'লিলিয়ানা ও একটি ঘরবউনি সাপ’- সাদিয়া সুলতানার অন্য এক গল্পকথন - নুসরাত জাহান

সাদিয়া সুলতানার গল্পগ্রন্থ 'লিলিয়ানা ও একটি ঘরবউনি সাপ’এর প্রচ্ছদ

মানুষের জীবনের প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি মুহূর্ত যেন একেকটি গল্পের প্লট। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সফলতা-ব্যর্থতা, চঞ্চলতা-স্থবিরতার ভিড়ে কখনও রোমাঞ্চকর সময়, আবার কখনও নিরুত্তাপ যাত্রা। এতসবের ভিড়ে নারীজীবন একেবারেই অন্যরকম এক আবহ। ভিন্ন ভিন্ন চব্বিশটি আবহে আবিষ্ট চব্বিশটি ছোটগল্প নিয়ে লেখক সাদিয়া সুলতানার গল্পগ্রন্থ লিলিয়ানা ও একটি ঘরবউনি সাপ। এর আগেও লেখকের একাধিক লেখা পড়া হলেও, এই গ্রন্থে যেন এক ভিন্ন রকম গল্পকারকে আবিষ্কার করেছি।

রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে পাঠকের অনুভূতির বিষয়ে বলেছিলেন, “শেষ হয়েও হইলো না শেষ।” এই গল্পগুলোও তেমনি—আবিষ্ট হতে হতেই সমাপ্তি। তারপর পাঠকের থমকে যাওয়া, কিংবা সমাপ্তি খুঁজতে গিয়ে একরাশ ভাবনায় ডুবে যাওয়া।

ইদানীং খুঁজে খুঁজে নারীজীবন কিংবা নারী লেখকদের লেখা পড়া হচ্ছে প্রচুর। একজন পুরুষ হয়ে নারীর অবস্থান ব্যাখ্যা করা আর নারী হয়ে সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে পৃথিবীকে দেখা— যেমন বিস্তর ফারাক, তেমনি লেখাজোখার উপস্থাপনাতেও কোথাও একটা সূক্ষ্ম ফাঁক থেকেই যায়। অনুভূতিসম্পন্ন মানবীর চোখে এক অদ্ভুত বিপন্ন পৃথিবীর উপস্থাপনা বিমূর্ত হয়ে ধরা দেয় এই পাঠকের ইন্দ্রিয়সত্তায়। পরপর নারী লেখকদের লেখা পড়তে গিয়ে এমন অসংখ্য সূক্ষ্ম বিষয় সম্ভবত ভিন্ন রকমভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হচ্ছে। একেবারেই ব্যতিক্রম উপলব্ধি। এই গল্পগুলো সেই উপলব্ধিকেই আরও গাঢ় করে তুলেছে।

লেখক অবশ্য শুরুতেই স্পষ্ট করেছেন, 

এই সংকলনের প্রতিটি আখ্যান কোনো না কোনো নারী চরিত্র ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। পাঠককে স্বস্তি দিতে তবু জানানো প্রয়োজন মনে করছি যে, ‘লিলিয়ানা ও একটি ঘরবউনি সাপ’ গ্রন্থের গল্পগুলো কেবল নারীর নয়, পুরুষেরও।

কৌতূহলোদ্দীপক ও আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ পেরোতেই প্রথম গল্প কিন্নর। কিছু সত্যি, কিছু ঘটনা আমাদের ভীষণ অস্বস্তির মুখোমুখি দাঁড় করায়। এটি তেমনি এক নির্মম বাস্তব কিন্তু অস্বস্তিকর গল্প। লেখকের ঈশ্বরকোল উপন্যাসিকাটি পড়েছিলাম কিছুদিন আগে। প্লটের মূল অংশে মিল থাকলেও গল্পটির নির্মাণ-বৈচিত্র্য ভালো লেগেছে। তবে ক্রম অনুযায়ী সাজাতে গিয়ে এই গল্পটি আরেকটু পিছিয়ে দিলেই হয়তো ভালো হতো। শুরুতেই এমন ধাক্কা নেওয়ার জন্য সব পাঠক প্রস্তুত না-ও হতে পারেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেই চারপাশে প্রতিনিয়ত চাউর হওয়া জীবনের এইসব অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে বেড়াতে চাই। সেইদিক থেকে লেখককে বেশ সাহসী হিসেবেও ধরা যায়।

দোলনা গল্পটিতে মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের অপূরণীয় ইচ্ছে কিংবা চিরকাল মনের গহীনে বয়ে বেড়ানো নীপার শখের অপূর্ণতার কথা। আবার নামঞ্জুর গল্পে স্বামীর জেলজীবন, এক নারীর জীবনের স্বস্তি এবং মা-ছেলের মানসিক প্রশান্তির বার্তা। লোকে কী বলবে? -গল্পে জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে শেষপর্যন্ত মায়ের সারাজীবন লালন করা সংস্কার— লোকে কী বলল, না বলল, সেইসব পিছুটান উপেক্ষা করে বেরিয়ে আসা— এসব তো আমাদের চারপাশেরই প্রতিবিম্ব।

যে দেশে মানুষ নেই, গোলচেহারার আয়না, মাছগুলো সাঁতার জানে না, কাজলগৌরী ইলিশ— প্রতিটি গল্পেই লুকিয়ে রয়েছে একেকটি টুইস্ট। আর সবকিছুকে ছাপিয়ে 'ভাতের নামতা' গল্পটি আমাদের সামনে উপস্থাপন করে এ সমাজ-সংসার তথা জীবনের আরেক নির্মম বাস্তবতা। অল্প কিছু কথায় ছোট্ট গল্পটি যেন মুহূর্তেই থমকে দেয়, থামিয়ে দেয়। পুরুষ, পুরুষ নয় গল্পটিও উন্মোচন করে কিছু অস্বীকৃত কিন্তু জীবনঘনিষ্ঠ ঘটনাবলি।

সবশেষে রয়েছে বইটির নামগল্প 'লিলিয়ানা ও একটি ঘরবউনি সাপ'। এ তো এদেশের মানুষের, মানবীর ঘরের কথা, তথা সংসারের কথা—  আমাদেরই কথা। গল্পটির ভেতর দিয়ে যে ঘর, যে সম্পর্ক, যে চেনা অথচ অনুচ্চারিত বাস্তবতা সামনে আসে, তা শেষ পর্যন্ত কেবল একটি পরিবারের গল্প হয়ে থাকে না। আমাদের চারপাশের অসংখ্য ঘরের সঙ্গে তার কোথাও না কোথাও মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

পেশাগত জীবনের সুবাদে লেখক সাদিয়া সুলতানার প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করবার সুযোগ হয় সমাজের নানাবিধ অসংগতি এবং ঘটনাবলী। সেইসব অভিজ্ঞতা থেকে তুলে আনেন লেখার নির্যাস। তাই হয়তো গল্পগুলোকে এত বেশি জীবন ঘনিষ্ঠ মনে হয়।

'ঈশ্বরকোল'-এ যে তীব্র মানবিক বোধ ও অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা পেয়েছিলাম, লিলিয়ানা ও একটি ঘরবউনি সাপ-এ তারই যেন আরও বিচিত্র, আরও বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটেছে। আর 'সমুদ্র সমগ্র' -এর স্মৃতি ও অনুভবনির্ভর ভুবনের তুলনায় এই গল্পগ্রন্থ অনেক বেশি চরিত্রনির্ভর, ঘটনাবহুল এবং জীবনঘনিষ্ঠ। তিনটি বই যেন তাঁর লেখকসত্তার তিনটি আলাদা জানালা— কোথাও মানুষ, কোথাও স্মৃতি, কোথাও নারীর ঘর-সংসার ও অপ্রকাশিত জীবন এসে দাঁড়িয়েছে পাঠকের সামনে।

সব মিলিয়ে, "লিলিয়ানা ও একটি ঘরবউনি সাপ" কেবল চব্বিশটি গল্পের সংকলন নয়। এটি চব্বিশটি জীবনের ভেতর দিয়ে চেনা পৃথিবীটাকে আরেকবার দেখার সুযোগ। গল্পগুলো পড়ে শেষ করেছি, কিন্তু শেষ করতে পারিনি তাদের। কিছু চরিত্র রয়ে গেছে, কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে, কিছু অস্বস্তি রয়ে গেছে। হয়তো ছোটগল্পের সার্থকতাও এখানেই— শেষ হয়েও হইলো না শেষ।

'জলধি' কর্তৃক প্রকাশিত গল্পগ্রন্থটির দারুণ সিম্বোলিক প্রচ্ছদ করেছেন তাইফ আদনান। গল্পগুলোর শেষে লিখিত রচনাকাল পাঠককে সময়ের সাথে সংযোগ ঘটাতে সহায়তা করে। বইটির প্রকাশকাল - অক্টোবর ২০২৪। ১৬৮ পৃষ্ঠা বিশিষ্ট বইটির মুদ্রিত মূল্য ৪০০টাকা। ISBN: 978-984-97925-0-5

মতামত:_

0 মন্তব্যসমূহ