‘কাওড়া’ শব্দটার মধ্যেই যেন একটা ধুলোমাখা জনপদের গন্ধ আছে। এমন এক সমাজের দরজা খুলে দেয়, যাদের দিকে সভ্যতার মূল স্রোত সাধারণত তাকায় না। বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়, লেখক শুধু মানুষের গল্প বলেননি; বলেছেন অবহেলা, বঞ্চনা আর শ্রেণিগত ঘৃণার বহু পুরোনো ইতিহাস।
কাওড়া হচ্ছে দেশের এক ঐতিহ্যবাহী প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। মূলত পশুপালন বিশেষ করে শূকর পালনের সাথে তারা যুগ যুগ ধরে যুক্ত। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অবহেলিত হলেও গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। গ্রামীন এলাকায় এরা দল বেঁধে মাঠে, বনে, জঙ্গলে বা নদীর ধারে শূকর চড়িয়ে বেড়ায়। শূকর পালনের পাশাপাশি তারা কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে।
তারা সাধারণত গ্রামের মূল অংশ থেকে একটু দূরে আলাদা পাড়া বা কাওড়া পাড়া তৈরি করে বসবাস করে।
কাওড়াদলের সর্দার মঙ্গল এখানে কেবল একজন শুয়োরের রাখাল নয়, সে যেন সমাজের প্রান্তে ঠেলে রাখা সমস্ত মানুষের প্রতিনিধি। গ্রামের পথ, কাদামাটি, গালিগালাজ, ক্ষুধা, তাচ্ছিল্য- সবকিছু মিলে তার জীবন এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে পাঠকের মনে অস্বস্তি তৈরি হয়। কারণ আমরা বুঝতে পারি, এই মানুষগুলো আমাদের সমাজেই ছিল, এখনো আছে, অথচ তাদের জীবন নিয়ে আমরা খুব কমই ভাবি।
বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর নির্মম বাস্তবতা। এখানে দরিদ্রতাকে রোমান্টিক করা হয়নি। বরং লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে মানুষ শুধু পেটের দায়ে এমন কাজ করে, যার জন্য তাকে সারাজীবন অপমান সহ্য করতে হয়। কাওড়ার ভেতরের ক্ষুধা, রাগ, অপমানবোধ, এগুলো এত নিঃশব্দে এসেছে যে পাঠক ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
ভাষার মধ্যেও একটা লোকজ ঘ্রাণ আছে। সংলাপগুলো একেবারে বাস্তব অনেক জায়গায় বইটি এত জীবন্ত হয়ে ওঠে যে কাদা, ঘাম আর পশুর গন্ধও যেন অনুভব করা যায়।
বর্তমান যুগে আধুনিকায়ন এবং সামাজিক পরিবর্তনের কারণে অনেকেই এই আদি পেশা ছেড়ে দিয়ে দর্জি, রাজমিস্ত্রি, ভ্যান চালক বা অন্যান্য পেশায় যুক্ত হচ্ছে। এদিকে উন্মুক্ত জমি বা মাঠ কমে যাওয়ায় শূকর চড়ানোর জায়গাও দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।
তবে এই বই শুধু দুঃখের নয়। এর ভেতরে মানুষের টিকে থাকার এক জেদও আছে। আছে প্রেম, সংসার, মেয়েদের বৈধ্যের জ্বালা। সমাজ যাদের নিচু চোখে দেখে, তাদেরও স্বপ্ন থাকে, ভালোবাসা থাকে, অপমানের কষ্ট থাকে- এই সহজ অথচ কঠিন সত্যটাই বইটি গভীরভাবে মনে করিয়ে দেয়। এখানে এক জাদুবাস্তব চরিত্র আছে ‘আনন্দ ঠাকুর’ যে শূকরের পালের মড়ক ঠেকায়, তার ইচ্ছেতেই মাদি শূকর বাচ্চা বিয়োয়। সেই সাথে দীপেন, দীনেশ, হরিপদ, নীলে, কালি, অঞ্জনা, সুবোধ, নারায়ণী আছে নিজ নিজ কাজে। আছে বেশ কিছু ছড়া। যেমন-
আমি কান্দি তোমার জন্য
তুমি কান্দ ক্যান?
দুঃখে আমরা জোড়া শালিক
দুঃখ যেন ধ্যান।
বইটি পড়ে শেষ করার পর একটা ভারী অনুভূতি থেকে যায়। মনে হয়, আমরা যে সমাজে বাস করি, সেখানে মানুষের পরিচয় এখনো তার শ্রম বা মনুষ্যত্ব দিয়ে নয়, বরং তার পেশা আর জন্ম দিয়ে বিচার করা হয়।
কাব্রা বিটা শুয়োর চড়ায়,
হাইগে-মুইতে খায়
কাব্রা মাগীর ভাতার ছাড়া
খোঁয়াড় ভইরে যায়।
শুয়োর চড়ায় যে কাওড়া সেই ‘কাওড়া মঙ্গল’ অন্ধকার বাস্তবতারই এক তীব্র দলিল।
**********
কাওড়ামঙ্গল
রোমেল রহমান
প্রকাশক- অনুপ্রাণন, ঢাকা।
প্রকাশকাল: ২০২৫
পৃষ্ঠা: ৮০
মূল্য ৩০০ টাকা
ISBN: 987-984-29017-2-1

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম