জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ নিয়ে তানভীর হকের আলোচনা

জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ উপন্যাসের প্রচ্ছদ

আজ (১৮ই আগস্ট, ২০২৫) কালোত্তীর্ণ সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েলের (১৯০৩–১৯৫০) কালজয়ী রূপক উপন্যাস 'অ্যানিমেল ফার্ম' (Animal Farm) প্রকাশের ৮০তম বার্ষিকী। এই ক্ষুরধার রাজনৈতিক ব্যঙ্গোপন্যাসটি খামারের পশুদের বিদ্রোহের একটি আপাতসরল গল্পের আড়ালে মূলত রুশ বিপ্লবের আদর্শিক বিচ্যুতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সর্বগ্রাসী একনায়কতন্ত্রের ভয়াবহ রূপকে উন্মোচিত করে।

জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ উপন্যাসের মূল কাহিনীতে দেখা যায়, ‘ম্যানর ফার্ম’-এর অত্যাচারী ও মাতাল মালিক মিস্টার জোন্স দীর্ঘদিন ধরে খামারের পশুদের ওপর অমানুষিক শোষণ ও নির্যাতন চালাচ্ছিল। একদিন খামারের সবচেয়ে বয়স্ক ও জ্ঞানী শূকর ‘ওল্ড মেজর’ এক গোপন সভার ডাক দেয়, যেখানে খামারের সব পশু একত্রিত হয়। সেই সভায় ওল্ড মেজর পশুদের শৃঙ্খলমুক্তির স্বপ্ন দেখায়, মানুষের শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেয় এবং সমস্ত পশুকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়।

এই ঐতিহাসিক সভার কিছুদিন পরেই ওল্ড মেজর মারা যায়, কিন্তু খামারের পশুদের মনে সে বপন করে দিয়ে যায় বিপ্লবের বীজ। খামারের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হওয়ায় আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় শূকর শ্রেণী। একদিন মিস্টার জোন্সের চরম অবহেলা ও ক্ষুধার্ত পশুদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে আকস্মিক এক বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। পশুরা দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করে অত্যাচারী জোন্স ও তার কর্মচারীদের খামার থেকে বিতাড়িত করে।

বিপ্লবের পর ‘ম্যানর ফার্ম’-এর নাম বদলে রাখা হয় ‘অ্যানিমেল ফার্ম’। এরপর তারা পুড়িয়ে ফেলে পরাধীনতার প্রতীক—ঘোড়ার জিন, ঠুলি, চাবুক ও লাগাম। খামারে ‘পশুবাদ’ (Animalism) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সর্বসম্মতিক্রমে সাতটি মূল অনুশাসন বা নীতিমালা তৈরি করা হয়, যা সব পশুর জন্য মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়। দেয়ালের গায়ে এই ঐতিহাসিক সাতটি অনুশাসন লিখে দেয় শূকরদের মধ্যে অন্যতম দূরদর্শী ও মেধাবী চরিত্র ‘স্নোবল’।

‘সব পশুই সমান, তবে কিছু পশু অন্য পশুদের চেয়ে বেশি সমান' (All animals are equal, but some animals are more equal than others)
পশুদের মুক্তির মূল রূপকার ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে অন্যতম ছিলেন নেপোলিয়ন এবং স্নোবল। তাদের নেতৃত্বে পশুরা নিজেরাই জমিতে ফসল বোনে, পাকা ফসল কাটে এবং নিজেদের মতো করে তা মাড়াই করে নিজেদের জন্যই সংরক্ষণ করে। এখন আর তাদের দুধ বাজারে বিক্রি করার কেউ নেই। ডিমও বাজারে বিক্রি না করে আগামী দিনে বাচ্চা ফোটানোর জন্য যত্নে রাখা হয়। এ সময় স্নোবলের নির্দেশনায় পশুদের শিক্ষিত করে তোলার লক্ষ্যে একটি শিক্ষাবিস্তার কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়।

একদিন সভায় স্নোবল যখন পশুকুলের বিদ্যুৎ সুবিধার জন্য বায়ুকল নির্মাণের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরছিল, তখনই নেপোলিয়ন তার তীব্র বিরোধিতা করে। নেপোলিয়নের এক আকস্মিক হুঙ্কারে সভাস্থলে ধেয়ে আসে একদল হিংস্র শিকারি কুকুর, যাদের এর আগে খামারের কোনো পশুই দেখেনি।

নেপোলিয়নের ইঙ্গিতে কুকুরগুলো স্নোবলকে হিংস্রভাবে ধাওয়া করে খামার থেকে তাড়িয়ে দেয়। মূলত এই কুকুরগুলো ছিল নেপোলিয়নের নিজস্ব গোপন বাহিনী, যাদের সে এতদিন এক গুপ্তকক্ষে অত্যন্ত গোপনে লালন-পালন করেছিল। এই ঘটনার পর যারা নেপোলিয়নের বিরোধিতা করার চেষ্টা করে, তারা এই কুকুর বাহিনীর হাতে বন্দি হয়; আর বাকিরা ভয়ে ও আতঙ্কে মৌনতা অবলম্বন করে। এরপর প্রচার করা হয় যে, শূকররা যেহেতু তাদের বুদ্ধি দিয়ে 'অ্যানিম্যাল ফার্ম' পরিচালনা করছে, তাই তাদের বাড়তি পরিশ্রম ও মগজের খাতিরে অন্য পশুদের চেয়ে বেশি খাবারের প্রয়োজন।

নেপোলিয়ন ক্রমেই স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে এবং খামারের সমস্ত সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে শুরু করে। শূকরদের এই সন্দেহজনক আচরণ অন্য পশুদের মনে প্রশ্নের জন্ম দিলে, চতুর প্রচারক স্কুয়েলার তাদের বোঝায়—সবকিছুই করা হচ্ছে 'অ্যানিমেল ফার্ম'-এর বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য। সে নেপোলিয়নের প্রতিটি স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তকে খামারের পশুদের সামনে অত্যন্ত মহৎ ও যুক্তিসঙ্গত হিসেবে উপস্থাপন করে।

একপর্যায়ে খামারে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিলেও, শূকরদের বিলাসী জীবনে তার কোনো প্রভাব পড়ে না। এর মাঝেই, একসময়ের বায়ুকল-বিরোধী নেপোলিয়ন হঠাৎ সুর বদলে বায়ুকল নির্মাণের ঘোষণা দেয় এবং দাবি করে এই নকশা ও পরিকল্পনা মূলত তারই ছিল। বায়ুকলের খরচ জোগাতে পশুদের দৈনিক কর্মঘণ্টা বাড়িয়ে খাবারের বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়; অথচ শাসকশ্রেণি তথা শূকরদের সুযোগ-সুবিধা অপরিবর্তিতই থাকে। তারা কোনো শারীরিক পরিশ্রম না করে কেবল তদারকির দায়িত্বে লিপ্ত হয়। খামারের সবচেয়ে পরিশ্রমী ঘোড়া বক্সার বৃদ্ধ বয়সেও নেপোলিয়নের প্রতি অন্ধ আনুগত্য থেকে খামারের উন্নয়নে প্রাণপণ খাটতে থাকে। অবশেষে, খামারের মূল সাতটি নীতি মুছে দিয়ে সবশেষে জন্ম নেয় সেই কুখ্যাত ও চরম সত্য বাক্য—

সব পশুই সমান, তবে কিছু পশু অন্য পশুদের চেয়ে বেশি সমান।

খামারের পশুদের মাঝে ক্রমেই অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে, কিন্তু নেপোলিয়নের স্বৈরাচারী ক্ষমতার ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। এরই মাঝে খামারের দেয়াল থেকে একে একে মুছে যেতে থাকে সাম্যের প্রতীক সেই ‘সাত অনুশাসন’। আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে শূকরেরা লিপ্ত হয় মানুষের মতো সব লোভী ও বিলাসী কর্মকাণ্ডে। আর তাদের এই নৈতিক পতন ও ক্ষমতার অপব্যবহারকে চতুর তোষামোদকারী স্কুয়েলার তার কুটিল যুক্তি ও বাগ্মিতা দিয়ে সাধারণ পশুদের সামনে বৈধ বলে প্রচার করতে থাকে। দিন যায়, ঋতু বদলায়। কিন্তু শোষিত পশুদের ভাগ্যের কি কোনো পরিবর্তন ঘটে? শাসকের মুখোশ বদলালেও শোষণের নির্মম বাস্তবতাকে অপরিবর্তিত রেখেই শেষ হয় ‘অ্যানিমেল ফার্ম’।

জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত রূপকধর্মী উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এর আখ্যান শুরু হয় মাতাল মিস্টার জোন্সের মালিকানাধীন ‘ম্যানর ফার্ম’-এ। এক রাতে খামারের পুরস্কারপ্রাপ্ত বুড়ো শূকর ‘ওল্ড মেজর’ অন্যান্য পশুদের মানুষের অত্যাচারমুক্ত এক স্বাধীন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়। ওল্ড মেজরের এই স্বপ্ন মূলত ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের সমাজতান্ত্রিক আদর্শেরই প্রতিধ্বনি, আর চরিত্রটি নিজে কার্ল মার্ক্স বা ভ্লাদিমির লেনিনের রূপক। ওল্ড মেজরের মৃত্যুর পর খামারের নেতৃত্বের হাল ধরে দুই তরুণ শূকর—স্নোবল এবং নেপোলিয়ন। তাদের এই নেতৃত্ব ও পরবর্তী সংঘাত মূলত লিওন ট্রটস্কি এবং জোসেফ স্ট্যালিনের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বকেই ফুটিয়ে তোলে।

একপর্যায়ে পশুরা ‘ব্যাটল অব দ্য কাউশেড’-এর মাধ্যমে অত্যাচারী জোন্সকে সফলভাবে তাড়িয়ে দেয় এবং খামারের নতুন নাম দেয় ‘অ্যানিমেল ফার্ম’। তারা সমতার ভিত্তিতে ‘পশুবাদ’-এর (Animalism) সাতটি মূল অনুশাসন তৈরি করে, যার মূল কথাই ছিল—‘সব পশুই সমান’। নতুন এই ব্যবস্থা শুরুতে খামারে দারুণ সমৃদ্ধি ও আনন্দ নিয়ে আসে, যা রুশ বিপ্লবের প্রাথমিক দিনগুলোর আশাবাদকেই প্রতীকায়িত করে।

সাধারণ পশুদের ইতিহাস পড়তে বা মনে রাখতে না পারার চরম ব্যর্থতাকে কাজে লাগিয়েই শূকররা ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং তাদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
শূকররা সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হওয়ায় ধীরে ধীরে খামারের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। তাদের মধ্যে নেপোলিয়ন ধূর্ততা ও পেশিশক্তির জোরে স্নোবলকে বিতাড়িত করে এবং খামারের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে বসে। এই ঘটনাটি মূলত জোসেফ স্ট্যালিন কর্তৃক লিওন ট্রটস্কিকে নির্বাসনে পাঠানো এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ঐতিহাসিক সত্যটিকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।

পরবর্তীতে নেপোলিয়নের শাসন ব্যবস্থা যত বেশি নিপীড়ক হয়ে ওঠে, ততই তা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের একনায়কতন্ত্রী রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রতিচ্ছবি হিসেবে ধরা দেয়। জর্জ অরওয়েল উপন্যাসে খামারের মূল 'সপ্ত অনুশাসন' (Seven Commandments) ধাপে ধাপে পরিবর্তনের মাধ্যমে বিপ্লবী আদর্শের চরম অবক্ষয়কে দারুণ দক্ষতায় চিত্রিত করেছেন।

এই আদর্শিক বিচ্যুতির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ প্রকাশ পায় যখন মূল নীতি— 'সব প্রাণীই সমান' (All animals are equal) পরিবর্তিত হয়ে রূপ নেয়: 'সব প্রাণীই সমান, তবে কিছু প্রাণী অন্য প্রাণীদের চেয়ে বেশি সমান' (All animals are equal, but some animals are more equal than others)। এই রূপান্তরটি আসলে বিপ্লবের আদি সমতাবাদী ও সাম্যবাদী নীতির প্রতি এক চরম বিশ্বাসঘাতকতাকেই নির্দেশ করে।

জর্জ অরওয়েল তাঁর রূপক উপন্যাসে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের জন্য পশুদের প্রতীক হিসেবে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন। যেমন—পরিশ্রমী ঘোড়া 'বক্সার' তার ‘আমি আরও কঠোর পরিশ্রম করব’ নীতিবাক্যের মাধ্যমে শোষিত ও অনুগত শ্রমিক শ্রেণীর প্রতীক হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, নির্বিচারে দলীয় স্লোগান পুনরাবৃত্তি করা ভেড়ার দল মূলত অন্ধ অনুসারী ও সহজে চালিত সাধারণ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। এই চরিত্রায়নের মাধ্যমে অরওয়েল দেখিয়েছেন কীভাবে একটি সর্বগ্রাসী শাসনামলে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী সাড়া দেয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

উপন্যাসে শূকরদের ধীরে ধীরে মানুষের আচরণ ও রূপ ধারণ করার প্রক্রিয়ার মধ্যে অরওয়েলের বিদ্রূপ ও ব্যঙ্গাত্মক শৈলী সবচেয়ে জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে। শুরুতে মানুষের সব অভ্যাস নিষিদ্ধ করা হলেও, সময়ের ব্যবধানে শূকররা দুই পায়ে হাঁটতে শুরু করে, পোশাক পরে এবং একনায়কের প্রতীক হিসেবে হাতে চাবুক তুলে নেয়। কাহিনীর সমাপ্তিতে যখন শূকর এবং মানুষের মধ্যকার পার্থক্য পুরোপুরি মুছে যায়, তখন অরওয়েলের মূল রাজনৈতিক বার্তাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

 

বিপ্লবীরা একসময় ঠিক সেই স্বৈরাচারীতেই রূপান্তরিত হয়, যাদের তারা একদা হটিয়েছিল।


অ্যানিম্যাল ফার্ম (Animal Farm)- এর মূল সার্থকতা নিহিত রয়েছে এর বহুমাত্রিক স্তরবিন্যাসের মধ্যে। আপাতদৃষ্টিতে একে একটি সরল রূপকথা মনে হলেও, গভীর পর্যবেক্ষণে উপন্যাসটি এক জটিল রাজনৈতিক রূপক (allegory) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মানব চরিত্রের পরিবর্তে পশুদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে জর্জ অরওয়েল জটিল রাজনৈতিক তত্ত্ব ও মতাদর্শকে অত্যন্ত সহজ এবং সর্বজনীনভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন। উপন্যাসটির আখ্যানভাগ ইতিহাসের এক চক্রাকার গতিপথ অনুসরণ করে, যা স্বৈরাচারী শাসনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে পুনরায় স্বৈরাচারেই আবর্তিত হয়। এই বৃত্তাকার কাঠামোটি মূলত রাজনৈতিক বিপ্লব সম্পর্কে অরওয়েলের এক চরম হতাশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে ফুটিয়ে তোলে। তাঁর মতে, মানুষ প্রায়শই বিপ্লবের মাধ্যমে যে শাসনব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করে, অবধারিতভাবে তা পূর্বের চেয়েও নৃশংস বা সমপরিমাণ নিষ্ঠুর এক নতুন স্বৈরাচারের জন্ম দেয়।


অ্যানিম্যাল ফার্ম (Animal Farm) উপন্যাসে ভাষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, যা চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ভাষার শক্তি সম্পর্কে অরওয়েলের বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে। বিশেষ করে, শূকরদের দ্বারা 'সপ্ত অনুশাসন' (Seven Commandments) পরিবর্তনের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, কীভাবে শাসকরা সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত ও বশীভূত করতে বাগ্মিতার অপব্যবহার করে। এছাড়া, কাহিনীর পটভূমি হিসেবে অরওয়েলের একটি খামারকে বেছে নেওয়াটাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি পাঠককে শ্রম, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং শাসক ও শাসিতের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ককে একটি ক্ষুদ্র সংস্করণে (microcosm) দেখার সুযোগ করে দেয়।



সে মূলত এমন এক বুদ্ধিজীবী শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে, যারা সত্যকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েও নিষ্ক্রিয় থাকে। বেঞ্জামিনের চরিত্রের মাধ্যমে জর্জ অরওয়েল মূলত সেইসব মানুষদের সমালোচনা করেছেন, যারা অন্যায়কে পরিষ্কারভাবে চিনতে পেরেও তা রুখে দাঁড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না।।

 

অবহেলিত ‘ম্যানর ফার্ম’ থেকে আপাতদৃষ্টিতে সমৃদ্ধ ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’, এবং সবশেষে পুনরায় শোষক ‘ম্যানর ফার্ম’-এ খামারটির এই রূপান্তর মূলত রুশ বিপ্লবের উত্থান-পতন ও তার নির্মম পরিণতিকেই নিখুঁতভাবে চিত্রিত করে।

নিন্দুক গাধা বেঞ্জামিন 'যেকোনো শূকরের মতোই ভালো পড়তে পারত', কিন্তু সে নিজের ইচ্ছায় নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। সে মূলত এমন এক বুদ্ধিজীবী শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে, যারা সত্যকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েও নিষ্ক্রিয় থাকে। বেঞ্জামিনের চরিত্রের মাধ্যমে জর্জ অরওয়েল মূলত সেইসব মানুষদের সমালোচনা করেছেন, যারা অন্যায়কে পরিষ্কারভাবে চিনতে পেরেও তা রুখে দাঁড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না।

একই সাথে, ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ উপন্যাসটি রাজনৈতিক অসচেতনতার বিপদ এবং শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে একটি চরম সতর্কবার্তা। সাধারণ পশুদের ইতিহাস পড়তে বা মনে রাখতে না পারার চরম ব্যর্থতাকে কাজে লাগিয়েই শূকররা ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং তাদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। এর মাধ্যমে অরওয়েল স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, একচ্ছত্রবাদ বা স্বৈরতন্ত্রের (Totalitarianism) আগ্রাসন থেকে বাঁচতে একটি সচেতন, শিক্ষিত এবং সমালোচক জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি কতটা অপরিহার্য।

জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ (Animal Farm) বিশেষভাবে রুশ বিপ্লব এবং স্ট্যালিনের একনায়কতান্ত্রিক উত্থানের রূপক হলেও, এর মূল ভাবার্থ সর্বজনীন। ক্ষমতা, দুর্নীতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রুখতে সদা সতর্ক থাকার এক চিরন্তন বার্তা দেয় এই উপন্যাস। সহজ-সরল রূপক কাহিনীর আড়ালে এটি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার যে গভীর ব্যবচ্ছেদ করেছে, তা অরওয়েলের অনন্য সাহিত্যিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতারই প্রমাণ। স্বাধীনতা ও সাম্যের ভঙ্গুরতা এবং স্বৈরতন্ত্রের ভয়াবহতা নিয়ে উপন্যাসটির এই তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ আজও সমান প্রাসঙ্গিক। আর এই সহজপাঠ্যতাই বইটিকে একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানব ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এক সতর্কবার্তা হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।



©️ তানভীর হক- এর অনুমতিক্রমে প্রকাশিত

 প্রচ্ছদ সূত্র: উইকিপিডিয়া

আরও পড়ুন:

জর্জ অরওয়েল ও তাঁর উপন্যাস 'অ্যানিম্যাল ফার্ম' নিয়ে কয়েকটি আলোচনা


মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ