রুশোর 'দি কনফেশান্‌স্‌' ও তাঁর ভূতগ্রস্ত অনুবাদক সরদার ফজলুল করিম - তানভীর হক

রুশোর 'দি কনফেশান্‌স্‌'  বইয়ের প্রচ্ছদ


কোনো বই যখন অনুবাদের গণ্ডি পেরিয়ে স্বয়ং অনুবাদকের অস্তিত্বকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়, তখন তা আর সাধারণ সৃষ্টিতে সীমাবদ্ধ থাকে না— রূপ নেয় এক মনস্তাত্ত্বিক আখ্যানে। ফরাসি দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী এবং ইউরোপীয় আলোকায়নের অন্যতম পথপ্রদর্শক জ্যাঁ জ্যাক রুশোর (১৭১২–১৭৭৮) মতো তীব্র সংবেদনশীল ও কালজয়ী চিন্তাবিদের জীবনের অলিগলিতে বিচরণ করতে গিয়ে এক অনুবাদকের নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলার এক জীবন্ত দলিল এই গ্রন্থ।

ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশোর বিখ্যাত আত্মজীবনী 'The Confessions'-এর অনুবাদক সরদার ফজলুল করিম ছিলেন একাধারে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, চিন্তাবিদ ও আজীবন সংগ্রামী। ১৯২৫ সালে বরিশালে জন্ম নেওয়া এই মনীষী ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীকালে তিনি সক্রিয়ভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হন এবং রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন মেয়াদে দীর্ঘ ১১ বছর কারাবরণ করেন। এরপর ১৯৬৩ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তান সামরিক বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং অবশেষে ১৭ ডিসেম্বর তিনি অন্যান্য কারাবন্দির সঙ্গে মুক্তি লাভ করেন। ১৯৭২ সালে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের বিশেষ উদ্যোগে তিনি আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় প্রত্যাবর্তন করেন; তবে এবার দর্শন বিভাগে নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। ১৯৮৫ সালে তিনি সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

সরদার ফজলুল করিম নিরাপদ জীবন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশা ত্যাগ করে বেছে নিয়েছিলেন আত্মগোপন ও কারাবরণের রাজনৈতিক জীবন। ১৯৫৪ সালে বন্দী অবস্থায় তিনি কারাগার থেকেই পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সমাজের তথা সমষ্টির মঙ্গলের জন্য একটি কল্যাণকর ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্নের পেছনে আজীবন নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্যেই তিনি মানুষের ব্যক্তিজীবনের সার্থকতা খুঁজতেন। কর্মপাগল ও চিন্তাশীল এই মানুষটি আমৃত্যু লেখালেখিতে মগ্ন ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘প্লেটোর সংলাপ’, ‘প্লেটোর রিপাবলিক’, ‘অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স’, ‘রুশোর সোশ্যাল কনট্রাক্ট’, ‘রুমির আম্মা ও অন্যান্য প্রবন্ধ’, ‘আমি সরদার বলছি’, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ: আলাপচারিতায় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক’, ‘চল্লিশের দশকের ঢাকা’ এবং ‘দর্শনকোষ’। ২০১৪ সালের ১৫ জুন এই মহান চিন্তাবিদ মৃত্যুবরণ করেন।

জ্যাঁ জ্যাক রুশোর রাজনৈতিক চিন্তাধারা যেমন ফরাসি বিপ্লবকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, তেমনি পরবর্তী সময়ে জাতীয়তাবাদের বিকাশেও রেখেছিল বিশেষ ভূমিকা। আত্মজৈবনিক রচনাশৈলীতে তিনি আধুনিক ধারার সূত্রপাত করেন। অষ্টাদশ শতকে তাঁর রচিত উপন্যাসগুলো যেমন তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল, তেমনি তা ছিল সাহিত্যে রোমান্টিকতাবাদের অন্যতম প্রধান উৎস। এছাড়া, সুরকার হিসেবে পাশ্চাত্য সংগীতেও রয়েছে তাঁর অনন্য অবদান।

জ্যাঁ জ্যাক রুশোর বিখ্যাত আত্মজীবনী "The Confessions" (দ্য কনফেশনস)। ১৭৬৫ সাল পর্যন্ত নিজের জীবনের প্রথম ৫৩ বছরের খতিয়ান নিয়ে রুশো ১৭৬৯ সালে গ্রন্থটি লেখা শেষ করেন। তবে তাঁর মৃত্যুর চার বছর পর, ১৭৮২ সালে এটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। অবশ্য মূল পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশের আগেই রুশো এর কিছু অংশ বিভিন্ন সাহিত্যসভায় পড়ে শুনিয়েছিলেন। 'The Confessions' মোট দুটি স্বতন্ত্র খণ্ডে বিভক্ত এবং প্রতিটি খণ্ডে ছয়টি করে পুস্তক রয়েছে:

  • প্রথম খণ্ড (১ম থেকে ৬ষ্ঠ পুস্তক): ১৭৬৫ থেকে ১৭৬৭ সালের মধ্যে রচিত এই অংশটি ১৭৮২ সালে প্রকাশিত হয়।
  • দ্বিতীয় খণ্ড (৭ম থেকে ১২শ পুস্তক): ১৭৬৯ থেকে ১৭৭০ সালের মধ্যে রচিত এই অংশটি ফরাসি বিপ্লবের ছয় বছর পর ১৭৯৫ সালে প্রকাশিত হয়।

রুশো বইটির একটি তৃতীয় খণ্ড লেখার পরিকল্পনা করেছিলেন, তবে তাঁর সেই ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে যায়।

রুশোর 'The Confessions'-এর ১ম থেকে ৭ম পুস্তক পর্যন্ত সরদার ফজলুল করিম 'আমি রুশো বলছি: দি কনফেশান্‌স্‌' শিরোনামে বাংলায় রূপান্তর করেছেন। এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও প্রধান আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। এই আত্মজীবনীতে রুশো মূলত তাঁর পার্থিব অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত অনুভূতির আলোকে অত্যন্ত অকপটে নিজের জীবনকাহিনী তুলে ধরেছেন। রুশো তাঁর এই বইটির সূচনা করেছেন এভাবে— 


'...আমার সমকালের সহযাত্রীদের সম্মুখে আমি একটি মানুষকে অনাবৃত করতে চাই… এই মানুষটিকে আমি চিনি। মানুষটিকে আমি আদ্যোপান্ত জানি। সেই মানুষটি আমি নিজে। যার নাম রুশো।'

 

আত্মজীবনীমূলক লেখার ক্ষেত্রে রুশোর এই অকপট প্রকাশশৈলী পরবর্তীতে অনেক বিখ্যাত লেখক ও কবিকে অনুপ্রাণিত করে; তাঁদের মধ্যে জার্মান লেখক ও কবি ইয়োহান ফন গ্যোটে (১৭৪৯ – ১৮৩২), ইংরেজ রোমান্টিক কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (১৭৭০ – ১৮৫০) এবং ফরাসি ঔপন্যাসিক স্তাঁদাল্ (১৭৮৩ - ১৮৪২) অন্যতম।

১৭১২ সালে জেনেভাপ্রবাসী এক প্রোটেস্ট্যান্ট পরিবারে রুশোর জন্ম। জন্মের মাত্র কয়েকদিন পরেই তিনি মাতৃহারা হন। দশ বছর বয়সে পিতার কাছ থেকে দূরে গিয়ে তিনি আত্মীয়স্বজনের আশ্রয়ে প্রতিপালিত হতে থাকেন। রুশো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, জন্মের পর পরই মায়ের এই অকালমৃত্যুই তাঁর জীবনের সকল দুর্ভাগ্যের মূল উৎস। এর কয়েক বছর পর রুশো বাড়ি থেকে পালিয়ে যান এবং পরিব্রাজকের মতো বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৭২৮ সালের দিকে তিনি মাদাম দ্য ওয়ারেন্সের সংস্পর্শে আসেন, যিনি বয়সে রুশোর চেয়ে প্রায় ১৩ বছরের বড় ছিলেন। মাদাম ওয়ারেন্সের প্রতি নিজের মুগ্ধতা ও গভীর নির্ভরতার কথা রুশো তাঁর আত্মজীবনীতে অসাধারণ বাক্যশৈলীতে ফুটিয়ে তুলেছেন। পরবর্তীকালে তাঁদের মধ্যে প্রণয় সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং মাদামের অনুপ্রেরণাতেই রুশো ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত হন। প্রায় এক যুগ একসঙ্গে কাটানোর পর, একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। তখন রুশো লিয়োঁ শহরে চলে যান এবং সেখানে কিছুদিন গৃহশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। সরদার ফজলুল করিম মূলত রুশোর জীবনের এই অধ্যায় পর্যন্তই তাঁর অনুবাদ গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন।

রুশোর অবমাননাকর ও লজ্জাজনক মুহূর্তগুলোর বিশদ বিবরণের জন্য 'The Confessions' বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ, বইটিতে বর্ণিত একটি ঘটনায় দেখা যায়— রুশো পরিচারক হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন নিজে একটি ফিতা চুরি করেন; কিন্তু সেই অপরাধ গোপন করতে তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে একজন নির্দোষ পরিচারিকাকে দোষী বানিয়ে দেন। আত্মজীবনীটিতে বেশ কিছু ত্রুটিও লক্ষ করা যায়; যেমন—অনেক ক্ষেত্রেই তারিখ ও ঘটনাক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি।

প্রতিভাবান রুশো অল্প বয়সেই প্রচুর গ্রন্থ পাঠ করেছিলেন এবং তখন থেকেই তাঁর মধ্যে এক ভিন্নধর্মী চিন্তার উন্মেষ ঘটে। সারল্য ও আভিজাত্যের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সবসময়ই তাঁর মনকে বিচলিত করতো। জীবনের নানা বঞ্চনা ও ভাগ্যবিড়ম্বনা পরবর্তীকালে তাঁকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, রুক্ষ স্বভাবের ও খ্যাপাটে এক মানুষে পরিণত করে। আর এই মানসিক অবস্থার কারণেই তৎকালীন সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল প্রচলিত রীতিনীতির বিরুদ্ধে তিনি বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলেন।

অনুবাদক সরদার ফজলুল করিম 'আমি রুশো বলছি: দি কনফেশান্‌স্‌' গ্রন্থের ভূমিকায় নিজেকে রুশোর 'ভূতগ্রস্ত' বলে উল্লেখ করেছেন; এমনকি গ্রন্থটি তিনি উৎসর্গও করেছেন রুশোকে। ১৭৬২ সালে কালজয়ী রাষ্ট্রদর্শন 'The Social Contract' এবং শিক্ষাদর্শন 'Emile' প্রকাশিত হলে রুশো একাধারে গির্জা ও রাজতন্ত্রের রোষানলে পড়েন। ফলে শুরু হয় তাঁর যাযাবর ও পলাতক জীবন। কোথায় যেন মিলে যায় সরদার ফজলুল করিম এবং রুশোর জীবনরেখা! এই বৈরী পরিস্থিতিতে ১৭৬৬ সালে রুশো ইংল্যান্ডে আশ্রয় নেন। পলাতক জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা শেষ জীবনে তাঁকে তীব্র সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মানুষে পরিণত করে। পরবর্তীতে ১৭৭০ সালে তিনি প্যারিসে ফিরে আসেন এবং স্বরলিপি রচনায় মনোনিবেশ করেন। তাঁর এই স্বরলিপি পদ্ধতিটি ছিল সম্পূর্ণ স্ব-উদ্ভাবিত। ১৭৭৮ সালের ২ জুলাই ভাগ্যবিড়ম্বিত এই মহান চিন্তাবিদ শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

'আমি রুশো বলছি: দি কনফেশান্‌স্‌' একাধারে মেধা, মনন এবং তীব্র এক অবসাদের কোলাজ, যা পাঠের পরও মনের ভেতর দীর্ঘস্থায়ী বিষাদের রেশ রেখে যায়। বইটিতে রুশোর জীবনের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে শব্দের পেছনে লুকিয়ে থাকা অনুবাদকের নীরব আত্মনিবেদন—যিনি অনুবাদ করতে গিয়ে নিজেই এক 'ভূতগ্রস্ত' সত্তায় পরিণত হয়েছেন। চিন্তার গভীরতা আর অনুভূতির তীব্রতায় সমৃদ্ধ বইটি সংবেদনশীল পাঠকের হৃদয়ে এক অমোঘ দাগ কেটে যাবে।

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ