মা হওয়া কি মুখের কথা
শুধু প্রসব করলে হয় না মাতা
যদি না বুঝে সন্তানের ব্যাথা
—রামপ্রসাদ সেন
প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার যেমন আছে, ঠিক তেমনি সন্তানেরও মূল্যবোধের অধিকার রয়েছে—সেসব বিষয়বস্তুকে সামনে রেখে ‘সন্তানের অধিকার’ রচিত হয়েছে। তরুণ চিন্তক স্বাধীন আহমেদ তার রচিত গ্রন্থে সন্তানের স্বাধীনতা, মাতা-পিতার দায়িত্ব কর্তব্য, লালন-পালন ও পিতা-মাতার নিঃস্বার্থতা বিষয়ক কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন, যা পিতা-মাতার দায়িত্বহীনতার বিপক্ষে সচেষ্ট অবস্থান।
প্রাচীন ভারতে সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষার কাঠামো ছিল বেশ শক্তপোক্ত ও গুরু আশ্রিত। পিতা-মাতার অনুপস্থিতি অর্থাৎ বিধাতার প্রথম দান মাতৃস্নেহ হতে দূরে গিয়ে জ্ঞানার্জন করে ফিরতে হয়েছিল। কিন্তু একালের চিক্তক পিতা-মাতার সংস্পর্শ ত্যাগ করতে চান না বরং স্নেহধন্য হয়ে তাদের সাথে থেকে সন্তানের মৌলিক অধিকার দাবি করেন।
সন্তানের দৈনন্দিন যাপনের খোঁজখবর, বেড়ে ওঠা, রুটিনমাফিক চলাফেরা ইত্যাদি বিষয়ে যথেষ্ট ভূমিকা না থাকলে সন্তানের মেধাবিকাশে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়, তার জন্য যাতে পিতা-মাতাকে ভবিষ্যতে দোষী না হতে হয়। সে কথা চিন্তা করেই ‘সন্তানের অধিকার’ রচিত হয়েছে।
‘সন্তানের শিক্ষা’ প্রবন্ধে শ্রীমৎ অনির্বাণ বলেন,
বাবা-মা ছেলেকে ভালবাসতে জানেন, কিন্তু কেন যে ভালবাসেন, তা বুঝেন না। এই অন্ধের মত ভালবাসাতেই তো সর্ব্বনাশ হয়। অজ্ঞানের ভালবাসায় সকল কর্ত্তব্যবুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়— ও তো ভালবাসা নয়, ও হচ্ছে রাক্ষসী মায়া।
এখনকার তরুণ চিন্তকরাও সে কথায় সম্মতি জানিয়ে বলেন, সন্তানের অধিকার রক্ষায় শুধুমাত্র ভালোবাসার একঘেয়েমি দূর করে—যথাযথ প্রক্রিয়ায় সন্তানের অধিকার সুনিশ্চিত করা কর্তব্য। স্বাধীন আহমেদ এ গ্রন্থে পিতা-মাতার চরিত্র, যোগ্যতা ও সন্তান ধারণের পরিকল্পনার পূর্বে সন্তানের অধিকারের বিষয়ে নিশ্চিত হতে বলেন। জন্ম দিলেই যে কেউ পিতা-মাতা হবেন, এ ধারণা থেকে বের হয়ে প্রত্যেক পিতা-মাতাকে দায়িত্ব নিতে হবে। এক্ষেত্রে পিতা-মাতা যদি দায়িত্ব গ্রহণ না করেন বা সন্তানের প্রতি অনধিকার চর্চা করেন, তাহলে আইনের মুখোমুখি হতে হবে, শাস্তিভোগ করতে হবে। লেখক এ কথায় বারবার বলার দরকার মনে করেছেন। তিনি এ গ্রন্থটিকে সন্তানের অধিকার নিয়ে পৃথিবীতে প্রথম গ্রন্থ বলে উল্লেখ করেছেন।
সন্তানের অধিকার গ্রন্থের বেশ কয়েকটি প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে; পুত্র সন্তানের প্রত্যাশা, বাল্যবিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও বহুবিবাহ, পথেরশিশু ও শিশুশ্রম, উপেক্ষিত সন্তান, আদর্শ সন্তান, অতিরিক্ত জনসংখ্যার প্রভাব, কারণ ও প্রতিকার, সন্তানের অধিকার ইত্যাদি প্রবন্ধের বিষয়বস্তুর মূলে সন্তানের অধিকার সুনিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
‘পুত্র সন্তানের প্রত্যাশা’ প্রবন্ধে পুত্র কামনা ও কন্যা শিশুর প্রতি অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিকারের সম্বন্ধে বলা হয়েছে। এদিকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও বিবাহবিচ্ছেদের কারণে সন্তানের অনধিকার চর্চা এবং শিশুশ্রমের মতো জটিল বিষয়গুলো উঠে এসেছে—অপরদিকে আদর্শ সন্তান, পিতা-মাতার কর্তব্য, সন্তানের কর্তব্য, বৈশ্বিকপ্রভাব, জনসংখ্যা বৃদ্ধি কারণে বিপর্যয় ইত্যাদি বিষয়েও লেখকের সুচারু মন্তব্য সন্তানের অধিকার রক্ষায় কার্যকর হবে।
এদেশের তরুণ চিন্তকরা একটু সহযোগিতা পেলে সমাজ ও সভ্যতার প্রয়োজনীয় উপাদান হয়ে উঠবে। স্বাধীন আহমেদের মতো অখ্যাত মানুষও একদিন সমাজের বিপ্লব ঘটাবে। যে সমাজব্যবস্থা চিন্তা করতে পারবে তার অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারবে। এবং সুন্দর শিক্ষিত একটি সমাজের জন্ম দেবে।
★★★★★★★★
সন্তানের অধিকার
স্বাধীন আহমেদ
প্রকাশনা: সূর্যোদয় প্রকাশন, ঢাকা।
প্রথম প্রকাশ: নভেম্বর, ২০২৩
মূল্য: ৩৫০ টাকা
পৃষ্ঠা : ১৬০
আইএসবিএন: ৯৭৮-৯৮৪-৯৭৭০৮-৫-৫

0 মন্তব্যসমূহ
মার্জিত মন্তব্য প্রত্যাশিত। নীতিমালা, স্বীকারোক্তি, ই-মেইল ফর্ম