এডওয়ার্ড সাঈদের 'বুদ্ধিজীবীর প্রতিচ্ছবি' - তানভীর হক

এডওয়ার্ড সাঈদের 'বুদ্ধিজীবীর প্রতিচ্ছবি' বইয়ের প্রচ্ছদ চিত্র


ফিলিস্তিনী-আমেরিকান বিশিষ্ট তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ (১৯৩৫-২০০৩) ১৯৯৩ সালে বিবিসি রেডিওতে ছয়টি 'Reith Lectures' প্রদান করেন। তাঁর সেই বিখ্যাত বক্তৃতামালার সংকলনই হলো "Representations of the Intellectual", যা বাংলায় ভাষান্তর করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তরুণ শিক্ষক দেবাশীষ কুমার কুন্ডু। 

এডওয়ার্ড সাঈদ প্যালেস্টাইনে এক প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার সূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়া সাঈদের শৈশব কাটে জেরুজালেম ও কায়রোতে, যেখানে তিনি অভিজাত ব্রিটিশ বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (ব্যাচেলর) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি (PhD) সম্পন্ন করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। 

১৯৭৮ সালে প্রকাশিত সাঈদের যুগান্তকারী গ্রন্থ 'Orientalism' তাঁকে বিশ্বজুড়ে একজন খ্যাতিমান তাত্ত্বিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। একাডেমিক কাজের পাশাপাশি সাঈদ ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের সাথেও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৭৭ সালে ফিলিস্তিনী পার্লামেন্টের প্রবাসী সদস্য নির্বাচিত হন। তবে ১৯৯১ সালে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন চুক্তির শর্তাবলীর সাথে একমত হতে না পেরে তিনি দীর্ঘ ১৪ বছরের এই দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেন। কর্মজীবনে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও সাঈদ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পশ্চিমা আধিপত্যবাদী নীতি ও তাদের বিভিন্ন প্রকল্পের আসল স্বরূপ উন্মোচন ও বিশ্লেষণ করে গেছেন। 

এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর "Representations of the Intellectual" গ্রন্থে বুদ্ধিজীবীর আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, বুদ্ধিজীবী কে? তাঁর উদ্দেশ্য, দায়িত্ব, ব্যাপ্তি এবং প্রকৃত স্বরূপই বা কেমন? সাঈদ মূলত ইতিহাস, সাহিত্য ও সভ্যতার পরম্পরায় এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের বুদ্ধিজীবী—যাঁরা প্রতিনিয়ত নানামুখী আদর্শিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হন, তাঁদের প্রতি সাঈদের বিশেষ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। সাঈদ মনে করেন, বুদ্ধিজীবীদের কাজ কেবলই সরকারের নীতির সমালোচনা করা নয়; বরং তাঁরা সর্বদা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চিরন্তন বুদ্ধিবৃত্তিক আদর্শ লালন করেন। একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবী কোনো ‘অর্ধ-সত্য’ কিংবা ‘সর্বজনগ্রাহ্য বিষয়’ কখনো বিনা প্রশ্নে মেনে নেন না।

ইতালীয় মার্ক্সবাদী দার্শনিক ও কমিউনিস্ট রাজনীতিক আন্তোনিও গ্রামসি (১৮৯১-১৯৩৭) এবং ফরাসি দার্শনিক ও সমালোচক জুলিয়েন বেন্দার (১৮৬৭-১৯৫৬) বুদ্ধিজীবী সংক্রান্ত ধারণা নিয়ে এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর Representations of the Intellectual গ্রন্থে যে তুলনামূলক চিত্র এঁকেছেন, তা অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

গ্রামসি তাঁর Prison Notebooks- এ দুই ধরনের বুদ্ধিজীবীর কথা বলেছেন—'ট্রেডিশনাল ইনটেলেকচুয়ালস' (Traditional Intellectuals) বা প্রথাগত বুদ্ধিজীবী এবং 'অর্গানিক ইনটেলেকচুয়ালস' (Organic Intellectuals) বা জৈব বুদ্ধিজীবী। শিক্ষক, পুরোহিত ও প্রশাসকগণ প্রথাগত বুদ্ধিজীবীর অন্তর্ভুক্ত, যাঁরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ঐতিহাসিকভাবে একই ধরনের সামাজিক ভূমিকা পালন করে আসছেন। অন্যদিকে, জৈব বুদ্ধিজীবীগণ সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের সাথে যুক্ত থাকেন। এই শ্রেণির উত্থান ঘটে মূলত নিজেদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ সুসংগঠিত করা, ক্ষমতা অর্জন ও সমাজে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থেকে। তবে গ্রামসি মনে করেন, সমাজে সবাই বুদ্ধিজীবী হিসেবে কাজ না করলেও, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই বুদ্ধিজীবী হয়ে ওঠার সুপ্ত সম্ভাবনা রয়েছে। 

বিপরীতে, জুলিয়েন বেন্দা ১৯২৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ The Betrayal of the Intellectuals -এ বুদ্ধিজীবীর একটি শাশ্বত বা প্লেটোনিক সংজ্ঞা দিয়েছেন। তাঁর মতে, বুদ্ধিজীবী হলেন অতি-বুদ্ধিমান ও উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন 'দার্শনিক-রাজা'দের (Philosopher-Kings) একটি ক্ষুদ্র অভিজাত দল, যাঁরা মূলত মানবজাতির বিবেক হিসেবে কাজ করেন। বেন্দা আক্ষেপ করে বলেন যে, আধুনিক বুদ্ধিজীবীরা সত্য ও ন্যায়ের নির্মোহ বিশ্লেষণ পরিহার করে সংকীর্ণ স্বার্থ, দলীয় রাজনীতি ও উগ্র জাতীয়তাবাদের কাছে নিজেদের বিকিয়ে দিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। 

এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর গ্রন্থজুড়ে গ্রামসি ও বেন্দার এই বিপরীতমুখী দুটি দৃষ্টিভঙ্গিকে কষ্টিপাথর হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি অন্বেষণ করার চেষ্টা করেছেন— বর্তমান সমাজে একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর আসলে কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়। 

সাঈদ মনে করেন, বুদ্ধিজীবীকে সর্বদা নির্বাসনের আবরণ ধারণ করতে হবে— আক্ষরিকভাবে না হলেও, অন্তত রূপক অর্থে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি নিক্সন ও ফোর্ড সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জার এবং রাষ্ট্রপতি কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেজিনস্কি হলেন ঠিক এমনই দুই ব্যক্তিত্ব; যদিও সাঈদ উল্লেখ করেছেন যে, তাঁরা দুজনেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী স্বার্থকে এগিয়ে নিতে নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন। 

সাঈদ পেশাদারদের চেয়ে অপেশাদার বুদ্ধিজীবীদের বেশি সমর্থন করেছেন। পেশাদাররা সাধারণত দুর্বোধ্য শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করেন, কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ পান এবং পৃষ্ঠপোষক ও সংস্থাকে খুশি করতে সদা উদ্বিগ্ন থাকেন। তাঁরা অতি উজ্জ্বল একাডেমিক প্রশংসাপত্র ও সামাজিক কর্তৃত্বের অধিকারী হলেও কোনো মুক্ত বিতর্কের পরিবেশ তৈরি করেন না; বরং নিজেদের খ্যাতি প্রতিষ্ঠা করতে এবং অন্যদের ভীতি প্রদর্শন করতে ভালোবাসেন। এর বিপরীতে, অপেশাদার বুদ্ধিজীবীরা যেকোনো বিষয়কে আরও বিস্তৃত পরিসরে বোঝার চেষ্টা করেন। 

আলোচ্য গ্রন্থের অধিকাংশ অংশ জুড়েই রয়েছে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে পণ্ডিতদের অবিমিশ্র প্রশংসা। এর আগে এডওয়ার্ড সাঈদের বিখ্যাত 'ওরিয়েন্টালিজম' (Orientalism) গ্রন্থে তাঁর মৌলিক ও উদ্ভাবনী চিন্তা-চেতনার পরিচয় পেয়েছি; তবে সেই তুলনায় এই গ্রন্থটিকে কিছুটা রক্ষণশীল বলেই মনে হয়।

 

-*-*-*-*-*-*-*-*-*-*-
Representations of the Intellectual (বুদ্ধিজীবীর প্রতিচ্ছবি)
এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ

অনুবাদ: দেবাশীষ কুমার কুন্ডু
সম্পাদনা ড. মাহবুবা নাসরীন

প্রচ্ছদশিল্পী: পিযুষ দস্তিদার
প্রকাশকাল: ২০০৯
প্রকাশনী: সংবেদ, ঢাকা
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৮৭
মূল্য: ২০০ টাকা
ISBN: 9843000002008 

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ