অশোক মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘সংসদ সমার্থশব্দকোষ’ পরিচিতি

অশোক মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘সংসদ সমার্থশব্দকোষ’ পরিচিতি

সংসদ সমার্থশব্দকোষ
সম্পাদকঃ অশোক মুখোপাধ্যায়

সাহিত্য সংসদ, কলকাতা
প্রচ্ছদঃ ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রথম প্রকাশঃ ১৯৮৭
একবিংশতিতম মুদ্রণঃ ২০১৬
পৃষ্ঠাঃ ৭০৮
মূল্যঃ ৩৫০ রুপি
ISBN: 978-81-7955-212-4

সমান অর্থ রয়েছে এমন শব্দগুলো একত্রিত করে যে বই তার নাম সমার্থশব্দকোষ। সংস্কৃত ভাষাতে এই জাতীয় অভিধান ছিল ‘অমরকোষ’ (অমরসিংহ রচিত 'নামলিঙ্গানুশাসন’)। এই অভিধানের শব্দগুলো বর্ণানুক্রমিকভাবে সাজানো ছিল। ফলে প্রয়োজনের সময় চট করে যথাযথ শব্দ খুঁজে পাওয়া দুস্কর ছিল। সম্পূর্ণ ‘অমরকোষ’ মুখস্থ না থাকলে শিক্ষার্থীর পক্ষে কাঙ্ক্ষিত শব্দসন্ধান সহজসাধ্য হত না। ১৮৫৩ সালে ‘শব্দাম্বুধি’ নামে একটি বাংলা অভিধান প্রকাশিত হয়। এখানে পর্যায়শব্দ শিরোনামে কিছু সমার্থকশব্দ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে তা ছিল অসম্পূর্ণ। উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় সমার্থক শব্দ বিষয়ক অভিধানের প্রয়োজনীয়তা লেখক সাহিত্যিক তথা শব্দসন্ধানীদের মাঝে ব্যাপকভাবে অনুভূত হতে থাকে। তারই প্রেক্ষিতে ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘রত্নমালা’ নামে একটি সমার্থক-শব্দ সংকলন। সংকলক ছিলেন প্রাণতোষ ঘটক। এই সংকলনের শব্দসজ্জাভঙ্গিতে পুরনো রীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। বর্ণভিত্তিক শব্দসজ্জা ব্যবহার করায় সমার্থক শব্দ অন্বেষণে এই অভিধানটি ততোটা ব্যবহারবান্ধব ছিল না। ১৯৮৬ সালে ড. জগন্নাথ চক্রবর্তী একটি বাংলা-ইংরেজি দ্বিভাষিক থিসরাস প্রকাশ করেন। এই অভিধানটির নাম ‘মণিমঞ্জুষা’। এটাও বর্ণানুক্রমিক শব্দসজ্জারীতি গ্রহণ করায় ততোটা জনপ্রিয় হয়নি।

 বাংলাভাষায় সমার্থক শব্দবিশিষ্ট কোষগ্রন্থ আবির্ভাবের বহু আগে ইংরেজি ভাষায় ১৮৫২ সালে প্রকাশিত হয় ‘পিটার মার্ক রজে’ (Peter Mark Roget, 1779-1869) এর ‘থীসরাস অব ইংলিশ ওয়ার্ডস এ্যান্ড ফ্রেজেস’ (Thesaurus of English Words and Phrases )। সংক্ষেপে এর নাম ‘রজার্স থীসরাস’ বা ‘রজার্স থসার্স’ (Roget's Thesaurus)। এই বইয়ের প্রথম সংস্করণের ভূমিকা থেকে জানা যায় ১৮০৫ সালে বিষয়ভিত্তিক সমার্থক শব্দকে একই শ্রেণীতে রেখে অল্প কিছু শব্দের একটি তালিকা তিনি তৈরি করেছিলেন। প্রায় ৫০ বৎসর পরে এই তালিকাটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। মি. রজে ছয়টি মূল শ্রেণীকে ছাব্বিশটি বিভাগে ভাগ করেছেন। আর এই ছাব্বিশটি বিভাগের অধীনে রেখেছেন এক হাজারটি মূল শব্দ। ইংরেজি ভাষার যাবতীয় শব্দ এই মূল শব্দগুলোর অধীনে অন্তর্ভূক্ত করা যায়। সংস্করণভেদে শব্দের সংখ্যা অবশ্য কম-বেশী হয়েছে। শব্দকে বিষয়ভিত্তিক সাজানোর যে ধারনা মি. রজে তার বইতে প্রয়োগ করেছেন সেই একই পদ্ধতি বাংলাভাষার দুই বিখ্যাত সমার্থক শব্দের অভিধানে গ্রহণ করা হয়েছে। মি. রজের পদ্ধতিকে হুবহু অনুসরণ করে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সংকলিত সমার্থকশব্দের কোষগ্রন্থ ‘যথাশব্দ’ নিয়ে আমরা পূর্বে একটি আলোচনা প্রকাশ করেছি। আজ আমরা আলোচনা করছি বাংলা ভাষার দ্বিতীয় বিখ্যাত সমার্থকশব্দের কোষ গ্রন্থ ‘সংসদ সমার্থশব্দকোষ’ নিয়ে।

‘সংসদ সমার্থশব্দকোষ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালে। আঠারোটি পুনর্মুদ্রণসহ বর্তমানের তৃতীয় সংস্করণ বাজারে এসেছে ২০১৩ সালে। এই অভিধান তৈরিতে রজে'র নীতিকে সামনে রেখে কিছুটা পরিবর্তিত আকারে শব্দ সংকলন করা হয়েছে। রজে'র মতোই এখানে বইয়ের প্রথমাংশে বিষয়ভিত্তিক শব্দের সংকলন রয়েছে এবং বইয়ের দ্বিতীয়াংশে রয়েছে বর্ণভিত্তিক শব্দতালিকা। দ্বিতীয়াংশের বর্ণভিত্তিক তালিকা থেকে কাঙ্ক্ষিত শব্দটিকে নির্বাচন করে তার সূচক সংখ্যা অনুযায়ী বইয়ের প্রথমভাগের বিষয়ভিত্তিক অংশ থেকে প্রয়োজনীয় শব্দটিকে খুঁজে পাওয়া যাবে। একই নীতি রয়েছে রজে'র থিসরাস ও ‘যথাশব্দ’তে। কিন্তু বিষয়ের পরিমাণে ‘সংসদ সমার্থশব্দকোষ’ পরিবর্তন এনেছে। সংসদ সমার্থশব্দকোষে বিষয়ের সংখ্যা রয়েছে ৩০টি (ত্রিশ)। ফলে আরও বিস্তারিত প্রেক্ষাপট থেকে যথাযথ শব্দটিকে খুঁজে বের করা যায়। তবে, সংসদ সমার্থকশব্দকোষের এই তৃতীয় সংস্করণে মোট কতগুলি শব্দ রয়েছে তা কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।

আলোচ্য বইয়ের ভূমিকা থেকে এর বৈশিষ্ট্যসমূহের কয়েকটি উল্লেখ করিঃ
  • এই সমার্থশব্দকোষ মূলত রজে-র আদর্শে সংকলিত-- অর্থাৎ এর বিন্যাস বিষয়ভিত্তিক এবং এর শেষে আছে বর্ণানুক্রমিক সূচি।
  • পরিচ্ছেদ বিভাগ, বিষয়ভাগ বা প্রধানশব্দের নির্বাচন রজে- র থিসরাস বা ‘যথাশব্দে’র মতো নয়।
  • এখানে তিরিশটি পরিচ্ছেদে প্রধান শব্দ সাত-শো সাতান্ন।
  • এই সমার্থশব্দকোষে কোনো শব্দ, তার প্রতিশব্দ বা সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক প্রাসঙ্গিক সমবর্গীয় সমচরিত্রের শব্দগুলিকে একত্রীকরণের চেষ্টা করা হয়েছে।
  • এর প্রথম ব্যবহার প্রতিশব্দ বা সমার্থকশব্দ পাওয়ার জন্য।
  • আনুষঙ্গিক কিংবা সমগোত্রীয় শব্দ পেতে হলেও এই কোষগ্রন্থ কাজে লাগতে পারে।
  • বিষয়টি মনে আসছে অথচ শব্দটি জানা নেই-- এমন অবস্থায় সমার্থশব্দকোষ সহায়ক হতে পারে।

এই গ্রন্থের সজ্জারীতির অনন্যতা রয়েছে বিষয় তালিকাটিতে। সংসদ সমার্থকশব্দকোষকে চিনতে এর বিষয়ভিত্তিক তালিকাটি একবার দেখে নেয়া দরকার।

১। মহাবিশ্ব-প্রকৃতি-পৃথিবী-গাছপালা
২। প্রাণ-প্রাণী-শরীর
৩। ইন্দ্রিয়-অনুভূতি
৪। বাস্তবতা-অস্তিত্ব-সংরক্ষণ
৫। কাল-ঋতু-বয়স
৬। স্থান-অধিষ্ঠান-আশ্রয়
৭। দিক-আপেক্ষিক অবস্থান
৮। মন-মনোভাব-মানসিকতা
৯। সম্পর্ক-সাদৃশ্য-নির্ভরতা
১০। গতি-প্রবাহ-পরিবহন
১১। কাজ-প্রয়োগ-ব্যবস্থা
১২। নির্মাণ-বন্ধন-প্রতিকার
১৩। মনন-জ্ঞান-জ্ঞাপন
১৪। ভাষা-সাহিত্য-সৃজনশীলতা
১৫। পরিমাণ-পরিমিতি-সংখ্যা
১৬। আকৃতি-আয়তন
১৭। বস্তু-বস্তুধর্ম
১৮। আবরণ-আচ্ছাদন-পোশাক
১৯। পরিচ্ছন্নতা-সৌন্দর্য-অলংকার
২০। যন্ত্র-অস্ত্র-আধার
২১। সত্য-ঔচিত্য-যাথার্থ
২২। তেজ-দহন-বিদ্যুৎ
২৩। ধর্ম-দেবতা-উপাসনা
২৪। পরিচিতি-আত্মীয়তা-তত্ত্বাবধান
২৫। গোষ্ঠী-সমাজ-জাতি
২৬। রাষ্ট্র-প্রশাসন-রাজনীতি
২৭। হিত-সহযোগিতা-সংঘাত
২৮। দেওয়া-নেওয়া-চাহিদা
২৯। অর্থ-বিত্ত-জীবিকা
৩০। খেলা-বিনোদন-শিকার


সমার্থকোষ জাতীয় অভিধানকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে গেলে সংশ্লিষ্ট ভাষার শব্দভান্ডার সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক জ্ঞান থাকা দরকার। কারণ এই অভিধান শব্দার্থকোষ নয়। অভীপ্সিত শব্দের অর্থ এখানে পাওয়া যাবে না। এমনকি ভাষার শব্দভান্ডারের সব শব্দও এখানে নেই। মনের ভাব সঠিকভাবে প্রকাশের সময় একাধিক ধ্বনিব্যঞ্জনা বা রূপবৈশিষ্ট্যের শব্দ ব্যবহারের প্রয়োজন পরে। হাতের কাছে কয়েকটি সম অর্থ বিশিষ্ট শব্দ থাকলে সেগুলি থেকে উপযুক্তটি বাছাই করা সহজতর হয়। থিসরাস লেখকের বা বক্তার এই শব্দসন্ধানের এই কাজটি নিজের থেকে করে দেয়। কিন্তু কোন শব্দটির ব্যবহার মানানসই বা কার্যোপযোগী হবে তা নির্বাচনের দায় শব্দসন্ধানীর। তাই থিসরাস থেকে নেয়া যে কোন শব্দ ব্যবহারের পূর্বে তার অর্থ জানা আবশ্যক। আর সেই কাজটি করবে প্রচলিত অভিধান, সমার্থক শব্দকোষ নয়।

সংসদ সমার্থশব্দকোষ’ গ্রন্থটির মলাটের ভিতরের ফ্ল্যাপে এই বই সম্পর্কে কয়েকজন প্রাজ্ঞ বাঙালির মন্তব্য রয়েছে। বইটির গ্রহণযোগ্যতা বুঝতে মন্তব্যগুলোর পাঠ প্রণিধানযোগ্য বলে মনে করি।
  • সমার্থশব্দকোষ (সংসদ) বঙ্গভাষা ও সাহিত্যে একটি অতুলনীয় সংযোজন। যাঁহারা বাহুল্যবর্জিত, প্রসাদগুণবিশিষ্ট অথচ তাৎপর্যসমৃদ্ধ বাংলা লিখিতে অগ্রসর হইবেন, তাঁহারা নিশ্চয়ই এই গ্রন্থের সমাদর করিবেন। - সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত
  • সমার্থশব্দকোষ ব্যবহার করে আমি বিশেষ উপকৃত হয়েছি। বাংলায় থিসরাস ছিল না, এই বই সে অভাব পূরণ করবে। যেকোনো বাংলা লেখকের পক্ষেই বইটি অপরিহার্য বলে আমি মনে করি। – সত্যজিৎ রায়
  • এমন উপকারী ও দরকারি বন্ধু আর নেই। বাংলায় প্রকৃত থিসরাস তিনিই উপহার দিলেন – অমিতাভ চৌধুরী
  • এ কথা দ্বিধাহীনভাবে বলা চলে যে কী পূর্ণাঙ্গতার বিচারে, কী সামগ্রিক উপযোগিতার বিচারে সমার্থশব্দকোষ যেকোনও বাংলা-ভাষা-ব্যবহারকারী টেবিলে রাখার মতো বই। - আনন্দবাজার পত্রিকার
  • এতদিনে বাংলায় একটি প্রয়োজনীয় থিসরাস হলো। – যুগান্তর
মণীষীগণ কত তারিখে কোন পত্রিকায় বা সাক্ষাৎকারে এই কথাগুলো বলেছেন তার উল্লেখ ফ্ল্যাপে ছিল না। ফলে সত্যজিৎ রায়ের মন্তব্যটির মূল্যায়ন অপেক্ষাকৃত কঠিন। কারণ এই ‘সংসদ সমার্থশব্দকোষ’ এর পূর্বেই ‘যথাশব্দ’ প্রকাশিত হয়েছিল। দুঃখজনক যে, তার খবর হয়তো সত্যজিৎ রায়ের নিকট পৌঁছায় নি। যা হোক, শব্দসন্ধানী শব্দশিকারীদের জন্য ‘যথাশব্দ’ গ্রন্থটির মত ‘সংসদ সমার্থশব্দকোষ’ একটি অবশ্য প্রয়োজনীয় সংগ্রহযোগ্য অভিধান। উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত শব্দের সন্ধান দিতে প্রত্যেকটিই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। একে অপরের পরিপূরক নয়, তবে লেখক বা বক্তার সন্তুষ্টির জন্য দুই বইয়েরই  নিবিড় অধ্যয়ন ও নিয়মিত ব্যবহার অত্যাবশ্যক।

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করার পূর্বে মন্তব্যর নীতিমালা সম্পাদকের স্বীকারোক্তি পাঠ আবশ্যক। ইচ্ছে করলে ই-মেইল করতে পারেন।