুষকে এমন একটি পরিচয় গ্রহণে বাধ্য করে, যা তার নিজের নয়। নাগার্জুন সেই নির্মাণকে শূন্যতার আলোয় প্রশ্ন করেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। নন্দী মূলত উপনিবেশিত মানসিকতার বিশ্লেষণ করেন—কীভাবে ক্ষমতা মানুষের আত্মপরিচয়কে পরিবর্তন করে। কিন্তু দেশীয় মরমি ও দার্শনিক ঐতিহ্য আরও গভীরে গিয়ে প্রশ্ন তোলে—মানুষ কেন নিজের ভেতরের শক্তিকে ভুলে বাইরের স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে? কারণ সে নিজের সত্তাকে জানে না, নিজের ঐতিহ্যের গভীরতার সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
এই কারণেই অধুনান্তিকতার সংকট শুধু রাষ্ট্র, অর্থনীতি কিংবা সংস্কৃতির সংকট নয়; এটি আত্মপরিচয়ের সংকট। যে মানুষ নিজের চোখে নিজেকে দেখতে ভুলে যায়, সে শেষ পর্যন্ত অন্যের স্বপ্নই নিজের জীবন বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। আশিস নন্দীর সবচেয়ে বড় অবদান এখানেই—তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, উপনিবেশ থেকে মুক্ত হওয়ার সবচেয়ে কঠিন সংগ্রামটি বাইরের বিরুদ্ধে নয়; নিজের ভেতরের সেই উপনিবেশিত মনোজগতের বিরুদ্ধে।
-হাইব্রিড গদ্য ‘অধুনান্তিক ভাষা, দর্শন ও কবিতা'
**********
অধুনান্তিক ভাষা, দর্শন ও কবিতা
আলী আফজাল খান

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম