একটি ভালো শিশু-কিশোর পত্রিকা শিশুর কল্পনার ডানা মেলার উন্মুক্ত আকাশ। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে, 'রংপুর বিভাগীয় শিশু সাহিত্য উৎসব' উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে শিশু-কিশোর সাহিত্য পত্রিকা ‘কোথা পাবে পাখা সে’ -এর সূচনাসংখ্যা। খেলাঘর কর্তৃক প্রকাশিত এই স্মারক সংকলনটি সমকালীন যান্ত্রিক ও প্রদর্শনবাদী সংস্কৃতির বিপরীতে শিশুদের মননশীল সাহিত্যচর্চায় ফিরিয়ে আনার একটি প্রশংসনীয় অঙ্গীকার।
পত্রিকাটির নামকরণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে শিশুর অজানাকে জানার, চেনার ও কল্পনার ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোর এক চিরন্তন আকুতি। সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম ও সাম্য রাইয়ানের যৌথ প্রচেষ্টায় এই পত্রিকাটির অবয়ব গড়ে উঠেছে। পত্রিকাটির উৎসর্গপত্র অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; এটি উৎসর্গ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের প্রয়াত চেয়ারপার্সন মাহফুজা খানমকে, যিনি আজীবন শিশুর সৃজনশীল বিকাশে নিবেদিত ছিলেন।
একটি শিশুতোষ পত্রিকার প্রথম আকর্ষণই হলো তার প্রচ্ছদ। 'কোথা পাবে পাখা সে' পত্রিকাটির প্রচ্ছদ সাজানো হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী ভ্যান গঘের বিখ্যাত চিত্রকর্ম 'পোর্ট্রেট অফ কামিল রোলিন' (Portrait of Camille Roulin)-এর ওপর ভিত্তি করে। প্রচ্ছদে একজন নিষ্পাপ শিশুর অবয়ব, তার মাথায় নীল টুপি, এবং পটভূমিতে ডানা মেলে উড়ে যাওয়া লাল রঙের একটি পাখির ছবি চমৎকার এক আবহ তৈরি করেছে। এই চিত্রশৈলী শিশুদের নান্দনিক বোধ জাগ্রত করে বিশ্বচিত্রকলার সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিবে।
পত্রিকাটির সম্পাদকীয় অংশটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও চিন্তোদ্দীপক। অস্কার ওয়াইল্ডের একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে সম্পাদকীয়র মূল ভাবনা শুরু হয়েছে—
শিশুদের গড়ে তোলার সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো তাদেরকে আনন্দ দেয়া।
সম্পাদকদ্বয় অত্যন্ত ক্ষোভ ও বেদনার সঙ্গে বর্তমান যুগের সমাজবাস্তবতা তুলে ধরেছেন, যেখানে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা ও প্রদর্শনবাদিতা বাড়লেও শিশুদের প্রকৃত সাহিত্যচর্চার ও পাঠচক্রের সুযোগ ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হচ্ছে।
সম্পাদকীয়তে স্মরণ করা হয়েছে বাংলাদেশের শিশু সংগঠনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে, যখন দেয়ালপত্রিকা, গল্প শোনার আসর এবং কবিতা লেখার নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে শিশুর কল্পনাশক্তিকে সমৃদ্ধ করা হতো। এই পত্রিকাটির মূল লক্ষ্য হলো শিশুদের অনুশীলনের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ আশ্রয় হওয়া, যেখানে তারা লিখবে, ভুল করবে এবং পুনরায় লিখবে। সম্পাদকদের মতে, কল্পনার উর্বর ভূমি সাহিত্যই পারে শিশুর মনে ডানা বা পাখা তৈরি করতে।
পত্রিকাটির ভেতরের বিষয়বস্তু অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। গল্প, জীবনী, ইতিহাস, সঙ্গীত, বিজ্ঞান এবং চলচ্চিত্র সমালোচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এই সূচনাসংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যেমন,
ক) 'নান্দনিক শিশুসাহিত্যের চর্চা হোক' — আনজীর লিটন
প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক আনজীর লিটনের এই প্রবন্ধটি শিশুসাহিত্যের সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি ও প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ছোটদের জন্য সাহিত্য রচনা করা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি কাজ, যেখানে ভাষা, শব্দশৈলী এবং বিষয় নির্বাচনে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। তাঁর মতে, একজন সফল শিশুসাহিত্যিককে অবশ্যই শিশু-মনোবিজ্ঞানের তত্ত্ব বুঝতে হবে।
লিটন শিশুসাহিত্যের তিনটি মৌলিক উপাদানের কথা বলেছেন:
- ১. শক্তিমান ও সহানুভূতিশীল লেখক।
- ২. উৎকৃষ্ট সাহিত্য রস।
- ৩. চরিত্র গঠনের উপযোগী উপযুক্ত নীতিকথার সঠিক প্রয়োগ।
তিনি বর্তমান শিশুসাহিত্যের কিছু সংকটের কথাও তুলে ধরেছেন এবং বিদ্যাসাগরের অনুসৃত ভাষার শুদ্ধতা বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন। তাঁর মতে, শিশুসাহিত্যের উদ্দেশ্য কেবল শুকনো উপদেশ দেওয়া নয়, এমন অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করা যা শিশুকে নিজের ভুল-শুদ্ধ নিজেই নির্ণয় করতে শেখাবে এবং তাকে পরিবেশপ্রেম ও মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ করবে।
খ) 'আমার ছেলেবেলার কথা' — ডা. আবু সাঈদ
এটি একটি অত্যন্ত আবেগঘন এবং স্মৃতিতাড়িত আত্মজৈবনিক রচনা। লেখক তাঁর চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়ের এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের স্মৃতিচারণ করেছেন। ক্ষুধার্ত কঙ্কালসার মানুষের মেঠোপথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এবং নিজের একান্নবর্তী পরিবারে গমের তৈরি 'দলে' (আধাভাঙ্গা গম সেদ্ধ) খেয়ে ক্ষুধা নিবারণের গল্প পাঠকদের আবেগতাড়িত করে।
গল্পের মূল মোড় ঘোরে যখন লেখক নিজের দুপুরের খাবারের থালাটি ঘরের দরজায় আসা এক ক্ষুধার্ত মুমূর্ষু মানুষের হাতে তুলে দেন। এই ঘটনার পর তিনি কীভাবে পাড়ার মানুষের কাছে ভালোবাসার পাত্র হয়ে ওঠেন এবং এর ফলে তাঁর নিজের ভেতরেও অন্যের কষ্ট লাঘবের এক স্থায়ী মানবিক গুণ তৈরি হয়, তা অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তীতে বন্ধু আনসাদের বাবা খোরশেদ চাচার যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং টাকার অভাবে চিকিৎসা না পাওয়ার ঘটনা দেখে কিশোর লেখক প্রতিজ্ঞা করেন—
আমি ডাক্তার হব, তখন টাকা ছাড়াই চিকিৎসা করাব।
এই গল্পটি শিশুদের ত্যাগ, পরোপকার এবং জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের এক অনন্য শিক্ষণীয় দলিল।
গ) 'চোখের আড়ালে তবু বিস্মৃত হবার নন শিশু সাহিত্যিক কুলদারঞ্জন রায়' — আশুতোষ বিশ্বাস
এই দীর্ঘ ও গবেষণাধর্মী প্রবন্ধটি বাংলা শিশুসাহিত্যের এক প্রায়-বিস্মৃত স্বর্ণালী নক্ষত্র কুলদারঞ্জন রায়কে নিয়ে রচিত। লেখক শুরুতেই আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেছেন যে, আমরা শিশুদের যন্ত্রবৎ অনুশাসন আর প্রতিযোগিতার ইঁদুর-দৌড়ে ফেলে তাদের শৈশবকে ধ্বংস করছি। এরপর তিনি রায় পরিবারের শিশুসাহিত্যে একচেটিয়া আধিপত্যের ইতিহাস তুলে ধরেন। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছোট ভাই কুলদারঞ্জন রায় (যিনি সুকুমার রায়ের কাকা এবং সত্যজিৎ রায়ের ধনদাদু ছিলেন) ১৯১৩ সালে প্রকাশিত 'সন্দেশ' পত্রিকার অন্যতম প্রধান লেখক ছিলেন।
কুলদারঞ্জন রায়ের বহুমুখী প্রতিভা—যেমন চিত্রশিল্প, ফটোগ্রাফি, সঙ্গীত, ক্রীড়া (ক্রিকেট ও হকি) এবং অনুবাদ শিল্পে তাঁর অসামান্য অবদান এখানে আলোচিত হয়েছে। তিনি রবিনহুড, ওডিসিয়ুস, কথাসরিৎসাগর, এবং জুল ভার্নের 'দ্য মিস্টেরিয়াস আইল্যান্ড' (আশ্চর্য দ্বীপ) -এর মতো বিশ্বক্লাসিকগুলো সহজ বাংলায় রূপান্তর করেছিলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, বাংলা ভাষায় স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের 'শার্লক হোমস' (বাস্কারভিল কুকুর) -এর প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের কৃতিত্ব কুলদারঞ্জন রায়েরই। প্রবন্ধটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমাদের শিকড়ের মহান লেখকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক চমৎকার প্রয়াস।
ঘ) 'বিকশিত হই সাহিত্য সদানন্দে নতুন পৃথিবীপ্রাণ আমারই ছন্দে' — ফারিহা নূর
ফারিহা নূরের প্রবন্ধটি শিশু মনস্তত্ত্ব এবং শৈশবের সামগ্রিক বিকাশের বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক আলোচনার ওপর ভিত্তি করে রচিত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মননশীল রচনা। প্রবন্ধের শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উক্তি— "সহজ কথা যায় না বলা সহজে" উল্লেখ করে লেখিকা একটি চিরন্তন সত্যকে সামনে এনেছেন। তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে দেখিয়েছেন যে, ছোটদের জন্য সহজ ভাষায় গভীর জীবনবোধের সাহিত্য সৃষ্টি করা কতটা কঠিন এবং এই শিশুসাহিত্যই মূলত মানুষের পূর্ণাঙ্গ মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গঠনের প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে কাজ করে।
প্রবন্ধটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তাত্ত্বিক গভীরতা। তিনি বিখ্যাত শিক্ষাবিদ মারিয়া মন্টেসরি এবং মনোবিজ্ঞানী জ্যাঁ পিয়াজের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বের সার্থক অবতারণার মাধ্যমে তিনি শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত শিখন প্রক্রিয়া, কৌতূহল প্রবণতা এবং বয়সভেদে বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশের বিভিন্ন জটিল স্তরকে অত্যন্ত সহজ ভাষায় ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। একই সাথে, শৈশবে ছড়া, সুরময় গান এবং রঙিন ছবির মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে তিনি চমৎকার বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। এগুলো কীভাবে শিশুর শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বৃদ্ধি করে এবং সর্বোপরি সুপ্ত কল্পনাশক্তিকে ডানা মেলতে সাহায্য করে, তা এই প্রবন্ধে তাত্ত্বিকভাবে ও বাস্তবসম্মত উপায়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
পত্রিকার এ মূল প্রবন্ধটি বর্তমান যুগের অভিভাবক ও শিশুসাহিত্যিকদের জন্য একটি দিকনির্দেশনামূলক পাঠ। যান্ত্রিক যুগে যেখানে শিশুদের বিকাশ স্ক্রিন-নির্ভর হয়ে পড়ছে, সেখানে সুস্থ সাহিত্য ও নান্দনিক অনুষঙ্গ ছাড়া শিশুর মানসিক বিকাশ অসম্ভব। মনস্তত্ত্ব ও সাহিত্যের এই মেলবন্ধন প্রবন্ধটিকে সংকলনের অন্যতম সেরা ও পাঠকনন্দিত একটি তাত্ত্বিক রচনায় পরিণত করেছে।
ঙ) 'পাপেটম্যান মুস্তাফা মনোয়ার: ছোট-বড়ো সবার প্রিয়' এবং 'টোকাই আমার বন্ধু' — জাহিদ মুস্তাফা, সামছুল আলম আজাদ
এই রচনাদুটিতে বাংলাদেশের সংস্কৃতির দুই কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা হয়েছে। মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট শিল্প কীভাবে ষাট বা সত্তরের দশক থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের কল্পনাজগৎকে রাঙিয়েছে এবং তাদের মানসিক গঠনে অনন্য ভূমিকা পালন করেছে, তা চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, 'টোকাই আমার বন্ধু' লেখায় রফিকুন নবীর অমর কার্টুন চরিত্র 'টোকাই'-এর সঙ্গে এক মফস্বলীয় কিশোরের স্মৃতির মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে, যা তৎকালীন সামাজিক বৈষম্য ও জীবনবোধের এক চমৎকার চিত্র তুলে ধরে।
চ) ‘এআইয়ের যুগে রূপকথা কী কাজে লাগে’ — সাম্য রাইয়ান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর এই অতি-যান্ত্রিক যুগে শিশুদের কল্পনাশক্তি বাঁচিয়ে রাখতে রূপকথার উপযোগিতা নিয়ে লেখা সাম্য রাইয়ানের প্রবন্ধটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও চিন্তোদ্দীপক। লেখক দেখিয়েছেন যে, প্রযুক্তি যখন সবকিছুকে একটি নির্দিষ্ট ছকে বা অ্যালগরিদমে বেঁধে ফেলছে, তখন রূপকথা বা ফেয়ারিটেলস শিশুদের মনকে সেই ছকের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ডানা মেলতে শেখায়। রাক্ষস-খোকস, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী কিংবা জাদুর কাঠির এই গল্পগুলো শিশুর ভেতরে নৈতিকতা, সাহস এবং যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে আশাবাদী হওয়ার এক অবিনশ্বর মানবিক শক্তি জোগায়। প্রযুক্তির আগ্রাসনে যখন মানবিক আবেগ ও সৃজনশীলতা হুমকির মুখে, তখন রূপকথা কীভাবে শিশুর মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে, তা এই রচনায় খুব চমৎকারভাবে যুক্তি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ছ) সাহিত্য ভাবনা, সঙ্গীত, বিজ্ঞান ও চলচ্চিত্রের আলোচনা
এই বিভাগে পত্রিকাটির ভেতরের বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য ও গভীরতা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পেয়েছে। এখানে অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি রচনা কিশোর পাঠকদের মননশীলতাকে উসকে দিতে সক্ষম।
সুকুমার সাহিত্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপক: পত্রিকাটিতে সুকুমার রায়ের কালজয়ী দুটি সৃষ্টি 'আবোলতাবোল' ও 'হযবরল' গ্রন্থের ওপর একটি অত্যন্ত উঁচু মানের সাহিত্য সমালোচনা প্রকাশ করা হয়েছে। সাধারণ দৃষ্টিতে এগুলোকে নিছক ননসেন্স বা শিশুতোষ ছড়া-গল্প মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে থাকা সমকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক রূপকগুলোকে প্রবন্ধকার ছন্দা মাহবুব নিখুঁতভাবে উন্মোচন করেছেন। কীভাবে 'হযবরল'-এর আদালত কিংবা 'আবোলতাবোল'-এর অদ্ভুত চরিত্রগুলো তৎকালীন ঔপনিবেশিক সমাজের আমলাতন্ত্র ও সামাজিক অসংগতিকে ব্যঙ্গ করে, তা এখানে তাত্ত্বিকভাবে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
সঙ্গীত শিক্ষার গুরুত্ব: 'সঙ্গীত শিক্ষার গুরুত্ব' শীর্ষক সোহানা আহমেদের প্রবন্ধটি মানুষের আদিম ইতিহাসের পাতা থেকে শুরু করে তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীব হিসেবে গড়ে ওঠার মনোমুগ্ধকর বিবরণ দেয়। আদিম মানুষ কীভাবে প্রকৃতির গর্জন, পাখির ডাক আর ঝরনার শব্দ থেকে ছন্দের ধারণা পেয়েছিল এবং কীভাবে এই সুরের মেলবন্ধন মানুষের সমাজকে একত্রিত করতে সাহায্য করেছে, তা এখানে বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। শিশুদের জন্য সঙ্গীত চর্চা কেন কেবল একটি বিনোদন নয়, বরং তাদের মস্তিষ্কের গঠন, সংবেদনশীলতা এবং মানবিক গুণাবলি অর্জনের জন্য একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ, লেখক তা বিভিন্ন যুক্তি ও উদাহরণের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বিজ্ঞান বিভাগে 'আমাদের এই পৃথিবী': বিজ্ঞান বিভাগে স্থান পাওয়া সুশান্ত বর্মণের 'আমাদের এই পৃথিবী' বই রিভিউটি খুদে বিজ্ঞানমনস্ক পাঠকদের জন্য এক দারুণ উপহার। সত্যেন সেন রচিত মূল বইটিতে জটিল বৈজ্ঞানিক পরিভাষা এড়িয়ে অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় এতে আমাদের চেনা পৃথিবীর অজানা রহস্যগুলো উন্মোচন করা হয়েছে। পৃথিবীর অভ্যন্তরের উত্তপ্ত মজ্জার গঠন, অদৃশ্য ঢাল হিসেবে কাজ করা ভূ-চৌম্বকত্ব এবং মহাবিশ্বে আমাদের টিকিয়ে রাখা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখানে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা পাঠকদের মনে বিজ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ ও কৌতূহল সৃষ্টি করতে বাধ্য। আলোচনাটি পাঠ করে সত্যেন সেনের ‘আমাদের এই পৃথিবী’ বইটি পড়ার আগ্রহ জন্মাবে সবার।
'জোজো র্যাবিট' চলচ্চিত্রের আলোচনা: সবশেষে, নাৎসি জার্মানির অন্ধকার পটভূমিতে নির্মিত বিশ্বখ্যাত ব্যঙ্গাত্মক-নাট্য চলচ্চিত্র 'জোজো র্যাবিট' (Jojo Rabbit)-এর ওপর ভিত্তি করে একটি চমৎকার চলচ্চিত্র সমালোচনা এই পত্রিকায় স্থান পেয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একজন অবুঝ কিশোরের উগ্র জাতীয়তাবাদের অন্ধ মোহ এবং পরবর্তীতে এক ইহুদি মেয়ের সংস্পর্শে এসে তার সেই মোহভঙ্গ ও মানবতার জয়গান গাওয়ার গল্পটি এখানে খুব সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই সিনেমার রিভিউটি কিশোর পাঠকদের বৈশ্বিক ইতিহাস, ফ্যাসিবাদের কুফল এবং সামগ্রিকভাবে সিনেমা নামক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যমটিকে গভীরভাবে বোঝার ক্ষেত্রে দারুণ খোরাক জোগাবে। যেহেতু সিনেমাটি খুব প্রচলিত হয়, ফলে কিউআর কোড সংযুক্ত করার মাধ্যমো অনলাইনে প্রদর্শনের বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে।
পত্রিকাটির ইতিবাচক দিকগুলো হলো, গল্প বা কবিতা দিয়ে পত্রিকা ভরিয়ে ফেলার যে ঐতিহ্যবাহী ধারা, তা এড়িয়ে মনস্তত্ত্ব, বিজ্ঞান, অনুবাদ সাহিত্য, সঙ্গীততত্ত্ব, কার্টুন এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের মতো আধুনিক ও সময়োপযোগী বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি লেখার ভাষা অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, সহজবোধ্য এবং একই সঙ্গে সমৃদ্ধ, যা শিশুদের পড়ার অভ্যাস বা 'পাঠাভ্যাস' গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কুলদারঞ্জন রায়ের মতো বিস্মৃতপ্রায় ঐতিহাসিক চরিত্র কিংবা মুস্তাফা মনোয়ারের মতো পাপেট শিল্পীকে তুলে ধরে নতুন প্রজন্মকে সুস্থ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কিছু সীমাবদ্ধতার কথা বলি এবার। সূচনাসংখ্যাটিতে বড় বড় লেখক এবং গবেষকদের লেখা অত্যন্ত চমৎকার হলেও, শিশুদের নিজেদের লেখা গল্প, কবিতা বা আঁকা ছবি স্থান পেলে পত্রিকাটি আরও বেশি প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক হতো। যদিও প্রচ্ছদটি অসাধারণ, কিন্তু ভেতরের পাতাগুলোতে অলংকরণ বা স্কেচ নেই, যা শিশু-কিশোর পত্রিকার সাথে মানানসই নয়। শিশু-কিশোররা ছবির মাধ্যমে লেখার সঙ্গে বেশি সংযোগ স্থাপন করতে পারে। তাই পরবর্তী সংখ্যাগুলোতে লেখার পাশাপাশি রঙিন বা সাদাকালো স্কেচ ও ছবির ব্যবহার করা যেতে পারে। আরেকটা কথা, সূচিপত্র নিয়ে। গল্প, কবিতা এবং প্রবন্ধগুলো সূচিপত্রে আলাদা উপ-বিভাগে বিন্যস্ত থাকলে পাঠকদের পছন্দের লেখাটি খুঁজে পেতে আরও সুবিধা হতো।
পরিশেষে বলা যায়, 'কোথা পাবে পাখা সে' বর্তমান সময়ে শৈল্পিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধপর্বে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। স্মার্টফোন, ভিডিও গেম আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই অতি-যান্ত্রিক যুগে যখন শিশুদের শৈশব এক চারদেয়ালের ফ্রেমে বন্দি হয়ে যাচ্ছে, তখন এই পত্রিকা তাদের কল্পনার ডানা মেলার জন্য এক টুকরো নীল আকাশ উপহার দেয়। রংপুর বিভাগীয় শিশু সাহিত্য উৎসবের এই অনন্য প্রকাশনাটি প্রতিটি ঘরে ঘরে শিশুদের নিয়মিত পাঠসঙ্গী হয়ে উঠুক এবং দীর্ঘজীবী হোক এই প্রত্যাশা রইল। সুস্থ মনন ও মানবিক সমাজ গঠনে এই পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যার ধারাবাহিকতা অত্যন্ত জরুরি।
**********
কোথা পাবে পাখা সে
(শিশু-কিশোর সাহিত্য পত্রিকা)
সম্পাদক: সাজেদুল ইসলাম, সাম্য রাইয়ান
প্রচ্ছদ: ভ্যান গঘের 'পোর্ট্রেট অব কামিল রোলিন' অবলম্বনে
প্রকাশকাল: সূচনা সংখ্যা, জুলাই ২০২৬
প্রকাশক: খেলাঘর আসর, রংপুর জেলা কমিটি
পৃষ্ঠা: ৪৮
মূল্য: ১০০ টাকা

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম