সাদত হাসান মান্টো রচিত চিত্রনাট্য মির্জা গালিব বইটি একাধারে বহুমুখী শিক্ষা দেবে মনে করি। অতীত ঐতিহ্য, ইতিহাস, শিল্প সংস্কৃতি প্রভৃতির সাক্ষী থাকার মতো অনুভূতি লাভ হবে। মির্জা গালিব বইটির আলোচনা করার আগে আমাকে বইটির লেখক এর সম্পর্কে কিছু বলতেই হবে।
মান্টো ভারতের জাতি রাষ্ট্রের জন্মপর্বের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম গল্পকার। গালিবের অন্যতম ভক্ত ছিলেন তিনি। মির্জা কে নিয়ে যখন তিনি সিনেমা লিখছেন ও সেই সিনেমা তৈরি হয়েছে। তখন মান্টো নিজ দেশে পরবাসী হয়ে অন্যদেশের নাগরিক। পেশাগত দিক থেকে মান্টো রেডিও স্টেশন ও বিভিন্ন ফিল্ম কোম্পানিতে নাট্য, সিনেমা সংলাপ লেখালেখির কাজ করতেন। তিনি যেখানে সফলতা অর্জন করতেন সেই পেশাদারিত্বে সেই স্থানে আর বেশি দিন থাকতেন না। মির্জা গালিবের কবিতা নিয়ে মান্টো সাহেবের তেমন কোনো আগ্রহ না থাকলেও তার ব্যক্তিত্বের প্রতি ছিলো প্রবল আগ্রহ। দুইজন দুই সময়ের মানুষ। দু'জনই গুণী লেখক। ফিল্ম জগতে মান্টোর সবচেয়ে বড় কাজ মির্জা গালিবের চিত্রনাট্য। এই কাজ করতে গিয়ে মান্টোকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। এর জন্য মান্টো গালিবের লেখা চিঠি-পত্র ও নানাবিধ বই সংগ্রহ করেন। গালিবের সমসাময়িক রাজনৈতিক, সংস্কৃতি, ভাষা,পরিবেশ ও অবস্থা জানতে রাতদিন পড়াশোনা করেছিলেন। কাহিনীকে বাস্তব ও গালিবকে উপলব্ধি করার জন্য দিল্লি আর লখনৌর সমাজ নিয়েও বেশ পড়াশোনা করেছেন।
স্বাধীন ভারতে গালিবকে নিয়ে সিনেমা বানানো, সেটা আবার উর্দু ভাষায় তাহলে মহারাষ্ট্র, বাংলা বা অন্যান্য অঞ্চলে দেখার মত দর্শক পাওয়া যাবে তো? তখন তিনি ও তার বন্ধু সোহরাব মোদি সেই সময়ের পারদর্শী অভিনেতা-অভিনেত্রী আর শিল্পীদের অভিনয়ে সিনেমা তৈরি করতে ব্যস্ত হলেন। সিনেমা তৈরি হওয়ার পর সেন্সর বোর্ড সিনেমাটিকে আটকে দেয়। অভিযোগ ছিল এই যে, অভিনেত্রী সুরাইয়ার পোশাক যথেষ্ট শ্লীল নয়। সিনেমাতে ছুরি কাঁচি চালাতে বললেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। এখানেও মান্টোর ভাগ্য দোদুল্যমান।
সব শ্রম বৃথা হয়ে যাচ্ছে বলে সোহরাব মোদী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
এলাহবাদের বাসিন্দা নেহেরুজী খুব নিখুঁত উর্দু বলতে ও লিখতে পারতেন। তখন পর্যন্ত ভারতের দাপ্তরিক ভাষা ১২টি। নেহেরু নিজে ১৩ তম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে উর্দুকে জায়গা দিলেন।
সাক্ষাতের সময় সোহরাব মোদী যখন বয়ান করছেন, তখন সিনেমার অভিনেত্রী সুরাইয়া বলে উঠলেন
পন্ডিতজি, আপনি একবার আমার পড়া এই পোশাকের দিকে দেখুন তো! পুরনো কালে দিল্লির নারীরা এমন পোশাকই পরত।
সাব্যস্ত হলো নেহেরু মির্জা গালিব ছবির বিশেষ শো দেখবেন। ছবিটি নেহেরুর খুব ভালো লেগেছিলো। অতঃপর, নেহেরু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে বলেন সেন্সর বোর্ড যেন সিনেমাটি পুনর্বিবেচনা করে।
যেমন ছিলো গালিবের সময়ের দিনকাল
গালিবের সময় দিল্লিবাসী একদম ফুর্তিবাজ ও প্রাণবন্ত। এদিকে মোঘল সম্রাটদের সাম্রাজ্যের শাসন ক্ষমতা অস্তাচলে সেই জায়গায় ইংরেজরা নতুন ধরনের শাসনব্যবস্থা চালু করেছে। রাজ পরিবার আর শাহাজাদাদের সংখ্যাও ঢের। পুরনো সব অভিজাত পরিবারে নামে মাত্র আমির ওমরাহ আছেন, ইংরেজদের হাতে ঘটি বাটি বেচে দেয়া পরিবারও দেখতে পাওয়া যায়। এরা প্রত্যেকেই বৃত্তিভোগী। যাদের হাত শূন্য তারাও সবকিছু বিকিয়ে ফুর্তি আর তামাশা দেখতে সিদ্ধহস্ত। সে সময় দিল্লিবাসীদের সম্পর্কে অন্যান্য ভারতীয়রা জেনে গেছে
“দিল্লি কি দিলওয়ালি মু চিকনা পেট খালি” এর অর্থ এই যে দিলওয়ালা দিল্লি, মুখে রং পেট খালি।
গালিবের সময়ে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের আমলে রাখি-বন্ধন ,হোলি, দশহারা, দেওয়ালি, শিবরাত্রি, বসন্ত-পঞ্চমী পালন হতো। যাকে বলে সর্বমৈত্রী ভাবনার স্বাভাবিক বিস্তার।
বাদশা শাহজাহানের বড় ছেলে দারা শিকোহ সংস্কৃত থেকে যোগ বশিষ্ঠ অনুবাদ করেছেন। সেই সময়ে উপনিষদের ফারসি অনুবাদ করেছেন। সেই সময়েই মজমাউল ব্যাহরায়েন বা দুই সাগরের মিলন নামে এক বই লেখেন দারা শিকোহ্। তিনি সনাতন আর সুফি দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা করেন। এই ধারাকে কিছুদিনের জন্য আটকেছেন আওরঙ্গজেব, সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বাহাদুর শাহ ও মির্জা গালিব এই সমন্বিত জীবনধারা এক উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছিলেন। হিন্দু মুসলমানের উৎসব সংস্কৃতিতে এমন মৌসুম এলো যে ঈদ বা হোলি রইল, তবে সেখানে অপর সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের জন্য সব নিয়ম আচার হলো তৈরি।
যেখানে অংশগ্রহণ করলে অপরের জন্য অস্বস্তি না হয়। ইংরেজরা অবশ্য এই বোঝাপড়ার মাঝখানে ফাটল ধরিয়ে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা লাগানোর ধান্দা করেছিল দিল্লিতে কোরবানি ঈদে গরু জবাই করিয়ে। শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর ফরমান দিয়ে তা প্রতিহত করিয়েছিলেন। দেওয়ালির দিনে সারা দিল্লি আলোয় সাজতো। কেল্লায় হতো আলোর উৎসব। হিন্দুরা বসন্ত পঞ্চমী-পালন করতে আর মুসলমানরা বসন্ত-মেলা। জাতি ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাই বাসন্তী রঙের পোশাক পড়তেন।
গালিবের প্রেমিকার মৃত্যু
যৌবনের প্রথম দিকে একজন তাওয়ায়েফের প্রেমে পড়েছিলেন গালিব। তাওয়ায়েফরা ছিলেন নাচ, গান ও কাব্যে সুরসিক নারী। গালিবের আমলে তাদেরকে প্রচলিত ভাষায় ডোমনি বলা হত। এই প্রেম একতরফা ছিল না, তা গালিবের বয়ানে জানা গিয়েছিল। কোনো অজ্ঞাত কারণে গালিবের পক্ষ থেকে এক পর্যায়ে অবহেলা সইতে না পেরে সেই অজ্ঞাতনামা প্রেমিকার মৃত্যু হয়। গালিবের এই নাম না জানা প্রেমিকাকে প্রধান চরিত্রে রেখেছেন মান্টো। প্রেমিকার মৃত্যুর পর গালিব একটি গজল লিখেছিলেন বিগত দয়িতার স্মরণে।সেই গজলের শের এ গালিবের বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
“কেন এসেছিলে আমার দুঃখ মেটানোর ভাবনা তোমরা আমার কাছে এসে হলে নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু, হায় রে হায় ।
কিউ মেরি গমখোয়ারগি কা তুঝ কো আয়া থা খায়াল দুশমনি আপনি থি মেরি দোস্তদারি হায় হায়
অপবাদের লজ্জায় লুকোলে মাটির পর্দাতলে তোমার সঙ্গে শেষ হলো প্রেমের আবরণ টানা, হায় রে হায়
শর্মে রুসওয়ায়ি সে জা ছিপনা নাকাবে খাক মে খতম হ্যায় উলফত কি তুঝ পর পর্দাদারি হায় হায়
কেমন করে কাটবে এই বর্ষার রাতগুলো বলো তারা গুনে চোখের অভ্যাস রক্ত বওয়ানো, হায় রে হায়
কিস তারহা কাটে কোয়ি শাবহায়ে তারে বর্শগাল হ্যায় নযর খুকদায়ে আখতারশুমারি হায় হায়”
গালিবের জীবন চলতো ধার-কর্জ করে। কখনো বা শের শুনিয়ে রাজা বাদশাহের কাছে কিছু টাকা বকশিস পেতেন। পাশা খেলা সবসময়ই উপভোগ করতেন। তখন দিল্লির অভিজাত মহলে এটা কোন দোষের ছিল না। গালিবের সমস্যা ছিল অন্য একটি জায়গায়। ভারতের নৈতিক উন্নতি ঘটানোর জন্য ইংরেজরা কাজ শুরু করেছে। জুয়া খেলে ধরা পড়লে শাস্তি আর জেল জরিমানা।
জুয়ার দায়ে গালিবের কারাবাস
গালিব ভালো করেই জানতেন জুয়ার দায়ে জেল হতে পারে, তারপরেও তিনি ঘরে বসে টাকা বাজি রেখে জুয়া খেলেছিলেন। গালিবের কারাবাস হওয়ার আগে একবার একশো টাকা জরিমানা আদায় করেছিলেন। ইংরেজ প্রশাসনে গালিবের কিছু বন্ধু ছিলো এ কারণে হয়তো তার বেপরোয়া ভাব ছিলো। গালিব ভেবেছিলেন তাঁর বন্ধুরা তাকে রক্ষা করবে, পড়ে তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। সেই সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়-মির্জা সাহেবের ২০০ টাকা অর্থদণ্ড আর ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে কারাদণ্ডের মেয়াদ বাড়বে। ২০০ টাকার ওপরে আরও ৫০ টাকা প্রদান করলে সশ্রম হবে না।
উচ্চ আদালতেও গালিবের খালাস মেলেনি। তার প্রভাবশালী বন্ধুরা থাকার স্বত্ত্বেও কেন এমন হলো গালিব বুঝতে পারেননি। এর কারণ হিসেবে গালিবের লেখা একটা ফরাসি চিঠি থেকে মান্টো আবিষ্কার করেন যে, “কোতোয়াল ছিল আমার শত্রু” গালিবের শাস্তিতে দিল্লিতে খুব একটা আলোড়ন আর অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল বলে মনে হয়।
আবার পত্রিকায় প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল:
মির্জা সাহেব অনেকদিন ধরে অসুস্থ, তার খাবারের অনেক কাজ বিচার করতে হয়।
আর এমনিতেও তার যা শরীর, সেই শরীর দিয়ে একজন মেধাবী ও অভিজাত মানুষকে লঘু পাপে গুরু দন্ড সইতে হচ্ছে। এটা কখনো ন্যায় বিচার হতে পারে না।
বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছিলেন গালিবের মুক্তির জন্য। প্রশাসন নাকচ করে দিয়েছে।
মান্টো আর গালিবের সম্পর্কে কিছুটা ধারণার পর এখন মূল চিত্রনাট্যের ভেতরে প্রবেশ করা যেতে পারে। মান্টো তার এই চিত্রনাট্যের প্রারম্ভিক পৃষ্ঠা বিক্ষিপ্ত দৃশ্য দিয়ে শুরু করেছে এভাবেই যে,
দিল্লির অট্টালিকা, ভাঙ্গা ইটের সুরকি, পথ-প্রান্তরের পরিচিতির মধ্যে দিয়ে প্রথম দৃশ্যটি শুরু হয়। এই চিত্রনাট্যে মোট ৬৯টি দৃশ্য আছে। তার আগে চরিত্রগুলো একটু পরিচিতি জানতে পারলে সুখপাঠ্য হবে।
কাহিনির চরিত্র
- ১. মির্জা গালিব
- ২. উমরাও বেগম
- ৩. চৌদভি বেগম
- ৪. হাশমত খাঁ (কোতোয়াল)
- ৫. মালকা জান (চৌদভি বেগমের মা)
- ৬. ইলাহি বখশ মারুফ (উমরাও বেগমের বাবা)
- ৭. বাহাদুর শাহ জাফর
- ৮. জিনাত বেগম
- ৯. মুফতি সদরউদ্দিন আজুরদা
- ১০. শেখ ইব্রাহিম জওক
- ১১. হাকিম মোমিন খাঁ মোমিন
- ১২. বালমুকুন্দ হুজুর
- ১৩. নওয়াব মুস্তাফা খাঁ শেফতা
- ১৪. জনাব মুহাম্মদ আলী তাশনা
- ১৫. হাকিম আগা খান আয়েশ
- ১৬. কালু (মির্জা গালিবের পরিচারক)
- ১৭. ফিদ্দান (চৌদভির পরিচারক)
- ১৮. মথুরা দাস (মহাজন)
অন্যান্য চরিত্র
পুরদাস (গাইয়ে ভিক্ষুক), পানওয়ালি ছাবেলি, নওশাদ আলী, আরিফ, ব্রা, হাফিজ জি, খুরশিদ মিয়া, টিপু, নাজু, কালে শাহ সাহেব, শাহী তগার, মজদুর, সিপাহি, জেলার, রেসিডেন্ট বাহাদুর।
মূল চিত্রনাট্যের আলোচনা:
দিল্লির সরু প্যাঁচানো গলি। সেই পুরনো দিল্লির দৃশ্য, কুতুব মিনার, জামা মসজিদ, লালবাগ কেল্লা, দিল্লির ভেতরের বাজার রাস্তা। শহরের উজ্জ্বলতা সন্ধ্যার সময় অলিতে গলিতে জ্বলছে টিমটিমে বাতি। ধনী মানুষদের কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে বেহারাদের পালকী, ভিখারির ভিক্ষা পাত্রে পড়ছে পয়সা এমন বিক্ষিপ্ত কিছু দৃশ্যে শুরু হয়েছে এই চিত্রনাট্য।
বাদশা বাহাদুর শাহ জাফরের দরবারের নানাবিধ সাজসজ্জা ও চাকচিক্য। ভৃত্য দাঁড়িয়ে আছে আলমপনার আদেশ পালনের জন্য ।
দৃশ্য পরিবর্তন
মির্জার স্ত্রী উমরাও বেগম (নিগার সুলতানা), ঘরের মালকিন তার সাথে পাশে বসে আছে ভারতবর্ষের মির্জা গালিব তক্তে বসে। মির্জা জি হয়তো ফের রচনা করার জন্য বিড়বিড় করছেন।
মির্জাজির স্ত্রী ধর্মপরায়ণ নারী। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঘরোয়া কথাবার্তা চলছে সেই কথাবার্তায় বুঝা যায় মির্জা বেশ উদাসীন হয়ে সারাদিন বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা ও আসরে মেতে থাকে। এদিকে মির্জা আপন মনে শের তৈরি করছেন আর মুখে বিড়বিড় করতে থাকেন।
পরের দৃশ্যে দেখা যায় মাথায় টুপি পরা গলায় মালা লাঠিতে ভর করে সিড়ি দিয়ে আসছেন একজন বৃদ্ধ। মির্জাজির শশুর ইলাহী বখশ মারুফ গত পাঁচ দিন ধরে তার জামাতাকে দেখতে না পেয়ে মেয়ের কাছে এসেছে খবর নিতে। উপদেশ দিচ্ছেন মেয়ের প্রতি-
“বরকে তরফদারি করা ভালো।
এদিকে মির্জা ভেতর বাড়ি থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে ইলাহী বখ্স মারুফ এর সাথে কুশল বিনিময় করলেন। তিনি শুধালে বলেন কেল্লায় যাচ্ছেন। সোনালী নকশা করা গালিচা পাতা দামি ঝাড়বাতি ঝুলছে। শহরের আমির ওমরা এবং কাব্যজগতের সব লোকজন জমা হয়েছেন এরকম একটি পরিবেশের মধ্যে শাহানশাহা আলী ওয়াকার রাওয়ানিয়ে বাহাদুর শাহজাফর পদার্পণ করছেন। বাদশা আলমপনা হুকুম করেন শুরু করা হোক। সবাই সমস্বরে বিসমিল্লাহ বলে ওঠেন। রাজকীয় ঘোষক ঘোষণা করেন সুবহানির নক্ষত্রসম কবিতা পাঠের মাধ্যমে আসর শুরু করা হয়।
সবাই পাঠ শুনে “ওয়াহ্ ওয়াহ্ সুবাহানাল্লাহ” বলে প্রশংসার স্রোত বয়ে যাচ্ছে। শুরুতে বাদশার কবিতা পাঠ হয়, একে একে সরুজুদ্দিন আরজুরদা, বালমুকুন্দ হুজুর, শেখ ইব্রাহিম জওক। এতোক্ষণ শুধু প্রশংসার ফুলঝুরি গুঞ্জনে ভরে গেছে মুশায়ারা। ঘোষক বলে উঠলেন এবার জনাব মির্জা বেগ আসাদুল্লাহ খান গালিব। আরজুরদা বলল শোনান-
আজকে গালিবের শের শুনে শুধু আরজুরদা ও শেফতার খোলা গলায় 'ওয়াহ বহত খুব' বলল। অনেকেই গালিবের শের বুঝতে পারেনি, বিশেষ করে জওকের শিষ্যরা। মুশায়রায় নিরব পরিবেশ। মির্জা গালিব তখন বিড়বিড় করে বলেন কি বে-রসিকদের আসর…! আবার বিড়বিড় করে শের পড়েন
হ্যায় অওর ভি দুনিয়া মে সুখানওয়ার বহত আঁচ্ছে
ক্যাহতে হ্যাঁয় কে গালিব ক্যা হ্যায় আন্দাজে বয়া অওর
পৃথিবীতে আছেন আরো অনেক ভালো কবি
লোকে বলে গালিবের বলার ভঙ্গি অন্যরকম।
একটি কণ্ঠস্বর ভেসে আসে যে, আমরা এই আত্ম প্রশংসা শুনতে চাই না, আরেকজন বলেন কি বলছেন আমরা বুঝতেই পারছি না। এদের এমন আচরণ দেখে বিরক্ত প্রকাশ করে মির্জা তখন সেখান থেকে উঠে আসেন। আরজুদার দিকে তাকিয়ে বলেন আমি এখন উঠছি। মির্জা তার পরিচারক কাল্লুকে নিয়ে তখন অন্যদিকে পথ চলেন।
এই দৃশ্যে নীরব গলিতে পালকি আসছে। এক মেহরাবি দরজার পাশ দিয়ে পার হয়ে যায়। বিরান হয়ে আছে বাজার অন্ধকারে শুয়ে আছে দুটো চারপায়ে প্রাণী। প্রেক্ষাপটে শোনা যায় ফিদান মিয়ার সারেঙ্গীর আওয়াজ। এক বালাখানা থেকে মোতি ওরফে চৌদভি বেগমের কন্ঠ ভেসে আসে শের।
তাওয়ায়েফকন্যা চৌদভি কত আনন্দে ডুবে থেকে আত্মমগ্ন হয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যায়।
ইশক পর মোর নেহি হ্যায় য়ে ও আতশ গালিব
কে লাগায়ে না লাগে অওর বুঝায়ে না বনে
মির্জা পালকি থেকে নেমে আসেন। তারপর দাঁড়িয়ে শুনতে থাকেন। চেহারায় এক আশ্চর্য দ্বিধা দরজায় টোকা দেন। ওপার থেকে চৌদভি নিজেই দরজায় এসে দাঁড়ালেন। দরজার কপাট খোলে। এটাই চৌদভির সাথে মির্জার প্রথম দেখা। এখানে বলে রাখা ভালো যে চৌদভি কিন্তু মির্জা গালিবের অবয়ব চিনেন না। তাই অপরিচিত ব্যক্তি দেখে মাথায় ঘোমটা টেনে জিজ্ঞেস করেন
চৌদভি বেগম : “কে আপনি ? কার কাছে এসেছেন? "
মির্জাজী তখন বলেন মতির সাথে দেখা করতে চাইছি।
চৌদভি বেগম ওরফে মোতি তার মাকে জানান কেউ একজন দেখা করতে এসেছেন।
মালকাজান অর্থাৎ মোতির মা তখন ভেতর থেকে জানতে চায় কেন এসেছে? কথাগুলো মায়ের কাছ থেকে রিলে করে শোনায়। এখানে বুঝা যাচ্ছে যে চৌদভি বেগমের অপরিচিত ব্যক্তির সাথে কথা বলার অনাগ্রহ। ভদ্রলোককে উদ্দেশ্য করে বলে মা বললেন এত রাতে ভদ্রঘরের মানুষ কারও বাড়িতে কড়া নাড়ে।
জ্বি…আমি তো ভদ্র ঘরের মানুষ…. পাত্রি মুশায়রা থেকে ফিরছিলাম। আর এদিকে চৌদভি গালিব সম্পর্কে জানার জন্য নানাবিধ প্রশ্ন করেন এই অচেনা মানুষটাকে কারণ তিনি মুশায়রা গেছেন সেখানে গালিব শের পাঠ করেছেন। তার কন্ঠ কেমন দেখতে কেমন ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্নের বন্যা বইয়ে দিতে দিতে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন চৌদভি, মির্জা তখনো ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন। মির্জার সাথে কুশল বিনিময় হয় … মজার ব্যাপার স্বয়ং মির্জাকে চৌদভি জিজ্ঞেস করছেন তাঁর রূপ কেমন? আর তিনি নিজের বর্ণনা দিচ্ছিলেন চাঁপা ফুলের মতো গায়ের রং, দীর্ঘ দেহ দীর্ঘ হাত পা, সহজে রেগে যাওয়া লোক মনে হলো, জলদি রাগেন ও শান্ত হতে সময় লাগে।
চৌদভি তখনো জানতেন না তাঁর সামনে গালিব বসে, গালিব নিজেকে ছোট্ট একজন কবি হিসেবে পরিচয় দেন ও কিছুটা শের শুনিয়ে দেন। পানদানি থেকে রুপার তবক দেওয়া পান তুলে নিতে বলেন চৌদভি, আরও বলেন আপনার কবিতা বেশ ভালো।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে গালিব বলে উঠলেন, গালিবের বাপ দাদা সিপাহি দাঙ্গাবাজ ছিলো, তার কবিতা টবিতা ওনার সাধ্যের কারবার নয় বাপ দাদার পেশায় মনোযোগ দেওয়া উচিত। এই কথা শুনে গালিব অনুরাগী চৌদভি অচেনা লোককে (গালিব) বলেন আপনি এখন আসতে পারেন। চৌদভি কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করলেন।
বালাখানার বাইরের দৃশ্যে দেখা যায় হাতে ছড়ি ধরে আসছেন নগর কোতোয়াল হাশমত খাঁ। গালিবের সাথে প্রধান দরজায় মুখোমুখি হন। তারপর যে যার গন্তব্যে পৌঁছে এদিকে চৌদভি বেগম নিজ কামরায় বলছেন দরকার নাই এমন অতিথি যে আমার সামনে মির্জার নামে আজেবাজে বলে। হাশমত খাঁ মূলত চৌদভিকে গালিবের গজল মুশরায় থেকে টুকে এনে মোতিকে দিতো। মোতি ওরফে চৌদভিকে হাশমত জানান তোমার কামরা থেকে মির্জাকে চলে যেতে দেখলাম। এ কথা শোনার পর চৌদভি মির্জাজি.. মির্জাজি বলে পেছন থেকে ডাকতে শুরু করেন ততক্ষণে মির্জা চলে গেছেন।
মির্জা সাহেব বাড়ির ভেতরে এসে গলা খাঁকারানি দিচ্ছে …উমরাও বেগম ভেতরে আসতে বলছেন। পুরো ঘর যেন একটা মসজিদ সেরকম করে জায়নামাজ, রেহেল অগোছালো ভাবে ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। শশুরের বাড়িতে আর থাকবে না বাড়ি ছেড়ে দিবে। স্বামী স্ত্রীর কথোপকথনের মধ্যে এই দৃশ্য যবনিকা।
শাহ নাসির উদ্দিন ওরফে মিয়া কালে শাহ সাহেবের হাওয়েলিতে নতুন জায়গায় মির্জা ও তার স্ত্রীর সংসার জীবন। মথুরা দাস মহাজন মানুষ তার কাছে মাঝে মাঝে ধারদেন করে চলেন মির্জা গালিব। মহাজনী কারবারের খাতিরে মির্জার সাথে কথোপকথন চলছে। মির্জা সাহেব বলেন
লালা, আমাদের একটা কথা চালু আছে, কেউ যদি কারো তামার পয়সা শোধ না করে তাহলে তাকে শেষ বিচারের দিনে সোনার আশরাফি শোধ করতে হবে তুমি চিন্তা করো না।
মথুরা দাস বলে আমি তো আর আল্লাহর কাছে যাবো না। আমি তো ভগবানের কাছে হিসাব দেব। হাসতে হাসতে মহাজোটে বিদায় দেন গালিব। বাড়ির অন্দর মহলে বিবির সাথে কথোপকথন মির্জাজীর। এদিকে মুনশি সদরউদ্দিন আরজুর বাড়িতে আম খাওয়ার নিমন্ত্রণ পড়েছে সেখানে যান ও আম নিয়ে শের রচনা। … এক ভিক্ষুক বাইরে মির্জাজির গান গাইছে.. । অন্ধ ভিক্ষুক হাফিজ জি কীভাবে পেল তার শের।
হাফিজ বললেন
যদি বলেন তো এই কবিতা খোদার দান! তবে আমার পড়শি এক গাইয়ে আছেন। এই অসহায়কে মায়া করেন। আমাকে ডেকে মাঝে মধ্যে নতুন গান শেখান যেন খেয়ে দুটো পয়সা রোজগার করতে পারি।
তখন মির্জা তার সন্ধান করেন। মোতি বেগম এখন কিছু দিন থেকে চৌদভি বেগম নামে পরিচয় দেয়া শুরু করেছে। চৌদভি বেগমের কাছে তার পরিচারক ফিদ্দান মিয়া দুলকি চালে নাচতে নাচতে যায় আর নাম ধরে ডাকে। এদিকে চৌদভি বিরক্তি প্রকাশ করলে বলে ঠিক আছে, তুমি ঘুমাও। মির্জা সাহেব দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।
চৌদভি বেগমের তখন তাড়াহুড়ো বেড়ে যায়। মালকাজানকে বলে, মা তুমি আমার জামা বের করো চুল বেঁধে দাও। পরিপাটি হওয়ার তাগিদ বেড়ে যায়। আজ তার আরাধ্য মির্জা এসেছে, তার দরজায় অপেক্ষমান। কতো না আনন্দ, কতো না উচ্ছ্বাসে অস্থির হয়ে উঠলো তার মন। মাটির পাত্রে সুগন্ধি ঢেলে আগুন দেন, সুগন্ধি ধোঁয়া বের হয়ে আসে। নিজের দোপাট্টাকে সুন্দর করে গুছিয়ে নেন।
তারপর দরজা খুলে চৌদভি বেগম বললেন,
মির্জা সাহেব! আসুন, আপনার আগমন শুভ হোক। চৌদভি ভালো গাইয়ে…
একটা শের তুললেন গলায়
ও আয়ে হামারে ঘর মে খুদা কি কুদরত হ্যায়
কাভি হাম উনকো কবি আপনি ঘরকো দেখতে হ্যাঁয়।
মির্জাজি বলে উঠলেন, ডাক না পেলে তো আমি খোদার ঘরেও যাই না। চৌদভির সাথে ভাববিনিময়… মির্জা গালিব বলছে … কেবল খোদার কাছে অভিযোগ:
অঞ্জলি ভরে পানি করাও সাকি যদি আমায় ঘৃণা করো
পানপাত্র না দেবে তো দাও, শারাব তো দাও।
পিলা দে ওকে সে সাকি জো হ্যাম সে নফরত হ্যায়
পিয়ালা গড় নেহি দেতা না দে শরাব তো দে।
চৌদভি ও মির্জা গভীর ভাবে এখন মগ্ন। এদিকে নগর কোতোয়াল হাশমত খাঁ ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। হাতের লাঠি ঠুকে তাতে কেউ ভ্রুক্ষেপ করে না … মনে হয় একটা কাঁচের গ্লাস ভেঙ্গে যায়।
নগর কোতোয়াল বলে মোতি বেগমকে দামি গহনা দেয়ার জন্য। কিন্তু মোতি বেগম ওরফে চৌদভিকে রাজি করানো যায় না। কারণ মির্জার কবিতার ভালোবাসায় সে। মির্জা চলে যায়। মোতি হাশমতকে এক প্রকার প্রত্যাখ্যান করায় সে রাগে ডগমগ করে উঠে বলে, মির্জাকে আমি দেখে নেব। নগর কোতোয়াল মোতির মাকে বলে মোতির সাথে বিয়ে তারিখ ঠিক করতে। আগামী শুক্রবার বিয়ে।
পরবর্তী দৃশ্যে চৌদভি বেগমের ঘরে ফিদ্দানকে ডেকে পাঠানো হয়। ফিদ্দান কিছুটা কমেডি ধাঁচের। চৌদভি বেগম তার হাতে একটা চিঠি দিয়ে মির্জাকে দেয়ার জন্য পাঠিয়ে দেন।
এই দৃশ্যে দিল্লির একটা বাজারে পান বিক্রি করে ছাবেলি নামে একজন নারী। সে ফিদ্দানকে বলে অরে ও ফিদ্দান আজ কি পান খাবে না? ফিদ্দান হাতের ইশারায় না বলে কেটে পরে স্বভাববশত আবার ফিরে এসে ছাবেলির কাছে এসে বলে “খোদার কসম ছাবেলি আজ তোমাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে..। পান তো খেয়ে যাও কিন্তু ফিদ্দান থামে না।
পথে বন্ধু ঠিকাদার মুনশি জাহিদ আর টিপু মিয়ার চক্করে পরে, কয়েকজন নেশার ঘোরে ঘুমুচ্ছেন। খুরশিদ মিয়াও প্ররোচিত করে মারো টান ফিদ্দান। তখন ফিদ্দান ভাং খেয়ে চৈতন্য হারিয়ে পড়ে থাকে নেশার ঘোরে।
চৌদভি মঙ্গলবার ফিদ্দানকে পাঠিয়েছে বৃহস্পতিবার নাগাদ। আজও ফিদ্দানের দেখা নাই। বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠানের সরগরম চলছে। ফিদ্দান নেশায় বেহুঁশ হয়ে আছে। তারপর মনে পড়ে জরুরি চিঠি আছে। আবার চিঠি নিয়ে ছুটে দেরি হবে বলে।
চন্ডুখানার বাইরে ফকির বলছে আজ বৃহস্পতিবার, ভালো হোক সবার। ফিদ্দান শুনে তো চিন্তিত কালকে শুক্রবার আজ বৃহস্পতিবার মাঝখানে বুধবার গেল কোথায়? ফকিরের সাথে তর্ক করে কাজ নেই সে নেশায় বেহুঁশ হয়ে একটা দিন কাটিয়ে দিয়েছেন। ফকিরকে পয়সা দিয়ে ফিদ্দান মিয়া আর চলে এলো সোজা মির্জা গালিব সাহেবের ঘরে।
মির্জাকে চিঠি দেন আর বলেন খোদার শুকুর এই চিঠি আপনার জন্য এনেছি হুজুর। চিঠি নিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে চিঠি পড়া শেষে পকেটে রেখে দেন মির্জা সাহেব। মির্জার জুয়া খেলা একটা অভ্যাস আছে। সাদিক মিয়ার জুয়া খানায় খেলতে বসে মির্জা সাহেব। এদিকে চৌদভির ঘরে ফিদ্দান আসে উদ্বিগ্ন মুখে … চৌদভি বলে তার চিঠি পৌঁছে দিয়েছে কিনা। কি উত্তর দিয়েছে?
ফিদ্দান প্রত্যুত্তরে জানায়,
চিঠি পেয়েছি। অবস্থা জানতে পারলাম।
জুয়ার আসরে বসে গালিব জুয়া খেলছেন। আর এদিকে উঠতে চাইলে শর্ত বেঁধে বসিয়ে দিচ্ছিলো নওশাদ আলী। চৌদভিদের গলিতে বরযাত্রী যাচ্ছে। হাশমত খাঁর লোকজন আসছে। চৌদভির মনের অবস্থা ভালো নয়। মালকাজান মেয়েকে নিয়ে সাজঘরে প্রবেশ করলেন; এই সময় গালিবের আগমন। অসহায়ত্বের কাছে এক প্রকার বাধ্য হয়ে মালকা জান মেয়েকে বিকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। মির্জা সাহেব মালকা জানের হাতে টাকার থলে তুলে দেন। চৌদভিকে বাঁচানোর জন্য এর চেয়ে গালিবের আর উপায় জানা নাই। গালিব সিঁড়ি বেয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। বরযাত্রী এখন দরজায়। গালিব তার পেয়ারি চৌদভি বেগমকে নেওয়ার জন্য এসেছেন। চৌদভি বিছানায় বসেছিলেন। না দেখেই বললেন যে রুম থেকে বেরিয়ে যান। কেন এসেছেন আপনি? তখন কথা বলতে চাইলেও চৌদভি শোনার মতো অবস্থায় ছিলো না। গালিব নিরুপায় হয়ে সেখান থেকে বের হয়ে আসলেন। চৌদভি ভেবেছিলেন এটা নিশ্চিত নগর কোতোয়াল ছিলো। কিন্তু ততক্ষণে বড় ধরনের একটা ভুল হয়ে গেছে। তার হাতের কাছে অমাবস্যার চাঁদ পেয়েও দূরে ঠেলে দিয়েছেন অজান্তেই। পথে গালিবকে দেখে হাশমত খাঁ একটা শয়তানি বিজয়ের হাসি দিলেন। মালকাজান হাসমত খাঁ এর গায়ের উপর ছুড়ে মারে তাঁর দেয়া গহনা এবং স্পষ্ট বলে দেয় তাকে তার মেয়ের সাথে কখনো বিয়ে দিবে না।
তারপর গালিবের নতুন আবাস কালে শাহ এর বাড়িতে মথুরা দাস মহাজন আসেন, কর্জের টাকা পরিশোধ করতে বলেন। রাগ করে মির্জা কিছু কবিতা খসড়া দেন এই নিয়ে যাও, ভাই। মথুরা দাস বলে কে কিনবে এই কবিতা?
রামপুরের দরবারে নিয়ে যেতে পারো দু-চার পাঁচশো যা পাবে, তাই লাভ। পর্দার আড়ালে থেকে উমরাও বেগম সব শুনে তাঁর হাতে থেকে চুড়ি খুলে মহাজনকে দিয়ে দেন, যেন সেটা বিক্রি করে যেন অর্জনের পাওনা মিটিয়ে নেন।
নগর কোতোয়াল প্রতিশোধের আগুনে মির্জাকে হেনস্থা করার জন্য মথুরা দাসের কাছে থেকে পাওয়া টাকার কাগজটা (তমসুক) কিনে নিয়ে মহাজনী হিসেব চুকিয়ে নেন।
এবার কোতোয়াল এই তমসুক এর রেশ ধরে মির্জাকে সরকারি আদালতের কামরায় হাজির করান। কিন্তু এবার পরিকল্পনা সফল করতে পারেন নি কোতোয়াল হাসমত খাঁ। কারণ, মির্জার নামে মুফতি সদরউদ্দিন দুই হাজার টাকা আদালতে দাখিল করেছেন। আদালত মূলতবি হওয়ার পর মির্জা গালিব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মুফতি সাহেবের প্রতি। আর মুফতি সাহেবের ভাতিজার বিয়ের দাওয়াত পান মির্জা গালিব। শেখানে কিছু শের শোনানোর জন্য আহ্বান করেন মুফতি সাহেব।
এই দৃশ্যে বিয়ে বাড়িতে সদরউদ্দিন বললেন বন্ধুরা, অন্দরমহল থেকে ফরমাশ এসেছে মির্জা যেন তার গজল শোনান। আসরের সবাই নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই ধ্বনিতে উঠে দাঁড়ান।
“ইশক মুঝকো নেহি ওয়াহশত হি সহি” গজল গাইতে শুরু করেন মির্জা… এক পর্যায়ে বাহ্ সুবাহানাল্লাহ ধ্বনিতে ভরে। চৌদভি বেগম উচ্চ স্বরে তখন বলে উঠলেন মির্জা সাহেব! আহা! মির্জা সাহেব। পরের ভুলে যাওয়া অংশটুকু চৌদভি বেগম ধরেন …
“মেরে হোনে যে যায় কেয়া রুসওয়ারি”
ভুলে যাওয়া শের মনে পড়ে যাওয়ায় মির্জাজি বলে উঠেন - ইয়া আল্লাহ…! আসর শেষে অনেক প্রশংসা পেলেন। বিয়ে বাড়ি থেকে বাইরে আসেন। চৌদভি পেছনে থেকে ডাকেন মির্জাজি! মির্জাজি!
এখানে সম্পর্কের বোঝাপড়া অনেকটাই হয়। মির্জা সাহেব তার অবস্থান থেকে চৌদভিকে স্ত্রী স্বীকৃতি দিয়ে গ্রহণ করতে পারেনি ঠিকই।
কিন্তু মনে প্রাণে ভালোবাসতেন চৌদভি বেগমকে। এমনকি এরকমটাও বলছেন মির্জা…
“চৌদভি আমাকে পাপী বানিয়ো না। আমি আগে থেকেই হৃদয় আর বুদ্ধির দোটানায় পড়ে মরছি। হৃদয় আমাকে তোমার দিকে টেনে নিয়ে যায়…”
অতঃপর চৌদভি মির্জাকে আমন্ত্রণ জানান।
পরের দৃশ্যে মির্জার ঘরে বিবি উমরাও বেগম এর সাথে কথোপকথন। মির্জাজীকে তাঁর স্ত্রী বলেন আপনি আরেকটা বিয়ে করুন। এই যেন ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত ভালোবাসার দ্যুতি ছড়িয়ে প্রেমের দেবী উমরাও বেগম। স্বামীর মনের সকল ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে স্ত্রীর গুরু দায়িত্ব পালন করছেন। অবশ্য মির্জা সাহেব দ্বিতীয় বিয়ে করতে না রাজি।
এরপর ঘটনা মোড় নিচ্ছে ধীরে ধীরে…মালক জান চৌদভির মা বলে যে তুই মরছিস তো মরেছিস এমন নির্দয়ের প্রেমে … চৌদভি ঠিক করেন তিনি নাচবেন রাজদরবারে। রাজ দরবারের মুশয়েরায় মির্জার যে সম্মান হানি হয়েছে এমনটা না হয়ে যেন মির্জা আবার সম্মান পায়। বাদশার রাজদরবারের চৌদভি নাচে ও গায়। মির্জার গজল গেয়েছেন তিনি। তাঁকে পুরস্কার করতে চাইলে তিনি বলেন এই গজল যার তার এই পুরস্কার প্রাপ্য
এই দৃশ্যে বাদশাহ বাদশা সালামত সিংহাসনে আসীন। গালিব আদাব জানিয়ে দরবারে প্রবেশ করেন।
বাহাদুর শাহ জাফর গালিবের শেরকে ঈর্ষা করেন বলে গালিবকে জানান আর ঘোষণা করেন যে, আপনাকে দবিরুল মূলক আর নিজাম জংগ উপাধিতে ভূষিত করা হলো। আজ থেকে আপনি দরবারের বিশেষ কবি হিসেবে গণ্য হবেন। বাদশা খেলাত পরিয়ে দেন। এই পুরস্কৃত হওয়ার খবর ফিদ্দান মিয়া গিয়ে চৌদভিকে জানান। চৌদভিও রীতিমতো অনেক খুশি হয়।
নগর কোতোয়াল হাশমত খাঁ নওশাদকে নিয়ে পাশা খেলায় ফন্দি আঁটে। মির্জার ঘরের সামনে এসে নওশাদ আলী বলেন, মির্জা হয়ে যাক এক দান। মির্জা আজ নয় কালকে এই আহ্বান গ্রহণ করবে বলে জানান। এদিকে চৌদভি বেগম মির্জার অপেক্ষায় রইলেন। চৌদভির মা বললেন আমাদের চমকে দিয়ে পালিয়ে গেছে হয়তো তোমার দুদিনের কোকিল।
আড্ডায় জুয়াড়িরা খেলছেন নওশাদ ও মির্জাও ছিলেন সেখানে দৃশ্যত খেলায় মগ্ন। ইতিমধ্যে হাসমত খাঁ যিনি নগর পিতা। ঘোড়ার পিঠে চড়ে নগর কাঁপিয়ে বেড়ান। তিনি এসে বললেন কি হচ্ছে এসব নওশাদ! এ নিজাম জংগ উপাধি ভূষিত মির্জা আসাদুল্লাহ খাঁন গালিবও দেখছি আছে তোমার সাথে। সিপাহিকে সাথে নিয়ে সব আলামত উঠিয়ে নেন আর সবাইকে গ্রেফতার করার হুকুম দেন। দিল্লির বাজার গলিতে চলছে নওশাদ যিনি কোতোয়ালের পাঠানো দূত তার প্ররোচনায় গালিবও সহযাত্রী। গালিবের অপদস্থ হওয়ার সাক্ষী হচ্ছে এই বাজার ও রাস্তাঘাট। যেখানে মির্জার সম্মান ধুলায় লুটাচ্ছে আর সেখানে হাসমত খাঁ বুক ফুলিয়ে হাঁটছেন। দুই একজনকে বিদ্রুপ করতেও দেখা যায়। ফিদ্দান মিয়া এই দৃশ্য দেখতে পান মির্জার হাতে কড়া পড়ানো কোতোয়াল তাঁকে সিপাহিদের দ্বারা ধরে নিয়ে যাচ্ছে জুয়া খেলার অপরাধে। এই সংবাদ চৌদভিকে জানান ফিদ্দান মিয়া।
চৌদভি হাসমত খাঁর হাত ধরে বলে ছেঁড়ে দাও মির্জা সাহেবকে। তোমার পায়ে পড়ি কোতোয়াল সাহেব তবু মির্জাকে ছেড়ে দাও। হাসমত কোনো কথাই শুনলেন না তিনি মির্জাকে নিয়ে চলে গেল। চৌদভি বেগমের গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দেয়াতে মালকাজান অভিশাপ দিতে থাকে নগর কোতোয়ালকে।
জেলখানার দৃশ্য এখানে মির্জার শ্যালিকার ছেলে আরিফ দেখতে আসেন। শাহী দরবার থেকে চৌদভির অনুরোধে মির্জাজিকে মুক্তি দেয়ার সুপারিশ করেন বাদশাহ আলমপনা। এ যেন লঘু অপরাধে গুরু দন্ড সইতে হচ্ছে গালিবকে। গালিবের কয়েদ হওয়াতে সারা দিল্লি শোকার্ত।
আরজুদা হাশমতকে বলেন কে অপরাধী? আমি জানতে চাই মির্জার কাছে পাঠানো নওশাদ কী তোমার লোক নয়? এই দৃশ্যে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উমরাও ও চৌদভি বেগম একসাথে এসে মাজারে প্রার্থনা করেন। চৌদভি জানতে পারে মির্জাজির বিবি উমরাও বেগম। চৌদভি অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি হেরে গেছেন জীবনের মামলায়। তারা মা মেয়ে সিদ্ধান্ত নেন আর এখানে থাকবেন না। অন্যত্র চলে যায় সেই রাতে।
জেলখানার বাইরের দৃশ্যে মির্জা জেল থেকে বের হন সবাই তাকে অভিনন্দন জানান। তারপর একদিন হাফিজজির দেখা পান মির্জ সাহেব। তিনি চৌদভির কথা জিজ্ঞেস করেন চৌদভি কোথায় গেছে কিছু জানেন কিনা। হাফিজজি একটা তথ্য দেন।
সেই তথ্য অনুযায়ী মেহরোলির সরাইখানাতে একটা খুঁজতে খুঁজতে ভাঙাচোরা ঘরে এসে পৌঁছান মির্জা গালিব। গালিব দরজার সামনে এসে ডাক দেন চৌদভি। চৌদভি আমি এসেছি। এসেছো আমার নওশা এই বলে চৌদভি গালিবের বুকে মাথা রাখে। উদ্বিগ্ন নিয়ে চৌদভির দিকে তাকিয়ে থাকে গালিব। চৌদভির চোখের মণি কোঠায় কবির ছবি… ধীরে ধীরে চৌদভির মাথা ঢলে পড়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত থেকে খসে পড়ে প্রথমদিনের উপহার স্বরূপ গালিবের দেয়া মুদ্রা। মালকা জান আকুল হয়ে কাঁদতে থাকে।
চৌদভি বেগমের শবযাত্রা। বাতাসে ভেসে আসছে হৃদয় বিদীর্ণ করা বেদনার্ত কন্ঠ। একদিকে তা কাঁধে নিয়েছেন গালিব। অপরদিকে লোকজন কাঁধ বদলাতে থাকে। বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গালিব। শব সমাধিতে রাখা হয়। পেছনে থেকে আসেন উমরাও বেগম চৌদভির সমাধিতে মাটি দেন ও কিছু ফুল ছিটিয়ে। এরপর চৌদভি বেগমের আত্মার মাগফিরাত কামনায় প্রার্থনা করেন। বেদনার্ত গালিব কাঁধে হাত রাখেন উমরাও। মির্জা আর উমরাও ধীরে ধীরে কবরস্থান থেকে প্রস্থান করেন। ধীরে ধীরে ক্যামেরা ফেড আউট হয় ।
সাদত হাসান মান্টোর জীবনে সবচেয়ে বড় কাজ ও গুরুত্বপূর্ণ চিত্রনাট্য ছিলো এই মির্জা গালিব বইটি। যেটি কোনো পাঠক একবার কয়েক পৃষ্ঠা পড়তে শুরু করলে বইয়ের পাতায় মশগুল হয়ে থাকবে। উর্দু থেকে বাংলায় অনুবাদ বইটিতে হয়তো কিছু শব্দ বুঝতে সমস্যা হতে পারে। আর নিয়মিত পাঠক হলে কোনো ঝুঁকি নেই। অনায়াসে এক দুই বসাতে বইটি শেষ করতে পারবেন।
***********
মির্জা গালিব
সাদত হাসান মান্টো
অনুবাদক: মোঃ আসাদুজ্জামান
প্রচ্ছদ: রূপক
প্রকাশক: শব্দশিল্প, ঢাকা
প্রকাশকাল : এপ্রিল, ২০২৬
মুদ্রিত মূল্য : তিনশত টাকা মাত্র
পৃষ্ঠা: ১২৬
ISBN: 9789849693338

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম