চার্লস বুকোস্কি সংখ্যা, 'বিন্দু' পত্রিকার একটি দুঃসাহসিক প্রয়াস- মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান

বিন্দু পত্রিকার চার্লস বুকোস্কি সংখ্যা প্রচ্ছদচিত্র


সাম্য রাইয়ান সম্পাদিত এবং ঘাসফুল প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত চার্লস বুকোস্কি: কবিতা, গদ্য, সাক্ষাৎকার, ইশতেহার ও পর্যালোচনা সংকলনটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম বিতর্কিত ও প্রাতিষ্ঠানিকতা-বিরোধী কণ্ঠস্বরকে নিজস্ব ভাষায় আত্মস্থ করার এক দুঃসাহসিকভাবে সফল প্রয়াস। চার্লস বুকোস্কি বিশ্বসাহিত্যে এমন এক অসামান্য নাম, যা মধ্যবিত্তের মেকি নৈতিকতা, সাহিত্যিক আভিজাত্য এবং সামাজিক ভণ্ডামির মুখে এক সশব্দ চড়। সম্পাদক সাম্য রাইয়ান ও অনুবাদক-প্রাবন্ধিকবৃন্দ এই সংকলনটির মাধ্যমে বুকোস্কির সেই নগ্ন, কদর্য অথচ অদ্ভুতভাবে সততায় মোড়ানো বিশ্বকে বাংলাভাষী পাঠকের কাছে অত্যন্ত জীবন্ত ও বস্তুনিষ্ঠ রূপে হাজির করেছেন। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত সাতশত টাকা মূল্যের এই বিশাল গ্রন্থটি চার্লস বুকোস্কির কাব্য, গল্প, সাক্ষাৎকার, নিজস্ব নান্দনিক ইশতেহার এবং সমকালীন প্রাবন্ধিকদের গভীর সমালোচনামূলক আলোচনার এক অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ, যা বাংলা ভাষায় আন্তর্জাতিক কোনো লেখককে নিয়ে করা সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ কাজগুলোর একটি।

বইটির সূচনাতেই সম্পাদক সাম্য রাইয়ান তাঁর ‘প্রারম্ভিক’ বয়ানে বুকোস্কি পাঠের এক তীব্র ও অনস্বীকার্য বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছেন। বাংলাদেশের সমাজ ও নাগরিক জীবনের রুটিনবদ্ধ, স্থবির কিংবা কৃত্রিম বিপ্লবের মধ্যবিত্ত চশমায় বুকোস্কি যে চরম অস্বস্তি তৈরি করেন, সম্পাদক তা সততার সঙ্গে স্বীকার করেছেন। বুকোস্কি মানুষকে ভালো হওয়া, সকালে উঠে বিছানা গুছিয়ে ফেলা কিংবা নৈতিকতার পাঠ দেওয়া কোনো মোটিভেশনাল বা ইতিবাচক জীবনের দিশারী নন; বরং তিনি বারবার মনে করিয়ে দেন মানুষের ভেতরের অলসতা, ব্যর্থতা, হিংসা, কামুকতা ও ভণ্ডামির কথা। এই সংকলনটি পাঠ করতে গিয়ে পাঠক খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারেন যে, বুকোস্কির কদর্যতা মূলত কোনো সস্তা বিনোদন বা আলোড়ন তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়নি, বরং তা জীবনের সেই অনস্বীকার্য বাস্তবতার নথি—যা হাসপাতাল, মর্গ, শ্রমিক কলোনি, মাতালের বমি কিংবা প্রেমের চরম প্রতারণাকে বাদ দিয়ে সাহিত্য তৈরি করতে চায় না।

সংকলনটির প্রারম্ভেই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে শন পেনের নেওয়া চার্লস বুকোস্কির কালজয়ী সাক্ষাৎকারটি, যার প্রাঞ্জল ও গতিশীল অনুবাদ করেছেন ঋতো আহমেদ। সাক্ষাৎকারটিতে বুকোস্কির চিরচেনা স্পষ্টবাদিতা, অ্যালকোহল ও ধূমপানের প্রতি তাঁর অবিচল আসক্তি, বিড়ালের প্রতি গভীর ব্যাকুলতা, নারী ও যৌনতার জটিল মনস্তত্ত্ব, শেক্সপিয়ার বা বিখ্যাত কবিদের প্রতি তাঁর তীব্র কটাক্ষ এবং জীবনের শেষপ্রান্তে এসে মৃত্যুভাবনা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। পেনের সঙ্গে কথপোকথনে বুকোস্কি যেভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন না করে নিজের দুর্বলতা, একাকীত্ব ও ক্ষোভকে নির্দ্বিধায় তুলে ধরেন, তা বুকোস্কির মূল চরিত্রটি অনুধাবনে অত্যন্ত সহায়ক। সাক্ষাৎকারের পর সুশান্ত বর্মণের অনুবাদে ‘নির্বাচিত উক্তি’ অংশটি বুকোস্কির জীবনদর্শনের মূল কথাগুলোকে পাঠকের সামনে উন্মোচিত করে। সেখানে বুদ্ধিমত্তা ও সন্দেহপ্রবণতার সম্পর্ক কিংবা ভালোবাসার মাধ্যমে আত্মধ্বংসের খোঁজে নামার মতো প্রথাভাঙা বাক্যগুলো সংকলনটিকে এক চমৎকার সূচনা এনে দেয়।

বইটির ইশতেহার অংশে রথো রাফির ভাষান্তরে ‘আমাদের নিজস্ব সমালোচকদের জন্য আহ্বান’ এবং ‘শ্বাস-প্রশ্বাসের গণিত আর উপায় নিয়ে’ গদ্য দুটি বুকোস্কির সাহিত্যিক অবস্থানের এক অনবদ্য দস্তাবেজ। প্রাতিষ্ঠানিক ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সমালোচকদের তিনি যেভাবে কাব্যিক নিশ্চলতা তৈরির জন্য অভিযুক্ত করেছেন এবং জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে টাইপরাইটারের বোতামে রূপ দেওয়ার যে তীব্র তাগিদ দিয়েছেন, তা যেকোনো স্বাধীন শিল্পমনস্ক পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বুকোস্কি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, শিল্পচর্চা কোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের দৈনন্দিন টিকে থাকার সংগ্রাম ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই স্বাভাবিক একটি শারীরিক প্রক্রিয়া।

বুকোস্কির গদ্য সাহিত্যের আসল শক্তি ধরা পড়ে তাঁর ছোটগল্পগুলোতে, আর এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলোর সাবলীল অনুবাদের দায়িত্ব পালন করেছেন রথো রাফি। ‘শহরের সবচেয়ে সুন্দরী নারী’ গল্পে ক্যাস নামের এক অভিশপ্ত রূপসীর আত্মপীড়ন ও মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনা বুকোস্কির ডার্টি রিয়ালিজমের এক চরম নিদর্শন। ক্যাস এমন এক চরিত্র, যে নিজের বাহ্যিক সৌন্দর্যকে পুরুষের বস্তুভিত্তিক লালসার শিকার হতে দিতে চায় না এবং নিজের রূপকে কাঁচ দিয়ে বিকৃত করে অস্তিত্বের সততা খোঁজে। এই গল্পের মধ্য দিয়ে বুকোস্কি দেখিয়েছেন কিভাবে সামাজিক সৌন্দর্যের সংজ্ঞা একজন মানুষকে আত্মধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। একইভাবে ‘পৃথিবীতে আর আমার মাঝে যত গুয়া মারা’ কিংবা ‘মৃতরা যেভাবে ভালোবাসে’ গল্পগুলোতে হাসপাতাল, শারীরিক যন্ত্রনা, একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গ মানুষের আবেগের করুণ চিত্র উঠে এসেছে। অন্যদিকে ‘বাপের মৃত্যু’ গল্পে পিতা-পুত্রের জটিল সম্পর্ক ও পরিবারের ভিতরের অদৃশ্য ক্ষোভকে কোনো প্রকার আবেগসর্বস্বতা ছাড়াই বুকোস্কির নিজস্ব নিরাসক্ত ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।

কবিতা অংশে দীপশেখর চক্রবর্তী, বদরুজ্জামান আলমগীর, অসীম নন্দন, আহসানুল করিম, নীলম সামন্ত, অনিন্দ্য সান্যাল, অভিজিৎ পালচৌধুরী, সাগ্নিক দাস, সৌরভ মজুমদার, মেহেদি হাসান তন্ময় এবং রথো রাফির প্রাঞ্জল অনুবাদে বুকোস্কির কবিতার একটি বিশাল সম্ভার সংকলিত হয়েছে। প্রথাগত ছন্দ বা অলংকারের তোয়াক্কা না করে কীভাবে দৈনন্দিন জীবনের ধূলিমলিন সত্য, কারখানা-শ্রমিকের ক্লান্তি, ঘরের ভিতরের চিৎকার কিংবা সস্তা বারের অভিজ্ঞতা কবিতায় রূপ পেতে পারে, এই অনুবাদগুলো তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। প্রতিটি অনুবাদেই মূল কবির ভাষার যে রুক্ষতা, স্ল্যাং ও ভেতরের সুর, তা বাংলা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপকে ভেঙে অবিকৃতভাবে ধরে রাখার আন্তরিক চেষ্টা চোখে পড়ে।

সংকলনটির অন্যতম প্রধান ও শক্ত ভিত্তি হলো এর ‘পর্যালোচনা’ বা নিবন্ধ অংশটি। সাম্য রাইয়ান, সব্যসাচী মজুমদার, নাহার তৃণা, সব্যসাচী রায়, রথো রাফি, ফারিহা নূর, নিশীথ ষড়ংগী, সিয়াম আল জাকি, মৃণাল পাল, তামিম রেজা, সুবীর সরকার, সুতপা ব্যানার্জী, প্রদীপ চক্রবর্তী, মাসুদুল হক, চঞ্চল নাঈম, সাইদ মুহাম্মাদ ওলিউল্লাহ ও নিমাই জানার মতো প্রাবন্ধিকদের বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধগুলো বইটিকে কেবল অনুবাদের সীমানা ছাড়িয়ে এক গভীর একাডেমিক ও গবেষণামূলক আকর গ্রন্থে রূপান্তর করেছে। এই আলোচনাগুলোতে আমেরিকান ড্রিমের বিপরীত চিত্র, লুম্পেনের শৌর্য, ডার্টি রিয়ালিজমের বিশ্বজনীন প্রেক্ষাপট, বুকোস্কির সাহিত্যের যৌনতা ও নারী মনস্তত্ত্ব, এবং বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষিত নিয়ে বিস্তৃত ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে। নিবন্ধগুলো পাঠ করার পর পাঠক বুকোস্কিকে কেবল এক মাতাল বা ক্ষ্যাপাটে লেখক হিসেবে না দেখে, আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ছাঁচ থেকে ছিটকে পড়া প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।

বুকোস্কির সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের মূলধারার সাথে সমন্বিত করে দেখানোর লক্ষ্যে সংকলনে ‘ডার্টি রিয়ালিজমের আরো গল্প’ শিরোনামে রথো রাফির ভাষান্তরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে রেইমন্ড কার্ভারের ‘ক্যাথেড্রাল’ এবং রিচার্ড ফোর্ডের ‘কমিউনিস্ট’ গল্প দুটি। এই সংযোজনটি পাঠককে সমকালীন আমেরিকান কথাসাহিত্যের ভিন্ন এক আঙ্গিকের সঙ্গে পরিচিত করায় এবং বুকোস্কির নির্মাণশৈলীর তুলনামূলক পাঠে সাহায্য করে। পরিশেষে অন্তর্ভুক্ত বিস্তারিত জীবনপঞ্জি ও গ্রন্থপঞ্জি গবেষক এবং গভীর অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের জন্য এক মূল্যবান উপহার হিসেবে কাজ করে।

অকালপ্রয়াত অনুবাদক শুভঙ্কর দাশকে উৎসর্গ করা এই সংকলনটি বাংলা সাহিত্যের পাঠকের জন্য নিজস্ব নৈতিকতা ও সাহিত্যিক অভ্যাসের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক বিরল সুযোগ। আহমাদ দারবিশের অত্যন্ত যথোপযুক্ত ও অর্থবহ প্রচ্ছদ এবং বাঙ্ময়ের চমৎকার অক্ষরসজ্জায় সজ্জিত গ্রন্থটি সার্বিকভাবে বিশ্বমানের। চার্লস বুকোস্কির নগ্ন সত্যভাষণ, প্রথাগত সমাজের প্রতি চরম বিদ্বেষ এবং তার আড়ালে জমে থাকা গভীর মানবিক সংবেদনশীলতাকে যারা নিখাদভাবে উপলব্ধি করতে চান, তাঁদের জন্য সাম্য রাইয়ান সম্পাদিত এই আকর সংকলনটি বাংলা সাহিত্যচর্চায় এক অপরিহার্য ও ঐতিহাসিক সংগ্রহ।

~*~*~*~*~*~*~*~*~
বিন্দু পত্রিকা: চার্লস বুকোস্কি সংখ্যা
সম্পাদক: সাম্য রাইয়ান

প্রচ্ছদ: আহমাদ দারবিশ

প্রকাশকাল: ২০২৬
প্রকাশনী: ঘাসফুল প্রকাশনী, ঢাকা।
পৃষ্ঠা: ৩২৮
মূল্য: ৭০০
ISBN:978-984-8746-46-2

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ