বই রিভিউ: হুমায়ূন আহমেদের 'কুটু মিয়া' - রেশাদ আদিল

হুমায়ূন আহমেদ রচিত 'কুটু মিয়া' উপন্যাস প্রচ্ছদ

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দানবীয় লেখক হুমায়ূন আহমেদকুটু মিয়া তাঁর লেখা একটি ছোট উপন্যাস বা উপন্যাসিকা। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। উপন্যাসিকাটি মূলত মনস্তাত্ত্বিক ও অতিপ্রাকৃতিক উপাদানে গাঁথা।

উপন্যাসিকাটির শুরুতেই মূল চরিত্র কুটু মিয়া ও আরেক প্রধান চরিত্র আলাউদ্দিনের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটে। আলাউদ্দিন একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। অবসরের পর ঢাকায় একটি ফ্ল্যাটের অর্ধেক অংশ নিয়ে তিনি একা থাকেন। জটিলতাহীন, প্রায় নির্ঝঞ্ঝাট জীবন তাঁর। তিনি এখন পেশাদার লেখক— অন্যের জন্য লেখেন, আর এর বিনিময়ে প্রকাশনী থেকে টাকা পান।  এখন তার একজন কাজের লোক দরকার, কারণ গত পনেরো দিনে তিনটা কাজের লোক চলে গেছে। সর্বশেষটি সাথে করে একটি দামি রেডিও ও রাইস কুকার নিয়ে গেছে।

ঠিক তখনই আলাউদ্দিনের জীবনে আসে কুটু মিয়া—বাবুর্চি ও কাজের লোক হিসেবে।

কুটু মিয়ার চেহারা ও শারীরিক গঠন থাকে বিচিত্র। তেলতেলে মুখ, খাবলা খাবলা চুল। তার চোখের দিকে তাকালে মনে হয় লোকটার যেন চোখই নেই। একটি চোখ পুরোপুরি নষ্ট। গা থেকে আসে বাসি গন্ধ। লেখক তাকে পুরোনো বাড়ির খাম্বার সঙ্গে তুলনা করেন। 

আলাউদ্দিন কুটু মিয়াকে রেখে দেন। প্রথম দিনই কুটু মিয়া তাকে মুগ্ধ করে ফেলে অত্যন্ত সুস্বাদু রান্নার মাধ্যমে। এরপর কুটু মিয়া আলাউদ্দিনের জন্য এমন আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করে, যা আগে তিনি কখনো পাননি। আলাউদ্দিনের বলার আগেই কুটু মিয়া বুঝে ফেলে তার কী প্রয়োজন এবং জিনিসটি হাজির করে দেয়। আলাউদ্দিন বিস্মিত হন। তিনি ধীরে ধীরে এমন এক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, যেখানে তাকে আর কিছু নিয়ে ভাবতে হয় না। সবকিছু ঠিক সময়মতো হয়ে যাচ্ছে। সবকিছু তার প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানো। আর এই আরামের মধ্য দিয়েই কুটু মিয়া আরও গভীরভাবে ঢুকে পড়ে আলাউদ্দিনের জীবনে। তারপর শুরু হয় পরিবর্তন। আলাউদ্দিনের শরীর বদলাতে শুরু করে। বদলাতে থাকে তার আচরণ, চিন্তা এবং বাস্তবতাকে দেখার ধরন। যে মানুষটি শুরুতে নিজের জীবন নিয়ে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে মনে হতো, সে ধীরে ধীরে সব যেন হারিয়ে ফেলতে থাকে। 

এরপর পাঠকরা অতিপ্রাকৃতিক, আতঙ্কের অনেক কিছু পাবে গল্পে, যার সাথে কুটু মিয়া জড়িত। আলাউদ্দিনের মনে হয় সব তার নিজের ভ্রম। হামিদার মনে হয় সবকিছু কুটু মিয়াই নিয়ন্ত্রণ করছে। হামিদার বিয়ে হয় আলাউদ্দিনের সাথে। বিয়ের পর হামিদার জীবনেও কুটু মিয়া ঢুকে যায়। কেনো? কিভাবে?

গল্পে অনেক বাধা আসে। যে বা যা বাধা হয়ে আসে, তার সাথেও কিছু ঘটে।। কি ঘটবে, কে ঘটাবে?

পাঠকরা এক পর্যায়ে ভাববে, কুটু মিয়া কেবল একজন অসাধারণ কাজের লোক, যে আলাউদ্দিনের জীবনকে সুন্দর করে তুলতে চায়? নাকি সে ধীরে ধীরে আলাউদ্দিনের জীবন, হামিদার জীবন ও বাস্তবতাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিচ্ছে?

নাকি কুটু মিয়া আদৌ বাইরের কোনো মানুষ নয়—সে আলাউদ্দিনের, হামিদার নিজের অবচেতন মনেরই কোনো অংশ? লুকিয়ে থাকা এমন কোনো অন্ধকার, যার অস্তিত্ব আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু কোনো একদিন সে আমাদের জীবনেও এসে নিজের পরিচয় দেয়।

কুটু মিয়া আসলে কে? 

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ