‘মাফরুহা আলম’ রচিত “ট্র্যাভেলগ অব নেপাল” মানশ্চক্ষে ভ্রমণের আনন্দ দেবে


‘মাফরুহা আলম’ রচিত “ট্র্যাভেলগ অব নেপাল” মানশ্চক্ষে ভ্রমণের আনন্দ দেবে

ইতিহাস ও পাহাড়ের সহাবস্থান নেপালকে সারা পৃথিবীর ভ্রমণকারীদের প্রিয় গন্তব্যের মর্যাদা দিয়েছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশ্রেণীর কোলে বেড়ে ওঠা নেপাল প্রাচীন ঐশ্বর্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সগৌরবে বহন করে চলেছে। ভ্রমণপিপাসু মানুষ মাত্রই নেপালে জীবনের একটুকরো সময় কাটিয়ে আসতে চান। তরুণ লেখক মাফরুহা আলম নেপালে গিয়েছিলেন হানিমুন পর্ব সারতে। এগারো দিনে ঘুরে বেড়িয়েছেন কাঠমান্ডু, নাগরকোট, ভক্তপুর, পোখারা আর চিতওয়ান। আর দেখেছেন হিমালয়ের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গগুলোর অপার্থিব রূপ।
‘লেখকের কথা’ অংশে লেখক স্বীকার করেছেন-
লেখক হিসেবে আমি নিতান্তই আনাড়ি। পৃষ্ঠা-১৭
রচনার পরিমাণে কথাটি সত্য হলেও রচনার গুণে তা মনে হয় না। সাবলীল বর্ণনাভঙ্গির সাথে বৈঠকী উপস্থাপনভঙ্গি অনেক বাক্যকে দিয়েছে সাহিত্যের স্বরূপ। এগারো দিনের নেপাল ভ্রমণের প্রতিটি দিনের বিবরণ লেখক লগবুকের মত করে লিখে রেখেছিলেন। তারিখ উল্লেখ করে দিনের ভ্রমণ বর্ণনা স্বল্পকথায় খরচের হিসাবসহ লিখতে ভোলেন নি।

ডায়রি হিসেবে লেখা হওয়ায় সংক্ষেপে দিনের ঘটনাবলী উল্লেখের একটা তাড়না লেখার মধ্যে ছিল। লেখকের ভাষ্যে জানা যায় তিনি প্রতিদিন হোটেলকক্ষে ফিরে সারাদিনের ঘটনাগুলো লিখে রাখতেন। ক্লান্তিজনিত কারণে স্বল্পসময়ে লেখার তাগিদে বিবরণবাহুল্য পরিত্যাগ করার প্রয়োজন ছিল। নেপালের দ্রষ্টব্য অংশগুলোতে ভ্রমণে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাগুলোর বিস্তারিত বিবরণী তিনি এড়িয়ে গিয়েছেন। বই হিসেবে এই ডায়রি বা লগবুক বিবরণী বা দিনলিপিটি প্রকাশ করার পূর্বে সামান্য সংযোজন বিয়োজন পরিমার্জন শেষে ভাষা হয়ে উঠেছে ঝকঝকে তকতকে। সংক্ষিপ্ত বর্ণনা ও দ্রতলয়ে দৃশ্যপট পাল্টালেও প্রাপ্ত অভিজ্ঞতাগুলো বাদ যায় নি। অভিযাত্রীর কৌতুহল নিয়ে পাঠকও পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় পরিভ্রমণ করতে থাকেন দ্রুতবেগে।

লেখকের হাত ধরে নেপালে প্রবেশের আগে সূচীপত্রটা একবার দেখে নেয়া ভাল।
  • পর্ব-১: যাত্রা হল শুরু
  • পর্ব-২: নাগরকোট
  • পর্ব-৩: প্রাচীন শহর-ভক্তপুর
  • পর্ব-৪: গন্তব্য: পোখারা
  • পর্ব-৫: ফেওয়া তালে নৌ-বিহার
  • পর্ব-৬: সারাংকোটে সূর্যোদয়
  • পর্ব-৭: চিতওয়ান অভয়ারণ্য আর সোওরাহা পল্লী
  • পর্ব-৮: অভয়ারণ্যে গণ্ডারের ভয়
  • পর্ব-৯: হাতির পিঠে জঙ্গল ভ্রমণ
  • পর্ব-১০: ইতিহাসের শহর পাটান
  • পর্ব-১১: গুডবাই নেপাল! গুডবাই নেপাল!
২৫/৩/২০০৮ তারিখে বাংলাদেশ থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। বিকেলে নেপালে পৌঁছেই আশেপাশের জায়গায় ঢু মেরেছেন। নেপাল থেকে বিদায় নিয়েছেন ৪/৪/২০০৮ তারিখে। মাঝের এই কদিনে লেখক নেপালের দর্শনীয় স্থানসমূহের বেশিরভাগ জায়গায় পা রেখেছেন। হৃদয়ের ক্যানভাসে নেপালের বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গের সৌন্দর্যকে যতটা সম্ভব একে নিয়েছেন।

লেখক একেবারে না জেনে না বুঝে নেপালে প্রবেশ করেন নি। অভিজ্ঞজনদের কাছে জেনে নিয়েছিলেন নেপাল ভ্রমণের টিপস। হাতে ছিল 'Lonely Planet- Nepal’ এর একটি কপি। অর্থাৎ তিনি বাস্তবে নেপালে পৌঁছাবার পূর্বেই মনোজগতে নেপালের অলিগলি, দ্রষ্টব্য স্থানসমূহকে চিনে নিয়েছিলেন। তার সুফল পেয়েছেন প্রতিটি দিনই। তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে প্রকৃতিপ্রেমী ও পরিশ্রমী। ফলে নেপালের চড়াই উৎরাই অতিক্রম করতে খুব একটা বেগ পেতে হয় নি।

লেখক নেপালের বেশ কয়েকটা মন্দির দেখতে গিয়েছিলেন। দেখেছেন হিন্দু-মন্দির ও বৌদ্ধ-মন্দিরের সহাবস্থান। হাজার বৎসর ধরে নির্বিবাদ বসবাসের এই দৃশ্য লেখককে অবাক করেছে। যেখানে তিনি এরূপ দৃশ্য দেখেছেন, সেখানেই তিনি বিস্ময়মাখা প্রশংসায় বিষয়টিকে পাঠকের গোচরে এনেছেন (পৃষ্ঠা- ১৯, ৪৩, ৪৬)। যেন সহাবস্থানের এরূপ ঘটনা কতটাই না অস্বাভাবিক!

সংক্ষিপ্ত সরল বাক্য ব্যবহারে লেখক সিদ্ধহস্ত। ছোট ছোট বাক্যে নেপালের অনেক ছবি অল্প আঙ্গিকের রচনায় প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর চোখ দিয়ে নেপালের খুঁটিনাটি চিত্র দেখা হয়ে যায়। পোখারা বাসস্টপ বাংলাদেশের গাবতলীর মত। বাসস্ট্যান্ড ছেঁকে ধরে বিভিন্ন রিসোর্টের দালাল। সারাংকোটের সূর্যোদয়ের সময় একসাথে ৯টি হিমালয়চূড়া দেখা যায়, ফেওয়া লেকের ধার ঘেঁষে রয়েছে অসংখ্য হোটেল, সাইবার ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট বার এবং ট্রাভেল এজেন্সির দোকান। এর সাথে চট্টগ্রামের ফয়'স লেকের কিছুটা মিল যেন খুঁজে পাওয়া যায়। ভক্তপুর বাজারে রাস্তার পাশের দোকান থেকে ভেসে আসে হিমালয়ের থিম সং “ওম মনি পদ সে হুঁম”। লক্করঝক্কর মার্কা বাসে উঠে ঢাকার বাসের কথা মনে পড়ে যায়। এরকম বিভিন্ন রকম খুঁটিনাটি প্রসঙ্গ লেখক সরস ভঙ্গিতে বইয়ের পাতায় পাতায় উপস্থাপন করেছেন। আসলে লেখকের দৃষ্টির আড়ালে কোন কিছুই থেকে যায় নি।

নেপালের অবারিত প্রকৃতি ও প্রাণীসম্পদ প্রকৃতিপ্রেমী লেখকের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। উড়ন্ত বক, পাখির বাসা, বাঘের টাটকা পায়ের ছাপ, হরিণ, ময়ূর, গণ্ডারের কান, কাদামাখা গণ্ডারের বাচ্চা, বুনো বাইসন, হাতি, বন্যশুকর ইত্যাদির পাশাপাশি কাঠের রেলিংয়ে বসা সবুজ গিরগিটিও লেখকের দৃষ্টি এড়ায় নি।

দৃষ্টিনন্দন ভৌগলিক অবস্থান ও মানুষের সহযোগিতাপূর্ণ ব্যবহার বিশ্বের কাছে নেপালের আকর্ষণ তৈরি করেছে। এরকম একটি জায়গায় ভ্রমণকালে লেখক ছিলেন উচ্ছসিত আনন্দে ভরপুর। হিমালয়ের রহস্যময় সৌন্দর্য প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। লেখকের ভ্রমণতালিকার অবশ্য দ্রষ্টব্য বিষয় ছিল হিমালয়ের শৃঙ্গগুলো দর্শন। আর এজন্য তিনি রাতযাপন করেছেন পোখারার কাছে পাহাড়ি এক গ্রাম সারাংকোটে। এখানে রাত্রিযাপন করে ভোরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে অবলোকন করেছেন হিমালয় চূড়াগুলোর অপার্থিব সৌন্দর্য। লেখকের ভাষ্যে সেই সৌন্দর্য একটু উপস্থাপন করি-
হিমালয়ের ৯টি চূড়া তখন আমাদের সামনে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক্কেবারে বাঁয়ে ধবলগিরি শৃঙ্গ  (উচ্চতা ৮১৬৮ মিটার), তারপর বাঁ থেকে ডানদিকে পরপর দাঁড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণ অন্নপূর্ণা (৭২৯১ মিটার), অন্নপূর্ণা-১ (৮০৯১ মিটার), হিমচুলি (৬৪৪৪ মিটার), মাচ্ছাপুছাড়ে (৬৯৯৩ মিটার), অন্নপূর্ণা-৩ (৭৫৫৫ মিটার), অন্নপূর্ণা-৪ (৭৫২৫ মিটার), অন্নপূর্ণা-২ (৭৯৩৯ মিটার) এবং সর্বডানে ল্যামডং হিমাল (৬৯০৫ মিটার)। পৃথিবীতে ১৪টি শৃঙ্গ রয়েছে যাদের উচ্চতা আট হাজার মিটারের উপর, তন্মধ্যে হিমালয়েই রয়েছে ৮টি শৃঙ্গ যাদের উচ্চতা আট হাজার (এভারেস্ট আবার সবার শীর্ষে)।

আস্তে আস্তে ট্যুরিস্টরা ভিড় জমাতে শুরু করল – সামনে দিগন্তজোড়া তুষার পর্বতমালা দেখে কারো মুখে রা নেই। হঠাৎ অন্নপূর্ণা শৃঙ্গের উপর এসে পড়লো এক টুকরো আলো - সূর্যের প্রথম আলোয় সাদা চূড়াগুলো ঝিকমিক করতে লাগলো, সূর্য যেন আদর করে ছুঁয়ে দিচ্ছে বরফের কণাগুলোকে। অপার্থিব সেই দৃশ্য! সময় কেটে যায়, আমাদের আর ওঠার নামগন্ধও থাকে না। পৃষ্ঠা - ২৮
মোহমুগ্ধ সেই দৃশ্য লেখকের বর্ণনায় পাঠকের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। সংশ্লিষ্ট ছবি ব্যবহার করায় পাঠক যেন লেখকের সাথে একই সারিতে দাঁড়িয়ে হিমালয় শৃঙ্গগুলোর মুখোমুখি হয়ে পড়ে।

ট্যুরিজম এখনও বাংলাদেশে তেমনভাবে প্রসারিত হয় নি। এর নানাবিধ কারণ আছে। তবে ভ্রমণপ্রিয় বাঙালি তাই বলে ঘরে বসে থাকে না। আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে ভ্রমণকার্য ইতিমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছে। বাংলাদেশের পরিবেশ ভ্রমণবান্ধব হলে দেশ উপকৃত হবে। বেশি কিছু না, শুধু আন্তরিকতা থাকলেই দেশের ভাবমূর্তি বিদেশের সামনে উজ্জ্বল করে তুলে ধরা যায়। লেখকের বইটি পাঠে এটাই মনে হল যে, নেপালী জনগণ তাদের ছোট্ট পাহাড়ঘেরা দেশটিকে সঠিকভাবে বিদেশীদের সামনে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। নিজেদের মনোভঙ্গিও ছিল বন্ধুভাবাপন্ন। দুয়ে মিলে নেপালের আকর্ষণ ভ্রমণপিপাসুদের কাছে হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য।

ট্র্যাভেলগ অব নেপাল বইয়ের পাতায় পাতায় ছবি রয়েছে। সাদাকালো ছবি হলেও স্পষ্টতর হওয়ায় পাঠক হতাশ হবেন না। দুই তিন পৃষ্ঠায় এক এক অংশে ভ্রমণের বিবরণ থাকায় দীর্ঘপাঠ পঠনের ক্লান্তি পাঠককে স্পর্শ করবে না। ছোট আকারের মাত্র ৪৮টি পৃষ্ঠার এই বই এক বসাতে শেষ করার মত। ভাষাভঙ্গি সরল ও সরস হওয়ায় পাঠক গোগ্রাসে এই বই গিলে ফেলবেন। ঘরে বসে নেপাল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন হয়ে যাবে। বাস্তবে যারা ভ্রমণ করতে চান, তারা খুবই প্রয়োজনীয় বেশ কিছু গাইড বা পরামর্শ পেয়ে যাবেন এই বই থেকে। তবে সবচেয়ে কাজের পরামর্শটি লেখক তার ‘লেখকের কথা’ অংশে বলেছেন। তিনি বলেন -
… ভ্রমণে সবচেয়ে দরকার ‘Positive Attitude’। যেকোন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর যোগ্যতা থাকলে যেকোন স্থানের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য অনুভব করা সম্ভব।
ঘর হতে শুধু দুই পা দুরের দেশ নেপাল ভ্রমণের এই ছোট্ট লগবুক বৈশিষ্ট্যের বইটি ভ্রমণ পিয়াসী পাঠককে তৃপ্ত করবে। কুয়াশা ঘেরা হিমালয় শৃঙ্গের সামনে গন্ডার পরিবার এরকম একটি দৃশ্যপটকে পিছনে রেখে নেপালের বিখ্যাত কয়েকটি মন্দিরের ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ তৈরি করা হয়েছে। আকর্ষণীয় এই প্রচ্ছদপটের জন্য প্রচ্ছদশিল্পী সবিহ-উল-আলম হৃদয়ের উষ্ণতামাখানো একটি ধন্যবাদ পেতেই পারেন। বইয়ের দাম কম। ফলে সব বয়সী পাঠক অল্পায়াসে বইটিকে নিজের করে নিতে পারবেন। আমি এই বইটির বহুল প্রচার প্রত্যাশা করি।

-০-০০-০-০০-০-০০-০-
ট্রাভেলগ অব নেপাল
মাফরুহা আলম

প্রচ্ছদ: সবিহ-উল-আলম
প্রকাশকাল: ২০১৩
প্রকাশনায়: টইটম্বুর, ঢাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪৮
মূল্য: ১৩০ টাকা
ISBN: 978-984-8869-35-2

1 টি মন্তব্য:

  1. সাখাওয়াত লাভলুমার্চ ১৮, ২০১৯

    নেপালের বেশ কয়েকটি জায়গা চেনা হয়ে গেল। নেপাল গেলে কাজে লাগবে।

    উত্তরমুছুন

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে করলে ই-মেইল করতে পারেন।