আনিসুল হকের ‘বাসো কি ভালো’ কবিতার পাঠ প্রতিক্রিয়া: প্রেমের অনিশ্চয়তায় স্মৃতির মেট্রোরেল- জাহানুর রহমান খোকন

আনিসুল হকের ‘বাসো কি ভালো’ কবিতা পাঠ প্রতিক্রিয়া - জাহানুর রহমান খোকন

 

আনিসুল হক – এর লেখা ‘বাসো কি ভালো’ কবিতাটি আধুনিক নগরজীবনের প্রেম ও স্মৃতির এক সংবেদনশীল উপস্থাপন। কবিতাটিতে প্রেমের সরাসরি ঘোষণা নেই; আছে দ্বিধা, অপেক্ষা, স্মৃতির হালকা কুয়াশা এবং না-পাওয়া অনুভূতির দীর্ঘশ্বাস। খুব সাধারণ কিছু দৃশ্য মেট্রোট্রেন, বৃষ্টির দিন, বিদ্যুতের ঝলক কিংবা ক্ষণিকের চোখাচোখি কবির হাতে হয়ে উঠেছে গভীর আবেগের প্রতীক।


কবিতার শিরোনামেই রয়েছে এর মূল সুর। ‘বাসো কি ভালো’ এ যেন কোনো নিশ্চিত উচ্চারণ নয়, বরং মনের ভেতর জমে থাকা এক দীর্ঘ প্রশ্ন। প্রিয় মানুষটি সত্যিই ভালোবেসেছিল কি না, সেই অনিশ্চয়তা পুরো কবিতাজুড়ে ছড়িয়ে আছে। এই প্রশ্নই কবিতাটিকে নিছক প্রেমের কবিতা থেকে মানবিক অনুভূতির গভীর অন্বেষণে নিয়ে গেছে।

কবিতাটির বিশেষত্ব হলো, এটি সমকালীন নগরজীবনের প্রেমকে খুব পরিচিত উপকরণ দিয়ে নির্মাণ করেছে। এখানে প্রেম মানে শুধু মিলন বা রোমান্টিক স্বপ্ন নয়; বরং দূরত্ব, স্মৃতি, অসমাপ্ত অনুভূতি এবং হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া কিছু মুহূর্ত। ট্রেনের দুই লাইনের মতোই এখানে প্রেমিক-প্রেমিকার অবস্থান কাছাকাছি থেকেও দূরের।

কবির ভাষা সহজ, কথোপকথনধর্মী এবং স্বাভাবিক।

 

তাকালে তুমি, তাকিয়েছিলে, হেসেও ছিলে কি? 

 

এ ধরনের পঙ্‌ক্তি পাঠককে খুব সহজেই কবিতার আবেগের ভেতরে টেনে নেয়। একই সঙ্গে ‘মেট্রোট্রেন’, ‘টি-শার্ট’, ‘লাইন জোড়া’–র মতো শব্দ ব্যবহারে কবিতাটি পেয়েছে সমকালীন বাস্তবতার স্বাদ। আধুনিক শহুরে জীবনের দ্রুততা ও মানসিক একাকিত্বও এর ভেতরে সূক্ষ্মভাবে ধরা পড়েছে।

কবিতায় প্রেম প্রকাশ পেয়েছে সরাসরি নয়, বরং ইঙ্গিত ও স্মৃতির ভেতর দিয়ে। ক্ষণিক দেখা কিংবা একটি হাসি এসবই কবির মনে বারবার ফিরে আসে। মনে হয়, বাস্তবের চেয়ে স্মৃতির ভেতরেই প্রেম বেশি বেঁচে থাকে। তাই কবিতার শেষ পঙ্‌ক্তি 

 

এসেছে ট্রেন, দুলিয়ে গেল স্মৃতির ঢেউটাকে

 

পাঠকের মনে এক ধরনের বিষণ্ণ অনুরণন তৈরি করে। এখানে ট্রেন শুধু যানবাহন নয়; এটি সময়, দূরত্ব ও হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির প্রতীক।

সব মিলিয়ে, ‘বাসো কি ভালো’ আধুনিক প্রেমের এক হৃদয়স্পর্শী কবিতা। সহজ ভাষা ও পরিচিত চিত্রকল্পের ভেতর দিয়ে কবি তুলে এনেছেন ভালোবাসার চিরন্তন অনিশ্চয়তা। যা প্রেমিক মনে সুখের মতো ব্যথা হয়ে থাকে জন্ম-জন্মান্তর।

এছাড়াও, কবিতাটির ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এখানে প্রেমকে কোনো চূড়ান্ত পরিণতির জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়নি। বরং কবি প্রেমের সেই অসম্পূর্ণতাকেই শিল্পে রূপ দিয়েছেন। অনেক সময় জীবনের সবচেয়ে গভীর অনুভূতিগুলো পূর্ণতা পায় না, কিন্তু স্মৃতিতে থেকে যায় সবচেয়ে বেশি। এই কবিতায়ও ঠিক তেমনই, একটি ক্ষণিক দেখা, একটি তাকানো কিংবা একটি সম্ভাব্য হাসি এসব ছোট ছোট মুহূর্তই হয়ে ওঠে দীর্ঘস্থায়ী আবেগের উৎস।

কবিতার চিত্রকল্পগুলোও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিদ্যুতের ঝলক যেমন হঠাৎ আলো ছড়িয়ে আবার মিলিয়ে যায়, তেমনি প্রেমের অনুভূতিও এখানে ক্ষণস্থায়ী অথচ গভীর। আবার মেট্রোরেলের চলমান গতি যেন জীবনের নিরন্তর ছুটে চলার প্রতীক, যেখানে মানুষ পাশাপাশি থেকেও একে অপরের কাছে পৌঁছাতে পারে না। এই প্রতীকী ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কবি আধুনিক মানুষের মানসিক দূরত্ব ও নিঃসঙ্গতাকে সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন।

তাই বলা যায়, আনিসুল হক রচিত ‘বাসো কি ভালো’ শুধু প্রেমের কবিতা নয়; এটি স্মৃতি, সময়, দূরত্ব ও অনুভূতির এক আধুনিক নগরকাব্য। খুব সাধারণ জীবনঘনিষ্ঠ দৃশ্যের মধ্য দিয়ে আনিসুল হক মানুষের হৃদয়ের চিরন্তন প্রশ্নকে তুলে এনেছেন ভালোবাসা কি সত্যিই ছিল, নাকি সবই কেবল স্মৃতির ভেতরে বেঁচে থাকা এক মায়া। এই প্রশ্নের উত্তর কবি দেন না; বরং পাঠকের মনেই সেই অনুরণন জাগিয়ে রেখে কবিতাটিকে করে তুলেছেন আরও বেশি জীবন্ত ও হৃদয়স্পর্শী।


********
কবিতার লিংক

 ___________

প্রচ্ছদ: জেমিনি 

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ