আঙ্কেল টম'স কেবিন (১৮৫১-১৮৫২) - হ্যারিয়েট এলিজাবেথ বিচার স্টো' রচিত বিখ্যাত উপন্যাসের আলোচনা - সুজয় পোদ্দার

আঙ্কেল টম'স কেবিন (১৮৫১-১৮৫২) - হ্যারিয়েট এলিজাবেথ বিচার স্টো' রচিত বিখ্যাত উপন্যাসের প্রচ্ছদ

সাহিত্যকে সাধারণত সমাজ ও রাষ্ট্রের "দর্পণ" হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। কিন্তু এই দর্পণে কি সবসময় সমাজ বা রাষ্ট্রের ইতিবাচক দিক প্রতিফলিত হয়ে থাকে? অবশ্যই না, নেতিবাচক দিকও প্রতিফলিত হতে পারে! কিন্তু এই নেতিবাচক দিকগুলো কতজন লেখক বা লেখিকা তাঁর লেখায় সমাজ বা রাষ্ট্রের দেওয়া বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ফুটিয়ে তুলতে পারেন? তা নিয়ে লেখক বা পাঠক মনে যে দ্বন্দ্ব বিদ্যমান! তা বলতে কোনো দ্বিধা নেই।

নেতিবাচক দিকগুলোকে সবার সম্মুখে তুলে ধরার অন্যতম প্রধান কারণ মানবের অবচেতন মনকে চেতনে আনা। আর এই চেতনাত্বের কাজটি করেছিলেন মার্কিন লেখিকা Harriet Beecher Stowe (হ্যারিয়েট এলিজাবেথ বিচার স্টো) তাঁর আঙ্কেল টম'স কেবিন (Uncle Tom's Cabin, 1851-52) উপন্যাসের মাধ্যমে। তিনি মার্কিন রাষ্ট্রের বিদ্যমান নেতিবাচক দিকটির উপর থেকে স্বহস্তে পর্দা টানার ব্যবস্থা করেছিলেন।

"প্রথা" কত সুন্দর ছোটো একটা শব্দ। কিন্তু যখনই একই শব্দের সাথে অন্য একটি শব্দাংশের সংযুক্তি ঘটেছে তখনই হয়ে উঠেছে "ভয়ানক" "ভয়াবহ" "নির্মম" "নিষ্ঠুর"। তেমনই একটি শব্দ "দাসপ্রথা"। অষ্টাবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যায়ে মার্কিনে এই "দাসপ্রথা" আরও বিস্তৃত, সংগঠিত ও অর্থনৈতিকভাবে কেন্দ্রীয় রূপ নিয়েছিল। কতশত নির্মমতার ঘটনা ঘটেছিল এ-সময় কালে তা লিখতে গেলে হয়তো লেখকগণের কলম ও পাঠকগণের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে!

The longest way must have its close—the gloomiest night will wear on to a morning.


কিন্তু এই শেষের পথটুকু এতো কষ্টের! এতো বেদনার! এতো ব্যাথাতুর! হতে পারে তা আমরা এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আঙ্কেল টম'স এর মাধ্যমে দেখতে পাবো। শুধু আঙ্কেল টম নয়! প্রতিটা দাস, প্রতিটা দাসির জীবন ছিল এমন ভয়ানক, নিরস, কণ্টাকাকীর্ণ।

শুরুতে আমরা দেখতে পাবো, কেন্টাকি রাজ্যের এক দয়ালু দাসমালিক "শেলবি"র মতিভ্রম। যদিও অর্থ কী না পারে! ধনিকশ্রেণির মাঝে অভাবের হানা দিলে তারাও গরিবদের মতো বস্তু বেচাকেনা করে থাকে! তবে মার্কিনদের কাছে বস্তু হিসেবে ছিল "দাস-দাসী"। এই কথিত দয়ালু মালিক থেকে নিষ্টুর মালিকের হাতে পড়ে যায় আঙ্কেল টম। তবে ভাগ্যক্রমে আবারও এক দয়ালু মালিকের হাতে পড়ে টম। এখানে টমের মালিক ছোট্ট শিশু ইভানজেলি।

Papa, do buy him! it's no matter what you pay... I want to make him happy.


ছোট্ট ইভানজেলি তার মৃত্যুর মুখে এসেও বাবার কাছে চেয়েছিল তার টম আঙ্কেলসহ অন্যান্য দাসদের স্বাধীনতা।

O, that's what troubles me, papa. You want me to live so happy... isn't there any way to have all slaves made free?


কিন্তু হায়! একটা মৃত্যু যে আরও কয়েকজনের মৃত্যু নিশ্চিত করতে পারে!

হাত বদলে, টম এসে পড়ে এক মানুষরূপী দৈত্যের হাতে। যার কাজই ছিল দাস-দাসীদের নিয়ে নিষ্ঠুর খেলা করা। এ খেলায় হেরে যায় আঙ্কেল টম, হেরে যায় স্বাধীনতার কাছে। শুধু টম নয়, প্রতিটি চরিত্র যেন এই স্বাধীনতার কাঙাল! এই স্বাধীনতা পেতে তাদের যেতে হতো আমেরিকার বর্ডার পেরিয়ে কানাডায়। কিন্তু নিষ্ঠুর এ মালিকেরা তাদেরকে মেরে ফেলতে রাজি তবুও স্বাধীনতা দিতে নয়!

একটি উপন্যাসে শুধু কাহিনি থাকে না, থাকে চরিত্রের জীবনচিত্র। আঙ্কেল টম চরিত্রের একাগ্রতা, ধর্মভীরু জীবনাচার, সহনশীলতা যেন অন্যসব চরিত্রকে ছাড়িয়ে গেছে। সে কষ্ট করে স্বাধীনতা পেতে চায়, পলায়ন এর মাধ্যমে নয়। কারণ দয়ালু পরিবারে থাকার পরও তার ছিল একটিই চাওয়া-

Liberty is a sweet thing.


এলিজা চরিত্রের সন্তানবাৎসল্য, মিসেস শেলবির অসহায়ত্ব, ইভানজেলির নিঃস্বত্ব ভালোবাসা দাস-দাসীর প্রতি, হ্যালির নিষ্ঠুরতা, লেগ্রির দানবীয় প্রকাশ, জর্জ শেলবির মমত্ববোধ, টপসির খামখেয়ালিপনা, জর্জের বুদ্ধিমত্তা, যেন উপন্যাসটিকে করে তুলেছে আরও প্রাণবন্ত।

My country again! Mr. Wilson, you have a country; but what country have I, or any one like me, born of slave mothers? … all they do for us is to crush us, and keep us down. (জর্জ হ্যারিস,মিস্টার উইলসন এর কথার প্রেক্ষিতে বলে)


সর্বশেষে বলতে হয়, উপন্যাসে দাসদের প্রতি যে নির্মম-নিষ্ঠুরতা, তা যে সত্যিকার পাঠকমনে নিদারুণ করুণার জন্ম দিবে তা বলতেই হয়! যারা কষ্টকে সহ্য করে মৃত্যুকে আপন করাকেই সহজ ভেবেছিল!!!

Ye poor miserable critter! … there ain’t no more ye can do! I forgive ye, with all my soul! (Chapter 40, The Martyr)


বি:দ্র: বাংলা অনুবাদের quote থেকে মূল ইংরেজি বইয়ের quote বেশি সামঞ্জস্য হওয়ায়, তার ব্যবহার করা হলো।

-*-*-*-*-*-*-*-*-
বই: আঙ্কেল টম'স কেবিন
লেখক: হ্যারিয়েট বিচ্যার স্টো
অনুবাদ - জাকির হোসেন
আলোচকের নাম- সুজয় পোদ্দার

বইয়ের ধরন - উপন্যাস

প্রচ্ছদশিল্পীর নাম - মশিউর রহমান
প্রকাশনীর নাম ও দেশ - উপমা প্রকাশ / বাংলাদেশ 
প্রকাশকাল - ২০১৪
পৃষ্ঠাসংখ্যা - ২৩৬
মূল্য - ৩৫০ টাকা
ISBN — 978-984-8383-312-5

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ