এলসিনোর দূর্গ ডেনমার্কের লাগোয়া রাজপ্রাসাদ। রক্ষীরা সেখানে খুবই ভয়ে থাকে ইদানিং। ভয়ের কারণ একটাই সেখানে বেশ কিছুদিন যাবত একটি প্রেতমূর্তির আনাগোনা পাওয়া যাচ্ছে। পাহারাদারদের মধ্যে যারা দেখেছে তারা বলছে কি যেন বলতে চায় মূর্তিটা অথচ পারে না। মূর্তিটা দেখতে হুবাহু রাজার পেতাত্মা রাজা লেয়াসের মতো। রক্ষীরা প্রেতমুর্তির কথাটি কানে দিয়েছেন হোরেশিওর। হোরেশিও প্রাক্তন রাজার পুত্র হ্যামলেটের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। রক্ষীদের কথার সত্য মিথ্যা যাচাই করতে হোরেশিও নিজেই এসেছেন দুর্গ পাহারা দিতে। শেষ রাতে হোরেশিও দেখতে পেলেন মৃত রাজা লেয়াসের মতো অবিকল প্রেত মূর্তি। পরের দিন হোরেশিও তার বন্ধু হ্যামলেট কে সেই রহস্যময় প্রেত মূর্তি আগমনের কথা জানালেন। পিতার মৃত্যু কালে হ্যামলেট ছিলেন রাজধানীর বাইরে। ফিরে এসে সে জানতে পারলেন তার মায়ের কাছ থেকে মৃত্যুর ঘটনা। একদিন দুপুরে রাজা বাগানে বিশ্রাম নিতেছিলেন। এমন সময় ক্লোডিয়াস রাজার কানে হেবোনা গাছের বিষাক্ত রস ঢেলে দেয়। বিষে নীল হয়ে রাজা মৃত্যুবরণ করেন। এদিকে ক্লোডিয়াস সবাইকে বলে সাপের দংশনে রাজা লিয়াসের মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুতে হ্যামলেট দুঃখ পেলেন ঠিকই কিন্তু এর থেকে বেশি দুঃখ পেলেন যখন তার পিতার মৃত্যু পর ক্লোডিয়াস তার বিধবা মা গার্টুডকে বিয়ে করে সিংহাসনে বসলেন।
হ্যামলেট তার বন্ধুর কাছে শুনলেন যে প্রেতমূর্তির কথা। যে কিনা নিয়মিত বাগানে আসে। সেই মূর্তিটা নাকি তার বাবার মতো৷ হ্যামলেট ঠিক করলেন যে তিনি সেই মূর্তির সামনে দাড়াবেন। অন্যান্য দিনের মতো হ্যামলেট তার বন্ধুর সাথে এসে দাঁড়ালেন সেই দুর্গের সামনে। হ্যামলেট জানতে চাইলেন প্রেতমূর্তীর কাছে, আপনি প্রতিদিন কেন এখানে আসেন। হ্যামলেটের প্রশ্নের উত্তরে তার বাবার প্রেতাত্মা চাপা কন্ঠে বলল -
হ্যামলেট আমি তোমার নিহত বাবার প্রেতাত্মা।
হ্যামলেট চিৎকার করে বলে উঠলো,
নিহত বাবা? কি বলেন আপনি?
উত্তর দিল প্রেতমূর্তি, আমার সব কথা আগে শোনো তোমার কাকা ক্লডিয়াসই হত্যা করেছে আমায়। একদিন আমি বাগানে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকতে ক্লোডিয়াস আমার কানে হেবনা গাছের বিষাক্ত রস ঢেলে দিয়েছে। সেই বিষক্রিয়ায় আমার মৃত্যু হয়। আর এ কাজে সাহায্য করেছে তোমার গর্ভধারিনী মা রানী গার্টুড। সবকিছু বললাম তোমাকে এ অন্যায়ের প্রতিবিধান তুমি করো। বিদায়।
এই ঘটনার পরে, হ্যামলেট প্রতিজ্ঞা করলেন তার বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিবেন। কিন্তু শুধু কি পিতার মুখের কথা শুনে সব বিশ্বাস করা ঠিক হবে। এজন্য এর সত্য প্রমাণ করার জন্য হ্যামলেট পাগলের মত আচরণ করা শুরু করলেন। হ্যামলেটের অদ্ভুত আচরণ ও পাগলাটে কথা শুনে রাজপ্রাসাদের অধিবাসীরা খুবই বিপন্ন হলেন। হ্যামলেটের কথা শুনে সবাই ভাবতে থাকে যে হ্যামলেট কি সত্যিই পাগল হয়েছে নাকি নিছক পাগলের ভান করছে। হ্যামলেটের এমন আচরণের সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় তার প্রেমিকা ওফেলিয়া। এভাবে কেটে যাচ্ছে দিনগুলো রাজার প্রেতাত্মার আবির্ভাব হয়নি এলসিনোর দূর্গে। হ্যামলেট তার বাবার খুনিকে বের করার জন্য একটি নাটকের আয়োজন করে। বাবার প্রেতমূর্তির মুখে শোনা ঘটনাকে নাটকে হুবাহু তুলে ধরে। নাটকের প্রবেশ করার পর হ্যামলেটের চাচা ক্লোডিয়াস খুবই ঘাবড়ে যায়। তখন হ্যামলেট বুঝতে পারে তার পিতার প্রকৃত খুনি তার চাচা ক্লোডিয়াস। হ্যামলেট যখন সব বুঝতে পারলো তখন ক্লোডিয়াস একটি সু্যোগ খুজছিলেন কিভাবে হ্যামলেট কে দেশ ছাড়া করা যায়। অবশেষে হ্যামলেট যখন পেনোলিয়াস কে হত্যা করে তখন এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দেশ ছাড়া করবেন।
ওফেলিয়া মনে প্রাণে ভালোবাসতো হ্যামলেটকে। ওফেলিয়া পিতা পোলোনিয়াসকে হ্যামলেট হত্যা করার পর হ্যামলেটকে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দিবেন ক্লোডিয়াস। ক্লোডিয়াস ডেনমার্কের রাজার কাছে একটি চিঠি লিখলেন, হ্যামলেট যেন ইংল্যান্ডের মাটিতে পা দেওয়ার সাথে সাথে করে তাকে মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত করে। তৎকালীন সময়ে ইংল্যান্ড ছিলো ডেনমার্কের অন্তর্গত। জাহাজে করে ইংল্যান্ড যেতে সি আত্মগত হলো হ্যামলেটের। চিটিতে হ্যামলেট নিজের নামটি কেটে তার পত্রবাহক ও তার সঙ্গীদের নাম লিখে যথাস্থানে রেখে দিলেন হ্যামলেট। ডেনমাকে পৌছে হ্যামলেট দেখলেন ওফেলিয়ার বাবা শোকে সত্যি পাগল হয়ে গেছেন। দিনরাত তার বাবার কবরের উপর সুয়ে থাকে। এতে হ্যমলেট দুঃখ পেলেও তার করার কিছুই নেই। হ্যামলেটের সমবয়সী পেলোনিয়াসের ছেলে লেয়ার্টেস। সে তার মতো তলোয়ার চালাতে পারদর্শী। যে ফ্রান্স থেকে দেশে ফিরে জানতে পারলেন দেশে তার পিতাকে হত্যা করেছে হ্যামলেট। আর পিতার শোকে পাগল হয়ে গেছে ওফেলিয়া পিতার হত্যার পাগল পর ওফেলিয় শোকে। এগুলো শুনে বেজায় রেগে গেলেন লেয়ার্টেন প্রতিঙ্গা করলেন প্রতিশোধ নেওয়ার। ক্লোডিয়াস নতুন ফন্দি আটলেন হ্যামটোট কে হত্যা করবে। তিনি আয়োজন করলেন একটি তলোয়ার প্রতিযোগীতার। ক্লোডিয়াস স্থির করলেন হ্যামলেটকে হত্যা করার জন্য বিষ মাখানো তরবারি ব্যবহার করবেন। পাগল হওয়ার পরও ভুলতে পারেনা ওফেলিয়া হ্যামলেটকে। একদিন কেন মনে হল ওফেলিয়ার হ্যামলেট এর সাথে তার বিবাহ হবে। কথাটি মনে হতেই সে ফুল মালার নিজেকে সাজিয়ে নদীর ধারে দাড়ালো। কি যেন ভেবে সে একটি গাছের ডালে উঠে বসলো অমনি ডালটি সজরে ভেঙ্গে নদীতে গিয়ে পড়ল ওফেলিয়া। নদীটি ছিল খরস্রোতা। পরবর্তীতে ওফেলিয়ার মৃতদেহ পাওয়া গেল।
রাজধানী থেকে এসে ওফেলিয়ার মৃত্যুর খবর শুনে ভেঙে পড়ল হ্যামলেট নিজেও। মৃতদেহের জন্য কবর খোঁড়া লোকের সাথে কথা বলতে হ্যামলেট। কথা শেষ না হতেই ওফেলিয়ার মৃতদেহ নিয়ে উপস্থিত হয়ে ওফেলিয়ার ভাই লেয়ার্টেস ও রানী গার্টুড । দূর থেকে হ্যামলেট লুকিয়ে দেখতে থাকলেন। ওফেলিয়াকে কবরের শোয়ানোর পর নিয়ম অনুযায়ী সবাই দিল তিন মুঠো মাটি। লেয়ার্টেসের কান্না শুনে হ্যামলেট নিজেকে আর লুকিয়ে রাখতে পারলেন না। এসে দাঁড়ালেন লেয়ার্টেসের সামনে পাগলের মত কান্না করতে থাকলে হ্যামলেট। হ্যামলেট বলতে থাকলেও তুমি কি ওফেলিয়ার পাশে শুয়ে থাকতে পারবে তার মত চিরুনিদ্রায় শাহিত হতে পারবে। তার প্রতি আমার যে ভালোবাসা আছে তা তোমার কিছুই নেই। এমন কথায় রাগান্বিত হয়ে খাপ থেকে একটি তলোয়ার এনে হ্যামলেটের দিকে। সেই সময় লেয়ার্টেস তার তলোয়ার আটকে রাখল। রাজসভায় সিদ্ধান্ত হলো যে হ্যামলেট ও লেয়ার্টেস এর মধ্যে তলোয়ার বাজি হবে। রাজা ক্লোডিয়াস তার লক্ষ্য পূরণ করার জন্য লেয়ার্টেসের তরবারির দুই ধারে বিষ মাখিয়েছিলেন তিনি। যে বিষ একবার রক্তে মিশলে মৃত্যু নিশ্চিত। এর পাশাপাশি তিনি তৈরি করে রেখেছিলেন বিষ মাখানো শরবত। লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হলে খেতে দিবেন বিষ মাখানো শরবত। যাতে করে বিষ মাখানো শরবত খেয়ে হ্যামলেটের মৃত্যু হয়।
শূরা ভর্তি পান পাত্রে চুমুক দেওয়ার সাথে সাথে দামামা বেজে উঠলো চারদিকে। তার সাথে তাল দিয়ে দুই দিক থেকে শুরু হল পুরানো বাহুর তলোয়ার বাজি। খেলার নিয়ম মেনে হ্যামলেট তলোয়ার বাজি করলেও লেয়ার্টেস কিন্তু কোন নিয়ম মানছে না। খেলার একটি বিরতিতে এসে লেয়ার্টেস বললো হ্যামলেট খুবই তৃষ্ণার্ত তাকে শরবত দাও। ঠিক এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল রাজা ক্লোডিয়াস। সাথে সাথে বিষ মিশানো শরবতের গ্লাস রানী হাতে তুলে দিবেন তার হাতে, সাথে সাথে বেজে উঠলো দ্বিতীয় রাউন্ড শুরুর বাজনা। সাথে সাথে সেকান থেকে দৌড়ে এসে খেলা শুরু করলেন হ্যামলেট। তাই শরবতটা রাজাকে ফেরত না দিয়ে রাণী নিজে খেয়ে ফেললেন কয়েক চুমুক।
ক্লোডিয়াসের ইশারায় লেয়ার্টেস তরবারি দিয়ে আঘাত করলেন হ্যামলেটকে। হ্যামলেট লেয়ার্টেসকে যুদ্ধের নিয়মের কথা মনে করিয়ে দিলো হ্যামলেট। তাতে করে হ্যামলেটের কথা তোয়াক্কা না করে পুনরায় আঘাত করল লেয়ার্টেস। তখন হ্যামলেট লেয়ার্টেসের হাতের তরবারি কেড়ে নিয়ে বসিয়ে দিলো লেয়ার্টেসে বুকে। তরবারির আঘাতে মৃত্যু হয় লেয়ার্টেসের। পরক্ষনে, রানীকে এলিয়ে পড়তে দেখে সবাই চেচিয়ে উঠে বললো বেহুশ হয়ে পড়েছেন রানী। জ্ঞান লাভের ঠিক পর মহুত্বে রানী টের পেলেন যে তিনি যে শরবত খেয়েছেন তাতে বিষ মেশানো ছিল। তিনি চেচিয়ে বললেন, আমি মারা যাচ্ছি তোমার শরবতে বিষ মেশানো ছিল হ্যামলেট। হ্যামলেট অবাক হয়ে তাকালেন তার মায়ের দিকে। তুমিই ছড়িয়েছে এ বিষ। তাই তোমাকে সেটা ফিরিয়ে দিলাম চেঁচিয়ে বলে উঠলো হ্যামলেট। রাজা, রানী এবং ক্লোডিয়াস সবাই এখন মৃত। যে অন্যায়ের প্রতিবিধান চেয়েছিলেন বাবার প্রীতমূর্তি সেটাই করেছে হ্যামলেট। কিন্তু এবার তার মাথা ঘুরতে শুরু করেছে টলছে তার পা। হ্যামলেট বুঝতে পারলেন তার মৃত্যু নিকটে। কিছুক্ষণ আগেই তিনি মাটিতে ঢলে পড়েছেন ছুটে এলেন পুরনো বন্ধু হোরেশিও। হ্যামলেটের মাথাটা তুলে নিলেন হোরেশিও তার কোলে।
শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে কোন মতে মুখ তুলে বললেন-
সবাইকে ডেনমার্কের হতবাক্য যুবরাজের কাহিনী শোনানোর জন্য একমাত্র তুমি বেচে রইলো হোরেশিও।
..................
প্রচ্ছদ: ChatGPT

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম