দোলো আমার কনক চাঁপা - আহমদ ছফার শিশুসাহিত্যে শৈশব, স্বপ্ন ও পৃথিবীকে নতুন করে দেখার গল্প- সৌরভ বাঙালী

আহমদ ছফার দোলো আমার কনক চাঁপা বইয়ের প্রচ্ছদ

আহমদ ছফাকে আমরা যখন স্মরণ করি, তখন প্রথমেই যে মানুষটির কথা মনে পড়ে তিনি তর্কপ্রবণ, নির্ভীক, প্রতিষ্ঠানবিরোধী এবং গভীরভাবে চিন্তাশীল একজন লেখক। তাঁর লেখার সঙ্গে প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে; জড়িয়ে থাকে সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের অন্তর্গত সংকট। সেই ছফাকে সামনে রেখে যদি তাঁর শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা ‘দোলো আমার কনক চাঁপা’ হাতে নেওয়া হয়, প্রথমেই একটু বিস্মিত হতে হয়। এত পরিচিত একজন কঠিন স্বভাবের চিন্তকের কলমে শিশুর জন্য গল্প—কেমন সেই গল্প?

বইটি পড়তে পড়তে বোঝা যায়, ছফা এখানে তাঁর চিন্তাশীল সত্তাকে বিসর্জন দেননি; বরং তাকে অন্য একটি দরজা দিয়ে শিশুর জগতে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ফলে এই বই নিছক ছোটদের বিনোদনের গল্পসংকলন নয়। এর গল্পে আছে কল্পনা, রূপকথার আবহ, হাস্যরস, বিস্ময়, অদ্ভুত ঘটনা, স্বপ্ন এবং বন্ধুত্ব; কিন্তু এসবের নিচে রয়েছে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পৃথিবীকে বোঝার অভিজ্ঞতা। ফলে বইটি পড়ার আনন্দ এক বয়সে এক রকম, আরেক বয়সে অন্য রকম।

‘দোলো আমার কনক চাঁপা’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে; প্রচলিত একটি সংস্করণে বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯১। বইটি আজও শিশু-কিশোর সাহিত্যের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে, আবার আহমদ ছফা রচনাবলির পঞ্চম খণ্ডেও এটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু এত বছর পর বইটির দিকে ফিরে তাকালে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় মনে হয় এর প্রকাশকাল নয়; বরং 

শিশুর জন্য লিখতে গিয়ে একজন প্রাপ্তবয়স্ক লেখক নিজের পৃথিবীকে কতখানি বদলে নিতে পেরেছিলেন

—এই প্রশ্ন।


ছোটদের জন্য লেখা, কিন্তু শুধু ছোটদের বই নয়

‘দোলো আমার কনক চাঁপা’র গল্পগুলোকে একই ছাঁচে ফেলা যায় না। বইয়ের গল্পগুলোর মধ্যে আছে

  • আমির সওদাগর
  • সোনা পুতুল
  • ঘোড়া চুরির সাক্ষী
  • দুটি মর্মর মূর্তির কাহিনী
  • স্বপ্ন সমুদ্দুর
  • দোলো আমার কনক চাঁপা

—অর্থাৎ একই বইয়ে লোককথার ঢঙ, রূপকথার উপাদান, কল্পবিজ্ঞানঘেঁষা ভাবনা এবং শিশুমনের স্বপ্ন—সবকিছুর সহাবস্থান।

এই বৈচিত্র্য বইটির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ছফা যেন শিশুদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ধরনের গল্প লেখার বদলে তাদের সামনে একাধিক দরজা খুলে দিয়েছেন। একটি দরজা দিয়ে ঢুকলে দেখা যায় পুরোনো দিনের গল্প বলার পৃথিবী, অন্যটি দিয়ে গেলে দেখা যায় অদ্ভুত ও অসম্ভবের জগৎ, আরেকটি দরজা দিয়ে গেলে পৌঁছানো যায় এমন এক মানসিক ভূখণ্ডে যেখানে বাস্তবের চেয়ে স্বপ্ন বড়।

এই কারণে বইটির সাফল্য কোনো একটি গল্পের ‘চমক’-এর ওপর নির্ভর করে না। বরং বইটি পড়ার পর যে সামগ্রিক অনুভূতিটি থেকে যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ—

পৃথিবীকে শুধু যেমন দেখা যায় তেমন নয়, অন্যভাবেও দেখা যায়।

শিশুসাহিত্যের জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত জরুরি।


‘আমির সওদাগর’: পুরোনো গল্পের নতুন পাঠ

‘আমির সওদাগর’- এর মধ্যে আমরা গল্প বলার একটি পুরোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হই। সওদাগর, যাত্রা, দূরদেশ, বিপদ, অজানা অভিজ্ঞতা— এসব উপাদান বাংলা ও উপমহাদেশীয় লোককথার ভুবনে বহুদিনের পরিচিত।

কিন্তু ছফার কাছে গল্পের এই পুরোনো উপকরণগুলো নিছক পুনরাবৃত্তির বস্তু নয়। তিনি এগুলোর সাহায্যে শিশুকে এমন একটি পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, যেখানে নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে আরও অনেক কিছু আছে। আজকের শিশুর কাছে পৃথিবী হয়তো মানচিত্র, ইন্টারনেট বা ভিডিওর মাধ্যমে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে; কিন্তু গল্পের সময়ে দূরদেশের ধারণাই ছিল কল্পনার এক বিশাল ক্ষেত্র।

এই গল্পের তাৎপর্য তাই শুধু তার ঘটনায় নয়। 'অজানার প্রতি আকর্ষণ' শিশুমনের একটি মৌলিক প্রবৃত্তি। ছফা সেই প্রবৃত্তিকে কাজে লাগিয়েছেন।

এখানে তিনি শিশুকে পরামর্শ দেন না যে— ‘অজানাকে জানতে হবে’। বরং গল্পের ভিতর দিয়েই অজানাকে আকর্ষণীয় করে তোলেন। ভালো শিশুসাহিত্যের এটাই শক্তি।


‘সোনা পুতুল’: খেলনার মধ্যে মানুষ

‘সোনা পুতুল’ নামটি শুনলেই রূপকথার কথা মনে হয়। কিন্তু ছফার এই গল্পের আকর্ষণ কেবল পুতুল বা অলৌকিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পুতুলের মতো জড় বস্তু যখন গল্পের কেন্দ্রে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষ ও জড়ের পার্থক্য, আকাঙ্ক্ষা ও মূল্যবোধের প্রশ্ন সামনে আসে।

শিশুর কাছে পুতুল জীবন্ত। সে পুতুলকে খাওয়ায়, সাজায়, তার সঙ্গে কথা বলে, বিয়ে দেয়, কখনো তার ওপর অভিমানও করে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কাছে এটি নিছক খেলা; শিশুর কাছে তা বাস্তব অনুভূতির বিষয়।

ছফা এই শিশুমনের সত্যটিকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তবে এখানেই গল্পটির দ্বিতীয় স্তর তৈরি হয়। পুতুলের জগত আসলে মানুষের জগতের একটি ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। সেখানে সম্পর্ক তৈরি হয়, মূল্য নির্ধারিত হয়, আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। ফলে শিশুর খেলার জগত আর প্রাপ্তবয়স্কের বাস্তব জগত সম্পূর্ণ আলাদা থাকে না।

এই দ্বৈততাই গল্পটির সৌন্দর্য।

শিশু গল্পটি পড়তে পারে পুতুলের কাহিনি হিসেবে; প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক সেখানে মানুষের তৈরি মূল্যবোধের একটি ছোট প্রতিচ্ছবি দেখতে পারেন।


‘ঘোড়া চুরির সাক্ষী’: হাসির ভিতরে গল্প বলার কৌশল

‘ঘোড়া চুরির সাক্ষী’ গল্পটি বইয়ের অন্য গল্পগুলোর তুলনায় আলাদা স্বাদের। এখানে ঘটনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কৌতুক ও বুদ্ধির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

লোকগল্পের একটি বড় শক্তি হলো—তার গল্প বলার ভঙ্গি। সেখানে জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নেই; আছে পরিস্থিতি, ভুল বোঝাবুঝি, বুদ্ধির খেলা এবং শেষ মুহূর্তের মোচড়। শিশুর কাছে এই ধরনের গল্প সহজে গ্রহণযোগ্য, কারণ গল্পের আনন্দ অনেকটাই আসে ‘এরপর কী হলো’ জানার আগ্রহ থেকে।

ছফা এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। ফলে এখানে তাঁর ভাষা ও বর্ণনার ভেতরে একজন গল্পকথকের স্বর শোনা যায়।

এই গল্পটির গুরুত্ব হয়তো এই কারণে যে এটি বইয়ের চিন্তাশীল অংশগুলোর ভার কিছুটা কমিয়ে দেয়। পুরো বই যদি কেবল স্বপ্ন, দর্শন ও ভাবনার দিকে ঝুঁকে থাকত, তাহলে শিশুর পাঠে এক ধরনের ভার তৈরি হতে পারত। ‘ঘোড়া চুরির সাক্ষী’র মতো গল্প সেই ভার ভাঙে।

শিশুসাহিত্যে হাস্যরসের কাজ শুধু হাসানো নয়। এখানে বরং  

হাসি পাঠককে লেখকের কাছাকাছি নিয়ে আসে।

‘দুটি মর্মর মূর্তির কাহিনী’: ছফার কল্পনার পরীক্ষা

বইটির সবচেয়ে অস্বাভাবিক গল্পগুলোর একটি ‘দুটি মর্মর মূর্তির কাহিনী’। এই গল্পে ছফা বাস্তবতার স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।

শিশুসাহিত্যে কল্পনা মানে শুধু জাদু নয়। কল্পনা হলো এমন একটি মানসিক ক্ষমতা যার সাহায্যে পাঠক বাস্তব জগতের নিয়মকে সাময়িকভাবে সরিয়ে রেখে অন্য একটি সম্ভাব্য জগতে প্রবেশ করতে পারে।

ছফা এই গল্পে সেই সম্ভাবনাটিই পরীক্ষা করেছেন।

তবে গল্পটির মূল্যায়নে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার— সব ধরনের কল্পনা শিশুর কাছে সমান স্বচ্ছ নয়। একটি গল্পের ধারণা যত অভিনবই হোক, যদি তার আবেগগত সংযোগ দুর্বল হয়, তাহলে পাঠক গল্পের ভেতরে পুরোপুরি ঢুকতে পারে না। এই গল্পটি সেই দিক থেকে বইয়ের সবচেয়ে বিতর্কযোগ্য অংশগুলোর একটি হতে পারে।

কিন্তু এটিকে ব্যর্থতা বলে সরিয়ে দেওয়া সহজ হবে না। কারণ ছফা এখানে অন্তত প্রচলিত শিশুসাহিত্যের নিরাপদ পথে হাঁটেননি। তিনি শিশুর কল্পনাশক্তিকে একটু অচেনা অঞ্চলে নিয়ে যেতে চেয়েছেন।

সাহিত্যের ইতিহাসে পরীক্ষার মূল্য এখানেই।


‘স্বপ্ন সমুদ্দুর’: শিশুমনের সবচেয়ে গভীর অঞ্চল

‘স্বপ্ন সমুদ্দুর’ নামটির মধ্যেই গল্পটির চাবিকাঠি আছে।

সমুদ্রের সঙ্গে স্বপ্নের একটি গভীর সম্পর্ক আছে। সমুদ্রের শেষ দেখা যায় না; স্বপ্নেরও সীমা নির্ধারণ করা যায় না। শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণাও এমনই—সে জানে না সামনে কী আছে, কিন্তু অসংখ্য সম্ভাবনা কল্পনা করতে পারে।

এই গল্পকে কেবল একটি কিশোরের স্বপ্নের কাহিনি হিসেবে পড়লে তার পরিসর ছোট হয়ে যায়। এখানে আসলে বড় হয়ে ওঠার আগের সেই অবস্থাটিকে দেখা যায়, যখন ভবিষ্যৎ এখনও সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়নি।

প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জানে পৃথিবীর সীমা কোথায়, কোন স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়া কঠিন, কোন আকাঙ্ক্ষা সামাজিক বাস্তবতায় আটকে যাবে। শিশুর কাছে সেই সীমারেখা এখনও স্পষ্ট নয়।

ছফা এই অস্পষ্টতার সৌন্দর্য ধরতে চেয়েছেন।

এই কারণেই বইটির স্বপ্ন-নির্ভর গল্পগুলোকে আমি এর কেন্দ্রীয় অংশ বলে মনে করি। কারণ এখানে ছফা সবচেয়ে বেশি তাঁর নিজের প্রাপ্তবয়স্ক জগত থেকে দূরে সরে গিয়ে শিশুর সম্ভাবনার দিকে তাকান।


‘দোলো আমার কনক চাঁপা’: শিরোনাম গল্পের তাৎপর্য

সবশেষে আসে সেই গল্প, যার নামে পুরো বইটির নাম।

‘কনক চাঁপা’ একটি ফুল। কিন্তু সাহিত্যে ফুল কখনো শুধু উদ্ভিদ নয়। ফুলের সঙ্গে স্মৃতি থাকে, ঋতু থাকে, গন্ধ থাকে, সৌন্দর্য থাকে, কখনো প্রিয়জনের উপস্থিতিও থাকে।

‘দোলো’ শব্দটি সেই ফুলকে স্থির থাকতে দেয় না। যেন বাতাসে তার দোলন আছে। আর এই দোলনকে যদি বইটির সামগ্রিক মানসিকতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, তাহলে নামটি আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

শিশুর মনও স্থির নয়। সে এক মুহূর্তে বাস্তবে, পরের মুহূর্তে কল্পনায়; একবার খেলায়, পরক্ষণেই স্বপ্নে। তার আবেগ দ্রুত বদলে যায়, কিন্তু সেই আবেগ মিথ্যা নয়।

ছফা এই অস্থিরতাকে ধরতে চেয়েছেন।

শিরোনাম গল্পটির সবচেয়ে বড় সাফল্য তাই কোনো বিশেষ ঘটনা নয়; বরং তার আবহ। এখানে শৈশবকে দূর থেকে দেখা হয়নি। তাকে অনুভব করার চেষ্টা আছে।

এই কারণেই ‘দোলো আমার কনক চাঁপা’ নামটি পুরো বইয়ের জন্য যথার্থ। বইয়ের সব গল্প একই ধরনের নয়, কিন্তু তাদের মধ্যে একটি সাধারণ দোলা আছে—

বাস্তব থেকে কল্পনায়, বর্তমান থেকে স্মৃতিতে, শিশুর জগত থেকে প্রাপ্তবয়স্কের চিন্তায়।

ছফার নিজের সময় বইটির ভিতরে

১৯৬৮ সালকে ভুলে গেলে বইটির অনেক কিছুই বোঝা যাবে না। এটি এমন একটি সময়ের লেখা, যখন বাংলাদেশের সমাজ আজকের মতো নগরায়িত, প্রযুক্তিনির্ভর বা বিশ্বায়িত ছিল না। বইটির জীবনজগত তাই স্বাভাবিকভাবেই অন্যরকম।

কিন্তু ছফার লেখায় শুধু পুরোনো দিনের স্মৃতি নেই। তাঁর সময়ের সামাজিক চিন্তাও নানা জায়গায় ছায়ার মতো প্রবেশ করেছে।

এখানেই বইটি কেবল ‘পুরোনো দিনের শিশুদের বই’ হয়ে থাকে না।

একজন লেখক যখন শিশুদের জন্য লেখেন, তখন তাঁর সময়ের ধারণা অজান্তেই গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়ে। সমাজ সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাস, মানুষ সম্পর্কে তাঁর ধারণা, ভালো-মন্দের তাঁর বোধ—সবকিছু চরিত্র ও ঘটনার ভিতরে ছাপ ফেলে।

ছফার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

তবে তিনি সবসময় তা প্রচারপত্রের মতো করেননি। বরং কল্পকাহিনির ভিতরে রেখে দিয়েছেন। ফলে শিশুরা গল্প পাবে, আর বড়রা গল্পের নিচে থাকা সময়ের শব্দ শুনতে পাবেন।


এই বইয়ের শিশুরা কতটা সত্যিকারের শিশু?

এখানে একটি কঠিন প্রশ্ন তোলা দরকার।

শিশুর জন্য লিখলেই কোনো চরিত্র শিশু হয়ে যায় না।

শিশু চরিত্রকে সত্যি করে তুলতে হলে তার বিস্ময়, ভুল, অযৌক্তিকতা, স্বার্থপরতা, কৌতূহল, ভয়, সাহস এবং হঠাৎ বদলে যাওয়া মন—সবকিছু গল্পে থাকতে হয়।

ছফা কিছু ক্ষেত্রে এই শিশুমনকে স্পর্শ করেছেন, আবার সব ক্ষেত্রে একই সাফল্য পাননি। কোথাও কোথাও তাঁর নিজের চিন্তা চরিত্রের ওপর একটু বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন শিশুটি আর সম্পূর্ণ স্বাধীন চরিত্র থাকে না; লেখকের ভাবনা বহন করার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে।

এটি বইটির একটি সীমাবদ্ধতা।

কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই বইটির বিশেষত্বও রয়েছে। কারণ ছফা শিশুকে কেবল ‘শিশু’ হিসেবে দেখেননি; তিনি তাকে ভবিষ্যতের মানুষ হিসেবেও দেখেছেন। ফলে শিশুর কল্পনার মধ্যে তাঁর নিজের সময়, সমাজ ও মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা ঢুকে পড়েছে।

এ কারণেই বইটি পুরোপুরি নির্ভেজাল শিশুসাহিত্য নয়; বরং 

শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কের মাঝখানে দাঁড়ানো এক ধরনের সাহিত্য।

ভাষা: সরলতার মধ্যে ছফার নিজস্ব স্বর


ছফার গদ্যের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো তিনি শুধু ঘটনা বলেন না; ঘটনাটিকে একটি ভাবনার দিকে ঠেলে দেন। শিশুদের জন্য লিখলেও এই স্বভাব পুরোপুরি বদলে যায়নি।

তাঁর ভাষায় কোথাও সরলতা, কোথাও কাব্যিকতা, কোথাও কথকতার স্বাদ। বিশেষ করে প্রকৃতি, স্বপ্ন কিংবা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বর্ণনা করার সময় তাঁর ভাষা গল্পের বাস্তবতাকে একটু নরম করে দেয়।

তবে সব জায়গায় এই ভাষা সমান স্বচ্ছ নয়। কোনো কোনো অংশে লেখকের বক্তব্যের উপস্থিতি এতটা স্পষ্ট যে শিশুর নিজস্ব আবিষ্কারের জায়গা কিছুটা সংকুচিত হয়।

এখানে আধুনিক শিশুসাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হবে। আজকের অনেক ভালো শিশুসাহিত্য পাঠককে উত্তর না দিয়ে প্রশ্নের কাছে রেখে দেয়। ছফা কখনো কখনো উত্তরটি নিজেই বলে দেন।

তবু তাঁর ভাষার নিজস্বতা অস্বীকার করা যায় না।


বইটির সবচেয়ে বড় অর্জন

আমার চোখে ‘দোলো আমার কনক চাঁপা’র সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—

ছফা শিশুকে বোকা পাঠক হিসেবে বিবেচনা করেননি।

তিনি জানেন, শিশুর বোধগম্যতার সীমা আছে; কিন্তু তার কল্পনার সীমা নেই।

এই দুইয়ের পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন শিশু সব দার্শনিক ধারণা বুঝবে না, কিন্তু একটি অদ্ভুত প্রশ্ন তাকে অনেকক্ষণ ভাবাতে পারে। সে হয়তো লেখকের সামাজিক বক্তব্য বুঝবে না, কিন্তু গল্পের একটি চরিত্রের প্রতি মায়া অনুভব করবে। সে হয়তো রূপকের অর্থ জানবে না, কিন্তু রূপকের ছবি মনে রাখবে।

ছফার বইয়ে এই সম্ভাবনার প্রতি আস্থা আছে।

এ কারণেই বইটি আজও পড়ার মতো।


কোথায় বইটি দুর্বল

সাহিত্যকে ভালোবাসার অর্থ তার দুর্বলতাকে আড়াল করা নয়।

‘দোলো আমার কনক চাঁপা’র প্রধান দুর্বলতা হলো গল্পগুলোর মান ও নির্মাণে সমতা নেই। কোনো গল্পের ধারণা শক্তিশালী, কিন্তু তার কাহিনিগত গঠন ততটা দৃঢ় নয়। কোথাও ঘটনা দীর্ঘায়িত হয়েছে, কোথাও আবার গল্পের সম্ভাবনা আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা যেত।

আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো—ছফার নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব কখনো কখনো শিশুসাহিত্যের স্বাভাবিকতাকে ছাপিয়ে যায়।

কিন্তু এর বিপরীতে একটি বড় শক্তিও আছে; বইটি একেবারে ছাঁচে ঢালা শিশুসাহিত্য নয়। এতে ঝুঁকি আছে, অসম্পূর্ণতা আছে, পরীক্ষার আকাঙ্ক্ষা আছে।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে কখনো কখনো এই অসম্পূর্ণতাই বইটিকে স্মরণীয় করে।


আজ আবার কেন পড়ব?

আজকের শিশু যদি ‘দোলো আমার কনক চাঁপা’ পড়ে, সে হয়তো বইটির সব স্তর বুঝবে না। কিন্তু তাকে বইটি পড়তেই হবে এমন কথা বলারও দরকার নেই।

বইটি বরং সেই পাঠকের জন্য, যে গল্পের বাইরে গিয়েও গল্পের কথা ভাবতে চায়।

আর প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য বইটির আকর্ষণ আরও অন্যরকম। আমরা যখন শৈশবের দিকে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—আমাদের ছোটবেলার পৃথিবী কতটা বড় ছিল। একটি পুকুর ছিল সমুদ্র, একটি গাছ ছিল জঙ্গল, একটি খেলনা ছিল বন্ধু, আর একটি গল্প ছিল পুরো রাত জেগে থাকার মতো ঘটনা।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী ছোট হয়। কারণ আমরা পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করতে শিখি।

‘দোলো আমার কনক চাঁপা’ সেই ব্যাখ্যা শেখার আগের পৃথিবীর দিকে ফিরে তাকানোর একটি সুযোগ।


শেষ কথা

আহমদ ছফার ‘দোলো আমার কনক চাঁপা’ এমন একটি বই, যার মূল্য নির্ধারণ করতে গেলে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয়—‘শিশুরা এটি পড়ে কতটা আনন্দ পাবে?’ আরও একটি প্রশ্ন করতে হয়— 

এই বইটি শিশুকে পৃথিবীকে কীভাবে দেখতে শেখায়?

উত্তরটি সরল নয়।

ছফা এখানে কোনো নির্দিষ্ট নৈতিক শিক্ষা চাপিয়ে দিতে চাননি—অন্তত বইটির সামগ্রিক প্রকৃতি তেমন নয়। বরং তিনি গল্পের মাধ্যমে বাস্তবতার বাইরে তাকানোর অভ্যাস তৈরি করতে চেয়েছেন। কখনো লোককথার ভেতর দিয়ে, কখনো পুতুলের জগতে, কখনো হাস্যরসের আশ্রয়ে, কখনো অদ্ভুত কল্পনার ভেতর দিয়ে, আবার কখনো স্বপ্নের সমুদ্র পেরিয়ে।

এই বইয়ের সব গল্প সমান সফল নয়। কিছু জায়গায় লেখকের চিন্তা শিশুর স্বাভাবিক কণ্ঠকে ছাপিয়ে যায়। কিছু গল্প আরও সংহত হতে পারত। কিছু কল্পনা আরও আবেগঘন হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু বইটির প্রতি সুবিচার করতে হলে এই সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি তার সাহসটিও দেখতে হবে।

আহমদ ছফা শিশুদের জন্য লিখতে গিয়ে নিজের লেখকসত্তাকে সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলেননি। বরং নিজের গভীর চিন্তার জগত থেকে শিশুর জন্য কয়েকটি জানালা খুলে দিয়েছেন। সেই জানালায় কখনো পুরোনো দিনের গল্প, কখনো অচেনা পৃথিবী, কখনো পুতুল, কখনো সমুদ্র, কখনো ফুল—আর সর্বত্র একটি জিনিস: কল্পনা করার স্বাধীনতা।

সম্ভবত এই স্বাধীনতাই বইটির স্থায়ী সম্পদ।

‘দোলো আমার কনক চাঁপা’ তাই আহমদ ছফার শ্রেষ্ঠ রচনা কি না—সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এই বইয়ের প্রতি ন্যায্য হবে না। বরং এটি তাঁর সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বের একটি অন্য দরজা। সেই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আমরা দেখি এক কঠিন চিন্তকের নরমতর মুখ—যিনি জানতেন, মানুষের সমস্ত যুক্তিবোধের আগেও এবং সমস্ত যুক্তিবোধের পরেও একটি জগৎ থেকে যায়, যার নাম কল্পনা।

আর সেই কল্পনার জগতে একটি কনক চাঁপা ফুল বাতাসে যেন দুলতে থাকে, নাম তার-

দোলো আমার কনক চাঁপা।

‍~*~*~*~*~*~*~*~*~

দোলো আমার কনক চাঁপা
আহমদ ছফা


প্রথম প্রকাশ: ১৯৬৮
বর্তমান প্রকাশক    স্টুডেন্ট ওয়েজ
প্রচলিত সংস্করণ    ৩য় প্রকাশ, ২০১৭
পৃষ্ঠা    ৯১ 

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ