জসীম উদ্‌দীন রচিত 'যে দেশে মানুষ বড়' বই প্রসঙ্গে রিজিয়া জাহান ঐশী

পল্লীকবি জসীম উদ্‌দীন রচিত 'যে দেশে মানুষ বড়' বইয়ের প্রচ্ছদ


'যে দেশে মানুষ বড়' ভ্রমণকাহিনীমূলক গ্রন্থটি পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়ায় কল্পনায় ভ্রমণ করে ভ্রমণ অভিজ্ঞতার অনুভূতি প্রকাশ করলাম-

পল্লীকবি জসীম উদ্‌দীন লিখিত একটি ভ্রমণকাহিনী 'যে দেশে মানুষ বড়'। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। লাল ও হলুদের সংমিশ্রণে তৈরি বইটির হার্ডকভার অনেকটাই আকর্ষণীয় এবং নতুন দেশকে জানার ও দেখার কল্পনা করার মতোই সুন্দর।

লেখকের তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (রুশ দেশ) ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও সেখানকার সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার বিবরণ রয়েছে বইটিতে। তাছাড়া বইটিতে বিভিন্ন অনুচ্ছেদে প্রত্যেকটি স্থান উল্লেখ করে ঘোরার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন লেখক।

লেখকের খুব ইচ্ছা ছিল সোভিয়েত দেশে ভ্রমণে যাবেন। সেই স্বপ্ন সফল হয় পাক-রুশ মৈত্রী সমিতির সহ-সভাপতি ডা. গঙ্কোওস্কি পাকিস্তান সফরে এসে কবিকে তার দেশে নিমন্ত্রণ করায়। সত্য সত্যই একদিন বিজ্ঞান একাডেমি থেকে সোভিয়েত দেশ ভ্রমণের নিমন্ত্রণপত্র পেলেন কবি। রাশিয়ার বিমানবন্দরে নেমে তিনি অভিভূত হন। কবির ভাষায়, 

উড়োজাহাজ হইতে রুশ দেশের মাটিতে পা ফেলিলাম। কী সুন্দর এই দেশ ! আর কী সুন্দর এর নর-নারী! পথে পথে যেন রূপকথার ছেলে মেয়েরা ঘুরিয়া বেড়াইতেছে।

কবি হোটেলে উঠলেন। যেখানে একটি টেলিফোন আছে। যদি হোটেলের কারও সাথে কথা বলার প্রয়োজন হয় তখন টেলিফোনের ডায়াল ঘুরিয়ে অনুবাদিকাকে বললে তিনি টেলিফোনের সাহায্যে সেই ব্যক্তিকে রুশ ভাষায় বুঝিয়ে দেন। এমনি এক অনুবাদিকা সাতলানার সাথে কবির পরিচয় হয়। সে ভাষা ক্লাশের ইংরেজির ছাত্রী। দুই মাসের জন্য হোটেলে এসেছে, রুশ না জানা বিদেশিদের সাহায্য করতে। পাতলা ছিপছিপে গঠন, মুখখানা ভারি মিষ্টি। সে কবিতা পড়তে ভালোবাসে তাই সে কবির প্রতি আগ্রহ দেখালো; আর কবিতা নিয়ে কবির সাথে আলাপ-আলোচনা করল।

কিছুক্ষণ পর ডা. গঙ্কোওস্কির মোটরে উঠে শহরে যেতে যেতে চারদিকে অনেক গাছপালা দেখা গেল। ঘুরতে ঘুরতে রেডস্কোয়ারের সামনে আসলেন, যেখানে দাঁড়িয়ে লেনিন প্রতি বছর তার জনগণকে ভাষণ দিতেন সেই রেডস্কোয়ারে সৈনিকদের কুচকাওয়াজ দেখতে প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবসে লক্ষ লক্ষ মানুষ এসে সমবেত হয়। তারই পাশে একটি গৃহে লেনিন চিরনিদ্রায় নিদ্রিত।

অদূরে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি আশ্চর্য রুশদেশের অতিকায় ঘন্টা। ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে রূপা, তামা, ব্রোঞ্জ প্রভৃতি বিভিন্ন ধাতু গলিয়ে বিশাল ঘন্টাটি তৈরী করেন আড়াইশ বার বৎসর আগে প্রসিদ্ধ কারিগর আইভান নোটেরিন আর তাঁর পুত্র মিখাইল।

ঘণ্টার অদূরে ক্রেমলিন প্রাসাদ। অদূরে কয়েকটি সুন্দর সুন্দর গির্জা স্বর্ণচূড়া মাথায় পড়ে রোদের আলোতে ঝলমল করছে। এককালে সব দেশের স্থপতিরাই সব চেয়ে সুন্দর করে মন্দির, মসজিদ, গির্জা বানাতেন। একালের স্থপতিরা বিজ্ঞানের নানা সুযোগ-সুবিধা সত্ত্বেও মধ্যযুগের সেই স্থপতিদের মতো তেমন সুন্দর সুন্দর ইমারত তৈরী করতে পারেননি।

ক্রেমলিন ছেড়ে আরও দূরে যেতে চোখে পড়লো স্মরণীস্বরূপ স্পুটনিক স্তম্ভ। রুশদেশ স্পুটনিক চালনায় পৃথিবীর সব দেশকে অতিক্রম করেছে। কোথা হতে কীভাবে স্পুটনিক ছাড়া হয় তা অতি গোপন রাখা হয়। কারণ আমেরিকার সাথে চাঁদে অভিযান নিয়ে সোভিয়েত দেশের প্রতিযোগীতা চলছে।

পরদিন কবি এশীয় সংস্কৃতি কেন্দ্র দেখতে গেলেন। সেখানকার ডিরেক্টর সাহেব তাঁকে অতি সমাদরে গ্রহণ করলেন। এখানে দেখা হলো মিসেস বিকোভার সাথে। যিনি গত বিশ বছর ধরে বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন। ভদ্রমহিলার এমনই সুন্দর ব্যবহার, দু' একটি কথায় অপরের মন হরণ করতে পারেন। আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সাথে পরিচয় হলো তারা কেউ উর্দু, কেউ হিন্দি ভাষা শিখে গবেষণা করছেন। 

ডিরেক্টর সাহেব কবিকে বর্তমান পাকিস্তানে বাংলা ভাষার গতি প্রকৃতির বিষয়ে কিছু বলতে অনুরোধ করলেন। কবি বলেন -

স্বাধীনতার পর পূর্ব পাকিস্তানে অল্পদিনেই কয়েকজন ভালো সাহিত্যিকের উদয় হয়েছে। তাঁদের কারও কারও খ্যাতি পাকিস্তানের সীমানার বাইরেও প্রসারিত হয়েছে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস 'লালসালু' ইংরেজি ও ফরাসী ভাষায় অনূদিত হয়ে বহু সমালোচকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আবু ইসহাকের 'সূর্য দীঘল বাড়ি', চেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আমার 'মাটির কান্না' বইটির রুশ-ভাষায়, 'নক্সী কাঁথার মাঠ' এবং 'বাঙালীর হাসির গল্প' ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়া আমাদের লোক সাহিত্যের কিছুটা ইংরেজি, ফরাসী আর চেক ভাষায় অনূদিত হলে রঁমারোঁলা, শিলভালেভি প্রমুখ বহু মনীষী ব্যক্তির ইচ্ছার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন ।


একজন মহিলা পরিষ্কার বাংলা ভাষায় কবিকে জিজ্ঞেস করলেন,

বলুন তো কার কার বই আমরা অনুবাদ করতে পারি?


কবি বললেন, 

শহীদুল্লাহ কায়সারের 'সংশপ্তক', কাজী আতাহার উদ্দীনের যক্ষা হাসপাতালের পরিবেশে লেখা উপন্যাস 'পিপাসা', সরদার জয়েনউদ্দীনের 'অনেক সূর্যের আশা', শওকত ওসমানের 'জননী'। দিলারা বেগমের 'ঘর মন জানালা' ও মনোয়ারা বেগমের 'গোধূলির স্বপ্ন'। 

 

আলোচনা শেষ হলে একজন বৃদ্ধ মহিলা কবিকে এই প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি দেখালেন । 

পরদিন মিসেস মরিয়াম সালজনিকের সঙ্গে দেখা করলো কবি। কবির বন্ধু লেনিন-পুরস্কারখ্যাত ফয়েজ আহমদ ফয়েজের বান্ধবী তার সাথেও সাহিত্যের বিষয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা করা হলো। কিছুদিন মস্কো শহরে ঘুরে একদিন বিকেলে লেলিন-গ্রাডে এসে পৌঁছিলেন কবি। এই সেই লেলিনগ্রাড, যার নগর প্রান্তে দুর্ধর্ষ জার্মান অভিযান প্রতিহত হয়েছিল। জীবনদানের এই সেই মহাযজ্ঞভূমি।

পরদিন কবি গেলেন লেনিনগ্রাড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টাল বিভাগে। এই বিভাগের অধ্যক্ষা মিসেস নবিকভের সাথে কবির পত্রালাপ ছিল কিন্তু তিনি গরমের ছুটিতে বাইরে যাওয়ায় তার জায়গায় যিনি ইতিহাসের অধ্যাপক আছেন তার সাথে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে আলোচনা শেষে ফেরার সময় মহাভারতের সংক্ষিপ্তসার প্রায় পাঁচশত পৃষ্ঠার বই এবং আর একটি রামায়নের অনুবাদ তিনি কবিকে উপহার দিলেন।

এরপর কবি লেনিনের স্মৃতি মিউজিয়াম দেখতে গেলেন । এখানে লেনিন তাঁর বিপ্লবের কাজ আরম্ভ করে। যে চেয়ারে বসে যে টেবিল সামনে রেখে মহামতি লেলিন লেখাপড়া করতেন, যে বিছানায় ঘুমাতেন, তাঁর কাগজকলম, আসবাবপত্র সব কিছুই তার জীবিতকালে যেমন ছিল তেমনি আছে।

একদিন এক সাংবাদিক আসলেন, নাম মি. লিউবারস্কি । তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলেন। তার স্ত্রী লেনিনগ্রাড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষার অধ্যাপিকা। পরে তাদের সাথে যে হয় আলোচনা কিছুদিন পর 'টুলা' নামক একটি পত্রিকায় কবির উপর লেখা প্রবন্ধ ছাপানো হয়েছিল।

বিকালে ৭-৩০ মিনিটে কবি মালি অপেরা ও ব্যালে থিয়েটারের একটি নৃত্যনাট্য দেখতে গেলেন। ইবসেনের 'সালবেগ' নাটকের গল্পাংশ অবলম্বন করে এই নৃত্যনাট্য রচিত হয়েছে। এই অভিনয়ে প্রায় দুইশত লোক অংশগ্রহণ করে। স্টেজের সামনে যে বাদকমন্ডলী তাদের সংখ্যাও শ'খানেকের কম হবে না। বহুদিনের অভিজ্ঞতাপুষ্ট নট-নটী দ্বারা এই নাটকটি রূপায়িত হয়েছে। এই রূপায়নেও কর্তৃপক্ষের বৎসরাধিক সময় লেগেছে। এই নাটকের আবহসঙ্গীত যে কত মধুর আর কত বিচিত্র তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

পরদিন কবি গেলেন পায়নিয়র সেন্টার দেখতে। মানে যেখানে শিশুদের আস্তানা। কবির 'হলদে পরীর দেশ' বই-এ যুগোস্লাভিয়ার একটি শিশুরাজত্বের বর্ণনা দিয়েছিলেন। রাশিয়ায় এরূপ শত শত শিশুরাজত্ব আছে। এক জায়গায় চার বছর হতে ছয় বছরের অনেকগুলো ছেলে-মেয়ে। তারা বালুর উপর খেলছে। কি সুন্দর হাসিখুশি মাখা মুখ। এ যেন নন্দনের দেবশিশুরা। তাদের দেখাশোনা করার জন্য মেয়ে শিক্ষিকা আছেন। বাবা-মা'রা কাজে যায় আর শিশুদের এখানে রেখে যায়। আবার কাজ থেকে ফেরার সময় যার যার শিশু সঙ্গে করে নিয়ে যায়।

লেলিনগ্রাড হতে কবি মস্কোতে ফিরে এসে আগের মতই ইউক্রেন হোটেলে থাকার ব্যবস্থা হল। নিচের তলার সুন্দরী সাতলানা অনুবাদিকার কাজ করছে। কত লোক কারণে-অকারণে প্রশ্ন করছে সে হাসিমুখে তাদের উত্তর দিচ্ছে। ক্যাফে থেকে ভোরের খাবার খেতে বেলা আটটা বেজে গেল। সাতলানার সাথে কথা বলতে বলতে কবি বললেন -

তুমি আমার বই অনুবাদ করিয়া তোমার দেশের লোকদের সঙ্গে আমার দেশের মিতালী পাতাইও।

সাতলানা হেসে বলল-

আপনার 'মাটির কান্না' বইটি তো অনেক আগেই রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আপনার লেখার মাধ্যমে এদেশের সঙ্গে আপনার দেশের মিতালী ইতোমধ্যেই আরম্ভ হয়েছে।


সাতলানার পছন্দের 'দেশ' ও 'বস্তির মেয়ে "কবিতা দুটি রেডিওতে আবৃত্তি করবেন বলে লেখক তাকে জানালেন । এরপর মিঃ বরানভ মস্কোর বেতার কেন্দ্রে নিয়ে গেলেন। 

একজন রুশ ভদ্রলোক কবিকে একটি ঘরে নিয়ে গেল । সেখানে তিনি বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় জিজ্ঞেস করলেন-

সোভিয়েত দেশে এসে কোন জিনিসটি আপনার খুব ভালো লেগেছে?

কবি বললেন-

এদেশে এসে আমার সব চাইতে ভালো লাগলো, আপনারা আপনাদের জনগণকে সবচেয়ে উচ্চ আসল দিয়েছেন। আর আপনাদের গভর্নমেন্টের সাথে আপনাদের জনগণের একাত্ম। সেই জন্য আপনাদের দেশ যেন কোন যাদুকরের - স্পর্শে উন্নতির শিখরে থেকে শিখরে আরোহণ করছে। মস্কো, লেলিনগ্রাড যেখানেই গিয়েছি সেখানেই আমি আপনাদের এই অগ্রগতি রূপায়িত হতে দেখেছি।

লেলিনগ্রাডে থাকতে একদিন একটি সমবায় ফার্ম দেখতে গেলেন লেখক। সেখানে একটি‌ নাট্যশালাও আছে। যেখানে শ্রমিকরা মাঝে মাঝে অভিনয় করে। খামার সংলগ্ন ল্যাবরেটরিতে জমির মাটি পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞরা বলে দেন পরবর্তী বৎসরে জমিতে কি কি সার ব্যবহার করতে হবে। সেই অনুসারে সার ফেলে প্রতি বছর এরা প্রচুর পরিমাণে শস্য লাভ করে।

ক্ষেতের আশেপাশের আগাছাগুলোকে কেটে রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। জমিতে শস্য বপনের সময় কীটনাশক ঔষধ কিছুটা ছিটিয়ে দেওয়া হয়। রুশ দেশে জলশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন করা হয়। ফলে আজ রুশ দেশ বিদ্যুৎ শক্তিতে পৃথিবীর দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। প্রায় দুই বিঘা জমিতে শসা গাছ লাগানো হয়েছে। শসা ক্ষেতের পর ভুট্টা ও ক্ষেত। ভুট্টা ক্ষেতের পরে কার্পাস ক্ষেত। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কার্পাস তুলা তৈরী হয় এই সোভিয়েত দেশে। এক কৃষকের বাড়িতে যাওয়ার সাথেই সদ্যকাটা তরমুজ, আপেল, আঙ্গুর, কয়েকটা রুটি এনে দিল কৃষকের বউ।

১৬ই আগস্ট দুপুরে তাসখন্দে এসে পৌছালেন লেখক। এই সেই ইতিহাস বিখ্যাত তাসখন্দ। গত রক্তক্ষয়ী পাক-ভারত যুদ্ধের অবসান এখান থেকেই ঘোষিত হয়েছিল। এই শান্তি আলোচনায় সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন তথা তাসখন্দবাসীদের দান কোন অংশেই কম নয়। লেখক তাসখন্দের বাজার দেখতে গিয়ে বিস্ময়াভিভূত হয়েছেন। কি সুন্দর বাজার! হাজার বছর আগে যেভাবে এদেশে বাজার বসত তার এতটুকুও পরিবর্তন হয় নাই। কিন্তু কি কবিত্বময়! কত সুন্দর সুন্দর মেয়েরা সামনে আঙ্গুরের ঝুড়ি, আপেলের ঝুড়ি আরও কত রকমের ফলফলারী নিয়ে বসে আছে। কবি ভাবলো বৈষ্ণব কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে পারলাম না, "ওগো পশারিণী, তোমার সকলি কিনিয়া লইব"। লেখকের বলতে ইচ্ছা করছিল,

ওগো পশারিণী , তোমার কাছে সকলই বিকাইয়া যাইব।

 লেখক গেলেন বিবি হানুর মসজিদ দেখতে। বিবি হানু ছিলেন তৈমুরের প্রধানা মহিষী। তৈমুর যখন ভারত অভিযানে গমন করেন তখন সেই সময় হানু বিবি ভাবলেন তৈমুর ভারত জয় করে আসলে মসজিদ দেখে খুশি হবেন। তাই বিবি হানু দক্ষ শিল্পীর দ্বারা মসজিদটি নির্মাণ করেন। এর পরে লেখক গেলেন তৈমুরের কবর দেখতে। আমাদের দেশের তৈমুরকে আমরা শুধু লুন্ঠনকারী বলেই মনে করি। কিন্তু এদেশের লোকে তাঁকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখে। দেশ-বিদেশ থেকে ধন দৌলত লুন্ঠন করে এনে তিনি তাঁর দেশকে সাজাতেন। খুব ভাল শাসক বলেও ও তাঁর খ্যাতি আছে।

এরপর লেখক জাতীয় গ্রন্থশালা দেখতে গেলেন। রুশ ভাষায় লিখিত পাকিস্তানের বই পুস্তক ও সেখানে ছিল। এই লাইব্রেরিতে নানা বিভাগ আছে। একটি পুরাতন পুঁথি বিভাগও আছে। ফারসি আর আরবি ভাষায় প্রায় দুই হাজার হাতে লেখা পুঁথি এখানে রয়েছে। ফেরদৌসীর 'শাহনামা' গ্রন্থটি দেখে কবি বড়ই মুগ্ধ হলেন। এই লাইব্রেরিতে প্রায় ২০ লক্ষ বই সংগ্রহ করা আছে ।

 __________ 

প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় পড়তে পারেন


২৬ আগস্ট সকালে উঠে লেখক গেলেন তাজিকিস্তানের প্রসিদ্ধ লেখক মরহুম সরদউদ্‌দীন আইনির মাজার দেখতে। ইনি তাজিক সাহিত্য একাডেমির প্রথম সভাপতি ছিলেন। ১৮৭৮ সালে সালে তাঁর জন্ম। সেকালের আমীরের রাজধানী বোখারা হতে তার‌ জন্মভূমি সাকতা বেশি দূরে নয়। ১২ বৎসর বয়সে আইনির পিতা-মাতা কলেরায় মারা যান। আইনি বোখারার মাদ্রাসায় ইসলাম ধর্মশাস্ত্রে পাঠ গ্রহণ করেন। এই সময় তিনি কাপড় ধুয়ে নিজের পড়াশুনার খরচ চালাতেন। ষোল বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়। এই সময়ে তিনি তাজিক শিশুদের জন্য একটি স্কুল খোলেন। এই স্কুলে ধর্মশাস্ত্র ছাড়াও অঙ্ক, ইতিহাস ও ভূগোল বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হত। কাঠমোল্লারা এসব পছন্দ করতেন না। ফলে অকালে স্কুলের দরজা বন্ধ হল। এরপর আমীরের বিরাগভাজন হয়ে তাঁকে জন্মভূমি ত্যাগ করতে হল।

নানা দেশে ঘুরে আইনি দেশের মায়া কাটাতে না পেরে ১৯১৭ সালে দেশে ফিরলে আমীর তাকে অমানুষিক বেত্রাঘাত করে জেলে রাখলেন। পরে বিপ্লবীরা বোখারা দখল করলে তিনি মুক্তিলাভ করেন। জেল থেকে বের হয়ে তিনি সাহিত্য সাধনা শুরু করেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস 'বোখারার জল্লাদ', তারপরে 'ওদীনা', 'দাস', 'কুশীদ জীবির মৃত্যু' প্রভৃতি বহু ব‌ই রচনা করে তিনি আপন দেশবাসীর অন্তর জয় করেন। দুই খন্ডে তিনি তার বোখারা জীবনের স্মৃতিকথা রচনা করেন। কেউ কেউ বলে, এই রচনাটিই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা। এই রচনার জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় পুরষ্কারে সম্মানিত হন। ১৯৬৪ সালে তার মৃত্যু হয়। সোভিয়েত রাষ্ট্র এবং তার দেশবাসী তাঁকে কত ভালোবাসে, আইনির সমাধিভবন তার সাক্ষ্য বহন করছে।

নুরেন দাম দেখতে রওনা হলেন লেখক। অতি গভীর সংকীর্ণ একটি নদী। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলছে। এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যে জলশক্তির প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি জল এখানে আছে। তাই কর্তৃপক্ষ স্থির করলেন অতিরিক্ত জলশক্তিকে পৃথক নালায় বইয়ে দিয়ে যেটুকু জলের প্রয়োজন শুধু তাই ব্যবহার করবেন। তাই পাহাড় কেটে জলপথ তৈরী করতে হল। কিন্তু পাহাড়ের পাথর বড়ই শক্ত। প্রচলিত যন্ত্রপাতি দিয়ে যেভাবে পাথর কাটা সম্ভব সেভাবে পাথর কাটলে কাজ শেষ করতে প্রায় ২৪ বছর লাগবে। কিন্তু সোভিয়েত কর্মীরা এতদিন বসে থাকবেন না। ইউক্রেনের কারখানায় ইঞ্জিনিয়ারকে এখানকার পাথর পাঠিয়ে দেওয়া হল। তিনি সেখানে বসে নানা যন্ত্রপাতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নতুন যন্ত্র তৈরী করলেন ।

নতুন যন্ত্রের সাহায্যে অল্প দিনে পাথর কাটা সম্ভব। যন্ত্রের আবিষ্কারক যন্ত্র নিয়ে নুরেন দামে চলে আসলেন। অল্প দিনে অন্যান্য কর্মীরা এটি চালানো শিখলেন। তখন আরও যন্ত্র তৈরী হলো। দুই ধার হতে পাহাড় কেটে সুরঙ্গে তৈরী হতে লাগলো। আবার জায়গায় জায়গায় অটোমেটিক মেশিন লাগানো, খাদের মধ্যে পানি জমলে পাম্পের সাহায্যে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে আর পানি নিষ্কাশন শেষ হলে মেশিনটি আপনাআপনি বন্ধ হচ্ছে। কোনো হই-হল্লা নেই। কোনো ঝগড়া বিবাদ নেই, শৃঙ্খলার মধ্যে কাজ হচ্ছে। বছর খানেক গেলেই এ দামের কাজ শেষ হবে। তখন পৃথিবীর মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ দাম হবে।

পরদিন সকালে নুরেন দাম থেকে ফেরার পরদিন কবি গেলেন লেলিনগ্রাড সমবায় খামার দেখতে। এই ফার্মের চেয়ারম্যান মিঃ রজিকোভ নিউম্যান এদেশের একজন বিশিষ্ট কবি। তিনি শিশুদের জন্য বেশি লেখেন। নানা পথ ঘুরে শহর পেরিয়ে মাঠে এসে দেখা গেল দিগন্ত বিস্তৃত কার্পাস ক্ষেত্র। মাঝে মাঝে দু'একজন কৃষক কাজ করছে।

কার্পাস ক্ষেত্রের পর ভুট্টার ক্ষেত। তারও যেন শেষ নেই। সবুজে সবুজে দিগন্ত ছেয়ে গেছে। অথচ সোভিয়েত বিপ্লবের আগে এই দেশ মরুভূমির মতো ছিল। যে বছর বৃষ্টিপাত হতো না সে বছর দেশে দুর্ভিক্ষের হাহাকার পড়ত। তারপর দেখা গেল রেশমের খামার ও বাগান। এ দেশে রেশম পোকা পালনের একটি কেন্দ্রীয় বীজাগার আছে। যেখানে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে পোকা-গুলোকে ডিম পাড়বার সুবিধা করে দেওয়া হয়। এই খামারে থিয়েটার হল আছে। চাষীরা অবসর সময়ে গান-বাজনা করেন। মাঝে মাঝে থিয়েটারও হয়।

চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়িতে অনেক খাওয়া-দাওয়ার পর একটি বিয়ের বাড়ি দেখতে গেলেন কবি। বাড়ির বাইরে কয়েকটি চৌকি পেতে দিয়েছে অভ্যাগতদের বসবার জন্য। একটি চৌকিকে কিছু উঁচু করে পাতা হয়েছে। তার উপরে এদেশী মেয়েদের হাতে বুনানো সুন্দর গালিচা পাতা হয়েছে। একটি সুদর্শন ছেলে দোতারা বাজিয়ে দেশী গ্রাম্য গান গাইতে শুরু আরম্ভ করল। তারপর সামনে ভারে ভারে নানা রকমের খাদ্যবস্তু আসতে লাগল। এ দেশের নিয়ম গাঁয়ের যিনি মোড়ল তিনি প্রথমে রুটি ভেঙ্গে সকলের পাতে পাতে দিবেন। গান শেষ হলে ও বাজনা শুরু হলো আর সেই বাজনার তালে তালে বরের বন্ধুরা একে একে নাচতে লাগলো। একজন বন্ধু জোর করে বরকে টেনে আনলো। সেও কিছুক্ষণ নেচে চেয়ারম্যান সাহেবকে জোর করে ধরে নিয়ে গেল। তিনিও নাচতে লাগলেন। বিয়ে বাড়িতে মেয়েরা সবাই অন্দরমহলে। ঘরের জানালা দিয়ে কয়েকজন যুবতী যুবকদের নাচ দেখছিল। এদেশ সোভিয়েতের অন্তর্গত হলেও রুশ মেয়েদের মতো এখনো ততটা আধুনিক হতে পারেনি। তারা এখনও তাদের জাতীয় পোশাক পরে। কী সুন্দর মানায় তাদের এই পোশাকে।

নিমন্ত্রণ বাড়িতে দলে দলে বৃদ্ধরা আসতে লাগলেন। তাদের চলনে-বলনে, পোশাকে-পরিচ্ছদে মনে হলো এতোদিনের সোভিয়েত সংস্কার পদ্ধতি এদের মনে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। বিদায়ের বেলায় কবি বরকে ডেকে বললেন,

তুমি এতদিন বর্ষার বারিধারা ছিলে, আজ দুই কূলের বাঁধন পরিয়া নদী হ‌ইয়া জীবন পথে ছুটিবে। এতদিন তুমি ছিলে শুধু মেঘ, আজ রামধনু হ‌ইয়া তোমার মেঘে র‌ঙের রেখা পরাইবে । তোমাদের ঘর যেন সুন্দর হয়। তোমাদের মাটির কলস যেন শীতল পানিতে ভরা থাকে। পিপাসিত পথিকের জন্য তোমাদের নবীন দাম্পত্য জীবনের সর্বপ্রকার শুভকামনা করিয়া আমরা বিদায় ল‌ইতেছি।

কবি আবার মস্কোতে ফিরে আসলেন। একটু হাঁটাহাঁটি বেশি হওয়ার কারণে পায়ে তার বাতের ব্যথা বেড়ে গেছে। একজন ডাক্তারকে ডাকা হলো কিন্তু তিনজন ডাক্তার এসেছেন। তিনজনই সুন্দরী যুবতী। তারপর তাকে পরীক্ষা করার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। অনেক পথ ঘুরে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর মনে হল এ যেন বাগান বাড়ি। গাছপালায় ভরা বনের মধ্যে সরু সরু পথ। তারই সামনে হাসপাতালের ঘর। ব্লাড প্রেসার মাপার পর ডাক্তার বললেন স্বাভাবিক। অন্য একটি ঘরে নিয়ে যাওয়ার পর যেখানে তিন চারজন ডাক্তার পরীক্ষা করলেন। আঙুল ফুঁড়ে রক্ত নিলেন। নিজের পোশাক ছোড়ে হাসপাতালের পোশাক পরতে হলো। এক জোড়া মোজা ও একজোড়া চটি জুতাও দিল।

হাসপাতালে সকালের নাস্তা দেওয়া হয় সাড়ে নয়টার সময়। বেশ ভাল খাবার। ডিম, মাখন, দুধে-সিদ্ধ চাউল, এক গ্লাস চা, এক গ্লাস কফি। হাসপাতালের একটি রোগীর ঘরে একটি হাতবাতি মুখ-হাত ধোয়ার বেসিন, স্নানের টব সবকিছুই আছে শুধু আয়না নেই। ঘরের একপাশে ছোট একটা কুঠুরী। সেখানে ডাক্তারদের, নার্সদের বহির্বাস। ঘরের দরজা সবসময় বন্ধ থাকে। বিকাল ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত এই দরজা খুলে দেওয়া হয়। তখন অপেক্ষাকৃত সুস্থ রোগীরা সামনের বনে ঘোরাফেরা করতে পারে। কবির পাশের ঘরে থাকত লেনা নামের একটি মেয়ে। সামান্য ইংরেজি জানে। ডাক্তারদের সাথে কথা বলতে অথবা নার্সদের কোন নির্দেশ দিতে লেনার ডাক পড়ে। এই হাসপাতালের যত ডাক্তার তার শতকরা নব্বই জনই মেয়ে। হাসপাতালের যিনি প্রধান তিনিও একজন মেসে ডাক্তার। নাম ডা. স্ত্রিনভা ভলেন্টিনভন। বড়ই হাসিখুশি মেয়েটি।

হাসপাতালে কবির সব পরীক্ষা শেষ করার পর ডাক্তার বললেন আপনি সম্পূর্ণ ভালো আছেন। আপনার পেটে বা বুকে কোন অসুখ নেই। কিন্তু দেশের ডাক্তার বলেছিল, কবির নাকি ডিওডিনাল আলসার হয়েছে। এজন্য অনেক বাছাবাছি করে খাবার খেতে হয়েছে। আবার রুশ হোটেলে ফেরত যাবার পর খবর আসলো বলসাই থিয়েটার মস্কো শহরে অভিনয় করবে। অনেক কষ্টে দুইটি টিকিট সংগ্রহ হলো। কবি থিয়েটার দেখার সঙ্গী হিসেবে সাতলানাকে ফোন করতেই যে সহজে রাজি হল ।

থিয়েটার শুরু হলে স্টেজের উপরে বসন্তকালের সমারোহ দেখা গেল। গাছে গাছে অজস্র ফুল ফুটে আছে। ঝরণা হতে জলধারা ছুটে চলছে। প্রথম দৃশ্যে রাজবাড়ি সংলগ্ন একটি উদ্যান। যেখানে বসন্ত উৎসবে পাড়ার ছেলে মেয়েরা এসে নৃত্য করছে। রাজপুত্র ও তাদের মধ্যে একজন। কিছুক্ষণ নাচ দেখার পর রাজপুত্রকে রাজা বললেন এইসব সুন্দরী যুবতীদের ভিতর থেকে একজনকে তুমি পত্নী হিসেবে বরণ কর। রাজপুত্রের এই আদেশ মনে ধরল না। পরবর্তী দৃশ্যে গহন বনপথ। অদূরে জললহরী ভরা একটি হ্রদ। সেখানে জলের উত্তর হাঁসগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। রাজপুত্রের বন্ধুরা তীরধনুক দিয়ে হাঁসগুলো মারবার উদ্যেগ করলে রাজপুত্র কুপিত হয়ে তীরধনুক কেড়ে নিল। এতে রাজকুমারের বন্ধুরা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে চলে গেল।

নিজেদের প্রতি এমন মমতাবোধ দেখে হাঁসগুলো নারীমূর্তি ধরে কলকল শব্দ করে রাজপুত্রকে ঘিরে নৃত্য করতে লাগলো। তাদের পোশাকে হাঁসের পালক ঝলমল করছে। সবগুলো হাঁসের মধ্যে যেটিকে রাজপুত্র তার বন্ধুদের তীরক্ষেপ হতে রক্ষা করেছিল সেটিকেই তার সবচেয়ে ভাল লাগলো। আস্তে আস্তে সবগুলো হাঁস চলে যায়। আর রাজপুত্রের সেই প্রিয় হাসঁটি মাত্র মঞ্চে থাকে। রাজকুমার তাকে ধরতে গেলে এদিক ওদিক পালিয়ে যায়। তারপর রাজপুত্রে তাকে শুন্যে তুলে ধরলে সেই অবস্থায়‌ও হংসকুমারী নানা রকমের নৃত্যভঙ্গি দেখাতে লাগল। নৃত্যর ভাষায় রাজকুমারী রাজপুত্রকে বলল যে একজন রাজকুমারী আর বাকি হাঁসগুলো তার সখী। এক দৈত্য যাদুমন্ত্রের সাহায্যে তাদেরকে হাঁসের রূপ দিয়ে সরোবরে বন্দি করে রেখেছে। যদি কোন রাজপুত্র রাজকুমারীকে মন থেকে ভালোবাসে তবে আবার মানুষ হতে পারবে। এভাবেই অসাধারণ নৃত্য নৈপুণ্যের সাহায্যে এক একটি কাহিনী নৃত্যে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। যে মেয়েটি নায়িকার ভূমিকা নিয়েছিল তার অভিনয় অতি চমৎকার। দ্বিতীয় দৃশ্যে রাজপুত্রের সাথে তার প্রথম মিলন এবং শেষ দৃশ্যে রাজপুত্র অন্য নারীতে আসক্ত একথা শোনার পর আসন্ন মৃত্যুপথযাত্রী হয়ে নায়িকা যে মর্মান্তিক নৃত্যভঙ্গিমা করেছিলো তা ভুলবার নয়। যে ছেলেটি রাজপুত্রের পাঠ নিয়েছিল তার চেহারা রাজপুত্রেরই মতো। তারপর কবি আবার বলসাই থিয়েটারে অভিনয় দেখতে যান সেবার সাতলানা ছিল না। শেষবার গিয়েছিলেন মিসেস বিকোভাকে সাথে নিয়ে। 

একদিন বিকেলে কবি গেলেন পাকিস্তান এম্বেসিতে চা-পানের নিমন্ত্রণে। সেখানে পাকিস্তানের স্পীকার আবদুল জব্বার খান আর তাঁর সাথের কয়েকজন রাষ্ট্রসভার সভ্যকে অভ্যর্থনা দেওয়া হবে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত মি. সালমান আলী কবির সাথে করমর্দন করল। এই আলাপনী সভায় সোভিয়েত দেশের বহু গণ্যমান্য লোক এসেছেন। তাদের প্রত্যেকের সাথে একজন করে দোভাষী। সোভিয়েত সুপ্রিম সভার স্পীকার সাহেব দোভাষী মারফত এসে কবির সাথে পরিচিত হলেন। যেখানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা ও দুই দেশের বন্ধুত্ব আরও জোড়ালো করার জন্য কিছু পদক্ষেপের কথাও উত্থাপন হল।

দেশে ফেরার আগেরদিন কাটল এটা-ওটা কিনতে। মি. গঙ্কোওস্কি ছুটিতে চলে গিয়েছিলেন আবার ফিরে এসেছেন। সন্ধ্যার দিকে কবি মি. সিডারফের বাসায় মি. গঙ্কোওস্কির সাথে দেখা করলেন ও অনেকক্ষণ আলাপ করলেন। তিনি কয়েকটি উপহারও সাথে নিয়ে এসেছেন। পরদিন সকালে মি. সিডারফ এসে জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা করলেন। জরুরি কাজে মি. গঙ্কোওস্কি আসতে পারেননি। মি. সিডারফের সাথে আবেগপূর্ণ বিদায়ের পর কবি উড়োজাহাজে উঠলেন। তার মানসনয়নে বায়োকাপের মতো ছায়াছবির মতো দৃশ্যের পর দৃশ্য ভেসে আসছে। নানা ধরনের শস্যক্ষেত তাদের অঙ্গাবরণে নানা রঙের নকশা এঁকে দিচ্ছে।

বিদায় সোভিয়েত ভূমি, বিদায়। রূপে ঐশ্বর্যে আদর্শবাদে তুমি সকল দেশের অনুকরণযোগ্য। এভাবেই চমৎকার ভ্রমণকাহিনীটির ইতি টেনেছেন কবি জসীম উদ্‌দীন।

__________ 

যে দেশে মানুষ বড়
জসীম উদ্‌দীন

প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী
প্রথম প্রকাশ: ১৯৬৮
অষ্টম প্রকাশ: ২০২৩
প্রকাশক: পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা
পৃষ্ঠা: ১৪৩
মূল্য: ৩০০ টাকা
ISBN: 984-460-031-6

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ